***
না, সুব্রত হারাধন ও জগন্নাথকে ভোলেনি। সন্ধ্যার দিকে প্রায়ই দু-তিন ঘণ্টা করে তাঁদের ওখানে গিয়ে কাটিয়ে আসে গল্পে গল্পে।
জগন্নাথ অত্যন্ত স্বল্পভাষী; কিন্তু এই সামান্য বয়সেই সে এত পড়াশুনা করেছে যে ভাবলেও তা অবাক হয়ে যেতে হয়। কথা সে খুবই কম বলে বটে, কিন্তু যে দু-চারটে কথা বলে, অন্তরে যেন দাগ কেটে বর্সে যায়। হারাধন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, মাথার গোলমাল হওয়ার পর থেকে কথাটা তিনি একটু বেশীই বলেন। বিশেষ করে তাঁর অভিযোগটা যেন পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের প্রতি ও যে দেবতাটিকে চোখে কোনো দিনও কেউ দেখতে পায় না—তাঁর প্রতি। জগন্নাথ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে বসায়, মুখে তিনি সর্বদা জগন্নাথকে গালাগালি দিলেও,অন্তরে তিনি বিশেষ খুশীই হয়েছিলেন। ইদানীং অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব তেমন তাঁর ছিল না। তাছাড়া বছর পাঁচ মাত্র মাথার গোলমালটা একটু বেশী হওয়ায়, জগন্নাথ নিজেই টাকাকড়ির ব্যাপারটা দেখাশুনা করত।
সামান্য কয়েকদিনের পরিচয় হলেও, দাদু ও নাতির সুব্রতকে খুব ভালই লেগেছে।
সমস্ত দিনের কাজকর্মের পর সুব্রত নিয়মিত হারাধনের বাসায় এসে রাত্রি নটা-দশটা পর্যন্ত কাটিয়ে যেত। বাড়ির ভিতরে খোলা বারান্দায় চেয়ার পেতে তিনজনে বসে নানা গল্পগুজব হত। বেশীর ভাগ জগন্নাথ ও সুব্রতর সঙ্গেই কথাবার্তা চলত—মাঝে মাঝে হারধনও দুচারটে কথা বলতেন। সেদিন কথায় কথায় হারাধন বললেন, বুঝেছ কল্যাণ, তোমাদের ঐ লাহিড়ী মশাইটি একটি আসল ঘুঘু। বয়স ওর এখনও বত্রিশের কোঠা হয়তো পার হয়নি কিন্তু অমন ধড়িবাজ ছেলে আমি জীবনে খুবই কম দেখেছি। তোমাদের রাজাবাহাদুরের আসল মন্ত্রণাদাতা ঐ লাহিড়ীই। থাকেন ভিজে বিড়ালটির মত, কিন্তু ও পারে না এমন কোনো অসাধ্য কাজ আছে বলে আমি জানি না।
ভদ্রলোক তো শুনেছি আজ পাঁচ-সাত বৎসর মাত্র এখানে এঁদের স্টেটে কাজ করছেন এবং রাজাবাহাদুরের খুব বিশ্বাসীও।
হারাধন একটু থেমে বলতে থাকেন, জান কল্যাণ, আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে, ছুঁচ হয়ে ঢুকে, ফাল হয়ে বের হওয়া। রায়পুরের রাজবাড়ির ও শনি! যেদিন হতে ও রায়পুরের প্রাসাদে প্রবেশ করেছে, সেদিন হতেই যেন প্রাসাদে শনির দৃষ্টি লেগেছে। রাজস্টেটে ও চাকুরি নিতে না নিতেই রসময় হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গেল, তারপর গেল সুহাস। আহা সোনার চাঁদ ছেলে ছিল!
সুহাস মল্লিকের ব্যাপারটা নিয়ে তো মহা হৈ-চৈ হয়ে গেল।
কিন্তু তাতে কিই বা হল; গভীর জলের মাছ জাল ছিঁড়ে বের হয়ে গেল। মাঝখান হতে একটা নিরীহ একেবারে নিদোষী লোক জালে আটকা পড়ল।
কেন, একথা বলছেন কেন?
দেখ বাবাজী, আমিও এককালে মোক্তারী করেছি, দশজন মানতও। হয়ত তোমরা আমার নাতির মত বলবে, হুঁ মোক্তারী,… কিন্তু বাবাজী, আইনের মারপ্যাঁচগুলো ব্যারিস্টারেরও যা মোক্তারেরও তাই। তারা কটমট করে ইংরাজীতে বলবে, মি লর্ড, আমরা না হয় বলি ধর্মাবতার হুজুর বংলা ভাষায়। আরে বাবা, ঐ একটা বিচার হল নাকি! প্রহসন! একটা প্রহসন!
কিন্তু আইনের চোখে ডাঃ সুধীন চৌধুরীর দোষ তো প্রমাণ হয়েছে বলেই জজ সাহেব। রায় দিলেন যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের!
আসলে সত্যিকারের প্রমাণ যাকে বলে তা আর হল কোথায়? কেবলমাত্র সন্দেহের জোরে বেচারীকে শাস্তি দেওয়া হল, তাহলে বলতে চান?
তাছাড়া কি, কতকগুলো প্রশ্নের সওয়ালই নিল না; শেষ পর্যন্ত মুখ বুজেই রইল ছেলেটাকেন তা সে-ই জানে। অবশেষে কতকগুলো প্রমাণ খাড়া করে কোণঠাসা করে দোষী সাব্যস্ত করা হল। হবুচন্দ্রের বিচার আর কি!
তবে কি তুমি বলতে চাও দাদু, ডাঃ সুধীন চৌধুরী দোষী নয়, তাকে অন্যায় করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? এবারে প্রশ্ন করলে জগন্নাথ।
একশোবার বলব, তাকে অন্যায় করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
কেন?
কারণ সে দোষী হতেই পারে না। ধর যদি ধরে নেওয়াই যায়, প্লেগের বীজাণুই সুহাসের শরীরে ফুটিয়ে তাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে এবং এও যদি তর্কের খাতিরে স্বীকার করেই নেওয়া যায় যে সুধীন নিজে ডাক্তার হওয়ায় তার পক্ষে সেটা খুবই সহজ ছিল, তবু এ কথাটা তোরা ভেবে দেখেছিস কি যে ইনজেকশন দেওয়ার পর যন্ত্রপাতিগুলো সে কোথায় সরিয়ে ফেললে? তার হাতে একটা মরোক্কো-বাঁধাই কেস ছিল কিন্তু সেটা তো হিমোসাইটোমিটারের কেস; ইনজেকশনের যন্ত্রপাতি তো তার মধ্যে ছিল না। তাছাড়া সুহাসের মা মালতী দেবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর দৃষ্টি এড়ানো বড় সহজ কথা নয়। আরও একটা কথা, সুধীন যদি সে কাজ করেই থাকে, তবে তার সুহাসকে বাদ দিয়ে রসময়কেই মারা উচিত ছিল, কেননা সুধীনের বাপ যখন নৃসিংহগ্রামে নিহত হন, তখন সুহাস তো জন্মায়ই নি। এখানে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা তো উঠতেই পারে না। তাছাড়া এ জগতে এমন কেউ বোকা নেই, হত্যা করবার জন্য বিষ-প্রয়োগ করে তার চিকিৎসার জন্য আবার কলকাতায় আসতে লিখবে। ব্যাপারটা আগাগোড়াই গোলমেলে, বিচারভণ্ডুল। একটা জগাখিচুড়ী।
সুব্রত হারাধনের বিচারশক্তি ও বিশ্লেষণক্ষমতা দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে গেল, যদিচ হারাধনের কথাগুলো এলোমেলো। সে ভাবছিল, তবে কি সত্যি সত্যিই কিরীটীর কথাই ঠিক, ডাঃ সুধীন চৌধুরী নিদোষ! মিথ্যা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
