• আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি
মঙ্গলবার, জুন 16, 2026
  • Login
BnBoi.Com
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
BnBoi.Com
No Result
View All Result

সাইমুম সিরিজ – আবুল আসাদ

কয়েক দিন পর। পরদিনই ফিরতে হবে মস্কোতে। তখন বিকেল। ভল্লার তীরে যার যেমন ইচ্ছা প্রোগ্রাম চলছে। কেউ হাঁটছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ জোড়া বেঁধে গল্প করছে।
এই কোলাহল থেকে একটু দুরে ভলগার তীরে ওলগা এবং ফারহানা বসে। দু’জনে চেয়ে বহমান ভল্লার নীল পানির দিকে। একদম শান্ত নদী। একটা ছোট পখি এসে চকিতে এক ছোঁয়ে ঠোঁটটা পানিতে ডুবিয়ে আবার উড়ে গেল। নীল পালকে হলুদের ছোপ দেয়া তার। ফারহানা চিনেনা পাখিটাকে। ওলগাও নাম বলতে পারলোনা। ওটা নাকি সাইবেরিয়ার পাখি। এই সিজনে এদিকে আসে।
গোঁ গোঁ একটা শব্দে ওরা বামদিকে ফিরে তাকাল। দেখল একটা স্পীড বোট আসছে। সামনে এসে গেল বোটটা। শান্ত নদীর বুক চিরে এগিয়ে এল। ঢেউ এর মিছিল ছড়িয়ে পড়ছে বোটের দু’পারে। নদীর শান্ত জীবনে যেন একটা ঝড়।
বোটটা সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। দেখেই বুঝা গেল পুলিশ বোট। সামনে বোট ড্রাইভার। পেছনে ষ্টেনগান ধারী দু’জন পুলিশ। অবশিষ্ট ডজন খানেক লোক কয়েদীর পোশাক পরা। তাদের হাতে পায়ে হালকা শিকল। বোধ হয় সরকারী কোন প্রজেক্ট তারা বিনে পয়সায় শ্রম দিয়ে এল।
ওদিকে তাকিয়ে ওলগা আনমনা হয়ে পড়েছিল। বোট যতদূর দেখা গেল তার চোখ ততদুর অনুসরণ করল। কে জানে, ঐ কয়েদীদের মধ্য দিয়ে ওলগা তার মাকেই দেখছিল কি না।
বোট চোখের আড়ালে চলে গেল। ফিরে এল ওলগার চোখ। মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল সে। তারপর চোখ খুলে বলল, ফারহানা, কয়দিন থেকে তোমাকে একটা কথা বলব বলব মনে করছি।
কি কথা? আগ্রহে মুখ তুলল ফারহানা।
জবাব এলনা ওলগার কাছ থেকে। সে চিন্তা করছিল।
-কি কথা ওলগা?
ওলগা ফারহানার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, তোমাকে বলতে চাই, তুমি হয়তো ওদের কোন উপকার করতে পার। তোমার জাতির লোক ওরা।
ওলগা থামল। ফারহানা উৎসুক চোখ দু’টি তার দিকে মেলে ধরল। ওলগা চোখ ঘুরিয়ে একবার দেখে নিল। তারপর ফিস ফিস করে বলল, মস্কোভা বন্দী শিবির থেকে দু’জন বোন পালিয়ে এসেছে। মা একটা চিঠি দিয়েছিলেন, ওরা আমার ওখানেই উঠেছে। এখন পর্যন্ত লুকিয়ে রেখেছি। কি করব বুঝতে পারছিনা।
সত্যই বিস্ময়ে ফারহানার চোখ দু’টি কপালে উঠল। বলল, বন্দী শিবির থেকে পালিয়ে এসেছে?
-হাঁ।
-কি বললে, ওরা আমার জাতির লোক?
-হাঁ, দু’জনেই উজবেক মেয়ে, তোমার মতই মুসলমান।
-কি নাম ওদের ওলগা?
-আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা।
নাম দু’টি শোনার সাথে সাথেই ফারহানার গোটা দেহ বিস্ময় ও আনন্দের একটা ঢেউ খেলে গেল। একটা অভাবিত আবেশ যেন তাকে আচ্ছন্ন করল। কান দু’টিকে বিশ্বাস হতে চাইলনা। তারা যে দু’জন বোনের জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে, তাদেরকে আল্লাহ্ এমন করে তাদের হাতের কাছে এনে দিয়েছে।
বিস্ময় ও আনন্দের উচ্ছাসটা চেপে গেল ফারহানা। ওদের সাথে তাদের সম্পর্কের বিষয়টা গোপন থাকাই দরকার। যেন চিন্তা করছে ফারহানা, এমন একটা টানা কণ্ঠে সে বলল, খুশি হলাম ওলগা, ওরা আমার জাতির লোক। ওদের অবস্থা জানিনা, দেখা হলে বুঝতে পারব কি করা যায় ওদের জন্য।
-ফেরার পথেই চলনা আমাদের বাসায়। সাগ্রহে বলল ওলগা।
এমন আমন্ত্রণ আসুক ফারহানা কামনা করছিল। বলল, ঠিক আছে, সেটাই ভাল হবে।
ওলগার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, জান, ওরা আসার পর থেকে আমার বুক কাঁপছে, জেল পালান এবং পলাতককে আশ্রয় দেয়া যে কত বড় অপরাধ তা তুমি জান। কিন্তু মা’র আমানত ওরা আমার কাছে। আমার নিরাপত্তার চেয়ে ওদের নিরাপত্তাকে আমি বড় মনে করি। আমি চাই, ওরা নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে সমর্থ হক।
দিনের আলো তখন ফিকে হয়ে এসেছে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে। কালো ছায়া নামছে ভল্গার বুকে।
রেস্ট হাউজে ফিরে যাওয়ার জন্য সবাই তৈরী হচ্ছে। উঠে দাঁড়াল ওলগা এবং ফারহানাও।

৬

ওলগা এবং ফারহানা রেস্ট হাউজের সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল তাদের রুমে যাবার জন্য। রাতের খাওয়া হয়ে গেছে, এখন যাওয়ার জন্য গোছ গাছ করার পালা। আজ রাতের খাওয়ার আগে সমাপনী আনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। এখন যার ইচ্ছা আজ যেতে পারে, কাল সকালেও যেতে পারে। আজ গেলে তাকে নিজের ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে।
ওরা দোতালায় উঠে গেছে, এমন সময় বেয়ারা গিয়ে ওলগাকে খবর দিল, স্যার তাকে তাঁর অফিসে ডাকছেন। ফারহানা চলে গেল তার রুমে। ওলগা স্যারের সাথে দেখা করার জন্য নীচে নেমে গেল।
ফারহানা গিয়ে তার বিছানায় গা এলিয়ে ওলগার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওলগা এলেই দুজনে মিলে গোছ-গাছে লাগবে। ওলগা পনের মিনিট পরে এল। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। ওলগার মুখ ফ্যাকাশে। চোখ দু’টিতে তার উদ্বেগ ও ভীতি।
ফারহানা তার দিকে চেয়ে বিস্মিত হলো। উদ্বিগ্ন ভাবে উঠে বসল সে। বলল, কিছু হয়েছে ওলগা তোমার?
কিছু উত্তর দিলনা ওলগা। নীরবে এসে তার পাশে বসল। ফিস ফিস করে বলল, গোয়েন্দা পুলিশ এসেছে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। বোধ হয় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবে এবং বাড়ি সার্চ করবে।
-কেন? জিজ্ঞাসা করল ফারহানা।
-ব্যাপারটা পরিষ্কার। ঐ ওরা দু’জন আমার মা’র সেকশনে এবং পাশের চেয়ারে বসে কাজ করত। সুতরাং মা’র সাথে তাদের কোন যোগশাজস থাকতে পারে। যদি থাকে আমিও তাহলে তার সাথে যুক্ত আছি। সুতরাং ওদের সন্ধানে আমার এখানে আসা স্বাভাবিক।
আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভার জন্য উদ্বিগ্ন হল ফারহানা। ওলগার বাড়ী সার্চ হলেই তো ওরা ধরা পড়ে যাবে। এখন কি করবে সে। কিন্তু ফারহানা কিছু বলার আগেই আবার কথা বলল ওলগা। বলল, আমার বেশী সময় নেই ফারহানা, তোমাকে একটা দায়িত্ব দিতে চাই।
-কি দায়িত্ব? দ্রুত কণ্ঠে বলল ফারহানা।
-আমি আসার সময় ওদের দু’জনকে আমার খালার বাড়ীতে সরিয়ে রেখে এসেছি। আমার বাড়ী সার্চ করার পর, এরা তাঁর বাড়ীও সার্চ করবে। তারা সেখানে পৌঁছার আগেই তোমাকে গিয়ে ওদের সেখান থেকে সরাতে হবে। পারবে? ফারহানা খুশী হলো। আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাকে নিরাপদে সরিয়ে নেবার পথ একটা আছে জেনে আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করল। ফারহানা ওলগাকে জরিয়ে ধরে বলল, চিন্তা করোনা বোন, এ দায়িত্ব আমি নিলাম।
খুশীতে ওলগার মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল সে, আমার মায়ের জন্য আমি কোন দিন কিছু করতে পারব কিনা জানিনা, এদের জন্য কিছু করতে পারলেও আমি শান্তি পাব এই ভেবে যে, মায়ের দেয়া একটা দায়িত্ব পালন করেছি। তার দু’চোখে দু’ফোটা জল টল টল করে উঠল।
ফারহানা ওলগার কাঁধে একটা হাত রেখে সান্তনা দিয়ে বলল, কেঁদোনা বোন, মজলুমদেরই অবশেষে জয় হবে।
-হবে বলছ? আমার মা আবার ফিরে আসবেন?
-নিরাশ হতে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন। সুতরাং আমরা অবশ্যই করব।
-তোমাদের আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি জানতে চাই ফারহানা। তোমাদের জীবন্ত ধর্ম বিশ্বাস আমার ভাল লাগে।
-বেশ তুমি জানবে।
ওলগা আর কোন কথা বলল না। তাড়াতাড়ি কাগজে খালার ঠিকানা লিখে ফারহানার হাতে দিয়ে বলল, আমার বাড়ী সার্চ করার সময়টুকু হয়তো তুমি পাবে ওদের সরিয়ে নেবার জন্য।
ফারহানা বলল, আমি সব বুজেছি ওলগা, তুমি চিন্তা করোনা। ওলগা সবে কাপড়-চোপড় গোছ-গাছে হাত দিয়েছে। দরজায় নক হলো। দরজা খুলে দিল ওলগা। দেখল, স্বয়ং স্যার দাঁড়ীয়ে। ওলগা বলল, আসছি স্যার, হয়ে গেছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল ফারহানা। সেও স্যারকে বলল, স্যার আমিও চলে যাচ্ছি, সব ঠিক করে নিয়েছি।
মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক অধ্যাপক নিকোলাই ষ্টেপনাভ বলল যেতে পার, আমরা তো বলেই দিয়েছি।
একটু থামল ষ্টেপনাভ। তারপর ওলগার দিকে তাকিয়ে নীচু কণ্ঠে বলল, ভয় করোনা ওলগা, ভয় করেও কোন লাভ নেই। স্রষ্টাকে ডাক। ওলগা হাতের কাজ থামিয়ে বিস্ময়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনিও ইশ্বরের কথা বলছেন?
অধ্যাপক ষ্টেপনাভ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তোমার মা’র মত আমরা সাহসী নই, তাই উচ্চ কণ্ঠে বলতে পারিনা। কিন্তু আমরা কেউ না বললেও ঈশ্বর আছেন এবং থাকবেন।
ওলগা কিছু বলতে যাচ্ছিল। অধ্যাপক ষ্টেপনাভ বাধা দিয়ে বলল, কোন কথা নয়। তৈরী হয়ে নাও। তাড়াহুড়া করছে ওরা। এসে পড়বে হয়তো এখানেই।
ওলগা তৈরী হয়ে স্যারের সাথেই বেরিয়ে গেল। পরে ফারহানাও বেরিয়ে এল। ফারহানা নীচে এসে দেখল, একটা চকচকে গাড়ী, গাড়ী-বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেল। গাড়ী বারান্দার এক পাশে দাঁড়ীয়ে অধ্যাপক ষ্টেপনাভ। ফারহানা বুঝল এই গাড়ীতেই ওলগা গেল। ফারহানাকে দেখে অধ্যাপক ষ্টেপনাভ বলল, কিসে যাবে?
-বিমানে সিট তো মিলবেনা, গাড়ীতেই যাব স্যার।
-একা যাচ্ছ, বিমানেই যাও। এখনই আলাপ হলো সিট একটা আছে।
খুশী হল ফারহানা। ১৫ মিনিট পর বিমান ছাড়বে। সব মিলিয়ে অন্ততঃ আধা ঘন্টা আগে মস্কো পৌছা যাবে। ফারহানা বলল স্যার আপনি একটু টেলিফোনে বলে দিন।
অধ্যাপক স্টেপানাভ বলল, তুমি যাও আমি বলে দিচ্ছি। ফারহানা গাড়ীতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে এয়ারপোর্ট চলল। বিমানে সিট পেয়ে গেল ফারহানা। পিছনের দরজার কাছাকাছি একটা সিট পেল সে।
বিমান উড়ল আকাশে। টয়লেটে যাবার সময় ফারহানা কয়েক সারি সামনে দেখতে পেল ওলগাকে। দেখে সে চমকে উঠল। তা হলে সড়ক পথে তারা যায়নি। অথচ সে মনে করেছিল ওরা গাড়ীতেই যাচ্ছে। ব্যাপারটা চিন্তা করতেই শিউরে উঠল সে। বিমানে সে সিট না পেলে কি অবস্থা দাঁড়াত। তার মিশন নির্ঘাত ফেল। কিছুতেই সে ওদের আগে অলগার খালাম্মার বাড়ীতে পৌঁছাতে পারতো না। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল ফারহানা। আল্লাহ্ যেন বিশেষ করুনায় বিমানে আসার সু্যোগ করে দিয়েছেন।
বিমান মস্কো বিমান বন্দরে এসে ল্যান্ড করল। ফারহানা ওলগাদের পিছু পিছুই নামল বিমান থেকে। বিমান বন্দর থেকে বেরুতেই একটা কার এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। ওলগাকে ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে তুলে দিয়ে গোয়েন্দা অফিসার দু’জন পিছনের সিটে বসল। ওরা চলে গেলে ফারহানা ভাল চকচকে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ল। ড্রাইভার একজন মাঝারী বয়সের রাশিয়ান। ফারহানা তাকে বলল, গোর্কি রোড থেকে আমার দু’জন বান্ধবীকে নিয়ে কারকোভভ রোডে যাব।
চলতে চলতে ভাবল ফারহানা, ওলগার খালাম্মা কেমন হবে? আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা তার সাথে আসতে চাইবে কি না? সময় হাতে বেশী নেই। অনুমান সত্য হলে ওলগার বাড়ী সার্চ করার পরপরই তারা ওলগার খালাম্মার বাড়ীতে যাবে। সুতরাং মিনিট পনেরর বেশী সময় নেয়া তার কিছুতেই ঠিক হবে না।
গোর্কি রোডে ওলগার খালাম্মার বাড়ীর ঠিকানা ফারহান আবার মনে মনে আওড়ালো, বই-২১/১১।
তখন রাত সাড়ে ন’টা বাজে। ফারহানা গোর্কি রোডের ২১ নম্বর ব্লকে গিয়ে পৌছাল। গাড়ী বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখে ফারহানা উপরে উঠে গেল লিফটে চড়ে। ১১নং ফ্ল্যাট ৪তলায়। ফারহানা ১১নং ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে নক করলো। একবার, দু’বার, তিনবার।
-আমি ওলগার কাছ থেকে এসেছি। আপনি কি ওলগার খালাম্মা?
-হ্যাঁ। বলল মহিলাটি।
-জরুরী কথা আছে, ভেতরে আসতে চাই।
-আসুন। বলে স্বাগত জানাল মহিলাটি।
ভেতরে ঢুকেই ফারহানা বলল, আমাকে আয়েশা ও রোকাইয়েভার কাছে নিয়ে চলুন।
ওলগার খালাম্মা আরেকবার ফারহানার দিকে তাকাল। সন্ধানী দৃষ্টি তার।
আমাকে বিশ্বাস করুন, বলে খালাম্মার ঠিকানা লেখা ওলগার হস্তাক্ষর খালাম্মার হাতে দিল। সেদিকে একবার তাকিয়ে খালাম্মা ফারহানাকে নিয়ে তার বেড রুমে গেল। ডেকে আনল আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাকে। তারা আসতেই সালাম দিয়ে বলল ফারহানা, আমি ফাতেমা ফারহানা, আমি মুসলিম তাজিক।
আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা দু’জনেই তাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে স্বাগত জানাল। ফারহানা খালাম্মার দিকে তাকিয়ে বলল, এই মুহুর্তে ওলগার বাড়ী সার্চ হচ্ছে, সেখান থেকে তারা এখানে আসতে পারে। আমি এদের দু’জনকে নিয়ে যেতে চাই। ওলগার মত এটাই।
সার্চ হওয়ার কথা শুনে খালাম্মার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আতংকের একটা চায়া নামল তার চোখে। সে বলল, ওলগার এটাই মত হলে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু তোমার পরিচয় কি মা, কোথায় কি ভাবে এদের নিয়ে যাবে?
ফারহানা বলল, আমি এদের বোন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
ফারহান মাথা নীচু করে খালাম্মার হাতে একটু চুমু খেয়ে বলল, চলি খালাম্মা। আর ওদিকে চেয়ে বলল, চলুন বোনেরা।
আয়েশা আলিয়েভা ফারহানাকে দেখেই তাকে বিশ্বাস করেছে। সে যাবার জন্য ঘুরে দঁড়াবার আগে খালাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ওলগাকে আমার ভালোবাসা দিবেন। কোন দিনই আপনাদের কথা ভুলবনা।
লিফট দিয়ে তিঞ্জনেই নেমে এল গাড়ী-বারান্দায়। ড্রাইভার গাড়ী খুলে ধরল। ওরা তিনজনেই পেছনের সিটে উঠছিল। তারা কেউই লক্ষ্য করলনা, আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভার দিকে চোখ পড়তেই ড্রাইভারের ভ্রুটা কেমন কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিল।
গাড়ীর দরজা বন্ধ করে ড্রাইভার তার সিটে গিয়ে বসল। ছেড়ে দিল গাড়ী।
পিছনের সিটের মাঝখানে বসেছে আয়েশা আলিয়েভা। সামনের দুই আসনের ফাঁক দিয়ে স্পিডোমিটার, গাড়ীর গিয়ার পরিবর্তন, ষ্টিয়ারিং হুইলে রাখা ড্রাইভারের দুটি হাত সবই দেখতে পাচ্ছে সে।
স্পিডোমিটারের কাঁটা ফিফটিতে। বলা যায় আস্তেই চলছে গাড়ী। এক জায়গায় এসে সামনের গাড়ী গুলো মনে হয় কোন কারনে থেমে গেল। এ গাড়ীটাও দাঁড়িয়ে পড়ল। হর্ন দিচ্ছে বার বার ড্রাইভার। এ গাড়ীর হর্ন শুনে চমকে উঠল আয়েশা আলিয়েভা। একটা নির্দিষ্ট কোডে হর্ন বাজানো হচ্ছে, এ কোড তার কাছে পরিছিত। ‘ফ্র’ এবং কম্যুনিস্ট সরকারের গোয়েন্দারা এই কোডে হর্ন বাজায়। ট্রেনিং-এর সময় সেও এটা শিখেছে।
তা হলে এ গাড়ী কম্যুনিস্ট গোয়েন্দা অথবা ‘ফ্র’ এর। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর শিউরে উঠল আয়েশা আলিয়েভা। সে মাথা কাৎ করে ফারহানার কানে কানে বলল, এ গাড়ী আপনার ভাড়া করা নিশ্চয়?
-হ্যাঁ। বলল ফাতিমা ফারহানা।
-কোথা থেকে ভাড়া করেছেন?
-বিমান বন্দর থেকে।
-এ গাড়ী গোয়েন্দা বিভাগের।
শুনেই ফারহানা উদ্বেগের মধ্যেও একটা সান্তনা খুঁজল, আমাদের পরিচয় ও জানবে কি করে?
আয়েশা আলিয়েভা তার রিভলভার হাতে তুলে নিয়েছে। ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। তার চোখ দু’টোকে ড্রাইভারের সিটের সমান্তরালে নিয়ে গেছে। এখন ড্রাইভারে সব কিছু সে দেখতে পাচ্ছে।
হঠাৎ সে দেখল ড্রাইভার তার পকেট থেকে একটা ছোট অয়্যারলেস সেট বের করে মুখের কাছে ধরল। সে কিছু ইনফরমেশন পাচার করবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হোল আয়েশা আলিয়েভা। তাহলে আমাদের চিনতে পেরেছে?
চিন্তা করার সাথে সাথে আয়েশা আলিয়েভা পায়ে ভর দিয়ে একটু উঁচু হলো এবং ড্রাইভারের ঘাড়ের বিশেষ স্থান লক্ষ করে সজোরে রিভলবারের বাঁট চালাল সে। এবং সাথে সাথেই সিট টপকে ষ্টিয়ারিং হুইল হাতে নিল। গাড়িটা একটু ঝাঁকুনি খেয়ে একটু বেঁকে গিয়ে আবার ঠিক হয়ে গেল।
ঘাড়ের বাম পাশে কানের নীচে ঠিক মোক্ষম জায়গাতেই আঘাত লেগেছিল। আঘাত লাগার সাথে সাথেই দান পাশে দলে পড়েছিল ড্রাইভার। মাথাটা সিট এবং গাড়ীর দেয়ালের পাশে দুকে গিয়েছিল। দেহের মধ্যে ভাগটা সিটের উপর ছিল। আয়েশা আলিয়েভা সেটা ঠেলে নিচে নামিয়ে দিল। ড্রাইভারের দেহটা বেঁকে সিটের পাশে এমন করে ঠেসে গেছে যে, তার পক্ষে উঠা অসম্ভব।
সিটে ভাল করে বসে গড়ীর স্পীড বাড়ীয়ে দিল সে। পিছনের সিটে বসে ফাতিমা ফারহান এবং রোকাইয়েভা কাজ গুলো দেখছিল। আলিয়েভার হাতে গাড়ীর নিয়ন্ত্রন আসার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ফাতিমা ফারহানা এবং রোকাইয়েভা।
অন্যদিকে আয়েশা আলিয়েভা ভাবছিল অন্য জিনিস। গোয়েন্দা ড্রাইভার ইতিমধ্যেই কোন অথ্য পাচার করেছে কিনা? গাড়ীতে উঠার পর যত দূর মনে পড়ে গোয়েন্দা সে সুযোগ পায়নি। তার এ চিন্তা ঠিক কি না সে বিষয়ে নিশ্চিৎ হবার জন্য সে রিয়ারভিউ -এর দিকে উদ্ভিগ্ন ভাবে তাকিয়েছিল। সে গাড়ীর স্পীড বাড়ীয়ে, স্লো করে দিয়ে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করল। না, কেউ ফলো করছেনা। তা হলে সে খবর পাচার করতে পারেনি। সবে সে চেষ্টা করতে যাচ্ছিল বলে মনে হয়।
আশ্বস্ত হল আয়েশা আলিয়েভা। ড্রাইভার তার গড়ীর নম্বরটা এবং অবস্থানটা যদি হেড অফিসে দিয়ে দিতে পারত, তাহলে এতক্ষনে ওরা চারদিক থেকে এসে ঘিরে ফেলত। ওদের সে ট্র্যাপ থকে বেরুনো কঠিন হতো। আল্লাহ্ একটা বড় সাহায্য করেছেন।
মুখ ফিরিয়ে ফারহানাকে লক্ষ্য করে আয়েশা আলিয়েভা বলল, যে ঠিকানায় যাচ্ছি সেখানে ড্রাইভার এবং গাড়ী সামাল দেয়ার ব্যবস্থা আছে তো?
আয়েশা আলিয়েভা কি বলতে চায় তা ফাতিমা ফারহানা বুঝল। বলল, আছে, নিশ্চিত থাকুন।
কারকভ সড়ক আলিয়েভা চেনে। এখানে বড় বড় কর্তাদের বাস। অনুসরণ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হবার জন্য অনেকটা পথ ঘুরে আলিয়েভা জিজ্ঞেস করল, কত নম্বর।
-বি-৭০০। আরেকটু সামনে। বলে দিব আমি। বলল ফারহানা। বি-৭০০ কম্যুনিস্ট পার্টি সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য এবং পলিটব্যুরোর সদস্য কনষ্টাইন করিমভের বাসা। তিনি সরকারী বাড়িতে থাকেন, এখানে থাকে তাঁর বড় ছেলে ফরিদভ। তাঁর বয়স ৫০ এবং মস্কো মহানগরী কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সে। আজ পাঁচ বছর ধরে সে সাইমুমেরও সদস্য। তাঁর স্ত্রী হামিদাও সাইমুমের মহিলা ইউনিটে কাজ করে। মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের মুক্তির চাইতে তাদের বড় কামনা আর কিছুই নাই।
ফরিদভ-এর বাড়ী সাইমুম প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। কারকভ রোডের অপজিটে ষ্ট্যালিন এভিনিউ। ফরিদভের বাড়ীর পেছন দিকের গোপন দরজাটা খুললে ষ্ট্যালিন এভিনিউতে দাঁড়ানো অশতিপর কূটনীতিক ফেদর বেলিকভ এর বাসায় পৌঁছানো যায়। তিনি জাতিতে রাশিয়ান, কিন্তু বিয়ে করেছিলেন তাঁর সহপাঠী এক কাজাখ মেয়েকে। দীর্ঘ কয়েক যুগ তিনি বিভিন্ন আরব দেশে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় থেকেই তিনি একদিকে স্ত্রীর প্রভাব অন্যদিকে ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মধ্যপ্রাচ্য থাকতেই সাইমুমের আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি আজ মস্কোর সাইমুম ব্রাঞ্চের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি সবকিছুই ছেড়ে দিয়েছেন সাইমুমকে। তাঁর বাড়ীতেই সাইমুম মহিলা ব্রাঞ্চের অফিস। তাঁর একমাত্র নাতনী হাসনা আইরিনা মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। মহিলা ইউনিটের সে অফিস সেক্রেটারী। এই মহিলা ইউনিটের অফিসে আসার জন্য ফরিদভ এবং বেলিকভ উভয়ের বাড়ীর পথই ব্যবহার করা হয়।
ফরিদভ এর বিরাট গেট পার হয়ে আলিয়েভার গাড়ী ফরিদভের গাড়ী-বারান্দায় প্রবেশ করল। গাড়ী থামতেই ফারহানা নেমে ভিতরে গেল। কয়েক মিনিট, তারপরই ফরিদভ এবং তাঁর স্ত্রী হামিদা ফারহানার সাথে বেরিয়ে এল। গাড়ীতে চাবি দিয়ে গাড়ী থেকে নামল আয়েশা আলিয়েভা। নামল রোকাইয়েভাও। হামিদা এগিয়ে এসে প্রথমে জড়িয়ে ধরল আয়েশা আলিয়েভাকে, তারপর রোকাইয়েভাকে।
কুশল বিনিময়ের পর আয়েশা আলিয়েভা ফারহানার দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়ী ও ড্রাইভারের বিষয় বলছেন?
ফরিদভ এগিয়ে এসে বলল, তোমরা ভিতরে যাও মা, আমি জানি গাড়ী এবং ড্রাইভার দু’টোর অস্তিত্বই আমাদের জন্য বিপজ্জনক। আয়েশা আলিয়েভার হাত থেকে চাবি নিয়ে ফরিদভ গিয়ে গাড়ীতে বসল। বেরিয়ে গেল গাড়ী।
হামিদা সবাইকে নিয়ে ভিতরে চলে গেল। হামিদার বাড়ী পেরিয়ে সেই গোপন দরজা দিয়ে মহিলা সাইমুমের অফিস অর্থাৎ-ফেদর বেলিকভের বাড়ীতে গিয়ে বসল। তাদের সাথে হাসনা আইরিনা এসে যোগ দিল। তাঁর সাথে এল কিছু বিস্কুট ও গরম দুধ।
ফাতিমা ফারহানা সবার হাতে বিস্কুট তুলে দিয়ে দুধের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে নিজে একটা গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, আমি গোয়েন্দা বইতে এতদিন যা পড়েছি, তা আজ নিজ চোখে দেখলাম। বোন আয়েশা যেভাবে পেছনের সিট থেকে গিয়ে ড্রাইভারকে কাবু করে সিট দখল করল তা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। সবচেয়ে বড় কথা ড্রাইভারকে সরকারী গোয়েন্দা বলে চিনতে পারাটা আমার কাছে এখনও এক স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
ফারহানার কথা শেষ হতেই রোকাইয়েভা বলল, মস্কোভা বন্দী শিবির থেকে সরকারী গাড়ীতে করে সরকারী প্রসাদে আসার পথে বোন আয়েশা যে ভাবে একাই তিন সশস্ত্র রক্ষীকে কাবু করেন সেটা বোন ফারহানা জানলে আজকের ঘটনাকে কোন ঘটনাই বলতেন না।
রোকাইয়েভা থামতেই সবাই বলে উঠল, কি সেই ঘটনা।
গরম দুধে চুমুক দিতে দিতে গোটা কাহিনী বলল রোকাইয়েভা, তারপর আজকের কাহিনী শোনাল ফারহানা।
সবাই যখন আনন্দ-বিস্ময় নিয়ে আয়েশা আলিয়েভার প্রশংসায় মুখ খুলছে, তখন আলিয়েভা ধীর কণ্ঠে বলল, আপনাদের মত আমিও বিস্ময় বোধ করছি। যা করেছি তাঁর যোগ্যতা আমার নেই, আল্লাহই নিজ হাতে আমাদের সাহায্য করেছেন। সুতরাং প্রশংসা কিছু করতে হলে তারই করতে হবে।
আয়েশা আলিয়েভার কথায় সবাই চুপ করল।
ফারহানা মুখ খুলল প্রথম। বলল আয়েশা আপা ঠিকই বলেছেন। আমাদের প্রতি পদক্ষেপই আমরা এটা দেখেছি। হামিদা বলল, আল্লাহ্ আমাদের কবুল করেছেন, তারই প্রমান এটা।
একটু থেমে আবার হামিদাই বলল, আল্লাহ্র এ সাহায্য পাওয়ার যোগ্যতা যদি আমরা বাড়াতে পারি, তাহলে দেখব বিজয় আমাদের খুবই নিকটে। মধ্য এশিয়ার মানুষের সাথে কম্যুনিস্ট সরকারের মানসিক বিভাজন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং তাঁর ফলে একটা দৈহিক ভাঙ্গনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটা চূড়ান্ত হওয়া একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
হামিদা খালাম্মা থামল। কিন্তু কেউ আর কোন কথা বলল না। সবারই শূন্য দৃষ্টি সামনে। যেন সন্ধান করছে মুক্তির সেই সোনালী দিগন্ত কতদূর।
মস্কোতে ওয়ার্ড রেড ফোর্সেস- ‘ফ্র’-এর বড় বড় মাথাগুলো কয়েক দিনে ঘেমে উঠেছে। গেল কোথায় মেয়ে দুটি। বিমান বন্দর, বাস ষ্টেশন এবং রেলওয়ে ষ্টেশনগুলোকে বলতে গেলে সিল করে দেয়া হয়েছে, মস্কো থেকে তারা বেরুতেই পারেনা। মস্কোতেই তারা আছে। ড্রাইভার সমেত ট্যাক্সি লাপাত্তা, তারপর মস্কোভা নদী থেকে তাদের উদ্ধার থেকেও যে প্রমান পাওয়া গেছে তাতে এ বিশ্বাস আরও প্রবল হয়ে উঠেছে তারা মস্কোতেই আছে। কিন্তু কোথায় আছে, প্রাণপণ চেষ্টা করেও এর কোন হদিস তারা করতে পারেনি। মস্কোভা বন্দী শিবিরে যারা আছে তাদের সবার আত্মীয় স্বজনের বাড়ী সার্চ করা হয়েছে, কিন্তু কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। মস্কোভা বন্দী শিবিরেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, কিন্তু কিছুই বের করা যায়নি। এই ব্যর্থতাকে মস্কোর কম্যুনিস্ট পার্টির মহাশক্তিধর ফার্ষ্ট সেক্রেটারী, যিনি দেশের সব কিছুর ভাগ্য বিধাতা, বিষয়টাকে নিজের প্রেষ্টিজের সাথে যুক্ত করে ফেলেছেন। সরকারী প্রসাদের নিরাপত্তা প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মস্কোর নিরাপত্তা প্রধানকে ডেকে ধমকানো হয়েছে। সব মিলিয়ে বিষয়টা নিয়ে উপর তলা এখন আগুন। মস্কোর ঘরে ঘরে সার্চ ছাড়া মস্কোর নিরাপত্তা বিভাগ আর সব কিছুই করেছে।
এ ব্যাপারগুলোর সবই সাইমুমের নজরে আছে। আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাকে বেশীদিন মস্কো রাখা ঠিক হবেনা, এটা চিন্তা করেই মস্কোর সাইমুম শাখা একটা প্লান তৈরি করেছে ওদের মধ্য এশিয়ায় পাঠাবার জন্য।
প্রতি ১৫দিনে একবার একটা বিশেষ ট্রেন মস্কো থেকে তাসখন্দ যায়। বিলাসবহুল এ বিশেষ ট্রেনটি মূলত ভ্রমণকারীদের জন্য, যারা বৈচিত্রময় ল্যান্ডস্কেপ দেখতে ভালবাসে। বিদেশীদের জন্য এ ট্রেনটি একটা বড় আকর্ষণ। যারা সোজা তাসখন্দ যেতে চায় এমন স্বদেশী যাত্রীও এতে ওঠে। এ ট্রেন্টির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো মাঝখানে তেল নেবার জন্য একবার দাঁড়ানো ছাড়া আর থামে না, যাত্রি উঠানামা কোথাও আর করেনা।
নিয়ম হলো, এ ট্রেনে টিকেটের জন্য ফটো সমেত দরখাস্ত করতে হয়। দরখাস্তের পর বিশেষ টিকিট কার্ড ইস্যু করা হয়। সে কার্ডে প্যাসেঞ্জারের ফটো জুড়ে দেয়া থাকে। এই টিকিট কার্ড মূলত একটা আইডেন্টিটি কার্ডই। সাইমুম ঠিক করছিল ট্রেনেই আয়েশা আলিয়েভা ও রোকাইয়েভার জন্য নিরাপদ হবে। এর সব চেয়ে ভাল যে দিকটা সাইমুম বিবেচনা করছে সেটা হলো, সামনের তারিখে এ ট্রনের ডাইরেক্টর যিনি তিনি একজন উজবেক। নাম আবু আলী সুলেমানভ। আফগানযুদ্ধে তার দুই ছেলে মারা গেছে। যুদ্ধের শুরুতে যে উজবেক ব্রিগেডকে আফগানিস্তানে পাঠানো হয়, তাতে তার দুই ছেলে শামিল ছিল। সুলেমানভ মনে করে তার ছেলেদের জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। লাশ পর্যন্ত সে পায়নি। সেই থেকে সুলাইমানভ কম্যুনিস্ট সরকারের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারপরই সাইমুমের সাথে তার যোগাযোগ হয়। মুসলিম মধ্য এশিয়াকে কম্যুনিস্ট অক্টোপাস থেকে মুক্ত করার জন্য সুলেমানভ এখন একনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এই সুলেমানভই আশ্বাস দিয়েছে এই ট্রেন অন্য মাধ্যমের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। ট্রেনে বেশ কিছু রেলওয়ে পুলিশ থাকে। এরাই পথের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ভয়ংকর কিছু নয়। এরা দুরনিতিবাজ, বেশীর ভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটায় এই বিশেষ ট্রেনটির জন্য টিকিট কার্ড ইস্যু করে রেলওয়ে বিভাগ, কিন্তু OK করে নিরাপত্তা বিভাগ।
ঠিক হয়েছে আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাদের জন্য নকল ফটো দিয়ে টিকিট কার্ড তৈরী হবে। নকল ফটোর টিকিট কার্ড যাবে নিরাপত্তা বিভাগে পাশের জন্য। সেখান থেকে পাশ হয়ে আসার পর ফটোর উপরের অংশ পাল্টে ফেলা হবে। এ কাজ রেলওয়ে দফতরে অনেক হয় পয়সার বিনিময়ে। শেষ মূহুর্তে টিকিট কার্ড বদলের ব্যাপারটা সম্ভব হয়না বলে, নতুন কাউকে এ্যাকোমোডেট করার জন্য এটা করা হয়। সেখানকার দায়িত্ব সুলেমানভ নিজেই নিয়েছে। কার্ড হয়ে গেল।
মস্কোর মহিলা ইউনিট, ছাত্রী ইউনিট সকলের কাছে বিদায় নিল আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা। গাড়ীতে করে ফাতিমা ফারহানা খাদিজায়েভা এবং হাসনা আইরিনাই তাদের পৌছে দিল দক্ষিণ মস্কোর রেল ষ্টেশনের সুলাইমানভের অফিস বারান্দায়। পৌছে দিয়ে বিদায় নিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়াল আসার জন্য। আয়েশা আলিয়েভা ফারহানার হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কিছু বলবে তাঁকে? মুখে তার দুষ্টুমির হাসি।
-কাকে? তার চোখে কিছুটা বিস্ময়।
-তাঁকে।
-কাকে?
-ইস, কাকে আবার নেতাকে।
মুখে এক ঝলক রক্তের ছোপ লাগল যেন ফারহানার। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল তার মুখ। কিন্তু নিজকে সামলে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, এসব কথায় তার অবমাননা হয়, তিনি অনেক বড়।
আয়েশা আলিয়েভা ফারহানার হাত দুটি টেনে নিয়ে তাড়াতাড়ি বলল, এটা আমার একটা নির্দোষ আবেগ মাত্র। মাফ কর বোন, আল্লাহ নিশ্চয় আমাকে ক্ষমা করবেন।
ফাতিমা ফারহানা আয়েশা আলিয়েভার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, আমরা দূর্বলতার উর্ধ্বে নই। সে জন্য সব সময় আমাদের আল্লাহর সাহায্য চাওয়া উচিত।
-এ দূর্বলতা কি সব সময় অন্যয়? বলল আয়েশা আলিয়েভা।
-মানব মনের এ এক স্বভাব অনুভূতি। শরীয়তের সীমা না ডিঙালে এটা অপরাধ নয় বলে আমি মনে করি।
এ সময় রেলওয়ের ষ্টেশন মাইকে তাসখন্দ ট্যুরিষ্ট এক্সপ্রেসে যাত্রীদের আসন নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হল।
আর কথা বলল না কেউ। আয়েশা আলিয়েভা ফারহানার একটা হাত টেনে নিয়ে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, আসি বোন, আবার দেখা হবে খোদা হাফেজ।
ফারহানাকে বিদায় দিয়ে রোকাইয়েভার হাত ধরে দু’জনে এক সাথে প্রবেশ করল সুলাইমানভের অফিসে। লংকোটে ঢাকা তাদের গোটা শরীর। মাথায় পশমের টুপি। তা কপাল এবং দু’গালের একাংশ পর্যন্ত ছাড়া গোটা দেহটাই ঢাকা।
সুলেমানভ তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। তারা ঘরে ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়াল। কাছে এসে মুখ নিম্নমুখী রেখেই বলল, আমরা প্রাইভেট দরজা দিয়ে প্ল্যাটফরমে ঢুকব। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না। তবু কেউ জিজ্ঞেস করলে নতুন নাম বলবেন। আয়েশা আলিয়েভা হবেন লিলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা হবেন নিনিয়েভা। এই নামেই টিকিট কার্ড হয়েছে। ট্রেনের গোটা সময়ে আপনারা এ নামেই পরিচিত হবেন। কথা শেষ করে ঘুরে দাঁড়াল সুলেমানভ। তারপর ‘আসুন’ বলে চলতে শুরু করল।
খুব স্বাভাবিক ভংগিতেই হেঁটে চলছিল। দেখলে মনে হয় তিনজন রেলওয়েরই কেউ হবেন। রেলওয়ে সিকুইরিটি ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই তারা চলছিল। প্রবীন সুলেমানভকে দেখে সবাই রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে। প্ল্যাটফরমে এসে পৌঁছল ওরা। বামদিকে প্ল্যাটফরমের গেটটি দেখতে পেল আয়েশা আলিয়েভা। সেখানে বিরাট লাইন। রেলওয়ে কর্মচারীদের সাথে সিকুইরিটির একদল লোক সবার টিকিট কার্ড পরীক্ষা করছে। কার্ডের ফটোর সাথে মিলিয়ে দেখছে বিশেষ মানুষকে। অনেকের মাথায় টুপি, হ্যাট খুলে মিলিয়ে দেখছে। বিশেষ করে মহিলা যাত্রীদের ক্ষেত্রেই এ কড়াকড়িটা বেশী দেখা যাচ্ছে।
প্ল্যাটফরমে পাশাপাশি চলতে চলতে সুলেমানভ নিম্ন স্বরে বলল, ট্রেনে উঠার পর আপনাদের দায়িত্ব আমি অবশ্যই পালন করব। তবে কোন অসুবিধা না হোক, আমি প্রার্থনা করি।
ট্রেনে দুই সিটের বেশ কিছু রিজার্ভ বার্থ আছে। স্বস্ত্রীক এবং বিলাসী পার্টি বস অথবা বিশেষ বিদেশী কোন রাষ্ট্রীয় মেহমানের জন্য এসব বার্থ রাখা হয়েছে। সুলেমানভ এ ধরনেরই একটি বার্থ যোগাড় করেছে আয়েশা আলিয়েভাদের জন্য। ইঞ্জিনের পরে কয়েকটি লাগেজ ভ্যান। তারপর প্যাসেঞ্জার কম্পার্টমেন্টের প্রথম বার্থ সেটা। সুলেমানভ বার্থটি আয়েশা আলিয়েভা ও রোকাইয়েভাকে দেখিয়ে চলে গেল।
বার্থ দেখে দু’জনে খুশী হলো। দীর্ঘ পথ আরামেই যাওয়া যাবে। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লে ঝামেলা থেকেও বাঁচা যাবে। বিশেষ করে একপ্রান্তের ঘর হওয়ার কারণে নিরিবিলিই থাকা যাবে। ঠিক ন’টায় ট্রেন ছেড়ে দিল। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলের মধ্যে এটা অত্যন্ত দ্রুতগামী ট্রেন। ঘন্টায় একশ’ মাইল চলে। মস্কো থেকে তাসখন্দ রেলপথ দু’হাজার মাইল। সময় লাগবে বিশ ঘন্টা। মাঝখানে ট্রেন একবার থামবে। ইউরোপ থেকে এশিয়ার প্রবেশ মুখে ইউরাল পর্বতমালার গোড়ায়। ইউরাল নদীর তীরে। ইউরাল শহরে তেল নেবার জন্য। সেটা সকাল ৭টায়। তারপর একেবারে গিয়ে তাসখন্দে থামবে সন্ধ্যা ৫টার দিকে।
ট্রেন এখন ফুলস্পীডে চলছে। বার্থের দরজা বন্ধ করে দু’জন শুয়ে পড়ল। ভোর পাঁচটায় তাদের ঘুম ভাঙল। উঠে ওজু করে নামাজ পড়ল। ভালই কাটল রাতটা। সামনে একটা দিন বাকী। ট্রেনে কি আর কোন চেকিং হবে? রেল পুলিশকে তেমন ভয় নেই, কিন্তু ‘ফ্র’ -এর লোক কি ট্রেনে নেই? না থাকাটাই অবিশ্বাস্য। আলিয়েভা জানে কম্যুনিষ্ট সরকারের গোয়েন্দা থাকেনা এমন কোন জায়গা নেই। বিশেষ করে পাবলিক প্লেস, গণ-সমাবেশের ক্ষেত্রগুলোতে তারা না থেকেই পারেনা। ট্রেন এমনই একটি জায়গা। এই ট্রেনে বিদেশীরা, গণ্যমান্য পার্টির বসরা থাকেন, অতএব তারা না থেকেই পারেনা।
এসব নানা কথা ভেবে আয়েশা আলিয়েভা রোকাইয়েভাকে বলল, রিভলভার কাছে রেখো, সাবধান থাকতে হবে আমাদের। দিনের আলোতে কারো নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আমাদের আছে।
এ ট্রেনে রুম সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে। সুতরাং বাইরে না বেরুলেই চলে। তারা ঠিক করল, খাওয়া-দাওয়া সেরে আরেকবার আচ্ছা করে ঘুমাবে তারা। রোকাইয়েভা বলল, ট্রেনের কোথায় কি আছে, কারা কোথায় রয়েছে, এসব একবার দেখে নিলে হতোনা?
আলিয়েভা খুশী হয়ে বলল, ঠিক আছে রোকাইয়েভা।
ওরা বেরিয়ে গোটা ট্রেনটা একবার দেখে এল। ট্রেনের ডাইরেক্টরের রুমের পাশেই রেলওয়ে পুলিশের রুম। এরপর ট্রেনে একটা ক্যানটিন আছে। এ কয়টি বাদে অন্য সবগুলো প্যাসেঞ্জারদের জন্য ট্রেনে লম্বালম্বী দীর্ঘ করিডোর রুমগুলোর সামনে দিয়ে এসেছে। এ করিডোর দিয়েই একবার ঘুরে এল আয়েশা আলিয়েভা ও রোকাইয়েভা। অধিকাংশ রুমের দরজা বন্ধ। কারো কারো সাথে দেখা হল করিডোরে। পাঁচজন পুলিশকে পুলিশ রুমের সামনেই দেখা গেল।
ঘুরে এসে তারা নাস্তা খেতে বসল। গাড়ির গতি এ সময় কমে এল, এক সময় থেমে গেল গাড়ী। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আয়েশা আলিয়েভা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল সামনেই ব্রিজ–ইউরাল নদীর উপর। নদীটি ইউরাল পর্বতমালা থেকে বেরিয়ে কাস্পিয়ান সাগরে গিয়ে পড়েছে। ইউরালস্ক নগরীর নদী তীরের সামান্য অংশ নজরে আসছে। ঘরবাড়ী ও মানুষের আচার আচরণে এখানে ইউরোপীয় ধাঁচটাই মূখ্য। তবে এখানকার পল্লী জীবনে কাজাখদের অনেক বৈশিষ্ট্যই চোখে পড়ে। বহুদিন আগে আয়েশা আলিয়েভা মস্কো যাবার পথে এই ইউরালস্কে ক’দিন ছিল। গাড়ীর জানালা দিয়ে রোকাইয়েভাও একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল বাইরে, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন এখানে নেই, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
রোকাইয়েভার দিকে তাকিয়ে আয়েশা আলিয়েভা বলল, কারও কথা নিশ্চয় মনে পড়ছে রোকাইয়েভা?
-পড়ছে।
-কার কথা?
-দাদীর কথা। আর কেউ নেই আমার। জানিনা কোথায় আছেন তিনি, দেখতে আর পাব কিনা?
-ভেবনা রোকাইয়েভা, সাইমুম আমার এবং তোমার খোঁজ যখন পেয়েছে, তখন তোমার দাদী তাদের নজরের বাইরে নয়।
-ঠিক বলছব। আমার দাদীকে গিয়ে দেখতে পাব?
-আমার ধারণা মিথ্যা না হলে জুবায়েরভ তার ব্যবস্তা করেছে। এতক্ষণে রোকাইয়েভার মুখে হাসি ফুটে উঠল। টিক বলেছ। জুবায়েরভ প্রতিটি বিপদ মুহূর্তে অদৃশ্য থেকেও আমাদের পাশে দাডিয়েছেন।
-দেখেছ তাকে?
-না।
ইচ্ছা হয়নি কখনও?
রোকাইয়েভা আলিয়েভার দিকে চেয়ে একটু ভ্রকুটি করে বলল তোমার প্রশ্নটা সরল নয়। জুবায়েরভ নিশ্চয় সাইমুমের ভালো কর্মী।
আয়েশা আলিয়েভা একটু মুখ টিপে হাসল। কোন জবাব দিল না। কথা বলল রোকাইয়েভাই আবার। বলল দেশে যাচ্ছি, তোমার কারও কথা মনে পড়ছেনা ?
-আমার কেউ নাই।
-কেউ নাই?
-নেই।
বুকে হাত দিয়ে বল, কেউ নেই? কারও কথাই তোমার মনে পডছেনা?
আয়েশা আলিয়েভা কথা বলল না। তার চোখটা উজ্জল, মুখটা কেমন আরক্তিম হয়ে উঠল। বলল, তোমার ইংগিত বুঝেছি রোকাইয়েভা, এমন কতই তো ভাবতে পারি।
-কত নয়, একটাই ভাবতে পার।
-কিন্তু সে ভাবাটা যদি অন্যায় হয়। তার প্রতি অবিচার হয়? গলাটা একটু ভারী আয়েশা আলিয়েভার।
-এ প্রশ্নের জবাব কি তোমার চাই আলিয়েভা?
আমি আর কোন কথা বলব না, বলে রোকাইয়েভার পিঠে একটা ছোট কিল দিয়ে উঠে গিয়ে বাথে শুয়ে পড়ল সে।
গাডী তখন নডে উঠেছে চলতে শুরু করেছে। রোকাইয়েভাও উঠে গিয়ে তার সিটে শুয়ে পড়ল।
ট্রেন চলছে তখন ইউরাল পার্বত্য ভুমির উপর দিয়ে। এ পার্বত্য অঞ্চল পেরুলেই তুরান সমভূমি কাজাখদের এলাকা।
ঘুমিয়ে পড়েছিল আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা দু’জনেই। দরজার ঠক ঠক শব্দে তাদের ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে দু’জনে দু’জনার মুখের দিকে তাকাল। উভয়েরই চোখে জিজ্ঞাসা, কে হতে পারে? টিকিট চেকার? নাকি পুলিশ? অথবা ডাইরেক্টর সুলেমানভ? আয়েশা আলিয়েভা উঠে দাড়াল। কাপড়-চোপড় ঠিক করে নিয়ে দরজার দিকে গিয়েও আবার ফিরে এল। এসে ওভার কোটটি গায়ে চাপাল সে।
দরজার খুলল আলিয়েভা। দরজার মাঝারী বয়সের সুঠাম স্বাস্থ্যের দু’জন লোক। তারা খোলা দরজা পথে ঘরে ঢুকল। আনুমতির অপেক্ষা করল না। আলিয়েভা তাদের পিছনে পিছনে এল ঘরে। ওরা ঘরের চারদিকে একবার নজর করে ওদের দু’জনের দিকে আরেকবার ভালো করে তাকিয়ে বলল আপনাদের টিকিট কার্ড দেখি।
দু জনে টিকিট কার্ড বের করে ওদের হাতে দিল। কার্ড দু’টির উপর নজর বুলিয়ে আয়েশা আলিয়েভার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম?
-কার্ডই তো লিখা আছে। বলল আয়েশা আলিয়েভা।
তারপর ঐ লোকটিই রোকাইয়েভার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল আপনার নাম?
-নিনিয়েভা। বলল রোকাইয়েভা।
ওদের দু’জনের চোখে একটা সংশয়-সন্দেহ স্পষ্টই ধরা পড়ল আয়েশা আলিয়েভার কাছে।
ওরা পরিচিতি কার্ড নিয়ে ঘর থেকে বেরুবার জন্য ফিরে দাঁড়াল। তারপর বলল, আপনারা দু’জনে এখনি আসুন আমাদের সাথে। বলে তারা রুম থেকে বেরুল।
আয়েশা ওভারকোট পরেই ছিল রোকাইয়েভাও পরে নিল। তারপর ওদের পিছু পিছু বেরিয়ে এল রুম থেকে। আয়েশা আলিয়েভার দুটো হাত ওভারকোটের দুই পকেটে। পকেটের দু’টো হাত গিয়ে স্পর্শ করেছে সাইলেন্সার লাগানো দু’টো রিভলভারকে। সেই পুলিশ রুমে তারা এল। ওদের সাথে সাথে আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাও প্রবেশ করল সে ঘরে। পুলিশ পাঁচজন ঘরে বসে ঝিমুচ্ছিল। সেই দু’জন ওদেরকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। বুঝা গেল পুলিশরা অনিচ্ছা সত্বেও উঠে দাঁড়াল এবং এমন করে তাকাল যাতে মনে হল কেউ বসে মজা করবে, কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে সময় গুনবে এতে তাদের ঘোর আপত্তি।
ওরা বেরিয়ে গেল। সাথে সাথে অটোমেটিক দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আয়েশা আলিয়েভা নিশ্চিত হল এরা রেলওয়ের নয় গোয়েন্দা বিভাগের লোক। আর দেখলেই বুঝা যায় লোক দু টি লম্পট চরিত্রের। গোয়েন্দা দু’জন গিয়ে পাশাপাশি চেয়ারে বসল। ধীরে সুস্থে মুখ খুলল একজন, আমরা আপনাদের সাহায্য করতে চাই। কথা বলার ধারাটাই কেমন কুৎসিত ধরনের, আয়েশা আলিয়েভা সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে জিজ্ঞেস করল কি সাহায্য ?
-আপনাদের পরিচয় আমরা জানি। দাঁত বের করে উত্তর দিল সাথের লোকটি।
-কি পরিচয় ? জিজ্ঞেস করল আয়েশা আলিয়েভা।
তাদের একজন তাড়াতাড়ি পকেটে হাত দিয়ে দু’টো ফটো বের করল। বলল এই দেখুন আপনার ছবি। আপনারা মস্কুভা বন্দি শিবির থেকে… কথা শেষ না করেই লোকটা উঠে দাঁড়াল এবং একটা কুৎসিত হাসির সাথে আলিয়েভার দিকে এগিয়ে এল। আয়েশা আলিয়েভা একটু সরে দাঁড়াল। পাশের লোকটাও উঠে দাঁড়িয়েছে। খপ করে একটা হাত ধরে ফেলেছে সে রোকাইয়েভার। রোকাইয়েভা এক ঝটকায় তার হাত খুলে নিয়েছে।
এদিকের লোকটা বলল দেখুন আপনারা আবার সেই জেলে জান তা আমরা চাইনা। যদি….
কথা শেষ না করেই লোকটা আবার এগিয়ে এল আয়েশা আলিয়েভার দিকে। ওদিকের ঐ লোকটি এক পা এক পা করে আগুচ্ছে রোকাইয়েভার দিকে। ওদের চোখে মুখে লাম্পট্যের শয়তানী নাচ।
আয়েশা আলিয়েভার দু হাত তখনও ওভার কোটের পকেটে। বিদ্যুৎ বেগে রিভলভার সমেত তার একটি হাত বেরিয়ে এল। লোকটার বুক বরাবর তাক করে বলল আর এক পা এগুলে…
মুহূর্তের জন্য লোকটির চোখ ছানাবড়া হয়ছিল। কিন্তু তার পর সে দ্রুত হাত দিল পকেটে। কিন্তু তার হাত পকেট থেকে বেরুবার আগেই আয়েশা আলিয়েভার রিভলভার অগ্নি উদগীরন করল। লোকটি ঝরে পড়ল মেঝের উপর।
গুলি করেই আলিয়েভা আপর লোকটির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল লোকটি ঝাঁপিয়ে পড়েছে রোকাইয়েভার ওপর। রোকাইয়েভার হাতেও রিভলভার। আলিয়েভা তার রিভলভারের ট্রিগার চেপে ধরল আরেকবার। সেই সাথে রোকাইয়েভার রিভলভারও অগ্নি উদ্গীরন করল। লোকটা বোটা থেকে খসে পড়া পাকা ফলের মতই ঝরে পড়ল মেঝের উপর। লাফ দেয়া অবস্থাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
তাড়াতাড়ি রিভলভার পকেটে ফেলে তারা দরজা খুলে বেরিয়ে এল রুম থেকে। সাইলেন্সার থাকায় গুলির কোন শব্দ হয়নি। কিন্তু দরজা খোলার সাথে সাথে বারুদের গন্ধ বেরিয়ে এল।
তাদের তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে দেখে মনে হল পুলিশরা একটু কৌতুক আনুভব করল। দু’জন পুলিশ দরজার দিকে এগিয়ে এল। ঘরের ভেতর চাইতেই তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তাদের এ অবস্থা দেখে অন্য তিনজনও এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। বিস্ময়-আতংকে হা হয়ে গেল তাদেরও মুখ।
আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা তাদের পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারা আবার রিভলভার হাতে তুলে নিল। আয়েশা আলিয়েভা তার দুহাতে দুটি রিভলভার উঁচিয়ে চাপা স্বরে বলল ঘরে ডুকে যাও, একটু এদিক ওদিক করলে সবার মাথা উড়ে যাবে। দু জন পিছনে ফিরে তাকাল। তারপর সুড় সুড় করে সবাই ঘরে ঢুকে গেল। ঘরে ঢুকলে আয়েশা আলিয়েভা দ্রত দরজা বন্ধ করে দিল। দেখল ঘরের চাবিটা দরজাতেই ঝুলছে। দরজায় চাবি লাগিয়ে দিল সে।
মাত্র দু তিন মিনিটের মধ্যে সাংগ হয়ে গেল এসব ঘটনা। পুলিশ রুমটি পেছনের দিকের শেষ রুমে বলে এদিকে মানুষের আনাগোনা কম। আয়েশা আলিয়েভা খুশি হল। কারো চোখেই এ ঘটনা পড়েনি।
পাশেই ডাইরেক্টর সুলেমানভের রুম। তার রুম বন্ধ। আয়েশা আলিয়েভা একবার মনে করল তাকে সব কথা বলে আসে, কিন্তু পরে বল তার কিছু না জানাই ভালো। জওয়াবদিহী করতে সুবিধা হবে তার। রোকাইয়েভা বলল চল তাহলে এখন আমাদের রুমে যাই।
আয়েশা আলিয়েভা মাথা নেড়ে বলল না, আর রুমে নয়। অবশিষ্ট কয়েকঘন্টা এখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়েই কাটাতে হবে। শত্রুর শেষ হয়েছে কি না আমরা এখনও জানিনা।
ট্রেন তীব্র গতিতে এগিয়ে চলছে। অরল হৃদকে ডান পাশে রেখে তুরান সমভূমি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। অরল হৃদের পূর্ব পাশে পৌঁছে আর একশ মাইল দক্ষিণ পূর্বে এগুলেই সির দরিয়া পাওয়া যাবে। তারপর সির দরিয়ার তীর ধরেই ট্রেন চলবে প্রায় সাড়ে তিন শত মাইল। তাসখন্দের দেড়শ মাইল উত্তরে পৌঁছে ইসর দরিয়া একটু পশ্চিমে সরে গিয়ে তাসখন্দের মাইল পঞ্চাশেক দক্ষিণ দিয়ে এগিয়ে তাজিকিস্তানে প্রবেশ করবে। আর ট্রেন সোজা এগিয়ে যাবে তাসখন্দে।
বাইরে থেকে মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল আয়েশা আলিয়েভা। ট্রেনে তাদের উপর আর কোন আক্রমন হবে বলে মনে হয় না। অরল হৃদের অরলঙ্ক শহর তারা পেরিয়ে এসেছে। তাসখন্দের কাছাকাছি অরিস জংশন ছাড়া মাঝখানে কিজিল ওরস নামে একটা ছোট্ট শহর আছে। কিন্তু ট্রেন থেকে ওয়ারলেস না করলে সেখান থেকে বিপদের সম্ভাবনা নেই, কারণ ট্রেন সেখানে থামেনা। আর ওয়ারলেসতো সুলেমানভের কাছে। গোয়েন্দা দুজনের কাছেও হয়তো ওয়ারলেস ছিল, কিন্তু সেগুলো আর কোন কাজে আসছে না। এসব ভেবে খুব খুশী হলো আয়েশা আলিয়েভা।
কিন্তু এরপর কি, তার কিছুই জানে না আলিয়েভারা। শুধু এতটুকু তাদের বলা হয়েছে। ট্রেন সির দরিয়া এলাকায় পৌঁছার পর তাদের সব দায়িত্ব তাসখন্দ সাইমুমের উপর বর্তাবে। তারাই সব ব্যবস্থা করবে। বাইরের বাতাসে যেন সির দরিয়ার স্নিগ্ধ পরশ অনুভব করল আলিয়েভা। ওতে যেন নতুন জীবনের এক আশ্বাস। রোকাইয়েভা বাইরে তাকিয়েছিল। আলিয়েভাও তার দৃষ্টি মেলে ধরল বাইরে। তার চোখ দুটি খুঁজে ফিরছে সির দরিয়ার সবুজ উপত্যকা, তার রুপালী বুক।

৭

তাসখন্দ থেকে সত্তর মাইল উত্তরে আরিস রেলওয়ে জংশন। বেলা তখন সাড়ে তিনটা। ছোট্ট শহর আরিসের উপকন্ঠে এখানকার সাইমুম ঘাঁটিতে হাসান তারিক, আনোয়ার ইব্রাহিম, আরিসের সাইমুম প্রধান আলী খানভ জংশনের একটা মানচিত্র নিয়ে বসে। মানচিত্র বুঝিয়ে দিচ্ছে আলী খানভ। আলী খানভ আরিসের সিভিল ডিফেন্স ইউনিটের একজন ডাইরেক্টর। শেষ বারের মত পর্যালোচনা করছিল তারা আজকের অপারেশন প্ল্যানটার।
মস্কো থেকে খবর এসেছে গতরাত ৯ টায় তাসখন্দ ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস সেখান থেকে ছেড়ে এসেছে। আহমদ মুসার সাথে পরামর্শ করে তাসখন্দ সাইমুম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আরিস জংশনেই আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেয়া হবে। তাসখন্দ রেলওয়ে ষ্টেশনে এই অপারেশনকে সাইমুম বেশী ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে।
আরিস রেলওয়ে জংশনে মোট ১৫ জন রুশীয় কম্যুনিস্ট অফিসার রয়েছে রেলওয়ে বিভিন্ন বড় বড় পদে। ১০০ জনের মত একটা সিকিউরিটি ইউনিট রয়েছে জংশনে। এদের মধ্যে অর্ধেক রুশ এবং অর্ধেক উজবেক ও কাজাখ মুসলিম। এখানকার উজবেক এবং কাজাখদের সংগ্রামকে সবাই পছন্দ করে। তারা হয়তো পক্ষে আসতে ভয় পাবে, কিন্তু সাইমুমের বিরুদ্ধে কিছুতেই তারা অস্ত্র ধরবে না।
এই অবস্থাকে সামনে রেখেই অপারেশন প্লান তৈরী করা হয়েছে। আরিসের পশ্চিম প্রান্তে শহর থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে একটা আর্মি ব্যারাক আছে। সেখানে ৫০০ সৈন্যের একটা ব্রিগেড থাকে। তারা খবর পেয়ে আসার আগেই অপারেশন শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সাইমুম।
অপারেশনে নেতৃত্ব দেবে হাসান তারিক, কিন্তু সিকিউরিটি অপারেশনের দায়িত্বে থাকবে আনোয়ার ইব্রাহিম। তাকে সাহায্য করবে আলি খানভ।
ঠিক সাড়ে তিনটায় আলী খানভের ওয়ারলেস বিপ বিপ করে উঠল। সবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, নিশ্চয় কোন খবর আছে কিজিল গুদা থেকে।
হ্যাঁ ঠিক। ওয়ারলেস থেকে কান সরিয়ে আলী খানভ বলল, কিজিল গুদার সাইমুম প্রধান জানাল তাসখন্দ ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস এখন তাদের শহর অতিক্রম করেছে।
সবাই খুশি হলো। হাসান তারিক বলল, সবাই দোয়া কর আমাদের বোনরা ভাল থাকুক।
তারপর আনোয়ার ইব্রাহিম ও আলী খানভের দিকে চেয়ে বলল, তোমাদের ইউনিট তো চলে গেছে ষ্টেশনে?
-হ্যাঁ।
-তাহলে চল আমাদেরও এবার উঠতে হবে। সবাই উঠে দাঁড়াল।
বাইরে দু’টো মাউন্টেন জীপ দাঁড়িয়ে ছিল। জীপগুলো সাধারণ পাহাড়ী পথে খুব সহজেই চলতে পারে। সবাই গিয়ে গাড়ীতে উঠল। একটাতে উঠল হাসান তারিক এবং দু’জন, অন্যটিতে উঠল আনোয়ার ইব্রাহিম, আলী খানভ এবং আরও কয়েকজন।
ঠিক তিনটা পয়তাল্লিশ মিনিটে হাসান তারিক ও আনোয়ার ইব্রাহিমরা ১নং প্ল্যাটফরমে প্রবেশ করল। এ রকম ৪টা প্ল্যাটফরম আছে। ৪টা প্ল্যাটফরমেই রেলওয়ে সিকুইরিটি লোকেরা ছড়িয়ে আছে। প্রত্যেকটা প্ল্যাটফরমেই ৫ জনের করে একটা সিকিউরিটি টিম টহল দিচ্ছে। টিমের নেতৃত্ব আছে একজন করে রুশ অফিসার। সাইমুমের টার্গেট এই রুশ অফিসার। সাইমুমের টার্গেট এই রুশ অফিসাররাই।
এক নং প্ল্যাটফরমের রয়েছে সিকিউরিটি অফিস। সিকিউরিটির রিজার্ভ লোকেরা এখানেই অবস্থান করে। দেখা যাচ্ছে মেস সদৃশ বিশাল হল ঘরে সিকিউরিটির লোকেরা কেউ বসে আছে, কেউ শুয়ে শুয়ে রেস্ট নেবার চেষ্টা করছে।
এক নম্বর প্ল্যাটফরমের সামনেই বিশাল যাত্রী বিশ্রামাগার। বিশ্রামাগারের দু’পাশ দিয়ে বাইরে যাবার দু’টো গেট। গেটের পরেই সড়ক। সাইমুমের দু’টো গাড়ী প্ল্যাটফরমের উত্তর প্রান্তের অর্থাৎ বিশ্রামাগারের উত্তর পাশ দিয়ে বেরুনোর যে গেট তার মুখেই দাঁড়িয়ে আছে।
হাসান তারিক দেখল, প্ল্যাটফরমের সিকুউরিটির পাঁচ জন লোক টহল দিচ্ছে, তার মধ্যে রুশ অফিসারটি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্রামাগারের দক্ষিণ পাশ দিয়ে যে গেট তারই কাছাকাছি জায়গায়। এখানেই যাত্রীর ভীড় বেশী হয়। যাত্রী বেশে সাইমুমের লোকেরাও পরিকল্পনা অনুসারে পজিশন নিয়েছে।
ঠিক ৪ টা ১৫ মিনিটে তাসখন্দ ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস আরিস শহরে প্রবেশ করল। নিয়ম অনুসারে স্পীড তার কমে গেছে। জংশন এলাকায় পৌঁছুতে স্পীড তার আরও কমে গেল। গাড়ী এখানে দাঁড়াবে না বটে, কিন্তু ক্লিয়ারেন্স ডকুমেন্ট নেবার জন্য এটা তাকে করতে হয়।
৪টা ১৭ মিনিট। ট্রেন জংশন এলাকায় প্রবেশ করল। সংগে সংগে ১নং প্ল্যাটফরমের দক্ষিণ প্রান্তে রেল লাইনের উপর বিরাট বিস্ফোরণের শব্দ হলো।
সেখানকার রেললাইন উড়ে গেল। সিকিউরিটির লোকেরা সে দিকে ছুটল, সেই রুশ অফিসারও।
সিকিউরিটি অফিসেও তখন চাঞ্চল্য। যারা শুয়ে ছিল তারা উঠে বসেছে। যারা বসে ছিল তারাও উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তারা বেরুবার সুযোগ পেল না। দেখল তারা, তাদের চোখের সামনে কয়েকজন মুখোশধারী লোক ছুটে এসে দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। হল ঘরের দু’টো গেট, দু’টোই বন্ধ হয়ে গেল।
যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছিল, সে এলাকা থেকে গুলির শব্দ এল, সেই সাথে শ্লোগানঃ মুক্তির সাইমুম জিন্দাবাদ, জীবনের সাইমুম জিন্দাবাদ। গোটা প্লাটফরম এলাকা সাইমুমের দখলে চলে গেছে। বিভিন্ন দিক থেকে কিছু গুলি গোলার শব্দ এল। ষ্টেশনের কর্মচারীরা যে যেখানে ছিল সেখানেই বসে থাকল। বেরুলনা অথবা বেরুতে পারলনা। আর বাইরে যারা ছিল সাইমুমের শ্লোগান শোনার পর তারা গা ঢাকা দিল। রুশ অফিসাররা যারা প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করল তারা সাইমুম কর্মীদের গুলির মুখে পড়ল।
হাসান তারিক এবং আনোয়ার ইব্রাহিম ১ নং প্ল্যাটফরমের মাঝখানে যেখানে দাড়িয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। পরিকল্পনা অনুসারেই ট্রেন থামানোর এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সকলের মনোযোগের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল দক্ষিণে প্ল্যাটফরমের বাইরের অংশকে, যাতে সিকিউরিটির দৃষ্টি সেদিকেই থাকে।
ট্রেনের ডাইরেক্টর সুলেমানভ জানত ট্রেনকে থামাতে বাধ্য করার পদক্ষেপের কথা তাই ট্রেনকে কোন বিপদে পড়তে হয়নি। বিস্ফোরণের সংগে সংগেই ট্রেনকে সামলে নিয়েছিল এবং ঠিকভাবে ট্টেনকে এনে প্ল্যাটফরমে দাঁড় করালো।
একেবারে প্ল্যাটফরমের প্রান্ত ঘেঁষে দাড়িয়েছিল হাসান তারিক ও আনোয়ার ইব্রাহিম। প্ল্যাটফরমে কোন লোক নেই। তাই ট্রেন যেমন নজরে পড়ছে, তেমনি ট্রেন থেকেও প্ল্যাটফরম নজরে পড়ছে।
ট্রেন প্ল্যাটফরমে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ট্রেনের করিডোরের জানালা কোনটা খোলা, কোনটা বন্ধ। কোন জানালাতেই কোন মুখ দেখছে না হাসান তারিক। চঞ্চল হয়ে উঠল সে, তাহলে কি……….
ট্রেন আরও এগিয়ে এল। প্রায় থেমে গেছে ট্রেন। ট্রেনের পেছনের শেষটা পযন্ত এবার দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ হাসান তারিক দেখল, করিডোরের জানালায় দু’টো মুখ। একজন হাত নাড়ছে হাসান তারিকের দিকে চেয়ে। ছুটে গেল হাসান তারিক সে দিকে। হাত নাড়া মেয়েটি তার মাথার হ্যাট খুলে ফেলছে, আয়েশা আলিয়েভা। চিনতে পারল হাসান তারিক।
চোখাচোখি হল। সর্বাঙ্গে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল তার। আলিয়েভার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে হাসান তারিক করিডোরের দরজা টানাটানি করল। বন্ধ দরজায় তালা দেওয়া। এক মুহূর্ত দেরী তার সইছে না। দরজার কী হোলে গুলি করল হাসান তারিক। তারপর এক লাথিতে খুলে ফেলল দরজা। আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা নেমে এল গাড়ী থেকে।
হাসান তারিক আনোয়ার ইব্রাহিমের দিকে চেয়ে বলল, চল গাড়ীতে। তারপর আয়েশা আলিয়েভার দিকে ঘুরে বলল, এস।
তারা গেটের দিকে ছুটল। তারা দেখতে পেল, উত্তরের গেট দিয়ে কয়েকজন পুলিশ ছুটে আসছে। সাইমুমের রক্ষীরা পাশেই দাঁড়িয়েছিল। উঁচু হয়ে উঠল তাদের স্টেনগান। গেটের সামনে লুটিয়ে পড়ল পুলিশ কয়েকজন। হাসান তারিক দেখল দক্ষিন গেটের সামনেও কয়েকজন পুলিশের লাশ পড়ে আছে। এরা বিস্ফোরণ ও গুলির আওয়াজ শুনে বাইরে থেকে এসেছিল। ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারেনি। সাইমুমের পরিচয় পেলে ঐ উজবেক পুলিশেরা এভাবে আসতো না। হাসান তারিকের দুঃখ হলো ওদের জন্য। সিকিউরিটির লোকদের কাউকেই দেখা গেলনা। রুশরা নিশ্চয় সাইমুমের হাতে প্রান দিয়েছে। আরব, উজবেক, কাজাখরা ঘটনাস্থল থেকে চুপে চুপে সরে গেছে।
গাড়ি স্টার্ট দেয়াই ছিল। একটি জীপের সামনের সিটে হাসান তারিক উঠল, তারপাশে আলী খানভ। পেছনের সিটে আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা উঠে বসল।
অন্য গাড়িতে আনোয়ার ইব্রাহিম এবং অন্যান্যরা। গাড়ী নড়ে উঠল , যাত্রা শুরু করল তারা। হাসান তারিক আলী খানভকে বলল, তোমার লোকজন ফিরবে কখন ?
আলী খানভ বলল, দু নম্বর গেট এবং প্ল্যাটফরমের বাইরের গেটে তাদের গাড়ী আছে। কোন চিন্তা নেই, ওরা আমাদের পেছনে পেছনেই চলে।
গাড়ী তখন ফুলস্পিডে চলতে শুরু করেছে। হাসান তারিক আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। কোন বড় ঘটনা ছাড়াই আল্লাহ্ তাদের সাফল্য দান করেছেন।
গাড়ী শহর থেকে বেরুবার পর একটি পার্বত্য পথে হাসান তারিকের পাশ থেকে আলী খানভ নেমে গেল। পেছনে সাইমুমের কর্মীদের যে দু টো গাড়ী আছে তারাও এখানে আলী খানভের সাথে এসে মিলিত হবে। তাদের কয়েকজন আলী খানভের সাথে এখানে থাকবে, অন্যরা ফিরে যাবে আরিসের সাইমুম ঘাটিতে। অবশিষ্টদের নিয়ে আলী খানভ এ গিরিপথ পাহারা দেবে যাতে শত্রুরা হাসান তারিকের পিছু নেবার সুযোগ না পায়।
হাসান তারিক ও আনোয়ার ইব্রাহিমের দু’টো গাড়ী আলী খানভ কে নামিয়ে দিয়ে কিরঘিজিয়ার রাজধানী ফ্রুনজের পথ ধরে ছুটল পূর্বদিকে। আসলে তাদের লক্ষ্য ফারগানা এবং তাসখন্দের মধ্যবর্তী সাইমুমের শহীদ আনোয়ার পাশা ঘাঁটি। সমরখন্দকে বাম পাশে রেখে যেখানে পামির সড়ক তাসখন্দের দিকে এগিয়ে গেছে , সেখান থেকে ৭০ মাইল পূবে এবং ফারগানা থেকে ৫০ মাইল পশ্চিমে উজবেকিস্তান ও কিরঘিজিস্তানের সংগমস্থলের দুর্গম পার্বত্য উপত্যকায় এই ঘাঁটি। আরিস থেকে তাসখন্দ হয়ে এখানে আসা যেতো, কিন্তু আরিস থেকে সোজা তাসখন্দের পথে আসা হাসান তারিক ঠিক মনে করেনি। গন্তব্য সম্পর্কে শত্রুদের বিভ্রান্ত করার জন্যই হাসান তারিক এ পথে এসেছে। ফ্রুনজের পথে মাইল পঞ্চাশেক এগিয়ে যাবার পর আরেকটা ক্যারাভান ট্রাক পাওয়া যায় যা দিয়ে পামির সড়কে পৌছা যাবে। এ পথে হাসান তারিক শহীদ আনোয়ার পাশা ঘাঁটিতে পৌছাবে ঠিক করেছে।
হাসান তারিকের গাড়ী তখনও দৃষ্টির বাইরে যায়নি। এমন সময় সেই পার্বত্য গিরিপথের এক টিলায় বসে আলী খানভ দেখল বিরাট আর্মি সাঁজোয়া আরিসের দিক থেকে এগিয়ে ছুটে আসছে।
সহকর্মীদের প্রতি সতর্ক সংকেত দিয়ে আলী খানভ টিলা থেকে দ্রুত নেমে পড়ল। তারপর দ্রুত সেই পার্বত্য পথের উপর গিয়ে উপস্থিত হলো। খুঁজে পেতে উপযুক্ত স্থান বেছে নিয়ে পর পর তিনটা রোড-মাইন পাতল। এমন জ্যামিতিক কোণ করে সেগুলো পাতল যাতে করে মিস হবার কোন ভয় রইল না।
মাইন পেতে সে রাস্তা থেকে সরে আসতে না আসতেই সেই সাঁজোয়া গাড়ী এসে পড়ল গিরিপথের মুখে। একটা পাথরের আড়ালে বসে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে আলী খানভ।
গাড়ী এসে গেছে, আর ৫০ গজ, ২০ গজ, হ্যাঁ এসে গেছে সেই কৌণিক অবস্থানে। সংগে সংগে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ। একটা খেলনার মত উর্ধ্বে নিক্ষিপ্ত হয়ে ছিটকে পড়ল সাঁজোয়াটি । কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল এলাকাটা। ধোঁয়া যখন মিলিয়ে গেল, দেখা গেল গাড়ীটি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, মানুষের কোন চিহ্ন নেই।
হাসান তারিকের গাড়ী তখন দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। আলী খানভ প্রথম বিস্ফোরণের জায়গা থেকে অনেক পশ্চিমে গিরিপথটির মুখে আরো তিনটি মাইন পাতল একটা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে। কারণ, বাড়তি ব্যবস্থা হিসেবে এক বা একাধিক গাড়ী এই সাঁজোয়াটির পিছনে আসবে সেটাই স্বাভাবিক।
মাইন পাতা শেষ করে সাইমুম কর্মীদের নিয়ে আলী খানভ পার্বত্য উপত্যকার পথে আরিসের ঘাটির দিকে ফিরে চলল। ১৫ মিনিটও পার হয়নি। পিছন থেকে বিরাট বিস্ফোরণের শব্দ কানে এল। তারা পেছনে ফিরে দেখল গিরিপথের ঐ এলাকা থেকে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠছে। খুশী হলো আলী খানভ, ফাঁদে আরেকটা শিকার পড়েছে। এখন হাসান তারিকের পিছু নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তাদের পক্ষে কঠিন হবে।
আরিস শহরে কম্যুনিস্ট সৈন্য এবং ‘ফ্র’ এর সামরিক ইউনিটের লোকজন গিজ গিজ করছে। ভয় এবং অপমান দু’টোই তাদের চোখে মুখে। সাইমুমের একটা চুলও তারা স্পর্শ করতে পারেনি, এই জন্যই ক্রোধটা তাদের খুব বেশী। সব ক্রোধ গিয়ে এখন পড়েছে আরিসের দেশীয় অর্থাৎ উজবেক এবং কাজাখ কর্মচারীদের উপর। উঁচু প্রাচীর ঘেরা আরিসের জেলখানায় তাদের এই জিঘাংসা বৃত্তিরই মহোৎসব চলছে কতগুলো নিরপরাধ মানুষের উপর।
সুলাইমানভকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দু’জন গোয়েন্দা হত্যা ও রেলওয়ে পুলিশদের বন্দী করার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে। বলা হচ্ছে, তারই পাশের রুমে এটা ঘটেছে, সুতরাং তার যোগশাজস না থেকেই পারেনা, বিশেষ করে তার যখন কিছুই হয়নি।
বৃদ্ধ সুলাইমানভকে কথা বলানোর জন্য প্রথমে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছে। চোখ বন্ধ করে মুখ বুঁজে পাহাড়ের মত সব সহ্য করেছে সে। নির্মম চাবুকের সাথে পিঠের চামড়া উঠে গেছে। বেদনায় কুকড়ে গেছে তার দেহ, নীল হয়ে গেছে মুখ। কিন্তু মুখ থেকে ওরা একটা কথাও বের করতে পারেনি।
অবশেষে তাকে নিয়ে এল বিদ্যুৎ আসনে। বিদ্যুৎ শকে বেদনায় কুকড়ে গেল তার দেহ, চোখ দু টি তার ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। কানেকশন সরিয়ে তাকে বলা হলো এর পরের শকে আগের চেয়েও কঠিন অবস্থা তার জন্য অপেক্ষা করছে। যদি বাঁচতে চায় তাকে বলতে হবে সাইমুম সম্পর্কে সে কি জানে।
প্রথম শকের পরেই বৃদ্ধ সুলাইমানভের মাংসপেশিগুলো গভীর ক্লান্তি ও বেদনায় কাঁপছিল। কিন্তু চোখ তার স্থির, তাতে অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য। সে বলল, যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, তাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে তোমরা কি করবে? আমাদের এ দুর্ভাগা মুসলিম জাতির মুক্তির আন্দোলনের পতাকা ভূ-লুন্ঠিত ছিল অনেক দিন, তাকে আবার সাইমুম তুলে ধরেছে। আমি তাদের জন্য যদি জীবন দিতে পারি, সেটা আল্লাহর জন্যই জীবন দেয়া হবে, আমি গৌরবান্বিত হবো।
‘ফ্র’ মিলিটারী ইন্টেলিজেন্সের প্রধান সার্জি সোকলভ পাশেই দাঁড়িয়েছিল। তার চোখ দুটি ভাটার মত জ্বলে উঠল, দেহের সমস্ত রক্ত যেন মুখে এসে জমা হলো। সে দু পা এগিয়ে এসে প্রচণ্ড এক লাথি মারল সুলাইমানভের মুখে। সুলাইমানভের বাম গাল থেকে এক খাবলা মাংস উঠে গেল লোহার কাঁটাওয়ালা বুটের আঘাতে। ঝর ঝর করে ছিটকে পড়া রক্ত প্রবাহে ভিজে গেল বিদ্যুৎ আসনের কাঠের পাটাতন।
সুলাইমানভ তার রক্ত ধোঁয়া মুখটি সোকলভের দিকে ফিরিয়ে বলল, আমার কোন দুঃখ নেই। যুগ যুগ ধরে তোমরা আমার দেশকে, আমার মুসলিম জাতিকে এ রকম পদাঘাতেই ক্ষত-বিক্ষত করেছ। আমি আজ তাদের দলে শামিল হতে পেরে আনন্দিত। তোমাদের অনেক হারাম টাকা আমার পেটে গেছে, তা এই ভাবে মাফ হয়ে গেলে আমি খুশী হবো।
চুপ কর কুকুর বলেই পাশ থেকে ভারী লোহার রোলারটি তুলে নিয়ে জোরে ছুড়ে মারল তার মুখে।
কিন্তু রোলারটি সুলাইমানভের মুখে না লেগে প্রচন্ডভাবে আঘাত করল গিয়ে তার কপালে। ‘আল্লাহ’ একটা শব্দই শুধু তার মুখ থেকে বেরুতে পারল। তারপর সব শেষ। থেতলে গুড়িয়ে গেছে তার মাথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে।
আরিস স্টেশনের ৫০ জন সিকুইরিটির লোক এবং আরও অনেক সাধারণ কর্মচারী সহ প্রায় পাঁচশ উজবেক ও কাজাখ যুবককে গ্রেপ্তার করে এই জেলখানায় আনা হয়েছে।
গত কয়দিন ধরে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলছে। ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের উঁচু করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। উত্তপ্ত ইস্পাতের চাবুক দিয়ে প্রহার করা হয়েছে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তাদের নিষ্পেষিত করা হয়েছে। তাদের কাছে দাবী একটাই, সাইমুমের সাথে তাদের যোগশাজসের তথ্য ‘ফ্র’ কে দিতে হবে। বেচারারা কিছুই জানে না, কি তথ্য দেবে ‘ফ্র’ কে। সুতরাং তারা মার খেয়েছে আর রোদন করেছে।
অবশেষে ‘ফ্র’ মিলিটারী ইন্টেলিজেন্সের সার্জি সোকলভ এবং ‘ফ্র’ এর নিরাপত্তা প্রধান কলিনকভ এসে উঁচু অবস্থা থেকে নামিয়ে সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে বলল, তোমাদেরকে শেষ বারের জন্য বলা হচ্ছে, তোমরা যদি সাইমুমের কোন খবর না দাও, তা হলে সবাইকে সাইমুমের সদস্য হিসেবে ধরা হবে। এবং আজ রাত ৭টা থেকে প্রতি ঘন্টায় এক একজনকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মারা হবে। আর ইতিমধ্যে স্টেশনের ৫০ জন সিকিউরিটির দন্ডাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে।
বলার সংগে সংগে ৫০ সিকিউরিটির লোককে পিছ মোড়া করে বেঁধে কারাগারের দেয়াল বরাবর দাঁড় করানো হলো। তাদের সামনে বন্দুক নিয়ে দাড়াল আরও পঞ্চাশ জন। নির্যাতনে কয়েদীদের কান্নার সাধ্য ছিল না। তাদের চোখে উপায়হীন এক অসহায়তা।
প্রথম সংকেতের সংগে সংগে বন্দুক উচু হয়ে উঠল ফায়ারিং স্কোয়াডের। সেই পঞ্চাশ জনের মধ্য থেকে একজন বলল, আমার শেষ একটা কথা আছে, বলতে চাই।
সার্জি সোকলভের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠল, তা হলে ওরা মুখ খুলছে। সে তার দিকে এসে বলল, তুমি বল, আমরা তোমাকে মুক্তি দেব।
-মুক্তির কথা নয়, আমার একটি প্রার্থনা আছে।
-কি প্রার্থনা? এখনও সোকলভের চোখে আশার আলো।
-কোন দিন নামাজ পড়ার সুযোগ হয়নি, শেষ সময়ে দু’রাকাত নামাজের সুযোগ প্রার্থনা করছি।
হো হো করে হেসে উঠল কলিনকভ এবং সার্জিও সোকলভ। দু’জনেই কিছু যেন ভাবল। একটা কৌতুকের হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। বলল, আর কে চাস তোরা এই কর্মটি করতে?
সবাই বলল, আমরাও চাই।
সবার হাতের বাধন খুলে দেওয়া হলো। কয়েকজন তায়াম্মুম করল। তাদের দেখে অন্যেরা সেই ভাবে তায়াম্মুম করল। বোঝা গেল, তারা তায়াম্মুম জানে না। জানবে কি করে? হাজার হাজার মাদ্রাসা মক্তব দেশের মাটি থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। আরবী শিক্ষার লোক দুষ্প্রাপ্য। তার উপর কম্যুনিষ্ট আইনের কড়াকড়ি। এমন প্রার্থনা ট্রার্থনার খোজ পেলে জীবন জীবিকার দরজা বন্ধ হয়। সুতরাং জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে এটা চলার পর আজ বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক যুবকের এই অবস্থা দাড়িয়েছে। অজু তায়াম্মুম তাদের অনেকে জানেনা।
কিন্তু আল্লাহ আছে, পরকাল আছে, এটা তাদের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। সম্ভবত এই কারণেই আজ শেষ সময়ে আল্লাহর কাছে একবার হাজির হতে চায় ওরা।
পঞ্চাশ জন এক সাথেই নামাজে দাড়িয়েছে তারা। রুকুতে গেল।
সার্জি সোকলভ আঙুল তুলে কি যেন ইংগিত করল। সংগে সংগে পঞ্চাশটি বন্দুকের মাথা উচু হলো।
রুকু থেকে উঠে দাড়িয়েছে তারা। সিজদায় যাবার জন্যে তাদের দেহ ঝুকেছে মাত্র।
তার আগেই সার্জি সোকলভ নির্দেশ দিল, ‘ফায়ার’।
পঞ্চাশটি বন্দুক এক সাথে গর্জে উঠল। সিজদার জন্য পঞ্চাশটি দেহ ঝুঁকতে যাচ্ছিল। গুলিতে পঞ্চাশটি দেহ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সামনে। পড়ে গিয়ে পড়েই থাকল। নড়লনা কোন দেহ। সেজদা তারা দিতে পারলনা, কিন্তু এ যেন আরেক সেজদা, যে সেজদা থেকে কোন দিনই তারা আর উঠবেনা।
সার্জি সোকলভ এবং কলিনকভ দু’জনেই হো হো করে হেসে উঠল। নিবার্ক স্পন্দনহীন ভাবে দাড়িয়ে থাকা ৫০০ যুবকের দিকে চেয়ে সোকলভ বলল, মুসলমানদের আল্লাহ নাকি সর্ব শক্তিমান, দেখলি তো শক্তির জোর।
বলে আবার হো হো করে হেসে উঠল দু’জনে।
সোকলভ ঘড়ির দিকে চেয়ে বলল, আর এক ঘন্টা আছে, তোরা এদের মত মরবি না বেচে থাকতে চাস ঠিক কর। আমরা এক ঘন্টা পরে আসছি।
চলে গেল ওরা। এদিকে পাঁচশ যুবক বেচে থেকেও মরার মত। এদের অধিকাংশই চাকুরে। ছাত্রও আছে। যুব কম্যুনিষ্ট লীগ এবং কম্যুনিষ্ট পার্টির সদস্যও এদের মধ্যে আছে। এরা আধুনিক জীবন যাপন করে, এদের অনেকেরই হয়তো সাইমুমকে ভালো লাগে, সমর্থনও করে হয়তো আরও অনেকে, কিন্তু সাইমুমের কিছু জানেনা এরা, কোনই সম্পর্ক নেই সাইমুমের সাথে এদের। সুতরাং এরা বুঝতে পারছেনা এদের অপরাধ কি? সুতরাং ভয়, হতাশা এদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আসন্ন পরিণতির কথা ভেবে অধিকাংশই কাঁদছে, বিলাপ করছে।
এই কান্নার মধ্যে একজন বলে উঠল, ভাইসব, কেঁদে কোন লাভ নেই, কান্না আমাদের মৃত্যু ঠেকিয়ে রাখতে পারবেনা। বরং আসুন হাসিমুখে বীরের মৃত্যু বরণ করি। আমাদের পূর্ব পুরুষরা কাপুরুষ ছিলেন না, কিন্তু কম্যুনিষ্ট ব্যবস্থা আমাদের ঈমান আকিদা কেড়ে নিয়ে, জাতীয়তাবোধ কেড়ে নিয়ে আমাদের কাপুরুষে পরিণত করেছে। তাই মৃত্যুকে এমন ভয় পাচ্ছি আমরা। ভাইসব, আমাদের কোন অপরাধ নেই, একটাই অপরাধ, আমরা মুসলিম। আমরা সব বিসর্জন দিলেও জাতীয় পরিচয় বিসর্জন দেইনি। তাই সাইমুমের আমরা কেউ না হলেও আমরা অপরাধী। এটাই যদি আমাদের অপরাধ হয়, তাহলে এ অপরাধ নিয়ে আমাদের গর্ববোধ করা উচিৎ। এর জন্য যদি আমাদের মরতে হয় সে মৃত্যুকে আমাদের হাসিমুখে বরণ করা উচিত। সাইমুম আজ আমাদের সম্মানিত এবং অকুতোভয় পূর্ব পুরুষদের স্বাধীনতা ও মর্যাদার পতাকাকে ভুলুন্ঠিত অবস্থা থেকে উর্ধে তুলে ধরেছে। আমরা বাইরে থাকতে তাদের জন্য কিছু করতে পারিনি, আসুন মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে জাতির গৌরব সে বাহিনীর জয় ঘোষণা করি।
বলে সে তকবির ঘোষণা করল উচ্চ কন্ঠে। সংগে সংগে কারাগারের নিরবতা ভেঙ্গে পাঁচশ কন্ঠে জবাব এল, ‘আল্লাহ আকবার।‘ সম্মিলিত কন্ঠে শ্লোগান উঠল, জীবনের সাইমুম, মুক্তির সাইমুম, জিন্দাবাদ।
কম্যুনিষ্ট কারাগারে বহু বছর, হয়তো বহু যুগ পর সম্ভবত এটাই প্রথম সম্মিলিত কন্ঠের, স্বাধীন কন্ঠের নিরুদ্বিগ্ন এবং উচ্চ কন্ঠ জীবন সংগীত। উদ্যত সংগীন হাতে একদল সৈনিক দাড়িয়ে আছে এই পাঁচশ যুবককে ঘিরে। ওরা এদেশীয় নয়। ওদের চোখে বিস্ময়। বোধ হয় ভাবছে কম্যুনিষ্ট রাজ্যেও এমন কিছু ঘটতে পারে! ওদের চোখে ভয়ও। কে জানে ওদের মধ্যে এদের মতই হারাবার বেদনা আছে বলেই এই ভয় কিনা?
শ্লোগান শেষ হলে সেই যুবকটি বলল, ভাইসব, জাতির জন্য, জীবনের জন্য, আমার ধর্মের জন্য আমিই প্রথম জীবন দিতে চাই। বলে সে মাঝখান থেকে লাইনের প্রথমে এসে দাড়াল।
এ সময় কলিনকভ এবং সার্জি সোকলভ ফিরে এল। সার্জি সোকলভ পিস্তল নাচিয়ে বলল, মরবার আগে তোদের পাখা উঠেছে। ঠিক আছে, আমি যা বলেছি সেটাই এখন হবে। বলে সে একজন রক্ষীকে বলল, লাইনের প্রথমটাকে ধরে এনে উচু মঞ্চটাতে দাঁড় করাও। আমার পিস্তলই আজকের উৎসব উদ্বোধন করবে।
রক্ষী লাইনের প্রথমে দাড়ানো সেই যুবককে ধরতে গেল। যুবক বলল, আমাকে ধরে নিতে হবে না, আমি নিজেই যাচ্ছি। সেখানে সোকলভের এক গুলি কেন হাজার গুলি আমাকে ভয় দেখাতে পারবেনা। বলে পিছ মোড়া করে বাধা সেই যুবক মাথা উচু করে বীর দর্পে মৃত্যু মঞ্চে গিয়ে উঠল। তার মুখে হাসি। ভয় ও উদ্বেগের সামান্য চিহ্নও তার চোখে নেই।
হো হো করে হেসে উঠল সোকলভ। বলল, খুব বীরত্ব দেখাচ্ছিস। মরেও তুই রক্ষা পাবিনা, তোর স্ত্রী ও ছেলে সন্তানকে আমরা শুকিয়ে মারব।
মুহুর্তের জন্য চমকে উঠেছিল যুবক। বুকটা যেন একবার মোচড় দিয়ে উঠেছিল। দুটি মেয়ের নিষ্পাপ মুখ, স্ত্রীর অসহায় ছবি তার সামনে জ্বলন্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তা মুহুর্তের জন্যই। নিজেকে সামলে নিয়ে যুবক বলে উঠল, আমার স্ত্রী ছেলে সন্তানকে আমি সৃষ্টি করিনি, আমার আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তাদের দেখবেন। তোমাদের উপর আমি…………………।
সোলক্ভ যুবককে কথা বলতে দিলনা। ‘চুপ’ বলে হুংকার দিয়ে উঠল। তার চোখে যেন আগুন জলছে। তার পিস্তল উঁচু হয়ে উঠল। পিস্তলের ট্রিগারে তার তর্জনি স্থাপিত হলো। চারদিক নিরব নিস্তব্ধ। পরবর্তি সেকেন্ডের ঘটনার জন্য রুব্ধশাসে অপেক্ষা করছে সবাই।

৮

বিল জোয়ান ও খুজলাং পাহাড়ের মাঝখানে সংকীর্ন সমতল এক উপত্যকা। তাজিকিস্তানের এ কিরঘিজিস্তান এবং উজবেকিস্তানের সাথে যেন গলাগলি করে আছে। এর দক্ষিন ও পূর্বদিকটা ঘিরে কিরঘিজিস্তান এবং উত্তর দিকে উজবেকিস্তান। অবস্থানের দিক দিয়ে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন, স্থানটা দুর্গম, কিন্তু এখান থেকে শির দরিয়া নদী এবং ফারগানা সমরকন্দ রেলপথ খুব দূরে নয়। ঐতিহাসিক পামির সড়কটিও এর পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে। ঘোড়ায় চড়ে সেখানে পৌছতে সময় বেশী লাগে না। আর ফারগানা, তাসখন্দ এবং তাজিকিস্তানের রাজধানী স্টালিনবাদের মধ্যবর্তী এ উপত্যকা অবস্থিত বলে সবার সাথে সমান ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা সহজ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা এ উপত্যকার চারদিকে যেসব পাহাড়ি কবিলা ছড়িয়ে আছে সকলেই সাইমুমের মুক্তি আন্দোলনে শরিক। সুতরাং নিরাপত্তার দিক দিয়ে নিশ্চিত। বিল জোয়ান ও খুজলং পাহাড় এবং মধ্যবর্তী উপত্যকা ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে সাইমুমের নতুন অপারেশন হেডকোয়াটার। এ হেড কোয়াটার আগে ছিল লেলিন স্মৃতি পার্কে। এখন সেটাকে অস্র-শস্রের সাপ্লাই কেন্দ্র এবং সাইমুম মহিলা শাখার প্রধান অবস্থান কেন্দ্র বানানো হয়েছে।
বিল জোয়ান ও খুজলাং পাহাড় এবং মধ্যবর্তী এ উপত্যকার একটা ইতিহাস আছে। কম্যুনিষ্টদের কবল থেকে মুসলিম মধ্য এশিয়াকে মুক্ত করার জন্য পরিচালিত প্রথম মুক্তি সংগ্রামের নেতা গাজী আনোয়ার পাশা ১৯২২ সালের ৪ঠা আগষ্ট এখানে এই উপত্যকাতেই শাহাদত বরণ করেন। তিনি মুসলিম মুজাহিদিনদের নিয়ে একটা মিটিং করেছিলেন, এই সময় কম্যুনিষ্ট চররা কম্যুনিষ্ট বাহিনীকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসে এবং আনোয়ার পাশা অতর্কিতে চারদিক থেকে আক্রান্ত হন। তিনি আত্নসমর্পন করেননি। কম্যুনিষ্ট বাহিনির বিরুদ্ধে লড়াই করে সাথীদের সমেত তিনি শাহাদত বরণ করেন। এই উপত্যকা মুসলিম মধ্য এশিয়ার বালাকোট। সে বীর শহীদদের পবিত্র রক্তে মাখা এ ভূমিকাতেই আহমদ মুসা তাঁর অপারেশন হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেছেন।
বিল জোয়ান পাহাড়ের এক গুহা-মুখে সদর দফতরের প্রধান তাঁবুটি অবস্থিত। গাছ-পালা তাঁবুটাকে ঢেকে রেখেছে। তাঁবুর পাশে বিরাট এক প্লাস্টিক ফলক। ফলকটিতে গাজী আনোয়ার পাশা শহীদের একটি চিঠি উৎকীর্ণ রয়েছে। চিঠিটি এই রকমঃ
‘আমার সালাম গ্রহণ করুন। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের অপার অনুগ্রহে আমি ভাল আছি। আপনাদের একটা অর্থহীন পত্র পেলাম। তাতে আপনারা লিখেছেনঃ
‘শুরু থেকেই আপনি আপনার সকল শক্তি বোখারার বিপ্লবীদের জন্য ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন। কাজেই আপনার এ ত্যাগের প্রতিদান হিসেবে আমরা যখন আপনাকে একটা সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্টিত করতে যাচ্ছিলাম, তখন আপনি দায়িত্বহীন লোকের পাল্লায় পড়ে চলে গেলেন। আপনি ফিরে আসুন আপনার সকল অপরাধ ক্ষমা করা হবে।‘
আমার প্রতি আপনাদের এ অনুগ্রহের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে বলুন, আপনারা কি সেই তারা নন যারা কম্যুনিষ্টদের হাতে বোখারার পতন ঘটাতে সাহায্য করেছেন? জাতির বিপ্লবী শক্তির নিরপরাধ লোকদের রক্তনদী আপনারাই বইয়েছেন। আপনারাই তো আমাদের পবিত্র স্থান সমূহ, মসজিদ মাদ্রাসাকে ভূ-লুন্ঠিত করেছেন। আমাদের দরিদ্র জনগনকে বুর্জোয়া আখ্যা ব্যাপকভাবে হত্যা করেছেন। তাদের সর্বস্ব লুন্ঠন করেছেন। মাত্র ভাত-কাপড়ের লোভে রাশিয়ানদের হাতে নিজেদের ঈমান বিক্রি করেছেন। আমাদের বোখারা এখনও ধূলি ধূসরিত। দারিদ্র ও আনাহারক্লিষ্টতার বীভৎসতা চলছে সেখানে। আমি জন্মভুমির একজন মুক্ত সন্তান। জাতির জন্য লড়ছি, ভবিষ্যতেও লড়ব। জন্মভূমিকে কম্যুনিষ্ট এবং আপনাদের মত বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে মুক্ত করব। বর্তমানে আমার সাথে দেড় লাখ মানুষ আযাদীর জন্য পাহাড়ে বন্দরে সর্বদা শত্রুদের সাথে লড়বার জন্য প্রস্তুত। আমরা কোন ভাড়াটিয়া সৈন্য নই, জাতির সেবক মাত্র। আমরা অচিরেই দেশকে রুশদের কবল থেকে মুক্ত করব। আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের বিশ্বাস ও পথ সুস্পষ্ট। আমাদের কর্মসূচী পরিষ্কার। পল্লী নগর হতে মুসলমানরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে আমাদের সাথে শামিল হচ্ছে। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের হেফাজত করতে চায়। তোমরা ও যদি দ্বীনের সৈনিক হতে চাও, তাহলে রাশিয়ানদের বিতাড়িত করার সংগ্রামে এসে যোগ দাও।‘
আনোয়ার পাশা এ চিঠি লিখেছেন ১৯২২ সালে লোভ প্রলোভনে যে সব মুসলমান কম্যুনিষ্ট দলে যোগ দিয়েছিল তাদের উদ্দেশে। আহমদ মুসা বলে, গাজী আনোয়ার পাশার এ চিঠির আবেদন এখনও আছে, কম্যুনিষ্টদের বিতাড়ণ না করা পর্যন্ত থাকবেই।
বিলজোয়ান পাহাড়ের এ প্রধান তাঁবুতে আহমদ মুসা বসে। তার পাশের কক্ষেই বসে হাসান তারিক। হাসান তারিক এ অপারেশন ঘাটির ষ্টাফ প্রধান এবং কেন্দ্রিয় অপারেশন কো-অডিনেটর।
সেদিন ভোরে আহমদ মুসা এক ঘাটি সফরের জন্য বেরিয়ে গেছে। হাসান তারিক অফিসে একা। টেবিলে বসে কাজ করছিল সে। রিপোর্ট পড়ছিল সে আয়েশা আলিয়েভার। মস্কোভা বন্দি শিবির থেকে শুরূ করে আরিস ষ্টেশনে পৌঁছা পর্যন্ত সব কথাই বিস্তারিত আছে রিপোর্টটিতে। একবার পড়েছে সে শুরুতে, আবার পড়ছে। আয়শা আলিয়েভার ভুমিকায় স্থম্ভিত হয়েছিল সে, আনন্দও লেগেছে তার।
হঠাৎ হাসান তারিকের মনে হল, আবার কেন সে রিপোর্ট পড়ছে। কেন ভালো লাগছে তার এটা পড়তে? একজন মহিলার জন্য ঐ ভুমিকা বিস্ময়কর বলেই কি? অস্বস্তি বোধ করছে হাসান তারিক। এ প্রশ্নের কোন সরল জবাব নেই তার কাছে। মনের অবচেতন অংগনের কোথায় যেন সংঘাত। চঞ্চল হয়ে ওঠে সে। সে কি কোন অন্যায় করেছে?
এমন সময় সাইমুমের একজন রক্ষী ঘরে প্রবেশ করে বলল, মুহতারামা আয়েশা আলিয়েভা কথা বলতে চান।
প্রথমে হাসান তারিক চমকে উঠল, তারপর মনে পড়ল, আজ আয়েশা আলিয়েভাদের লেনিন স্মৃতি পার্কের ঘাটিতে যাওয়ার কথা। মহিলা শাখাকে ওখানেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোকাইয়েভাও তার সাথে যাছে। শিরিন শবনমকেও ওখানে রাখা হয়েছে। রোকাইয়েভার সাথে তার দাদীর সাক্ষাতের ব্যবস্থা ওখানেই করা হবে। সাইমুমের একটা ইউনিট তাদেরকে ওখানেই পৌছে দেবে।
হাসান তারিক রক্ষীকে বলল, আসতে বল তাকে।
রক্ষী বেরিয়ে গেল। অল্পক্ষণ পরেই পর্দার আড়ালে পায়ের শব্দ হলো। আয়েশা আলিয়েভা এসেছে। সালাম দিল সে।
হাসান তারিকও সালাম জানিয়ে হাতের কাগজ টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল, আয়েশা আলিয়েভাই প্রথম কথা বলল। বলল সে, পরামর্শ নিতে এসেছি, দোয়া নিতে এসেছি।
উল্লেখ্য, সাইমুম মহিলা শাখার সিকিউরিটি বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আয়েশা আলিয়েভাকে। মস্কোভা বন্দি শিবির থেকে এ পর্যন্ত আয়েশা আলিয়েভা যে সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে তাতে আহমদ মুসা খুশী হয়ে তার উপর এই গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আয়েশা আলিয়েভার রিপোর্টে ফারহানার কথাও ছিল। আহমদ মুসা চমৎকৃত হয়েছে ফাতিমা ফারহানার ভুমিকাতেও। আয়েশা আলিয়েভা ফাতিমা ফারহানার সালাম পৌছিয়েছিল আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা সালাম গ্রহণ করে বলেছিল, ও ভালো আছে তো? ওদের কাছে আমি অনেক ঋনী। পর্দার আড়ালে দাঁড়ানো আয়েশা আলিয়েভার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এই কথায়। সে খুশী হয়েছিল, ফারহানার কাছে একটা ভালো চিঠি লেখার পয়েন্ট তার হলো।
হাসান তারিক তার হাতের কলমটি মৃদুভাবে টেবিলের উপর ঠুকছিল। আয়েশা আলিয়েভার কথায় উত্তরে টেবিলের উপর চোখ রেখে বলল, হেদায়েত যা দেবার আহমদ মুসা ভাই তো দিয়েছেন। আমি দোয়া করছি, আন্দোলন তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে তা পালন করার তৌফিক আল্লাহ তোমাকে দান করুন। হাসান তারিক কথা শেষ করল।
ও দিকে আয়েশা আলিয়েভাও নিরব। এই নিরবতায় অস্বস্তি বোধ করছে হাসান তারিক। কিন্তু কি কথা আর বলবে সে।
পল পল করে সময় বয়ে যাছে। অসহ্য এক নিরবতার মধ্যে কেটে গেল কিছুক্ষণ। অবশেষে ওপাশে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর শব্দে এই নিরবতা ভেংগে গেল। উঠে দাড়িয়েছে আয়েশা আলিয়েভা বলল সে, আসি, দোয়া করবেন। আবার সালাম দিয়ে সে বেরিয়ে গেল।
তার গলাটা ভারী মনে হল।
হাসান তারিক সালাম দিতে ভুলে গেল। এক ধরনের বিমুঢ়তায় মাথাটা তার চেয়ারে এলিয়ে পড়ল। কেন সে কথা বলতে পারলোনা? এই দুর্বলতা কেন তার? এ পরিষ্কার বিষয়টা ও নিশ্চয় ধরতে পেরেছে? বেদনায় ক্ষোভে চোখ দু’টি তার ভারী হয়ে উঠল। আর নিজেকে মনে হল খুবই দুর্বল। ভাবল সে, ও কি কষ্ট পেল মনে? তার গলাটা অমন ভারী শোনাল কেন? হাসান তারিকের মনে পড়ল আয়েশা আলিয়েভার তাসখন্দ জেল লাইব্রেরীর সে চিঠিটার কথা। এ দুনিয়ায় তার কেউ নেই, একা সে।
চেয়ার থেকে উঠে দাড়াল হাসান তারিক। বেরিয়ে এল তাবুর গেট দিয়ে। সাইমুমের ছোট কাফেলা তখন যাত্রা শুরু করেছে। সামনের দুটি ঘোড়ায় আয়েশা আলিয়েভা আর রোকাইয়েভা। বড় চাদরে ঢাকা ওদের গোটা দেহ। সামনের মুখটি একবার ফিরে তাকাল তাঁবুর দিকে। আয়েশা আলিয়েভার মুখ, হাসান তারিক তার চোখ নামিয়ে নিল তার চোখ থেকে। যখন আবার মুখ তুলল, কাফেলা চলে গেছে পাহাড়ের আড়ালে।
তাঁবুতে ফিরে আসার জন্য হাসান তারিক ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, এমন সময় দেখল ঘোড়া ছুটিয়ে আহমদ মুসা আসছে।
আহমদ মুসা এল। সালাম বিনিময় হলো। আহমদ মুসা বলল ভেতরে চল জরুরী কথা আছে। আহমদ মুসার মুখাবয়বে চিন্তার স্পষ্ট ছাপ। আহমদ মুসা এবং হাসান তারিক দু’জনে তাঁবুর ভেতরে এসে আহমদ মুসার রুমে বসল।
চেয়ারে বসেই আহমদ মুসা কনুই টেবিলে রেখে একটু ঝুঁকে পড়ল সম্মুখে হাসান তারিকের দিকে। তার চোখে চাঞ্চল্য এবং চিন্তার সুস্পষ্ট ছাপ। বলল সে, আরিসের জেল খনায় আমাদের পাঁচশ ভাই অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। সাইমুমকে কিছু করতে না পেরে তারা আরিস ষ্টেশনের সকল মুসলিম কর্মচারী এবং শহরের প্রায় চারশ মুসলিম যুবককে জেলে আটকিয়ে তাদের উপর অত্যাচার করছে সাইমুম সম্পর্কে তথ্য বের করার জন্য।
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, বল এখন আমাদের করণীয় কি?
-ওদের উদ্ধার করা দরকার। কম্যুনিষ্টরা হয় ওদের মেরে ফেলবে, নয়তো চালান দেবে সাইবেরিয়ায়। এর কোনটাই আমরা হতে দিতে পারিনা।
-ঠিক বলেছ, আরিস থেকে আলী খানও এই কথাই জানিয়েছে।
-তাহলে আমাদের তড়িৎ পদক্ষেপ নেয়া দরকার?
-আমি চিন্তা করছি, আজই একটা ইউনিট আমরা আরিসে পাঠিয়ে দেব। আরিসের সাইমুম ইউনিট তৈরী আছে। আজ রাতেই আমরা আরিস জেলখানায় আঘাত হানবো।
-অনুমতি দিলে একটা ইউনিট নিয়ে আমি এখনই আরিসে যেতে পারি। বলল হাসান তারিক।
-এই তো তুমি সেখান থেকে এলে, এবার আমি যাব মনে করছি! জবাব দিল আহমদ মুসা।
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, আমার সাথে যাবে এমন একটা ইউনিট তুমি রেডি কর। আমরা যাতে জোহর পড়েই রওয়ানা হতে পারি।
হাসান তারিকের চোখে মুখে তখনও কিছু আপত্তির সুর। বলল, কাল কাজাখ রাজধানী আলমা-আতা থেকে আমাদের প্রতিনিধি দল আসবে। আপনি এসময় বাইরে গেলে …..।
হাসল আহমদ মুসা। হাসান তারিককে কথা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল, সেতো আগামী কালের কথা। দোয়া কর সাইমুমের এ অভিয়ান আল্লাহ সফল করুন। ইনশাআল্লাহ ভোরেই আমরা ফিরে আসব।
‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে হাসান তারিক একজন রক্ষীকে ডেকে নির্দেশ দিল আলি ইউসুফজাইকে ডেকে আনার জন্য। আলী ইউসুফজাই এই ঘাটির একজন ইউনিট কমান্ডার। আহমদ মুসার নির্দেশ মোতাবেক হাসান তারিক অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে দিল।
আহমদ মুসা। চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছিল। হাসান তারিকের কথা শেষ হলে সে বলল, কুতাইবার এখানে আসা দরকার, একটা জরুরী পরামর্শের জন্য, একথা বলে দিয়েছ তো আয়েশাকে?
সলাজ হাসি ফুটে উঠল হাসান তারিকের ঠোঁটে। বলল সে, দুঃখিত একদম ভুলে গেছি মুসা ভাই।
-কেন, কোন কথা হয়নি তার সাথে? বলে যায়নি সে?
-ও দোয়া নিতে এসেছিল, আর কথা হয়নি। মুখ একটু নিচু করে বলল হাসান তারিক।
আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি। বলল, দোয়া করতে কথা বলতে হয়না, এজন্যই বোধয় দোয়াটা করতে পেরেছ, না?
মুখটা হাসান তারিকের লাল হয়ে উঠল লজ্জায়। আহমদ মুসার কথার কোন উত্তর না দিয়ে হাসান তারিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি একটু ওদিকে দেখি, ইউসুফজাইকে ও পেল কিনা?
আহমদ মুসার সম্মুখ থেকে পালিয়ে গেল হাসান তারিক। আহমদ মুসার ঠোঁটে হাসি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে হাসিতে পিতার স্নেহ আছে, ভাইয়ের ভালবাসা আছে, বন্ধুর সমবেদনা আছে।
আরিস শহরের জেলখানা। শহরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া প্রধান সড়কটি থেকে একটা সরু কংক্রীটের রাস্তা চলে গেছে উত্তরে। কিছু দুর গিয়ে একটা বড় গেটে পৌছে রাস্তাটা শেষ হয়েছে। এটাই আরিসের জেলখানা। জেলখানার চারদিক দিয়ে বাগান। নানা রকম ফুলের গাছ সে বাগানে। সব্জিও ফলানো হয় এখানে। বড় তুলার গাছও কিছু আছে। বাগানটা অপেক্ষাকৃত ছোট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাগানের পরেই মুল জেল খানা। এটাও প্রাচীর ঘেরা। জেলখানার উত্তর অংশে অনেকটা জায়গা খালি। একে বলাহয় মৃত্যুমাঠ। এখানে যাদের আনা হয়, তারা আর ফিরে যায়না জেল ঘরে। পাঁচশ মুসলিম যুবকের উপর এই মুত্যু মাঠেই নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
সূর্য ডোবার পরেই সাইমুমের ইনফরমেশন ইউনিটের লোকরা জেল খানার চারদিকে অবস্থান নিয়েছে। অপারেশন ইউনিটের লোকেরা এল সাড়ে ৭টায়। পরিকল্পনা অনুসারে তারা জেলখানার মূল প্রাচীরের চার দিকে গাছের আড়ালে অবস্থান নিল। ইনফরমেশন ইউনিট আগেই জানিয়েছিল, জেলখানার বাগানে কোন প্রহরী নেই। বড় বড় কর্তারা জেল খানায় আসায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা আজ জেলখানা সিকিউরিটির হাতে নেই বলেই বোধ হয় রুটিন প্রহরার বাড়তি ব্যবস্থা তারা করেনি।
ঠিক সাড়ে সাতটাতেই আহমদ মুসা, আলী খানভ এবং আরও দু’জন একটা সামরিক জীপে এসে জেলখানার বাইরের গেটে দাঁড়াল। তাদের প্রত্যেকের গায়ে সামরিক অফিসারের পোশাক। মিলিটারী হ্যাট কপালের প্রান্ত পর্যন্ত নেমে এসেছে। এ সামরিক পোশাক ও সামরিক জীপ সাইমুমের যোগাড়ে আগে থেকেই ছিল।
আহমদ মুসার আজকের পরিকল্পনা নিঃশব্দে কাজ শেষ করা। গত কয়েকদিন থেকে শহরে যথেষ্ট পুলিশ ও সৈন্যের সমাবেশ করা হয়েছে। কাজ শেষ করার আগে জানাজানি হয়ে গেলে শহর থেকে বেরুনো, বিশেষ করে এত লোক নিয়ে কঠিন হবে।
জীপের ডাইভিং সিটে ছিল আহমদ মুসা। জীপ গেটের সামনে দাঁড়াতেই সিকিউরিটি বক্স থেকে দু’জন বেরিয় এল। আহমদ মুসা দ্রুত গেট খোলার জন্য হাতের ইশারা করল। তারা মুহূর্ত দ্বিধা করল তারপর খুলে দিল বিদ্যুৎ চালিত অটোমেটিক গেট। সাঁ করে জীপটি ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনের সিট থেকে দু’জন লাফিয়ে নামল নীচে। নেমেই ওরা সিকিউরিটি বক্সের দিকে এগুল। দেখলে মনে হবে সিকিউরিটির লেকদের তারা কিছু বলতে যাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুসারে এ দু’জন সাইমুম কর্মীর দায়িত্ব হলো গেটের প্রহরী দু’জনকে কাবু করে সিকিউরিটি বক্স দখল এবং গেটটা সিল করে দেয়া যাতে আর কেউ ঢুকতে না পারে। অল্পক্ষণ দাঁড়াল জীপটি। তাকিয়েছিল আহমদ মুসা সিকিউরিটি বক্সের দিকে। তারপর সিকিউরিটিবক্স থেকে সাইমুম কর্মী হাত নেড়ে শুভ সংকেত দিলে আহমদ মুসার জীপ ছুটল সামনে। জেলখানার মুল গেটের সামনে রাস্তার ডান পশে প্রধান সিকিউরিটি অফিস। এ সিকিউরিটি অফিসেই রয়েছে জেলখানার বিদ্যূৎ নিয়ন্ত্রন কক্ষ। এ অফিসে সর্বক্ষণ ডজন খানেক সিনিয়র নিরাপত্তা অফিসার ডিউটিতে থাকে। সবাই রুশ দেশের, দেশীয় কেউ নয়।
জীপ নিরাপত্তা অফিসটির সামনে চলে এসেছে। কাউকেই বাইরে দেখা যাচ্ছেনা। খুশী হল আহমদ মুসা।
জীপ নিয়ে অফিসের সিঁড়িতে দাঁড় করাল। লাফ দিয়ে নেমে পড়ল দু’জন দু’দিক থেকে। তর তর করে সিড়ি বেয়ে উঠে খোলা দরজায় গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা। সোল্ডার হোলস্টার থেকে এম-১০ রিভলভার সে তুলে নিয়েছে হাতে। আলী খানভ আহমদ মুসার পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাতে এম-১০ রিভলভার।
ঘরে একটা গোল টেবিল ঘিরে বসেছিল ১২ জন সিকিউরিটি অফিসার প্রত্যেকের পাশে ষ্টেনগান রাখা। কয়েকজন তাস খেলে সময় কাটাচ্ছিল। অন্যান্যরা দেখছিল, কেউ গল্প করছিল। রিভলভার হাতে আহমদ মুসাদের দেখে টেবিলের ওপশে থেকে একজন চুপ করে টেবিলের নীচে বসে পড়ল। সংগে সংগে আলী খানভ বসে পড়ল। ওপাশে বসে ও ষ্টেনগান ঘুরিয়ে নেবার আগেই আলী খানভ এম-১০ এর ট্রিগার চেপে টেবিলের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার থেকে শুধু একটা যান্ত্রিক শীষ উঠল। দেহগুলো কারও টেবিলে, কারও মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।
আলী খানভকে দরজার দাঁড় করিয়ে আহমদ মুসা গিয়ে সুইচ রুমে প্রবেশ করল। এই জেলখানার ইলেকট্রিক ডিজাইনার উজবেক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার। এখন সাইমুমের কর্মী। তার কাছ থেকে সুইচ বোর্ডের নক্সা সে মুখস্থ করেছে। সুইচ বোর্ড দেখেই সব কিছু চিনতে পারলো। সুইচ প্যানেলের বাম দিক থেকে ৭নং সুইচের দিকে তাকিয়ে দেখল ওটা অন করা। সুইচ সে অফ করে দিল। তারপর নক্সা অনুযায়ী ৩নং মেইন সুইচের ঢাকনা খুলে ফেলে সেখান থেকে নব খুলে নিল। বন্ধ করে দিল আবার মেইন সুইচ। এবার সুইচ অন করে দিলেও জেলখানার দেয়ালের তারগুলোতে বিদ্যুৎ যাবে না। জেলখানার দেয়ালের বিদ্যুতায়িত তারগুলোকে এইভাবে অকেজো করে দেয়া ছাড়া আর কোন লাইটে সে হাত দিলনা। অপারেশন শেষ করার আগে ওদেরকে এলার্ট হবার কোনই সুযোগ সে দিতে চায়না।
সুইচ রুম থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। তারপর সিকিউরিটি রুমের দরজা টেনে বন্ধ করে দিয়ে আলী খানভকে নিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত জেলখানার পূর্ব পাশের বাগানের পথ ধরে জেলখানার উত্তরের অংশে চলল। তারা চলা শুরু করতেই গাছের অন্ধকার থেকে দু’জন সাইমুম কর্মী বলল, চলুন আমরা আপনাদের অপেক্ষা করছি।
তারা জেলখানার উত্তর প্রান্তের দেয়ালের কাছে এসে পৌঁছাল। আসতে আসতে সাইমুমের ইনফরমেশন বিভাগের এ দু’জন কর্মী বলে ছিল, আজ রাত ৭টায় একসাথে অনেক গোলাগুলির শব্দ বাইরে থেকে শোনা গেছে। আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল সংখ্যা কত হবে?
চল্লিশ পঞ্চাশটির বেশি হবে না, তারা বলল। অর্থাৎ রাত ৭টার দিকে, আহমদ মুসা ভাবল, আমাদের চল্লিশ পঞ্চাশ জন ভাইয়ের জীবন তারা কেড়ে নিয়েছে।
ঘড়ির দিকে তাকাল আহমদ মুসা। সন্ধ্যা ৭টা ৫০মিনিট। আহমদ মুসা এদিকের গোটা প্রাচীরটা পরীক্ষা করে এল। দেয়ালের কাছ বরাবর সাইমুম কর্মীরা বসে আছে। ঠিক আটটা বাজার সাথে সাথে গলায় পিস্তল ঝুলিয়ে পঞ্চাশ জন সাইমুম কর্মী জেলখানার প্রাচীরে উঠে যাবে ঠিক করে রাখা হয়েছে। একজন সাইমুম কর্মীর উপর আর একজন দাঁড়াবে, এই দ্বিতীয় জনের কাঁধে পা রেখেই তারা পঞ্চাশজন প্রাচীর অতিক্রম করবে।
ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখা শেষ করে কয়েকজনকে দিয়ে দেয়ালের বিদ্যুতের তারগুলো আবার পরীক্ষা করাল, না ওগুলো মৃত। তারপর আলী খানভকে পরিকল্পনাটা আবার বুঝিয়ে দিয়ে বলল, সাইমুম কর্মীরা ভেতরে লাফিয়ে পড়ার সংগে সংগে দেয়ালের গোড়ায় পাতা দেয়াল মাইনে বিস্ফোরণ ঘটাবে। এতগুলো লোকের বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই একমাত্র সহজ পথ।
সব বুঝিয়ে দিয়ে আটটা বাজার কয়েক মিনিট বাকী থাকতে আহমদ মুসা জেলের পশ্চিমাংশের দিকে চলে গেল। জেলখানার তিন তলার বিল্ডিং পশ্চিম প্রাচীর যেখানে এসে শেষ হয়েছে সেখানে জেলখানার প্রাচীর এবং বিল্ডিং এর দেয়াল একসাথে মিশেছে। সে কোণা বেরাবর তিন তলার ছাদ থেকে একটা পানির পাইপ নীচে নেমে এসেছে। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এটা দেখে। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল ৭টা বেজে গেছে। আহমদ মুসা পানির পাইপ বেয়ে প্রাচীরের মাথায় গিয়ে বসল। ভেতরের মাঠে তার নজর গেল। পাঁচশ’ যুবককে ঘিরে প্রায় পঞ্চাশজনের মত সিকিউরিটির লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীর বরাবর। হঠাৎ নজর পড়ল সামনে। দেখল, ঈষৎ উঁচু একটা মঞ্চে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। সামনে থেকে আর একজন পিস্তল তুলল তাকে লক্ষ্য করে। কার্ণিশের ছায়ায় প্রাচীরের উপর সে বসেছিল। দ্রুত সোল্ডার হোলষ্টার থেকে এম-১০ রিভলভারটি খুলে নিল। রিভলভার ঘুরিয়ে সে চেপে ধরল ট্রিগার। লক্ষ্য তার হাত বাঁধা যুবকের মাথার উপর দিয়ে ঐ লোকটি। এক ঝাঁক গুলি বেরিয়ে গেল রিভলভার থেকে। পিস্তল ধরা ঐ লোকটি এবং চার পাঁচ গজ পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আর একজন ঢলে পড়ে গেল মাটিতে।
সকলের চোখ দেয়ালের এদিকে। ওদিকে সাইমুমের পঞ্চাশজন কর্মী প্রাচীর ডিঙিয়ে লাফিয়ে পড়ছে মাটিতে। মাটিতে পা দিয়েই ওরা রিভলবার তাক করছে কাছের কারারক্ষীদের লক্ষ্যে। মুহূর্তে এক সাথে পঞ্চাশটি রিভলভার গর্জে উঠল। লুটিয়ে পড়ল প্রায় পঞ্চাশটির মত দেহ।
আহমদ মুসাও লাফিয়ে পড়েছে মাটিতে। কাছেই একজন কারারক্ষী দাঁড়িয়ে ছিল। প্রথমটায় সে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু তারপরই ষ্টেনগান ঘুরিয়ে নেবার চেষ্টা করল। কিন্তু সময়ে না কুলালে সে ষ্টেনগান গিয়েই সজোরে আঘাত করল আহমদ মুসার মাথা লক্ষ্য করে। আহমদ মুসা চোখের পলকে মাথাটা নীচে চালান করে দিয়ে পায়ে জোড়া লাথি ছুড়ে মারল তার ষ্টেনগান ধরা হাত লক্ষ্য করে। তার হাত থেকে ষ্টেনগান ছিটকে পড়ে গেল, সেও আরেক দিকে ছিটকে পড়ে গেল। আহমদ মুসা শুয়ে থেকেই হাতের রিভলভার একটু উঁচু করে ট্রিগারে চাপ দিল। ছুটে আসা দু’জন রক্ষী মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। ছিটকে পড়া সেই লোকটি উঠে আবার তার ষ্টেনগান কুড়িয়ে নিচ্ছিল। আহমদ মুসার রিভলভারের নল তার দিকে ঘুরে এল। একটু চাপ দিল ট্রিগারে। ষ্টেনগান কুড়িয়ে নেবার জন্য সেই যে উঁচু হয়েছিল সে, আর উঠতে পারল না। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
এই সময় উত্তর দিক থেকে একটা বিস্ফোরণের শব্দ এল। সংগে সংগে জেলখানার উত্তর দেয়ালের একাংশ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে কোথায় উড়ে গেল। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে নির্বাক যন্ত্রের মত মুত্যু মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটির হাতের বাঁধন খুলে দিল। বলল, আমাদের সবাইকে এখন ভাঙা প্রাচীরের পথ হয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।
সাইমুম কর্মীরা শ্লোগান তুলেছে, জীবনের সাইমুম, মুক্তির সাইমুম, ইসলামের সাইমুম, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
কলিনকভ ও সাজি সোকলভ আহমদ মুসার গুলিতে প্রথমেই মারা গেছে। রক্ষীরা অধিকাংশই মারা পড়েছে। যারা দু’একজন ছিল জেলখানার ভেতর দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। জেলখানার সর্বত্র একটা ভয়ংকার ভীতি। জেলখানার ওদিকে যে রক্ষীরা ছিল তারা কি হচ্ছে, কি করবে তা বুঝার আগেই এদিক থেকে পালানোদের মুখে পড়ে তারা আর এমুখো হবার কোন চিন্তা করলোনা।
কারা রক্ষীদের ষ্টেনগান ও পিস্তলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সাইমুমের কর্মীরা সেই ভাঙা প্রাচীর পথে বেরিয়ে যাচ্ছে। সবার পিছনে আহমদ মুসা।
পাঁচশ যুবককে সাথে নিয়ে প্রায় দু’শ সাইমুম কর্মী বেরিয়ে এল জেলখানা থেকে। জেলখানার উত্তর দিকের সংকীর্ণ সড়ক ধরে এক সাথে এগিয়ে চলল সকলে। শ্লোগান দিতে নিষেধ করেছে আহমদ মুসা। এতগুলো লোককে কোন ঝুঁকির মধ্যেই সে ফেলতে চায়না। তাদের অবস্থান সম্পর্কে শত্রুদের যতটা বিভ্রান্ত রাখা যায় ততই মঙ্গল।
সাইমুমের এ মৌন মিছিল শহরের আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে চলছে। জেলখানার পাগলা ঘন্টা অবিরাম বাজছে। তারই মধ্যে উদ্যত ষ্টেনগান হাতে এত লোকের মিছিল দু’পাশের মানুষকে বিস্ময়-বিমুঢ় করে দিচ্ছে। জানালা খুলে ভীত-বিহ্বল দৃষ্টি তারা মেলে ধরছে এ মিছিলের দিকে। মাঝে মাঝে দু’একজন পুলিশকে দেখা যাচ্ছে। ওরা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখছে, কিছুই বুঝতে পারছেনা।
শহরের উত্তর প্রান্তে জেলখানা। উত্তরে আর শহর বেশী নেই। আবাসিক এলাকাটার পরেই এক উর্বর পার্বত্য ভূমি। সাইমুমের মিছিল থামলে আহমদ মুসা বলল, আপনার নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারেন। কম্যুনিষ্ট বাহিনীর সাধ্য নেই রাতে ওরা শহরের বাইরে আসে। তারপর আহমদ মুসা আলী খানভকে বলল, খোঁজ নিন আমাদের সবাই ফিরেছে কিনা।
আহমদ মুসার পাশেই বসেছিল সেই যুবক। যুবকটি আহমদ মুসাকে বলল, কি বলে আপনার শুকরিয়া আদায় করব, আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। আহমদ মুসা তার পিঠ চাপড়ে বলল, না ভাই, সব প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। তিনি তোমাকে বাঁচিয়েছেন।
-ঠিক বলেছেন, সব প্রশংসা আল্লাহর। আমি যখন হাসি মুখে মৃত্যুর জন্য মঞ্চে উঠলাম, তখন ওরা আমাকে কি বলেছিল জানেন? মরেও নাকি আমি রেহাই পাবোনা, আমার স্ত্রী ছেলে-সন্তানকে ওরা শুকিয়ে মারবে।
-মানুষের জীবন-মৃত্যুর ফায়সালা একমাত্র আল্লাহই করেন; আর কেউ নয়।
-জানেন, কিছুক্ষন আগে আমরা তকবির ধ্বনি করেছি, ‘সাইমুম জিন্দাবাদ’, শ্লোগান দিয়েছি।
-সাইমুমকে ভালোবাস তোমরা?
-আগে বাসতাম না, কিছুটা ভালো মনে হতো, কিন্তু জেলখানায় গিয়ে মৃত্যুর মুখো-মুখি দাঁড়িয়ে সাইমুমকে আমরা চিনেছি, তাকে ভালবাসতে শিখেছি।
-আলহামদুলিল্লাহ। সাইমুম জাতির খাদেম।
যুবকটির চোখ দু’টি উজ্জ্বল। আবেগ যেন ঠিকরে পড়ছে। বলল সে, শুধু আমরা সাইমুম কে ভালো বাসতে শিখিনি, জাতির সত্যিকার পরিচয় আমাদের সামনে ধরা পড়েছে, আমাদের জাতিসত্তাকে আমরা খুঁজে পেয়েছি।
-তোমার নাম কি ভাই? সস্নেহে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
-আবদুল্লাহ নাসিরভ।
কিছু বলতে যাচ্ছিল আহমদ মুসা। আলী খানভ ফিরে এল। ফিরে এসে বলল, সব ঠিক ঠাক। তারপর একটু থেমে বলল, এদের কি হবে, এরা কি করবে, এদের সম্পর্কে কিছু বলুন। বলে আলী খানভ উঠে দাড়িয়ে সকলকে বিশেষ করে সেই পাঁচশ যুবককে লক্ষ্য করে বলল, প্রিয় ভাইয়েরা আপনাদের উদ্দেশ্যে আমাদের নেতা সাইমুমের নেতা আহমদ মুসা এখন কিছু বলবেন।
আহমদ মুসা উঠে দাড়াল। বলল, প্রিয় ভাইয়েরা, আসুন আমরা আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করি। তিনি এক লড়াইয়ে আমাদের জিতিয়েছেন এবং আমাদের পাঁচশ ভাইকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করছেন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর সাহায্য আমরা অব্যাহত ভাবে পাব। আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে এবং আমাদের প্রানপ্রিয় জাতিকে কম্যুনিষ্ট কবল থেকে মুক্ত করতে পারব।
প্রিয় ভাইয়েরা, আপনারা যারা আজ জেল থেকে মুক্ত হলেন তারা আমাদের প্রাণপ্রিয় ভাই। আপনাদের সুখ সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা আমাদের জীবনের মতই গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা যদি আমাদের সাথে জাতির মুক্তি সংগ্রামে শামিল হতে চান আমরা আপনাদের স্বাগত জানাবো। আপনারা যদি আপনাদের ঘরে ফিরে যেতে চান, আমরা আপনাদের সাহায্য করব। যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনাদের নিরাপত্তা বিধানের।
সবশেষে বলতে চাই, আমরা সকলে আল্লাহর বান্দাহ। তার বন্দেগী করাই আমাদের জীবনের মূল কাজ। এর উপরই আমাদের মুক্তি, আমাদের পরকালীন চিরস্থায়ী কল্যাণ নির্ভর করছে। আমাদের এই মুক্তি সংগ্রাম আমাদের বন্দেগীরই একটি অংশ। আমরা যদি আন্দোলনকে সত্যিকার অর্থেই বন্দেগীতে পরিণত করতে পারি, তাহলে আল্লাহর সাহায্য আমাদের উপর অঝর ধারায় বর্ষিত হবে এবং সমস্ত ভয় ও বাধা অতিক্রম করে আমরা সাফল্যের সিংহধারে পৌঁছতে পারব। তাই সকলের প্রতি আমার আবেদন, আসুন আমরা ভাল মুসলমান হই, আল্লাহর সব বিধি নিষেধের আমরা পাবন্দ হই এবং এইভাবে আসুন আমরা অতীতের ব্যর্থতার বিধ্বস্ত ভূমিতে বিজয়ের নিশান উড্ডীন করি।
কথা শেষ করল আহমদ মুসা।
কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়াল সেই যুবক, আবদুল্লাহ নাসিরভ। বলল সে, আমরা অন্ধ ছিলাম, চোখ ফিরে পেয়েছি। আমরা আমাদের পতিত দশাকে বিধিলিপি ভাবতাম, সে ভুল আজ আমাদের ভেঙে গেছে। আমাদের সামনেটা জীবনের চিহ্নহীন মরুভূমি সদৃশ বিরাণ ছিল। ভাবতাম হতাশার সাগরে অন্তহীন ভাবে সাঁতার কাটা ছাড়া আমাদের করণীয় কিছুই নেই, কিন্তু আজ আমাদের সামনে জীবনের সবুজ সংগীত বাজছে। আমরা আর আমাদের পুরনো জীবনে ফিরে যেতে চাইনা। সাইমুমের নগণ্য কর্মী হবার সুযোগ পেলে আমরা সুখী হব।
আবদুল্লাহ নাসিরভ শ্লোগান তুলল, জীবনের সাইমুম, মুক্তির সাইমুম, ইসলামের সাইমুম জিন্দাবাদ। আবদুল্লাহ নাসিরভের সংগে সংগে পাঁচশ কন্ঠে উচ্চারিত হলো এই ধ্বনি। রাতের নিরবতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল শত শত কন্ঠের সে শ্লোগানে।
আহমদ মুসা আলি খানভকে বলল, আমাদের এই পাঁচশ ভাইকে আজই আমাদের ৩ নং ঘাটিতে পাঠিয়ে দাও। এদের পরিবার পরিজনদের প্রতি নজর রাখ। তাদের যেন কষ্ট না হয় , ক্ষতি না হয়।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। সবার কাছ থেকে বিদায় নিল। আবদুল্লাহ নাসিরভকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চুম্বন করে বলল, আবার দেখা হবে।
আহমদ মুসা এবং তাঁর ছোট কাফেলা যাত্রা শুরু করল গাজী আনোয়ার পাশা ঘাটির উদ্দেশ্যে। রাতেই পৌঁছতে হবে সেখানে, সকালেই আলমা-আতার প্রতিনিধিদল পৌঁছে যেতে পারে।

Page 77 of 165
Prev1...767778...165Next
Previous Post

পরী – আলাউদ্দিন আল আজাদ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা – আহমদ শরীফ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা - আহমদ শরীফ

বিচিত চিন্তা - সংস্কৃতি চিন্তা - আহমদ শরীফ

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৫: ভূমিকম্প – শামসুদ্দীন নওয়াব
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৮: বিভীষিকার প্রহর – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: বড়দিনের ছুটি – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আলাস্কা অভিযান – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আমিই কিশোর – রকিব হাসান

বিভাগসমূহ

  • আত্মজীবনী
  • ইতিহাস
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • কাব্যগ্রন্থ
  • গল্পের বই
  • গোয়েন্দা কাহিনী
  • ছোট গল্প
  • জীবনী
  • দর্শন
  • ধর্মীয় বই
  • নাটকের বই
  • প্রবন্ধ
  • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
  • বৈজ্ঞানিক বই
  • ভূতের গল্প
  • রহস্যময় গল্পের বই
  • রোমাঞ্চকর গল্প
  • রোম্যান্টিক গল্পের বই
  • শিক্ষামূলক বই
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In