যে দুজন দাঁড়িয়েছিল, তাদের একজন চাপা গলায় খিল খিল করে হেসে উঠল, তারপর সহসা গম্ভীর হয়ে বললে, আমি কে? অ্যাঁ! আমি কে?… তোর দুরাকাঙক্ষাই শেষ পর্যন্ত তোর মত্যুর কারণ হল। সেই সাংকেতিক ছক আঁকা কাগজটা কে নিয়েছে তাও আমি জানি, সেটা আমি উদ্ধার করবই।
হতভাগা কিরীটী রায় আজও বুঝতে পারেনি যে, হিংস্র কেউটে সাপ নিয়ে সে খেলতে শুরু করেছে!…তোর আগেও দলের আর দুজন আমায় জানবার চেষ্টা করেছিল, শেষ পর্যন্ত তাদের সে ইচ্ছা বুকে নিয়েই মত্যুকে বরণ করতে হয়েছে।
তারপর সহসা সে পাশে দাঁড়ানো লোকটার দিকে ফিরে কঠিন নির্মম আদেশের সুরে বললে, ফেলে দে হতভাগাটাকে এখনই স্ম্রদ্রের জলে! জলের অন্ধকারে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যখন ও তিল তিল করে মত্যুর মুখে এগিয়ে যাবে, হতভাগা তখন জানতে পারবে, কে আমি! কি আমার পরিচয়!
না না, আমায় এমনি করে জলের মধ্যে ড়ুবিয়ে মেরো না। এবারের মত আমায় ক্ষমা কর, প্রতিজ্ঞা করছি, এ জীবনে আর তোমার পরিচয় জানবার চেষ্টা করব না।
আবার সেই নিষ্ঠুর হাসি।
হিংস্র হাঙরে যখন তোর দেহ ধারালো দাঁতে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে খাবে, তখন জানবি আমি কে!
ক্ষমা কর আমায়! ক্ষমা কর!
ফেলে দে! দে!
পাশে দণ্ডায়মান লোকটি বিনা বাক্যব্যয়ে নীচু হয়ে লোকটাকে অবলীলাক্ৰমে তুলে উঁচু করে তখনই রেলিং টপকে নীচের গজমান অতল পারাপারহীন সমুদ্রগর্ভে নিক্ষেপ করল।
একটা বুক-ভাঙা আকুল চিৎকার নিশীথ রাত্রির গভীর স্তব্ধতাকে মহতের জন্য যেন আলোড়িত করে তোলে। ঝপাং করে একটা শব্দ শোনা যায় মাত্র।
সমগ্র ব্যাপারটা এত চকিত ও এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে গেল যে, কিরীটী বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। একটা টু শব্দ পর্যন্ত তার মুখে ফুটে বের হল না। স্থাণুর মতই কিরীটী প্যাকিং বাক্সটার ওপরে দাঁড়িয়ে রইল। পা দুটো যেন পাথরের মত ভারী ও অনড় হয়ে গেছে।
কেউ জানলে না, কেউ শুনলে না, রাত্রির নিস্তব্ধ অন্ধকারে একজনের জীবন্ত সলিল সমাধি হয়ে গেল। সাগরের কালো জলের তলে চিরনিদ্রায় সে অভিভূত হল। কিরীটীর যেন দম আটকে আসে।…
হতভাগা ভেবেছিল, আমার চোখে ধূলো দেবে। কিন্তু কি করব, এ ছাড়া উপায় ছিল না। বলতে বলতে লোকটার কণ্ঠস্বর কেমন যেন জড়িয়ে আসে। তারপর যেন কতকটা জোর করেই আপনাকে সামলে নিয়ে দ্বিতীয় লোকটির দিকে ফিরে বললে, ওই লোকটাকে বরাবর মৃত্যুগুহায় নিয়ে যাবে। জাহাজে আর তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না। বলেই লোকটা ফিরে দাঁড়াল।
ফিরে দাঁড়াতেই সামনের একটা আলোর খানিকটা বাঁকা হয়ে এসে তার মুখের উপর পড়ল।
কিরীটী বিস্ময়ে আতঙ্কে চমকে উঠল। অন্ধকারে চলতে চলতে সামনে বিকটাকার ভূত দেখলেও বুঝি মানুষ এতটা চমকে ওঠে না।
১৫. নিশাচর ভূত
চিনতে কষ্ট হয় না কিরীটীর ঐ মুহূর্তের দেখাতেই। লোকটা আর কেউ নয়, সেই চীনা আড্ডায় দেখা ভীষণ-দর্শন লোকটিই এই পৈশাচিক অনুষ্ঠানের হোতা।
কিরীটী ভাবলে, তবে আমার হিসাব ভুল হয়নি। দলের নেতা ইনিই! স্বনামধন্য দস্যুরাজ কালো ভ্রমর! হ্যাঁ, লোকটার শক্তি আছে বটে। তাহলে দস্যুরাজ আমাদেরই সহযাত্রী!
প্যাকিং করা বাক্সগুলোর আড়ালে কিরীটী স্তম্ভিত ভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল তা নিজেই বুঝতে পারেনি। যখন খেয়াল হল তখন সে আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে এল।
রাতও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চোখ দুটো জালা করছে। বেশ ঘুমও পেয়েছে।
কিরীটী ধীরে ধীরে এসে কেবিনে প্রবেশ করল এবং দরজাটা বন্ধ করে শয্যার ওপরে এসে গা এলিয়ে দিল। সাগরের দোলায় দোলায় অল্পক্ষণের মধ্যেই কিরীটী ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।
পরের দিন যখন কিরীটীর ঘুম ভাঙল, বেলা তখন প্রায় সাড়ে আটটা হবে, প্রভাতী চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
সুব্রত ও রাজু তখন কেবিনে ছিল না—সম্ভবত ডেকে বেড়াতে গেছে।
একটু পরেই জংলী কেবিনে ঢুকে বলল, চা বোধ হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে বাবুজি!
হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। আমি একেবারে স্নানটা সেরে আসি। বলে কিরীটী তোয়ালে ও একটা ঢোলা পায়জামা নিয়ে স্নানঘরের দিকে পা বাড়াল।
স্নান সমাপ্ত করে আসতে আসতেই ব্রেকফাস্টের ঘণ্টা শোনা গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে আবার ওরা সকলে যখন ডেকের ওপর এল, তখন একে একে অনেক যাত্রীই ডেকের ওপর এসে জড় হতে শুরু করেছে।
একটি বছর সাতেকের মেয়ে ডেকের ওপর স্কিপিং করছিল।
ডাঃ সান্যালও ডেকেই ছিলেন। সুব্রত ও রাজু ডাঃ সান্যালের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে কিরীটী যখন ওদের দলে এসে মিশল, ডাঃ সান্যাল, সুব্রত ও রাজু তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। কিরীটী ওদের একপাশে এসে দাঁড়াল।
সুপ্রভাত! কিরীটী জবাব দিল।
একবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কিরীটীর মুখের দিকে চেয়ে একটু মৃদু হেসে ডাক্তার বললেন, কাল বুঝি রাতটকু আপনার না ঘুমিয়েই কেটে গেছে, মিঃ রায়?
কিরীটী আনমনা ভাবে জবাব দিল, না, বেশ ঘুম হয়েছিল তো!
আর বিশেষ কোন কথাবার্তা হল না। সবাই একমনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
চারিদিকে কেবল জল। জল আর জল। নীল জলরাশি গভীর উচ্ছাসে ঢেউয়ের তালে তালে নেচে ফিরছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেন অস্ফুট সরে কি সব বলাবলি করছ।
সুনীল আকাশ রুপালী রোদের আভায় ঝিলমিল করছে।
***
সন্ধ্যায় ডাঃ সান্যালের কেবিনে সুব্রত, রাজু ও কিরীটী চা-পান করতে করতে ডাক্তারের সঙ্গে গল্প করছিল। কেবিনের মধ্যে স্টোভে চা তৈরী হয়েছে।
