আপনিও বোধ হয় প্রাসাদের বাইরেই থাকেন?
আজ্ঞে ওর নাম কি, সকলেই যখন বাইরে থাকেন, বাজার সরকার আমি…ঐ তারিণী খুড়োর ঘরটাতেই আমি থাকি।
চিৎকারটা আপনিও তাহলে শুনতে পেয়েছিলেন? আর এও হয়তো জানতে পেরেছেন, তারিণীবাবু কখন ঘর থেকে বের হয়ে যান? .
তা পেরেছিলাম বৈকি। তবে ওর নাম কি, জানি না খুড়ো কখন ঘর হতে বের হয়ে যান। মানে টের পাইনি।
কেন, সে সময় আপনি কি করছিলেন? মানে, জেগে না ঘুমিয়ে?
বোধ হয় ওর নাম কি, ঘুমিয়েই ছিলাম।
বোধ হয় ঘুমিয়ে ছিলেন, এ কথার মানে?
আজ্ঞে, ওর নাম কি, রাজবাড়ির বাজার সরকার আমি, আমার যে কখন জাগরণ কখন নিদ্রা আমি নিজেই টের পাই না। তবে ওর নাম কি, কেমন করে বলি বলুন স্যার, আমি ঘুমিয়েই ছিলাম না জেগেই ছিলাম। কারণ ঘুমোলেও আমাদের জেগে থাকতে হয়, জাগা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে নিতে হয়। এই দেখুন না স্যার, ওর নাম কি, আজ প্রায় পনের বছর একাদিক্রমে এই রাজবাড়িতে বাজার সরকারের কাজ করে আসছি, শরীরটা ক্রমে শণের দড়ির মত পাকিয়ে যাচ্ছে, তবু ওর নাম কি, পনের বছর আগেকার সুবোধ, একান্ত সুবোধ বালকটির মত বাজার সরকারের পদেই রয়ে গেল। আমার ছোট্ঠাকুদা বলেন, সুবোধ আমাদের সেই সুবোধই আছে। কুড়ি টাকায় ঢুকেছিলাম, এখন সাকুল্যে পচিশে গিয়ে ঠেকেছে। তা ওর নাম কি, করছি কি বলুন!
বিকাশ বুঝতে পেরেছিল, লোকটা একটু বেশীই কথা বলে, এবং মনে মনে খুশি নয়। ক্রমাগত বাজার সরকারের পদে একাদিক্রমে পনের বৎসর তোষামোদ ও মিথ্যার কারবার করে করে, এখন যা বলে তার হয়তো মোল আনাই মিথ্যে। এক্ষেত্রে এ লোকটাকে বেশী ঘাঁটিয়েও বিশেষ কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। তাই সে তাড়াতাড়ি সুবোধকে বিদায় দিল।
রাত্রিও প্রায় শেষ হয়ে এল। পূর্বাকাশে রাত্রিশেষের বিলীয়মান আবছা অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে অস্পষ্ট আলোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এর পর রাজাবাহাদুরের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে, লাশ স্থানীয় হাসপাতালের ময়নাঘরে ময়না-তদন্তের জন্য পাঠাবার ব্যবস্থা করে, সেদিনকার মত বিকাশ রাজবাটী থেকে বিদায় নিল।
ফেরবার পথে বিকাশ ও সুব্রত একসঙ্গেই পথ অতিক্রম করছিল। সুব্রত বললে, চলুন বিকাশবাবু, রাত্রি প্রায় ভোর হয়ে এল, আমার ওখানে এক কাপ চা খেয়ে যাবেন। এবং চা খেতে খেতে জবানবন্দিতে কি জানতে পারলেন তা শোনা যাবে।
বেশ চলুন, বকবক করে করে গলাটাও শুকিয়ে গেছে, এক কাপ চা এ সময় তো দেবতার আশীবাদ! জবানবন্দিতে বিশেষ কিছু জানা গেছে বলে তো আমার মনে হয় না। সবই টুকে এনেছি, পড়ে দেখুন যদি কিছুর সন্ধান পান।
দুজনে এসে সুব্রতর বাসায় উপস্থিত হল। থাকোহরিকে ডেকে চায়ের ব্যবস্থা করতে বলে সুব্রত বিকাশকে নিয়ে বারান্দায় দুটো চেয়ার পেতে বসল। রাত্রিশেষের বিলীয়মান তরল অন্ধকারে চারিদিক কেমন যেন স্বপ্নাতুর মনে হয়।
১.১৪ আরও সাংঘাতিক
গরম গরম চা-পান করতে করতে সুব্রত গভীর মনোযোগের সঙ্গে গতরাত্রের ঘটনা সম্পর্কে বিকাশের নেওয়া জবানবন্দি ও অন্যান্য নোটগুলি পড়ছিল। বিকাশের একেবারে শতকরা নিরানব্বইজন দারোগাবাবুর মত কেবল পকেটভর্তির দিকেই নজরটা সীমাবদ্ধ নয়। বেশ কাজের লোক এবং একটা জটিল মামলার মধ্য থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বেছে নেওয়ার একটা ন্যাক আছে বলতেই হবে। বিকাশের নেওয়া নোট ও জবানবন্দির কতকগুলো কথা সুব্রতর মনে যেন একটু নাড়া দিয়ে যায়। কথার পিঠে কথা হলেও, কথাগুলোর মধ্যে বেশ একটু গুরুত্ব আছে বলে যেন মনে হয়।
চা পান ও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা চালাবার পর বিকাশ সুব্রতর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল তখনকার মত। বলে গেল সন্ধ্যার দিকে আবার এদিকে আসবে। বিকাশের যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, সুব্রতও আর মুহূর্ত দেরি না করে গতরাত্রে লাহিড়ীর ঘর থেকে চুরি করে সংগৃহীত কাগজপত্রগুলো ও হিসাবের খাতাটা খুলে নিয়ে বসল।
কাগজপত্রগুলো, সাধারণ কয়েকটা ক্যাশ-মেমো—সেগুলো পরীক্ষা করে তার মধ্যে এমন কোনো বিশেষত্ব পাওয়া গেল না। তবে তার মধ্যে গোটা দুই ইনভয়েস ছিল,-৬০টা ড্রাই সেল ব্যাটারী (সাধারণ টর্চবাতির জন্য যা ব্যবহৃত হয়) কেনা হয়েছে, তারই ইনভয়েস। এতগুলো ব্যাটারী একসঙ্গে কেনবার লোকটার হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন হয়েছিল? একমাসের মধ্যে প্রায় ১২০টা ব্যাটারী কেনা হয়েছে।
যা হোক ক্যাশমেমোগুলো পরীক্ষা করে হিসাবের খাতাটা সুব্রত খুললে। সাধারণ দৈনন্দিন হিসাব নয়, মাসিক মোটামুটি একটা আয় ও ব্যয়ের হিসাব মাত্র।
৫ই নভেম্বর : দু হাজার টাকা ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া হয়েছে।
৭ই নভেম্বর : তারাপ্রসন্ন নামক কোনো ব্যক্তির নামে দশ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
লোকটা কত মাইনে পেত তা সুব্রত জানে। মাসে মাত্র তিনশত টাকা, ইদানীং মাস-দুই হবে চারশত টাকা বেতন পাচ্ছিল। অথচ সুব্রত হারাধনের ওখানে শুনেছে, এখানে আসবার পূর্বে সতীনাথের সাংসারিক অবস্থা খুব খারাপই ছিল। ইদানীং এই কয়েক বৎসর চাকরি করে সে কেমন করে এত টাকার মালিক হতে পারে? এর মধ্যে যে একটা গভীর রহস্যের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে সে বিষয়েও কোনো ভুল নেই। এসব ছাড়া দেখা যাচ্ছে,ন্যাশানাল ব্যাঙ্কে কোনো শ্রীপতি লাহিড়ীর নামে প্রতি মাসে ছশত থেকে সাতশত টাকা জমা দেখানো হয়েছে। এই শ্রীপতি লাহিড়ীই বা কে? এ কি লাহিড়ীর কোনো আত্মীয়? না আগাগোড়া শ্রীপতির ব্যাপারটা একটা চোখে ধুলো দেবার ব্যাপার মাত্র!
