***
সেই রাত্রে হারাধন ও জগন্নাথের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুব্রত যখন রাস্তায় এসে নামল, রাত্রি তখন প্রায় সাড়ে দশটা। শহরের রাস্তাঘাট ও তার দুপাশের বাড়ি দোকানপাট সব প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দু-একটা দোকান ভোলা এবং এক-আধজন লোক রাস্তা দিয়ে চলেছে মাত্র।
রাস্তার দুপাশে কেরোসিনের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে।
কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি, নক্ষত্রখচিত রাত্রির আকাশ যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়। সুব্রত এগিয়ে চলে। নানা চিন্তায় মনটা আচ্ছন্ন। হারাধনের বাড়ি থেকে সুব্রতর কোয়াটারটা বেশ খানিকটা দূর।
সুব্রত আজ প্রায় দিন কুড়ি হবে এখানে এসেছে, কাজ কিন্তু বিশেষ কিছুই এগোয়নি। অথচ কিরীটীর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে এক পাও নড়বার উপায় নেই বেচারীর।
একটি কম্বাইন্ড হ্যাণ্ড আছে, থাকোহরি। লোকটার বয়স হয়েছে। রাজাবাহাদুরই স্টেট থেকে বামুন ও চাকরের ব্যবস্থা করে দিতে সতীনাথকে বলেছিলেন, কিন্তু সুব্রত সতীনাথবাবুকে ও সেইসঙ্গে রাজাবাহাদুরকেঅশেষ ধন্যবাদ জানিয়েসে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। থাকোহরিকে জগন্নাথই দিয়েছে।
লোকটার স্বভাবচরিত্রও খুব ভাল, তবে দোষের মধ্যে একটু কালা ও রাত্রে তেমন পরিষ্কার দেখে না। অবিশ্যি তাতে সুব্রতর কোনো অসুবিধা নেই। গরীব লোক, সুব্রতর কেমন একটা মায়াও এ কদিনে লোকটার ওপরে পড়ে গেছে। ছোট একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়িখানা। বাড়ির পিছনের দিকে ছোট একটা অযত্ন বর্ধিত জঙ্গলাকীর্ণ বাগান। বাগানের সীমানা একমানুষ সমান প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাড়িতে সর্বসমেত চারখানা ঘর। দরজায় তালা দিয়ে, বারান্দার ওপরে একটা মাদুর পেতে থাকোহরি শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল। সুব্রত এসে তাকে গায়ে ঠেলা দিয়ে ডাকল, থাকোহরি!
থাকোহরি সুব্রতর ডাকে উঠে বসে।
দরজাটা খুলে দাও।
থাকোহরি দরজার তালা খুলে দিল। ঘরের এক কোণে একটা হ্যারিকেন বাতি জ্বালানো থাকে, কিন্তু আজ ঘরটা অন্ধকার।
এ কি, আলো জ্বালাওনি আজ?
আজ্ঞে আলো তত জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, বোধ করি নিভে গেছে।
সুব্রত পকেট থেকে টচটা বের করে বোতাম টিপতেই ঘরের মধ্যে নজর পড়ায় চমকে ওঠে।
ঘরের মেঝেতে তার চামড়ার সুটকেসটা ডালাভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। লেখবার টেবিলের কাগজপত্র, বই, সব ওলটপালট হয়ে আছে। এলোমেলো ভাবে চারিদিকে ছড়ানো।
থাকোহরি ততক্ষণে আলো জ্বালিয়ে ফেলেছে।
এসব কি-ঘরে ঢুকেছিল কে? থাকোহরিও কম অবাক হয়নি।
তাই তো বাবু, টের পাইনি, মনে হচ্ছে নিশ্চয় ঘরে চোর এসেছিল। ওপাশের জানলাটা খোলা রেখে গিয়েছিলেন বাবু?
সুব্রত জানলার দিকে চেয়ে আশ্চর্য হয়ে যায়।
টাকাপয়সা যায়নি তো বাবু?
সত্যিই জানালাটা খোলা। সুব্রতর বুঝতে কিছুই কষ্ট হয় না। জানালা ভেঙেই চোর ঘরে এসেছে। সুব্রত খুঁজে দেখলে, না, দশ টাকার এগারখানা নোট ও কিছু খুচরো পয়সা, আনি দুআনি, সুটকেসের মধ্যে পার্সটার ভিতরে ছিল, কিছুই চুরি যায়নি। টাকা-পয়সা, জামাকাপড় কিছুই নেয়নি, এ আবার কি ধরনের চোর? কী চুরি করতে তবে সে এসেছিল এ ঘরে? আপাতদৃষ্টিতে মূল্যবান কিছু চুরি না গিয়ে থাকলেও, কেউ যে তার অবর্তমানে তার ঘরে অনধিকার প্রবেশ করেছিল সে বিষয়ে কোনো ভুলই নেই। সুব্রত বেশ চিন্তিত হয়ে ওঠে। তবে কি এখানে তাকে কেউ সন্দেহ করেছে? না, তাই বা কি করে সম্ভব! কেউ তো তার পরিচয় জানে না। আচমকা মনে পড়ে, আজ কয়েকদিন থেকেই তার মনে হচ্ছিল, কে যেন অলক্ষ্যে ছায়ার মত তাকে অনুসরণ করে। সে দেখতে পায় না বটে, কিন্তু সর্বদা দুটি চক্ষুর দৃষ্টি তাকে যেন সর্বত্র অনুসরণ করে ফিরছে। প্রথমটায় সে এত মনোযোগ দেয়নি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা একেবারে উড়িয়ে দেবার মত নয়। একটা কিছু আছে। কিন্তু!
***
রাত্রি গভীর। থাকোহরি বাইরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
সুব্রত কিরীটীকে চিঠি লিখছিল:
কিরীটী,
গত পরশু তোকে একখানা চিঠি দিয়েছি, এখানে বোধ করি সন্দেহের হাওয়া বইতে শুরু হয়েছে। কে একজন অজানা অতিথির আবির্ভাব হয়েছিল আমার ঘরে, আমার অনুপস্থিতিতে থাকোহরির বধিরত্বের সুযোগ নিয়ে। ক্ষতি একটা কিছু হয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এখনও চোখে পড়েনি কিছু। আজ মনে হচ্ছে কয়েকদিন ধরে অন্ধকারে কে যেন আমায় অনুসরণ করে ফিরছিল। প্রথমটায় খেয়াল করিনি, সন্দেহ জাগছে এবারে। লাহিড়ী মশাই এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। প্রাসাদের সর্বত্রই যেন একটা থমথমে ভাব। কোথায় যেন একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে এ যেন ঝড় ওঠবার পূর্বলক্ষণ! আজ হারাধনের একটা কথায় বুঝতে পারলাম, নাটকের শুরু রসময় মল্লিককে নিয়েই।
আজ এই পর্যন্ত। ভালবাসা রইল।
তোর কল্যাণ
দিন চারেক বাদেই কিরীটীর জবাব এল।
কল্যাণ,
তোর চিঠিখানা আমায় বেশ চিন্তিত করে তুলেছে। থাকোহরি না হয় কালা ও রাতকানা, কিন্তু তোর একজোড়া ড্যাবডেবে চোখ থাকতেও কি বলে এখনো ধরতে পারলি না, চোর কেন তোর ঘরে এসেছিল? ওরে আহাম্মক, তোর গোপনীয় কাগজপত্রের সন্ধানে! তোকে এবারে একটা ডেয়ারিং কাজ করতে হবে। একটিবার লাহিড়ী মশাইয়ের ঘরে হানা দিতে হবে। ভদ্রলোক তো একক জীবন অতিবাহিত করেন, খুব কষ্ট হবে না। তাছাড়া রাত্রে প্রাসাদে রাজাবাহাদুরের সঙ্গে মাঝে মাঝে দাবা খেলতেও যান, সেকথা তো তুই লিখেছিস। ওই রকম একটা দিন বেছে নিলেই চলবে। হ্যাঁ রে, সাঁওতাল প্রজার কথা জানাতে লিখলাম কিন্তু সে-সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্যই তো করিসনি।
১.১১ মৃত্যবাণ
কিরীটীর চিঠি পাওয়ার পরদিনই, যে আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিতটা সুব্রত মনে মনে অনুভব করছিল, অকস্মাৎ সেটা সত্য হয়ে দেখা দিল। রাত্রি তখন প্রায় এগারোটা হবে। প্রাসাদের দিক থেকে সহসা একটা আর্ত চিৎকার রাত্রির স্তব্ধ বুকখানাকে কাঁপিয়ে তুললে। মুহূর্তে চারিদিক হতে লোকজন ছুটে এল। এমন কি রাজাবাহাদুর পর্যন্ত। সকলে এসে দেখলে লাহিড়ী মশাই তীব্র যন্ত্রণায় প্রাসাদের অন্দর ও বাহিরের সংযোগস্থলে বাঁধানো আঙিনার উপর পড়ে ছটফট করছেন। মাঝে মাঝে আগাগোড়া সমগ্র শরীরটা আক্ষেপে কুঁকড়ে কুঁকড়ে উঠছে। আলো নিয়ে এসে দেখা গেল, লাহিড়ীর বুকের বাঁদিকে, একেবারে হৃদপিণ্ড ভেদ করে, একটা বিঘত পরিমাণ ইস্পাতের সরু ছাতার শিকের মত তীক্ষ্ণ তীর বিধেঁ আছে।
