রাজবাড়ির পুরাতন চাকর শম্ভু, বর্তমানে শম্ভ রাজাবাহাদুরের খাসভৃত্য, রাজাবাহাদুরের ডাকে এগিয়ে এল ভিড় ঠেলে। যথেষ্ট বয়েস হলেও শরীরের বাঁধুনি খুব চমৎকার শম্ভর।
এই,এখুনি একবার কাউকে বলে দে, ম্যানেজারবাবুর বাসা থেকে বংশী আর জগন্নাথকে ডেকে আনুক, বলে যেন আমি ডাকছি।
কিন্তু শম্ভর আর তাদের ডাকতে যেতে হল না, ভিড়ের মধ্য হতে কে একজন বলে উঠল, রাজাবাবু, তারা এখানেই আছে। এই বংশী, যা রাজাবাবু ডাকছেন।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন মিলে একপ্রকার ঠেলেই লাহিড়ীর ভৃত্য বংশীকে সামনের দিকে এগিয়ে দিল।
লাহিড়ীর বংশীই ছিল একমাত্র ভৃত্য ও জগন্নাথ উৎকলবাসী রসুয়ে বামুন। বংশীর বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, জাতিতে সদগোপ। অত্যন্ত হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, চকচকে কালো গায়ের রং, মাথার চুলগুলো লম্বা লম্বা, তার প্রায় তিনের-চার অংশ পেকে সাদা হয়ে গেছে।
তোর নাম কি রে? বিকাশ প্রশ্ন করে।
আজ্ঞে বংশী কতা, বংশী কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দেয় কোনোমতে, একটা বড় রকমের ঢোঁক গিলে। লোকটা যে ভয় পেয়েছে তা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। সেই কারণেই হয়ত সে ভিড়ের মধ্যে আত্মগোপন করতেই চেয়েছিল। প্রভুর আকস্মিক মৃত্যুতে সে রীতিমত ভয় তো পেয়েই ছিল, হকচকিয়েও গিয়েছিল।
বাসা থেকেই গোলমাল শুনতে পেয়েছিস?
হ্যাঁ বাবু।
কতদিন বাবুর বাসায় কাজ করছিস?
প্রায় দেড় বছর হবে বাবু।
এখানে তুই কতক্ষণ এসেছিস?
আজ্ঞে বাবু, গোলমাল শুনেই তো ছুটে এলাম।
তাহলে বাসায় ছিলি বল?
হ্যাঁ বাবু।
তোর বাবু কতক্ষণ বাসা ছেড়ে এসেছে বলতে পারিস?
এই তো সবে এক ঘণ্টাও হবে না, কে একটা লোক একটা চিঠি নিয়ে এল। বাবু বাইরের বারান্দায় বসেছিলেন। খাবার হয়ে গেছে, খেতে আসবেন, এমন সময় চিঠি পেয়ে আমাকে বললেন, বংশী, আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঘুরে আসছি, ঠাকুরকে খাবার এখন দিতে বারণ। করে দে। ফিরে এসে খাবখন।
কে চিঠি নিয়ে গিয়েছিল? কোথা থেকেই বা চিঠি নিয়ে এল, জানিস কিছু? বাবু বলেননি, কোথা যাচ্ছেন?
আজ্ঞে না, শুধু বলে এলেন ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসবেন।
যে লোকটা চিঠি নিয়ে গিয়েছিল তাকে তুই ভাল করে দেখেছিলি? চিনতে পেরেছিলি লোকটাকে?
আজ্ঞে না কত, তাকে আমি আগে কখনও দেখিনি।
লোকটা লম্বা না বেঁটে? রোগা না মোটা? দেখতে কেমন?
আজ্ঞে লোকটার মাথায় একটা পাগড়ী বাঁধা ছিল, লম্বাই হবে, হাতে একটা টর্চবাতি ছিল। তার মুখ আমি দেখিনি।
লোকটা চিঠিটা দিয়েই চলে গেল, না সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল?
আজ্ঞে আমি বারান্দার অন্য ধারে বসেছিলাম, লোকটা চিঠি দিয়েই চলে গেল।
কোনো দিকে গেল?
আজ্ঞে বাড়ির বাইরে চলে গেল, দেখতে পাইনি কোন্ দিকে গেল তারপর।
লোকটা চলে যাওয়ার পরই তোর বাবু চলে আসেন?
হ্যাঁ, ভিতরে গিয়ে একটা জামা গায়ে দিয়ে বের হয়ে এলেন।
বাবু বাড়ি থেকে বের হয়ে আসবার কতক্ষণ পরে তুই গোলমাল শুনতে পাস?
তা পনের-কুড়ি মিনিটের মধ্যেই হবে হুজুর।
এর পর বিকাশ মৃতদেহের জামার পকেটগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। লাহিড়ীর পরিধানে ধুতি ও একটা সাধারণ সিল্কের পাঞ্জাবি। কিন্তু পাঞ্জাবির কোনো পকেট থেকেই কোনো কাগজ বা চিঠিপত্র পাওয়া গেল না, একটা সাদা ক্যালিকো মিলের রুমাল, একটা চাবির রিং ও পার্স পাওয়া গেল মাত্র, কিন্তু সেগুলো হতে কোনো সূত্রই পাওয়া যায় না।
রাজাবাহাদুর বললেন, দারোগাবাবু, এখানে এত লোকজনের মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে এদের জেরা না করে, আমার খাস কামরায় চলুন না? সেখানে বসেই যাকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয় করবেন।
সেই ভাল কথা, চলুন।
এর পর সকলে রাজাবাহাদুরের খাস কামরায় এসে প্রবেশ করল, সুব্রতও সঙ্গে সঙ্গে গেল।
বিকাশ একটা আরাম-কেদারায় বেশ জাঁকিয়ে বসল। তারপর বললে, রাজাবাহাদুর, সর্বাগ্রে আপনার সঙ্গেই আমার কয়েকটা কথা আছে। তারপর যাকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করবার করবখন।
রাজাবাহাদুর ক্লান্ত স্বরে বললেন, বেশ। বলুন কি জানতে চান?
আপনার ম্যানেজার ও সেক্রেটারী লাহিড়ীর মৃত্যু-ব্যাপারটা যে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড, তা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন! এই মাত্র অল্প কিছুদিন হবে আমার এখানে বদলি হয়ে আসবার আগে আপনাদের পরিবারের মধ্যে একটা বিশ্রী হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। যার ফলে আপনাদের কম ধকল সহ্য করতে হয়নি, অর্থব্যয়ও কম হয়নি, আবার আজকের এই ব্যাপার!
বিকাশবাবুর কথা শেষ হল না, সহসা যেন প্রচণ্ড একটা অট্টহাসির শব্দ নিশীথের নিথর স্তব্ধতাকে দীর্ণ-বিদীর্ণ করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল—হাঃ হাঃ হাঃ…!
ও কি! অমন করে হাসলে কে? চমকে উঠে প্রশ্ন করলে বিকাশ। প্রথমটায় রাজাবাহাদুরও যেন একটু চমকে গিয়েছিলেন, কিন্তু করে সামলে নিলেন যেন, বললেন, আমার দূরসম্পকীয় খুড়ো নিশানাথ মল্লিক। শোলপুর স্টেটে চিত্রকর ছিলেন, মাসপাঁচেক হয় মাথার গোলমাল হওয়ায় চাকুরি গেছে। বুড়ো মানুষ, বিকৃতমস্তিষ্ক, অথর্ব, আমার এখানে এনে রেখেছি। সংসারে ওঁর আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। বিয়ে-থাও করেনি। অকারণ অমনি হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠা, চিৎকার করা, আবোল-তাবোল বকা…এই করছেন আর কি।
এরপর ঘরের সকলেই কিছুক্ষণের জন্য যেন চুপ করে রইল, কারও মুখেই কথা নেই।
