বিকাশই সর্বপ্রথমে আবার ঘরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলে, আচ্ছা রাজাবাহাদুর, বলতে পারেন, সর্বপ্রথম কে লাহিড়ীর মৃতদেহ দেখতে পায়?
তাও ঠিক বলতে পারি না, তবে আমি পড়াশুনা সেরে বিছানায় শুতে যাচ্ছিলাম, এমন ১ময় হঠাৎ একটা চিৎকার শুনতে পেয়েই ছুটে জানলার সামনে যাই। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখলাম, (কেননা আমার ঘরের জানলা থেকে সুস্পষ্ট ভাবে অন্দর ও বহির্মহলের মধ্যকার সংযোগস্থল, ঐ আঙিনাটা দেখা যায়) কে একজন আঙিনায় শুয়ে ছটফট করছে। তখুনি ছুটে নীচে যাই। আমার পোঁছবার আগেই বাড়ির অন্যান্য ভৃত্য ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই চিৎকার শুনে সেখানে ততক্ষণে জুটেছে গিয়ে দেখি।
আপনি যখন আপনার শয়নকক্ষে জানলাপথে নীচের দিকে তাকান, তখন সেখানে আর কাউকেই দেখতে পাননি?
রাজাবাহাদুর সুস্পষ্ট স্বরে বললেন, না।
এমন সময় অতর্কিত একটা কণ্ঠস্বর শুনে সকলেই যুগপৎ সামনের খোলা দরজার দিকে দৃষ্টিপাত করলে।
মিথ্যে কথা। আমি দেখেছি, সেই কালো শয়তানটা! কিন্তু এবারে আর তার হাতে ছাতা ছিল না, একটা মস্তবড় টর্চবাতি ছিল…
একজন দীর্ঘকায় বলিষ্ঠ সুদর্শন পুরুষ, খোলা দরজাপথে ঘরের মধ্যে এসে ইতিমধ্যে কখন দাঁড়িয়েছেন, এ তাঁরই কণ্ঠস্বর। আগন্তুকের বয়স প্রায় পঞ্চাশের ঊর্ধ্বেই হবে। মাথায় ঢেউ-খেলানো শ্বেতশুভ্র বাবরি চুল, মুখের ওপর বার্ধক্যের বলিরেখা সুস্পষ্টভাবে রেখাঙ্কিত হয়ে উঠেছে। আগন্তুক যে যৌবনে একদিন অসাধারণ বলিষ্ঠ সুপুরুষ ছিলেন, বার্ধক্যেও তা বুঝতে এতটুকু কষ্ট হয় না। পরিধানে ঢোলা পায়জামা ও গায়ে সেরওয়ানী, পায়ে রবারের চপ্পল। তাই কখন যে তিনি নিঃশব্দে ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন কেউ টের পায়নি!
রাজাবাহাদুর দ্রুতপদে এগিয়ে গেলেন, এ কি কাকা, আপনি এখানে কেন?
কে, বিনু? এখনও তুমি এ বাড়িতে আছ? পালিয়ে যাও! পালিয়ে যাও! এ বাড়িতে সর্বত্র বিষের ধোঁয়া? বিষে জর্জরিত হয়ে মরবে!
চলুন কাকা, আপনার ঘরে চলুন।
কোথায় যাব, ঘরে? না না, সেখানেও মৃত্যু ওৎ পেতে আছে, মৃত্যু-বিষ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। That child of the past, again he started his old game-ভুলে গেলে এরই মধ্যে সেই শয়তান ছোটলোকটিকে?…মনে পড়ছে না তোমার? বলতে বলতে বৃদ্ধ একবার ঘরের চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে, কতকটা যেন স্বগত ভাবেই বললেন, এরা কারা বিনু? এরা এখানে কি চায়? আমি একটা চমৎকার অয়েল পেনটিং করছি, ছবিটা প্রায় শেষ হয়ে এল। একটি তেরো-চোদ্দ বছরের ছোট কিশোর বালক, শয়তানীতে সে এর মধ্যেই পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছে। উঃ, কি শয়তান! ধনুবান খেলার ছলে, খেলার তীরের ফলার সঙ্গে কুঁচফলের বিষ মাখিয়ে, তারই একজন খেলার সাথীকে মারতে গেল। কিন্তু ভগবানের মার যাবে কোথায়? সব উল্টে দিল। বিষ মাখানো তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে লাগল গিয়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় বল তো, কিছু দূরে মাঠের মধ্যে একটা গরু ঘাস খাচ্ছিল, তারই গায়ে। ছেলেটা বেঁচে গেল, কিন্তু দিন-দুই বাদে গরুটা মরে গেল। কিন্তু, তুমি কি সেই মস্তবড় টর্চ হাতে কালো পোশাক পরা লোকটাকে দেখতে পাওনি বিনু? ছায়ার মতই মিলিয়ে গেল, আমি দেখেছি তাকে। কেউ না দেখতে পেলেও আমি দেখেছি। … হ্যাঁ, আমি দেখেছি সেই শয়তানটাকে!
আঃ কাকা, ঘরে চলুন, অনেক রাত্রি হয়েছে, চলুন এবারে একটু ঘুমোবেন। রাজাবাহাদুর যেন ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছেন বোঝা যায়।
রাজবাড়ির পারিবারিক চিকিৎসক ডাঃ সোম পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন, রাজাবাহাদুর সুবিনয় মল্লিক তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ডাক্তার, এঁকে ঘুম পাড়াবার ব্যবস্থা কর।
ডাঃ সোম এগিয়ে এলেন, ধীর সংযত কণ্ঠে ডাকলেন, মিঃ মল্লিক! সুব্রত অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল আগন্তুক আর কেউ নয়, সুবিনয় মল্লিক বর্ণিত তাঁর বিকৃতমস্তিষ্ক দূরসম্পর্কীয় খুড়ো, আর্টিস্ট নিশানাথ। স্তব্ধ বিস্ময়ে সে নিশানাথের কথাগুলো শুনছিল। সত্যিই কি নিশানাথের কথাগুলো একেবারে স্রেফ প্রলাপোক্তি! মনের মধ্যেই যেন একটা সংশয় জাগছে। কিছুদিন আগে জাস্টিস্ মৈত্রের বাড়িতে বসে রায়পুর মার্ডার কেসের প্রসিডিংস পড়তে পড়তে কয়েকটা লাইন সহসা যেন মনের পাতায় স্মৃতির বিদ্যুতালোক ফেলে যায়, কালো ছাতাওয়ালা সেই কালোলোকটা!
১.১৩ তারিণী, মহেশ ও সুবোধ
তারিণী, মহেশ ও সুবোধ ডাঃ সোম ও রাজাবাহাদুর দুজনে মিলে অনেক কষ্টে একপ্রকার যেন জোর করেই নিশানাথকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে গেলেন।
নিশানাথ মৃদু অস্পষ্ট আপত্তি জানাতে জানাতে, ওদের সঙ্গে যেতে যেন কতকটা বাধ্যই হলেন। তাঁর মৃদু আপত্তি তখনও শোনা যাচ্ছিল, খুঁজে দেখ বিনু! খুঁজে দেখ! ভিতর থেকে যেমন করে হোক শয়তানটাকে খুঁজে বের কর। খুঁজে দেখ, খুঁজলেই পাবে। সুহাস গেছে, কে বলতে পারে এবার হয়ত তোমারই পালা। অভিশাপ! অভিশাপ! মৃত রত্নেশ্বর মল্লিকের অভিশাপ! দুধকলা দিয়ে তিনি কালসাপ পুষেছিলেন, কেউ থাকবে না! রাবণের বংশের মতই এ একেবারে নির্বংশ হয়ে যাবে রে! মনে করে দেখ রামায়ণে সেই দশাননের খেদোক্তি, এক লক্ষ পুত্র মোর, সোয়া লক্ষ নাতি, কেহ না রহিল মোর বংশে দিতে বাতি।… ক্রমে নিশানাথের কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হতে অস্পষ্টতর হয়ে একসময় আর শোনা গেল না।
