পাশাপাশি দুটো ঘর, সামনে ছোট একফালি বারান্দা।
কয়েকটি ফুলের টব।
কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি। নিঝুম অন্ধকারে চারিদিক যেন থমথম করছে।
টর্চ বাতি জ্বালিয়ে সুব্রত দেখলে, সামনের দরজার গায়ে একটি তালা ঝুলছে, অন্য দরজাটি পরীক্ষা করে দেখলে, সেটি ভিতর থেকে বন্ধ। লোকটা সাবধানী ছিল, সে বিষয়ে কোনো ভুলই নেই। কিন্তু এখন উপায়? যেমন করেই হোক ঘরের মধ্যে প্রবেশ তাকে করতেই হবে আজ রাত্রেই এবং এই মুহূর্তেই।
সুব্রত তালাটা টেনে দেখলে, ভাল বিলিতি তালা, সহজে ভাঙা যাবে না। বাড়িতে গিয়ে তালা খোলবার যন্ত্রগুলো আনা ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই।
সুব্রতর কোয়াটার এখান হতে যদিও খুব বেশীদূর নয়, মিনিট তিন-চারের রাস্তা, কিন্তু তা ভিন্ন আর উপায়ই বা কি!
সুব্রত আবার ছুটল নিজের বাসার দিকে। মিনিট দশেকের মধ্যেই তালা খোলবার যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে এল; কতকগুলো সরু মোটা বাঁকানো ও সোজা লোহার শিক।
মিনিট পাঁচ-সাতের চেষ্টায় তালাটা খুলে গেল।
আনন্দে সুব্রতর চোখের তারা দুটো অন্ধকারে ঝক্ঝক্ করে ওঠে। দরজাটা খুলে এবারে সুব্রত ঘরের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করে। বেশ প্রশস্ত ঘরখানি। আসবাবপত্র ঘরের মধ্যে সামান্যই, একটা ফোলডিং ক্যাম্পখাট, একটি বইয়ের আলমারি ও কয়েকটি ছোট-বড় বাক্স। সবার উপরে একটি এ্যাটাচি কেস।
প্রথমেই সুব্রত অ্যাটাচি কেসটা খুলে ফেললে। কতকগুলো কাগজপত্র, হিসাবের খাতা, ক্যাশমেমো ও ব্যাঙ্কের চেকবই।
অ্যাটাচি কেসটা একপাশে সরিয়ে রেখে সুব্রত একটা স্টীল ট্রাঙ্কের তালা ভেঙে ফেললে, বিশেষ কিছুই তার মধ্যে নেই, কতকগুলো জামাকাপড়। আর একটা ট্রাঙ্কও খুললে, তার মধ্যেও বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না।
হতাশ হয়ে সুব্রত উঠে দাঁড়াল। পরিশ্রমে কপালের উপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে তখন।
অ্যাটাচি কেস থেকে কতকগুলো কাগজপত্র ও হিসাবের খাতাটা পকেটে ভরে বাকি সব জিনিসপত্র সুব্রত সেই অবস্থায়ই ফেলে, যেমন ঘর হতে বের হতে যাবে, হঠাৎ সামনের ছাদের দিকে নজর পড়তে ও চমকে দাঁড়িয়ে গেল, অস্পষ্ট ছায়ামূর্তির মত ঘরের সম্মুখের ছাদ দিয়ে কে যেন এগিয়ে আসছে।
সুব্রত চট করে হাতের টর্চবাতিটা নিভিয়ে দিল। এবং অন্ধকারে ঘরের জানালার পিছনে গিয়ে সরে দাঁড়াল।
কে ঐ ছায়ামূর্তি!
কেউ কি অলক্ষ্যে থেকে তার সমস্ত কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে! স্তিমিত তারার আলোয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকাল।
পুরাতন রাজপ্রাসাদের একটা অংশকে বিভিন্ন কর্মচারীদের বাসের ও অফিসের জন্য ছোট ছোট ফ্ল্যাটের মত অংশে বিভক্ত করা হয়েছে পার্টিশন তুলে। তারই এক অংশ হতে অন্য অংশে ছাদ দিয়ে যাতায়াত করা যায়। যদিচ বিভিন্ন অংশের মধ্যবর্তী দরজাগুলো বন্ধ থাকে প্রায় সর্বদাই।
ব্যবধান মাত্র একমানুষ সমান প্রাচীরের। কারও পক্ষে সেটা পার হয়ে আসা এমন কিছুই কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।
কিন্তু ছাদ থেকে লাহিড়ীর ঘরে প্রবেশের দরজাটা বন্ধ। ছায়ামূর্তি যেই হোক, এ ঘরের মধ্যে এলে সহসা প্রবেশ করতে পারবে না। সম্ভবও নয়।
হঠাৎ সুব্রত লক্ষ্য করলে ছায়ামূর্তি ছাদের বাঁদিকে সরে গেল, তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। লোকটার চলার ধরন সুব্রতর যেন চেনা-চেনা বলেই মনে হয়। কিন্তু সামান্য আলোয় সুব্রত ভাল করে বুঝে উঠতে পারে না।
এদিকে এখানে আর বেশী দেরি করা মোটেই উচিত নয়, এতক্ষণে হয়ত থানা থেকে বিকাশবাবু এসে গেছেন ঘটনাস্থলে, এখুনি হয়ত তার খোঁজ পড়বে।
সুব্রত ত্বরিত পদে নেমে এল।
১.১২ নিশানাথ
অত্যন্ত দ্রুতপদে পথটা অতিক্রম করে সুব্রত যখন প্রাসাদে এসে পৌঁছল, দেখলে তার অনুমানই ঠিক। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে বিকাশ সান্যালের আবির্ভাব হয়েছে এবং তদন্তও শুরু হয়ে গেছে হত্যা-ব্যাপারের, তবে সেজন্য সুব্রতর খোঁজ এখনও পড়েনি।
বিকাশ মৃতদেহটা পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াতেই সুব্রতর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কি একটা কথা সুব্রতকে বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ সুব্রতর চোখের ইঙ্গিতে নিজেকে সে সংযত করে নিল।
কতক্ষণ হল এ ব্যাপার হয়েছে? বিকাশ রাজাবাহাদুরকেই প্রশ্ন করলে।
তা ঘণ্টা দুই হবে, কি বলেন কল্যাণবাবু! রাজাবাহাদুর সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললেন।
তা হবে বৈকি, সুব্রত সায় দেয়।
মৃতদেহ যেভাবে পড়ে আছে, তা দেখেই মনে হয়, উনি প্রাসাদের দিকেই যাচ্ছিলেন। রাত্রি এখন প্রায় একটা হবে। ঘণ্টা দুই আগে যদি ঘটনাটা ঘটে থাকে, তাহলে তখন বোধ করি রাত্রি এগারোটা আন্দাজই হবে। তা এত রাত্রে উনি প্রাসাদের অন্দরমহলেই বা যাচ্ছিলেন কেন? উনি কি আপনারই কোনো কাজে বা আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন রাজাবাহাদুর?
না, আমিও আশ্চর্য হচ্ছি, হঠাৎ উনি এত রাত্রে এদিকে আসছিলেন কেন?
এ সময় সুব্রত সহসা একটা চাল দেয়, বলে ওঠে, শুনেছি প্রায়ই রাত্রে উনি নাকি আপনার সঙ্গে দাবা খেলতে আসতেন, দাবা খেলতেই আসছিলেন না তো?
কথাটা ঠিকই, তবে আজ আমার শরীর ভাল না থাকায়, সন্ধ্যার আগেই বলে দিয়েছিলাম, আজ আর দাবা খেলা হবে না। বললেন রাজাবাহাদুর।
সতীনাথবাবুর বাড়ির চাকরদের একবার ডাকাতে পারেন রাজাবাহাদুর? বললে বিকাশ।
আমি এখুনি তাদের ডাকতে লোক পাঠাচ্ছি। বলে রাজাবাহাদুর চিৎকার করে ডাকলেন, শম্ভ, এই শম্ভ–
