হ্যাঁ। ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখেছি। তাছাড়া কাল খুব ভোরে আমার প্লেন ছাড়ছে।
তা যাও। তবে বলছিলাম—
কী?
দামটা কিছু কমাও না। একেবারে যে চীনে জোঁকের মত শুষে নিচ্ছ। এমন বেকায়দায় তুমি ফেলবে জানলে কোন্ আহাম্মক তোমার ঐ ফাঁদে পা দিত!
ছেড়ে দিলেই তো পার। কথাটা কেমন যেন আমার আপনা থেকেই মুখ দিয়ে হঠাৎ বের হয়ে গেল।
কি বললে! ছেড়ে দেব? হ্যাঁ, এইবার খাঁটি ব্যবসাদারী কথা বলছ। কি করব, অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই নেশাটা ছাড়তে পারলাম না। নইলে দেখিয়ে দিতাম তোমায়।
বিনয়েন্দ্রর কথায় দুঃখও হল, হাসিও পেল।
কিন্তু বুঝতে পারছিলাম ঘরের মধ্যে উপস্থিত ঐ মুহূর্তে তৃতীয় ব্যক্তিটি আর যাই করুক, কাজের ভান করলেও তার সমস্ত শ্রবণেন্দ্রিয় প্রখর করে আমাদের উভয়ের কথাগুলো শুনছে।
তাড়াতাড়ি তাই কথা আর না বাড়তে দিয়ে দরজার দিকে অগ্রসর হলাম।
দরজা বরাবর এসে কি জানি কেন নিজের কৌতূহলকে আর দাবিয়ে রাখতে পারলাম না। ফিরে তাকালাম।
সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম একজোড়া শাণিত ছুরির ফলার মত দৃষ্টি আমার দিকে নিবদ্ধ। দরজা খুলে বের হয়ে এলাম, কিন্তু মনে হতে লাগল সেই শাণিত ছুরির ফলার মতো চোখের দৃষ্টিটা যেন আমার পিছনে পিছনে আসছে।
কথাগুলো একটানা বলে পুরন্দর চৌধুরী থামলেন।
তারপর?
তারপর? আবার বলতে শুরু করলেন, সেই কয়েক মুহূর্তের জন্য তাকে দেখেছিলাম। আর দেখিনি। এবং ঐ কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখাই। পরিচয় হয়নি। এবং পরিচয়ের অবকাশও ঘটেনি। তারপর তো এবারে এসে শুনলাম, কিছুদিন আগে হঠাৎ তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
এবারে ইন্সপেক্টার কথা বললেন, যাক। তবু সেই মিস্টিরিয়াস ভদ্রমহিলাটির নামের একটা হদিস পাওয়া গেল। আর একটা কথা মিঃ চৌধুরী?
বলুন।
এত রাত্রে আপনি এ ঘরে এসেছিলেন কেন চোরের মত গোপমে, সন্তর্পণে?
সবই যখন আপনাকে বলেছি সেটুকু বলবারও আমার আর আপত্তি থাবার কি থাকতে পারে ইন্সপেক্টার। বুঝতে হয়তো পারছেন, আমি এসেছিলাম সেই সিংহলী মুক্তা যদি এখনও অবশিষ্ট পড়ে থাকে তো সেগুলো গোপনে সরিয়ে ফেলবার জন্য। কারণ মাত্র দিন কুড়ি আগে একটা পার্সেল ডাকযোগে আমি পাঠিয়েছিলাম। ঠিক আমার স্ত্রী ও পুত্র যেদিন সপাঘাতে মারা যায় তারই আগের দিন সকালবেলা।
পুরন্দর চৌধুরীর কথা শুনে ইন্সপেক্টার কয়েক মুহূর্ত আবার ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন, কিন্তু আপনার মুখেই একটু আগে শুনেছি মিঃ চৌধুরী, সেগুলো এমনি হঠাৎ দেখলে কারও পক্ষেই সাধারণ বড় আকারের মুক্তা ছাড়া অন্য কিছুই। ভাবা সম্ভব নয়; তবে আপনি সেগুলো সরাবার জন্য এত ব্যস্ত হয়েছিলেন কেন। আর এ ঘরেই যে সেগুলো পাবেন তাই বা আপনি ভাবলেন কি করে?
এ তো খুব স্বাভাবিক ইন্সপেক্টার। এই ল্যাবরেটরী ঘরের মধ্যেই তার বেশীর ভাগ সময় দিন ও রাত্রি কাটত। তাছাড়া এই ঘরে আলমারিতে তার গবেষণার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নানাপ্রকার ওষুধপত্র থাকতো, সেদিক দিয়ে সেগুলো এখানে রাখাই তো স্বাভাবিক।
হুঁ। একেবারে অসম্ভব নয়।
আর তাছাড়া হঠাৎ ওষুধপত্রের মধ্যে ঐ মুক্তা জাতীয় বস্তুগুলো কেউ দেখতে পেলে পুলিসের পক্ষে সন্দেহ জাগাও কি স্বাভাবিক নয়?
পুরন্দর চৌধুরীর যুক্তিটা খুব ধারালো না হলেও ইন্সপেক্টার আর কোন তর্কের মধ্যে গেলেন না। ইতিমধ্যে রাত্রিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।
খোলা জানালাপথে অন্ধকারমুক্ত আকাশের গায়ে আলো একটু একটু করে তখন ফুটে উঠছে। ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে দুজনে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ঝিরঝিরে প্রথম ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া জাগরণক্লান্ত চোখে-মুখে যেন স্নিগ্ধ চন্দনস্পর্শের মত মনে হল ইন্সপেক্টারের।
ক্ষণপূর্বে শোনা পুরন্দর চৌধুরীর বিচিত্র কাহিনীটা তখনও তাঁর মস্তিষ্কের মধ্যে পাক খেয়ে খেয়ে ফিরছে। সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, সত্যিই পুরন্দর চৌধুরীর কাহিনী বিচিত্র।
বাড়ির কেউ হয়তো এখনও জাগে নি। সকলেই যে যার শয্যায় ঘুমিয়ে।
পুরন্দর চৌধুরীকে সত্যিই বড় ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। তিনি ইন্সপেক্টারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধীর মন্থর পদে তাঁর নির্দিষ্ট ঘরের দিকে চলে গেলেন।
.
রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি মাথার মধ্যে তখনও যেন কেমন দপ দপ করছে। একাকী দোতলার বারান্দায় পায়চারী করতে করতে ইন্সপেক্টার আগাগোড়া সমগ্র ঘটনাটা যেন পুনরায় ভাববার চেষ্টা করতে লাগলেন। এবং তখনও সেই চিন্তার সবটুকু জুড়েই যেন পুরন্দর চৌধুরীর বর্ণিত কাহিনীটাই আনাগোনা করতে থাকে।
বিনয়েন্দ্র রায়ের হত্যার ব্যাপারটা মিঃ বসাক যতটা সহজ ভেবেছিলেন, এখন যেন ক্রমেই মনে হচ্ছে ততটা সহজ নয়। রীতিমত জটিল।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিয়ে কেটে যাচ্ছিল দিন, অবিবাহিত বিনয়েন্দ্রর এবং একটিমাত্র রহস্যময়ী নারীর মাস দুয়েকের সংস্পর্শ ব্যতীত অন্য কোন নারীঘটিত ব্যাপারের কোন হদিসই আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না। এবং সেই রহস্যময়ী নারীটির সঙ্গে তার কতখানি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল এবং আগে কোন ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল কিনা তারও কোন সঠিক সংবাদ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বিনয়েন্দ্রর অর্থের অভাব ছিল না। এবং বিশেষ করে ব্যাচিলর অবস্থায় প্রচুর অর্থ হাতে থাকায় সাধারণত যে দুটি দোষ সংক্রামক ব্যাধির মতই সঙ্গে দেখা দেয় প্রায় সর্বক্ষেত্রেই নারী ও নেশা, তার প্রথমটি সম্পর্কে কোনও কিছু এখন পর্যন্ত সঠিক না জানা গেলেও শেষোক্তটি সম্পর্কে জানা যাচ্ছে সে-ব্যাধিটির কবলিত বেশ রীতিমতভাবেই হয়েছিলেন বিনয়েন্দ্র। এবং সে ব্যাপারের জন্য মূলত দায়ী তারই অন্যতম কলেজ-জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঐ পুরন্দর চৌধুরী।
