অনেক কিছুই বললেন—যাতে বেশ আশ্চর্যই হতে হয়েছে আমাকে। প্রথমেই তো তিনি বললেন, তিনি জীবনে কোন দিনই আপনাকে ও ধরনের ডি ভায়োলেট কালি উপহার দেননি! জীবনে কোনদিনই তিনি চীনে যাননি!
এতে আশ্চর্য হচ্ছি না আমি এতটুকুও সুব্রতবাবু!
কেন? লোকটা ভয়ানক মিথ্যেবাদী না কী?
না, সে মিথ্যুক কিনা তা আমি জানি না।
কিন্তু একথা আপনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারেন না মিঃ চৌধুরী যে, আপনি বলেছিলেন সেদিন আপনারই জবানবন্দীতে, মিঃ দত্তই আপনাকে কালিটা দিয়েছিলেন!
সত্যি কথাই সেদিন আমি আপনাকে বলেছিলাম, সুব্রতবাবু। সেদিন আপনাকে যখন ও কথাগুলো বলি, তখন সব কথা আপনাকে খুলে বলা প্রয়োজন মনে করিনি।
শুনতে পারি কি, কেন প্রয়োজন মনে করেননি? তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুব্রত সুবিমলবাবুর মুখের দিকে তাকাল।
সুবিমলবাবু কিছুক্ষণ মৌন হয়ে বসে রইলেন। তারপর ধীর সংযত কণ্ঠে বললেন, বলিনি তার কারণ ব্যাপারটা অতি সামান্য। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে আপনার মনে সন্দেহ জেগেছে। সুবোধের এক বন্ধু চীন থেকে কালিটা নিয়ে আসে এবং সে সুবোধকে কালিটা দেয়। তাকে ঐ কালিতে কয়েকটা জাপানী স্কেচ করে দেবার জন্য। সুবোধের সেই বন্ধুটি একজন খেয়ালী জমিদার। সুবোধ বন্ধুর প্রস্তাবে রাজী হয়। কিছুদিন বাদে তার প্রতিশ্রুতিমত। কয়েকখানা ছবি ঐ কালিতে এঁকে দেয়। সুবোধের বন্ধুর মতলব ছিল আলাদা। সে সেই। ছবিগুলো চীনের কোন শিল্পীর কাছে চড়া দামে বিক্রি করে এবং চীনের সেই শিল্পীটি আরও কতকগুলো ছবি চেয়ে পাঠায় সুবোধের বন্ধুর কাছে।
সুবোধ কিন্তু ব্যাপারটা কোন রকমে আগাগোড়া জানতে পারে। এইখানে একটা কথা আছে। একটা বেদনার্ত ইতিহাস। আসলে যার জন্য ব্যাপারটা আপনাকে বলিনি। কোন এক সময় সুবোধের ঐ জমিদার বন্ধুটি সুবোধকে অর্থ দিয়ে নানাভাবে সাহায্য করেছিল। সুবোধরা দুটি ভাইবোন। ওর বোন নমিতার বয়স যখন পাঁচ, ওর বয়েস আঠারো, ওদের মা-বাবা মারা যান। এক ঘণ্টার ব্যবধানে এসিয়াটিক কলেরায়। সুবোধের পিতা হারাধনবাবু কলকাতা কর্পোরেশনের সামান্য পঁয়ত্রিশ টাকা মাইনের কেরানী ছিলেন। কাজে কাজেই যা তিনি উপায় করতেন তা ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোতো না।
পিতার মৃত্যুর পর সুবোধকে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ছোট বোনটির হাত ধরে পথের ওপর এসে দাঁড়াতে হল। কেননা তার ধনী আত্মীয়-স্বজনরা সকলেই ওই হতভাগ্য পিতৃ-মাতৃহারা ভাইবোন দুটিকে এতটুকু কৃপাদৃষ্টি থেকেও বঞ্চিত করলেন।
দুটো বসর সুবোধ বহু কষ্টে বোনটিকে নিয়ে একটি ভোলার ঘরে কাটায়। ঐ সময় সুবোধের ঐ ধনী জমিদার খেয়ালী বন্ধুটির সঙ্গে পরিচয় হয় এবং ঐ ধনী বন্ধুটির সাহায্যেই সুবোধ আর্ট স্কুলে প্রবেশাধিকার পায়। ক্রমে নিজের সাধনার দ্বারা সুবোধ যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, ওর বোন নমিতার খুব একটা বড় রকম অসুখ হয়। বোন একটু সুস্থ হলে ও বোনকে নিয়ে শিমূলতলায় বেড়াতে যায়।
মাসতিনেক বাদে ও যখন বোনকে নিয়ে ফিরে এল, দেখলাম, ওর বোনের সিঁথিতে সিন্দুর। কিন্তু শিমুলতলা থেকে ফেরা অবধি সুবোধ যেন কেমন হয়ে গেল। আমার সঙ্গে পর্যন্ত ও সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেললে।
কানাঘুষায় একদিন সংবাদ পেলাম সুবোধের বোনের একটি মেয়ে হয়েছে হাসপাতালে। সেই মেয়েটির যখন বছর ছয়েক বয়েস, হঠাৎ মেয়েটিকে কারা চুরি করে নিয়ে গেল। সেই থেকে সুবোধ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। কারও সঙ্গে দেখা হলেও কথা বলে না।
যাই হোক, ঐ সময় বছরখানেক সুবোধের অবস্থা আবার খুব খারাপ হয়ে যায়। আবার সুবোধের জমিদার বন্ধুটি এগিয়ে আসে এবং একটি গার্লস স্কুলে নমিতাকে চাকরি দেয়। আজও নমিতা সেই স্কুলেই চাকরি করছে। এখন ঐ সব কারণেই সুবোধ বন্ধুর ছবি বিক্রির কথা জেনেও চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়।
আরও একটা মজার কথা, সুবোধের বন্ধুটি সুবোধের আঁকা ছবিগুলি নিজের নামে আঁকা বলে বিক্রি করেছিল। তাতে সুবোধ খুব বেশী মর্মাহত হয় এবং জগতে তার যত বন্ধু ছিল সকলের উপর চটে যায়। অথচ সেই বন্ধুটি যখন আবার ছবির জন্য বললে, ও ভেবে পেলে না যে কি করবে। একদিকে নিজের বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে বন্ধুর বন্ধুত্বের দাবিতে বিশ্বাসঘাতকতা—দুয়ে বাধল সংঘর্ষ।
এমন সময় হঠাৎ একদিন তার বাড়িতে আমি যাই। কথায় কথায় ও বলে, সুবিমল, তুই কালিটা নিয়ে হ্যাঁ। তাকে বলবো, কালি ফুরিয়ে গেছে, তাই ছবি আঁকতে পারলাম না। আমি কালির শিশিটা নিয়ে আসি।
এরই দিন দুই পরে ওর বোনের চাকরিটা যায়। আমাদের অফিসে একজন লেডি ক্লার্কের পদ খালি ছিল। সুবোধের অবস্থা আমি জানি, তাই তাকে বলেছিলাম তার বোনকে আমাদের অফিসে ঢুকিয়ে দিতে। তাতে সে ভয়ানক চটে উঠল এবং বললে, আর বন্ধুদের পরামর্শ নয়— একজন বন্ধুত্বের মুখোশ পরে এসে অভাগিনী বোনটিকে বিবাহ করে গা-ঢাকা দিল। একটা মেয়ে ছিল, তবু বোনটার সান্ত্বনা, সেও চুরি গেল। তারপর আর এক ধনী বন্ধু আমার আঁকা ছবি নিজের নামে বিক্রি করল। আর বন্ধুদের সাহায্য আমি চাই না। যথেষ্ট হয়েছে। বেরিয়ে যাও তুমি আমার বাড়ি থেকে!
তার ঐ অভদ্র ব্যবহারে আমি গেলাম চটে। দুজনে রাগারাগি হল। আমি চলে এলাম। এসব ব্যাপার ঘটেছে আজ প্রায় মাস-সাতেক আগে। ঐ ঘটনার পর আর আমাদের পরস্পরের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। কেউ কারও সঙ্গে দেখা হলেও কথা বলি না।
