তখুনি ডাক্তারের ডাক পড়ল, কিন্তু ডাক্তার আসবার আগেই লাহিড়ী মশাইয়ের মৃত্যু ঘটল। রাজবাড়ির ডাক্তার অমিয় সোম কিছুই করতে পরলেন না। তীব্র যন্ত্রণায় লাহিড়ীর সমগ্র দেহটা বারকয়েক আক্ষেপ করে একেবারে স্থির হয়ে গেল। সমগ্র মুখখানা যেন নীলাভ বিকৃত হয়ে গেছে। ডাঃ সোম বললেন, তীরের ফলার সঙ্গে কোনো সাংঘাতিক বিষ মাখিয়ে, সেই তীর বিদ্ধ করে হতভাগ্য লাহিড়ীর মৃত্যু ঘটানো হয়েছে।
সংবাদটা পেতে সুব্রতর দেরি হল না। শরীরটা একটু অসুস্থ থাকায় সুব্রত সেদিন আর হারাধনের ওখানে যায়নি। খাওয়াদাওয়ার পর শয্যায় শুয়ে একখানি ইংরেজী উপন্যাস পড়ছিল। পুরাতন রাজবাড়ি থেকে নতুন রাজবাড়িও তেমন বিশেষ দূর নয়। লাহিড়ীর আর্ত চিৎকার। সুব্রতরও কানে গিয়েছিল। অকুস্থানে এসে দেখলে, রাজাবাহাদুর যেন কেমন হয়ে গেছেন। এ কি সাংঘাতিক ব্যাপার! একেবারেই বলতে গেলে তাঁরই প্রাসাদের মধ্যে খুন!
সুব্রতকে আসতে দেখে রাজাবাহাদুর ব্যগ্রভাবে বলে উঠলেন, এই যে কল্যাণবাবু, আসুন। এই দেখুন কি ভয়ানক ব্যাপার!
কি হয়েছে?
লাহিড়ী খুন হয়েছে।
খুন হয়েছে? সে কি!
হ্যাঁ দেখুন না, তাকে নাকি বিষাক্ত তীর দিয়ে কে মেরেছে।
বিষের তীর!
হ্যাঁ, কিন্তু আমি যে এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না কল্যাণবাবু। এত রাত্রে কেনই বা লাহিড়ী প্রাসাদে এসেছিল, আর প্রাসাদের মধ্যেই বা কে তাকে এইভাবে নৃশংসভাবে খুন করলে!
সুব্রত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভূপতিত লাহিড়ীর মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ডান পাশে কাত হয়ে ধনুকের মত বেঁকে লাহিড়ীর প্রাণহীন মৃতদেহটা অসাড় হয়ে পড়ে আছে। বাঁ দিককার বুকে তখনও তীরের খানিকটা ফলা বিদ্ধ হওয়ার পর বের হয়ে আছে। ক্ষীণ একটা রক্তের ধারা গায়ের জামাটা সিক্ত করে শান-বাঁধানো চত্বরের ওপরে এসে পড়েছে। মুখের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছে লোকটা। চোখমুখে এখনও তার সুস্পষ্ট আভাস।
মৃত্যুর পূর্বের তীব্র যাতনার আক্ষেপে বোধ হয় দুহাতের আঙুলগুলো দুমড়ে আছে বীভৎস মৃত্যু!…
কিন্তু সুব্রত ভাবছিল, লাহিড়ীও তা হলে নিহত হল! যে নাটক সে সুহাস মল্লিকের হত্যার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিল, আবার শুরু হল কি নতুন করে অন্য একটা অধ্যায়?
কে জানত লাহিড়ীর গোনা দিন এত কাছে এসে গিয়েছিল। আকস্মিক ভাবে ঘটনার স্রোত যে এইভাবে মোড় নেবে, কয়েক মুহূর্ত আগেও সুব্রত কি তা ভেবেছিল!
এ শুধু অভাবনীয় নয়, আকস্মিক।
তার সাজানো দাবার ক সহসা যেন অপমৃত্যুর অদৃশ্য হাতের ধাক্কা লেগে ওলটপালট হয়ে গেল।
এটা সেই গত ৩১শে মে সুহাস মল্লিকের দেহে যে হত্যাৰীজ ছড়ানো হয়েছিল তারই বিষক্রিয়া, না এ আবার এক নতুন নাটক শুরু হল!
সহসা রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বরে সুব্রত যেন চমকে জেগে ওঠে।
এখন আমি কি করি বলুন তো কল্যাণবাবু? অসহায় বিপর্যস্তের মত রাজাবাহাদুর সুব্রতর মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করেন।
সর্বপ্রথম থানায় একটা সংবাদ দেওয়া প্রয়োজন, থানার লোক এসে মৃতদেহ না দেখা পর্যন্ত মৃতদেহ ওখান হতে নড়ানো যাবে না।
অ্যাঁ! আবার সেই থানা-পুলিস! রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বরে ভয়মিশ্রিত উৎকণ্ঠা, কিন্তু কেন? কি তার প্রয়োজন?
বুঝতে পারছেন না, এ স্বাভাবিক মৃত্য নয়, খুন! পুলিস কেস।
আবার সেই পুলিস-কেস! তাহলে কি হবে?
আপনি স্থির হয়ে বসুন, আমিই থানায় খবর পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।
সুব্রত ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।
রায়পুরের থানা-অফিসার বিকাশ সান্যালকে সুব্রত ভাল ভাবেই চেনে। এবং এ কথাও বিকাশবাবু জানেন, কেন সুব্রত কল্যাণ রায় ছদ্মবেশে রায়পুরের রাজবাটিতে এসে আবির্ভূত হয়েছে। কেননা ইতিপূর্বে সুব্রত বিকাশবাবুর সঙ্গে গোপনে একদিন দেখাসাক্ষাৎ করে আলাপ-পরিচয় করে এসেছে।
সুব্রতরচেষ্টাতেই তখুনি সান্যালের ওখানে সংবাদ পাঠানোহল রাজবাড়ির একজন পেয়াদাকে দিয়ে।
লোকজনের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। ইতিমধ্যে লাহিড়ী মশাইয়ের মৃত্যুসংবাদটা আগুনের মতই প্রাসাদের বাইরে ও ভিতরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সকলেই উৎসুক ভাবে নানা প্রশ্ন একে ওকে জিজ্ঞাসা করছে।
সকলে যখন নানা আলোচনায় ব্যস্ত, ভিড়ের মধ্যে একফাঁকে সকলের অলক্ষ্যে সুব্রত গা-ঢাকা দিয়ে সরে পড়ল কিছুক্ষণের জন্য। নূতন প্রাসাদ হতে পুরাতন প্রাসাদ মিনিট চারেকের পথ হবে মাত্র। সুব্রত জোরপায়ে হেঁটে পুরাতন প্রাসাদে লাহিড়ী মশাইয়ের বাসভবনে এসে হাজির হল।
পুরাতন প্রাসাদের দক্ষিণ অংশে, উপরে ও নীচে গোটাচারেক ঘর নিয়ে লাহিড়ী থাকত। লোকজনের মধ্যে একটি ভৃত্য ও একটি রাধুনী বামুন।
তারাও গোলমাল শুনে অরক্ষিত অবস্থাতেই বাড়ি ফেলে রেখে নতুন প্রাসাদের দিকে ছুটে চলে গেছে ব্যাপার কি জানবার জন্যে।
লাহিড়ীর বাড়িটা অন্ধকার। সব আলোইনেভানো। কেবল বাইরে বারান্দায় একটা হ্যারিকেন দপ দপ করে জ্বলছে।
সুব্রত দ্রুতপদে খোলা দরজাপথে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে।
পকেট থেকে টচটা বের করে জ্বালাতেই চোখে পড়ে নীচের সুসজ্জিত বাইরের ঘরটি। তারই পাশ দিয়ে উপরে ওঠবার সিঁড়ি। মুহূর্তমাত্র ইতস্তত না করে সুব্রত অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
