পড়ল।
কেন—কেন তাকে দাদা এখানে রেখে গেল? সে এখন কী করবে?
ক্রমে একটু একটু রাত্রি ঘনিয়ে আসতে লাগল। কিন্তু বাবলুর কান্না যেন আর শেষই হয় না। অভিমানে ব্যথায় তার ছোট্ট কচি বুকখানা যেন ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে।
তখন চারিদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। মাথার উপরে কালো আকাশটার বুকে তারাগুলো সোনার প্রদীপের মত পিটুপি করে জ্বলছে।… মা গো কোথায় তুমি? কোন্ দূর দেশে? ঐ আকাশের তারাগুলোয় মাঝখানে কি তুমি লুকিয়ে আছ মা-মণি! এত তোমাকে ডাকি, সাড়া দাও না কেন? তোমার বাবলু যে এত তোমাকে ডাকছে তা কি শুনতে পাও না–মণি!
কাঁদতে কাঁদতে কখন একসময় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কার মৃদু সস্নেহ স্পর্শে ও চোখ মেলে তাকাল। চোখের কোলে তখন তার অশ্রুর ভিজা আভাস।
বাবলু–বাবলু সোনা! এখানে এমনি করে ঘুমিয়ে কেন মা? অমিয়াদি বাবলুকে দুহাত বাড়িয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।
বাবলু অমিয়াদিকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল—মা!
কি হয়েছে সোনা? কাদছ কেন কাঁদছ কেন? চল খাবে চল। আমি তোমাকে সারা বাড়ি খুঁজে হয়রান!
১৮. বাবলুকে অমিয়াদির কাছে রেখে
বাবলুকে অমিয়াদির কাছে রেখে একপ্রকার নিশ্চিন্ত হয়েই সুব্রত এসে ট্যাক্সিতে উঠে বসল এবং ট্যাক্সিওয়ালাকে লালবাজার থানার দিকে গাড়ি ছোটাতে বললে। থানায় এসে যখন ও পৌছাল বেলা তখন প্রায় এগারোটা। নিজের বসবার ঘরে ঢুকে প্রথমেই তালুকদারকে ডেকে পাঠাল। একটু পরেই তালুকদার এসে ঘরে প্রবেশ করল।
এই যে তালুকদার! কালকের সেই আসামীরা ধরা পড়ে ছিল তো?
া, তারা চারজনেই হাজত ঘরে বন্দী আছে।
তাদের এই ঘরে আনাও তো। লোকগুলোকে একবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।
তালুকদার ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে একজন সার্জেন্টকে আসামীদের সুব্রতর ঘরে হাজির করতে বলে এল।
মিনিট পনেরোর মধ্যেই দুজন পুলিস আসামী চারজনকে নিয়ে ঘরে এসে প্রবেশ করল।
সুব্রত তখন একটা কাগজের ওপরে কী যেন লিখছিল। কলমটা টেবিলের ওপরে একপাশে নামিয়ে রেখে চোখ তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে সে যেন হাঁ হয়ে গেল। এ কি! এরা কে? এদের কোথা থেকে ধরে আনলে?
চারজন কুলীমজুর লোক, অতি মলিন ছিন্ন বসন পরিধানে।
তালুকদার বললে, কেন, এদেরই কাল ধরে আনা হয়েছে!
হেড কনেস্টবল রমজান কোথায়? তাকে ডাক। সে-ই কাল সেখানে ছিল।
রমজানকে ডেকে আনা হল। রমজান বললে, এই চারজন লোককেই গতকাল রাত্রে চীৎপুরের বাড়িতে বন্দী অবস্থায় পাওয়া গেছে। লোকগুলোকে নানাভাবে প্রশ্ন করেও সুব্রত। কিছুই বুঝতে পারলে না। সে স্পষ্টই বুঝতে পারল সত্যিকারের আসল আসামীরা কোন গুপ্ত উপায়ে সরে গিয়ে প্রকাণ্ড চাল চেলেছে সুব্রতকে জব্দ করবার জন্য। নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে কোথাও গুপ্তদ্বার ছিল, যার সাহায্যে ওরা সরে পড়ে এই লোকগুলোকে তাদের জায়গায় রেখে গেছে। উঃ, কী শয়তান! কী ধড়িবাজ! কী জব্দই না করেছে তাকে!
সুব্রত লোকগুলোকে আপাতত হাজতেই বন্দী করে রাখতে বললে। সার্জেন্ট বন্দীদের নিয়ে চলে গেল।
কী করবে এখন সে? কোন্ পথ ধরে এগুবে?
আজই আর একবার সে বাড়িটা গোপনে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে হবে। বাড়িটার কোথায় কোন্ রহস্য গোপন হয়ে আছে, তার সব সন্ধান তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
দ্বিপ্রহরের দিকে সুব্রত রাজলক্ষ্মী মিলের অফিসে সুবিমল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গেল।
সুবিমলবাবু তার অফিসঘরে বসে কতকগুলো কাগজপত্র সই করছিলেন। সুব্রত ডোর-স্ক্রিন ঠেলে অফিসঘরে ঢুকতেই কাগজপত্র থেকে মুখ না তুলেই বললেন, আসুন!
সুব্রত একখানা চেয়ার অধিকার করে বসল। এক মিনিট—এই কাগজপত্রগুলো সই করে নিই, তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলব।
মিনিট দশেকের মধ্যেই সুবিমলবাবুর কাজ শেষ হয়ে গেল। ঘন্টি বাজালেন। বেয়ারা এসে সেলাম দিয়ে দাঁড়াল।
বেয়ারার হাতে কাগজপত্রগুলো তুলে দিয়ে সুবিমলবাবু বললেন, এগুলো ডেসপ্যাচ ক্লার্ককে দিয়ে এস।
বেয়ারা কাগজপত্রগুলো নিয়ে সেলাম জানিয়ে চলে গেল।
তারপর কী সংবাদ বলুন? আপনার তদন্ত কত দূর এগুলো?
এগুচ্ছে ধীরে ধীরে। মৃদুভাবে সুব্রত জবাব দিল।
কেষ্টার একটা কিনারা হবে বলে আপনার মনে হয় সুব্রতবাবু?
নিশ্চয়ই।
সেদিন আপনি সরকারবাড়ির সকলেরই জবানবন্দী নিয়েছিলেন সুব্রতবাবু?
হ্যাঁ।
সৌরীনকে কী রকম মনে হল?
সাধারণ। একটু বেশীরকম নার্ভাস। দোষী বলে তাকে একটুকুও আমার সন্দেহ হয় না।
হয় না? কেন?
ক্ষমা করবেন মিঃ চৌধুরী, কেন তা আপনাকে আমি বর্তমানে বলতে পারব না।
তাহলে নিশ্চয়ই আপনি অন্য কাউকে দোষী বলে সন্দেহ করেন!
হয়তো তাই।
আমাকে কী?
এমন কথা আমি নিশ্চয়ই আপনাকে বলিনি, মিঃ চৌধুরী!
মিঃ চৌধুরী হঠাৎ হেসে ফেললেন, যাক্, কতকটা তবু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। তারপর এখন বলুন দেখি, হঠাৎ আমার কাছে আপনার কী বিশেষ প্রয়োজন হল?
শুনুন মিঃ চৌধুরী, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন আমি করতে চাই। আশা করি সোজা ভাবেই জবাবগুলো দেবেন।
মৃদু হেসে মিঃ চৌধুরী বললেন, শোনাই যা!
শুনুন মিঃ চৌধুরী, সেদিন আপনার দেওয়া ঠিকানামত আপনার আর্টিস্ট বন্ধু মিঃ সুবোধ দত্তর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছিলাম।
তাই নাকি? তারপর? বেশ লোকটি, না?
হ্যাঁ, বেশই বটে। তবে মনে হল, গভীর জলের মাছ। সহজে ধরা দিতে চান না।
হ্যাঁ, আর্টিস্ট মানুষ কিনা! একটু খেয়ালী চিরদিনই। তারপর কী সে বললে?
