মস্কোভা বন্দী শিবিরের তৃতীয় তলার ডাইনিং রুম। বন্দী শিবিরের প্রত্যেক তলায় আলাদা আলাদা ডাইনিং রুম রয়েছে। প্রত্যেক তলায় প্রায় দু’শ করে মেয়ে আছে। তাদের একসাথে একত্রিত হবার জায়গা এই ডাইনিং রুম। রাতের খাবারের জন্য ওদের এক ঘন্টা সময় থাকে। খেতে সময় লাগে ১৫ মিনিট, অবশিষ্ট্য সময় তারা একত্রে গল্প করে কাটায়।
কাউন্টার থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিতে হয়। খাবার নিয়ে যে যার মত টেবিলে বসে খাবার খায় এবং গল্প করে। এই গল্পটা সকলের প্রিয়। ৭ টা থেকে ৫ টা এই দশ ঘন্টা খাটুনির পর এটা তাদের জন্য যেন একটা মুক্তির বাতায়ন। শ্বাসরুদ্ধকর একটা গুমোট পরিবেশে এ সময়টুকুই তারা হেসে গল্প করে জীবন ধারণের শক্তি সঞ্চয় করে।
আয়েশা আলিয়েভা সেদিন খাবার লাইনে দাঁড়িয়ে দেখল নাতালেভা, রোকাইয়েভা, আলুলিয়েভা ডান প্রান্তের একটা টেবিলে বসে গল্প করছে। আজ খেতে আসতে আলিয়েভার একটু দেরী হয়েছে। মন ভাল লাগছে না তার। আজ সারাদিনই তার বারবার হাসান তারিকের কথা মনে পড়েছে। কারখানার কাজ থেকে গিয়ে হাতমুখও ধোয়নি সে। জানালা দিয়ে মস্কোভা নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল সারাক্ষণ। হাসান তারিখের মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠে তাকে আকুল করে তুলছে। সে রোকাইয়েভার কাছে শুনেছে হাসান তারিক জেল থেকে বেরুতে পেরেছে। কোথায় সে এখন? তার কি মনে আছে আয়েশা আলিয়েভার কথা? আয়েশা আলিয়েভা কিন্তু তার একটি কথাও ভুলেনি। হাসান তারিক ভাবে কি এমন করে আয়েশা আলিয়েভার কথা? ওঁর হৃদয়টা তো এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ওখানে আমার মত এক সামান্য কেউ প্রবেশাধিকার পাবে? কিন্তু বিদায়ের সময় আয়েশা আলিয়েভা ওঁর চোখে আলো দেখেছে, একটা আবেগের স্ফুরণ দেখেছে। ওটুকুই আলিয়েভার সম্বল। আলিয়েভা ভাবে ও শেষ কথাটা বলার আগে চোখ বুজেছিল কেন? একটা আবেগকে কি সে চাপা দিতে চায়নি? শেষ কথাটা বলার সময় ওঁর গলাটা ভারী হয়ে এসেছিল কেন? ওটা কি তার বিচ্ছেদ বেদনার কান্না নয়? ভালো লাগে ভাবতে এসব আলিয়েভার। সত্ত্বা জুড়ে শিহরণ জাগে তার।
হাসান তারিকের শেষ উপদেশ ভুলেনি আয়েশা আলিয়েভা। যেখানেই থাক কাজ করতে হবে মধ্য এশিয়ার মজলুম মুসলমানদের মুক্তির জন্য। মাঝখানে সে হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নাতালোভা তাকে আবার জাগিয়ে দিয়েছে। সে এখন বাচতে চায়। বাচতে চায় তার প্রিয় হাসান তারিকের জন্য, বাচতে চায় তার দেশজোড়া মুসলিম স্বজনদের জন্য।
লাইনের সামনে আরও চারজন আছে। তারপরই খাবার পাবে আলিয়েভা। এই লাইনে দাড়ানোই তার কাছে বড় বিরক্তিকর; ক্ষুধার সময় এটাকে একটা বড় শাস্তি মনে হয় তার কাছে।
আবার চোখ গেল নাতালোভার টেবিলে। আলুলিয়েভার সাথে আজও মারিয়া নেই কেন? ওদের গল্পে আলুলিয়েভাকে আজ তো আগের মত প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে না?
লাইন থেকে সামনের শেষ মেয়েটি খাবার নিয়ে চলে গেল। তারপর আয়েশা আলিয়েভা। আয়েশা আলিয়েভা খাবার নিয়ে এসে বসল নাতালোভাদের টেবিলে আলুলিয়েভার পাশে। বসেই চিমটি কাটল আলুলিয়েভাকে। বলল, মারিয়া কোথায়?
-জানোনা আলিয়েভা তুমি? গম্ভীর কন্ঠ আলুলিয়েভার। শংকিত হল আলিয়েভা। বলল, না তো! কি হয়েছে ওর? কথা বলল না আলুলিয়েভা। মুহুর্তকাল নিরবতা। নিরবতা ভাঙল নাতালোভা। বলল, রাক্ষসকে মানুষ ভেট দেবার সেই গল্প আলিয়েভা। এ মাসে তিনবার সেটা ঘটল মারিয়া, নাদিয়া ও নারালোভাকে দিয়ে।
শুনেই মুখটি ফ্যাকাশে হয়ে গেল আলিয়েভার। কোন কথা যোগল না তার মুখে।
মস্কোর কম্যুনিস্ট কর্তাদের চোখ মাঝে মাঝে মস্কোভা বন্দী শিবিরের উপরে পড়ে। ওদের সরকারী প্রাসাদেই বেশ্যালয় পোষা হয়। তারপরও মস্কোভা বন্দী শিবিরের প্রতিভাবান কুমারী সুন্দরীদের প্রতি ওদের নিদারুন লোভ। এর মধ্যে ক্যারেকটার এসোসিয়েশনের মাধ্যমে ‘বেয়াড়া’ মেয়েদের বাগে আনার একটা লক্ষ্যও তাদের থাকে। আলিয়েভা, রোকাইয়েভা, আলুলিয়েভা সবাই নীরব। আবার কথা বলল নাতালোভাই। বলল, দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় মিটিং সিটিং উপলক্ষ্যে কম্যুনিস্ট পুজিপতিরা যখন রাজধানীতে জমায়েত হন, তখনই এ প্রবণতা বাড়ে, যেমনটা গতমাস থেকে বেড়েছে।
-এই জুলুম ওদের কারও মনেই কি কোন দাগ কাটে না? বলল, আলিয়েভা।
আলিয়েভার কথা শুনে হাসল ডঃ নাতালোভা। বলল, কম্যুনিজম শেখানোর কেন্দ্রে লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ বছর আমি ছাত্র পড়িয়েছি। আমি জানি ওদের মানসিকতা। কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দরা নিজেদের শুধু দেশের অর্থসম্পদেরই অবিসংবাদিত মালিক মনে করে না, দেশের মানব সম্পদেরও মালিক, এই আচরণ তারা করে। যেহেতু মালিক তারা সেহেতু, যাকে যেমন ইচ্ছা তারা ব্যবহার করতে পারে। ব্যাপারটা যখন তাদের অধিকারের, তখন এর মধ্যে তারা কোন জুলুম দেখবে কেন!
আলোচনা আজ জমলো না। আলিয়েভা আর একটি কথাও বলেনি। নিষ্পাপ প্রাণোচ্ছল মারিয়া ও নাদিয়ার ভাগ্যের কথা শুনে মনটা একেবারে ভেংগে গিয়েছিল আলিয়েভার।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল। তার সাথে রোকাইয়েভাও উঠল। উঠে দাঁড়াল নাতালোভাও। সে আলিয়েভাকে কাছে টেনে বলল, আমি আটটায় তোমার রুমে যাব।
মস্কোভা বন্দী শিবিরের নিয়ম অনুসারে ৯ টা পর্যন্ত ঘরের দরজা খোলা রাখা যায়, দু’জনের বেশী না হলে পাশের রুমে আলাপ করাও নিষিদ্ধ নয়।
তবে রাত ৯টার পরে আর কোন দরজাই খুলবে না, কেউ করিডোরে বেরুবে না। পায়খানা প্রস্রাব তখন চলে ঘরের ভিতরে নির্দিষ্ট পাত্রে।
রাতে মাঝে মাঝেই নাতালোভা আলিয়েভার রুমে আসে। তারা দু’জনে মস্কোভা বন্দী শিবিরের বন্দীদের একটা জীবনবৃত্তান্ত তৈরী করছে। দু’জনে সারাদিনে বা কয়েকদিনে যা সংগ্রহ করে তা রাতে বসে সমন্বিত করে লিখে ফেলে। লেখা শেষ হলে এটা তারা বাইরে পাঠাবার চেষ্টা করবে।
আয়েশা আলিয়েভা চলে এল তার ঘরে। ঘরতো নয়, একটা কুঠুরী। কাপড়-চোপড় রাখার একটা আলনা, খাবার একটা পাত্র, একটা গ্লাস, আর শোবার জন্য ইস্পাতের ফ্রেমে প্লাস্টিকের একটা খাটিয়া। একটা কম্বল বিছানোর, একটা কম্বল গায়ে দেবার। এই নিয়েই তাদের সংসার। দাঁত মাজার একটা ব্রাশ আছে বটে, কিন্তু পেস্ট দুষ্প্রাপ্য। সুতরাং দাঁত মাজার জন্য তাদেরকে নানা জিনিসের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। এসব দৃশ্যমান আসবাব পত্রের বাইরে লেখার জন্য কলম, চিরকুট জাতীয় কিছু কাগজ তাদের আছে। ওগুলো তারা নানা কৌশলে লুকিয়ে রাখে।
আয়েশা আলিয়েভা গড়াগড়ি দিচ্ছিল বিছানায়। সারাদিনের ক্লান্তি ও খাওয়ার পর শোবার সংগে সংগে চোখ জড়িয়ে আসছিল তার। চোখটা একটু ধরেছিল। এমন সময় দরজায় নক হলো। কান খাড়া করল আয়েশা আলিয়েভা। না, এটা নাতালোভার নক নয়। আবার নক হলো। একটু জোরে। বুঝা গেল, বন্দী শিবির কর্তৃপক্ষেরই কেউ।
আয়েশা আলিয়েভা উঠে গায়ের কাপড়-চোপড় ঠিক করল, তারপর খুলতে গেল দরজা। গিয়ে আবার ফিরে এল। নামাজের জন্য যে কাপড়টা সে কেবলামুখী করে বিছিয়েছিল, নামাজের পর তা আর তোলা হয়নি। এ বন্দী শিবিরে কোন প্রকার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মারাত্মক অপরাধ। এ অপরাধ ধরা পড়লে এমনকি তাকে সংশোধনের বন্দী শিবির থেকে দাস শিবিরে পাঠানো হতে পারে। সুতরাং সব বন্দীরাই এ ব্যাপারে খুব হুশিয়ার। আলিয়েভা দরজা থেকে ফিরে এসে জায়নামাজটি তুলে ফেলল। তারপর খুলে দিল দরজা।
দরজা খুলে দেখল, দরজায় দাঁড়িয়ে এ বন্দী শিবিরের মহিলা ব্লকের সুপার অরলোভা আলেকজায়া স্বয়ং।
প্রথমে তাকে দেখে ভয়ানক চমকে উঠল আলিয়েভা। সবাই আলেকজায়াকে শনির সংকেত বলে জানে। সাড়ে ছয় ফুটের মত লম্বা, আড়াই ফুটের মত চওড়া আলেকজায়ার ঐ বিশাল দেহটার মধ্যে অন্তর আছে বলে কেউ মনে করে না। শাসন ও শাস্তির শানিত ছুরি যেন একটা সে। তার ডাক পড়লে কিংবা কারো দরজায় সে আবির্ভূত হলে সে বুঝে নেয় তার কোন দুঃসময় এসেছে।
সেই অরলোভা আলেকজায়াকে দরজায় দেখে কোন কথা জোগালনা আয়েশা আলিয়েভার মুখে। আয়েশা আলিয়েভার কথা বলার অপেক্ষাও করলোনা আলেকজায়া। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরের মেঝেয় দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। ঘরের বিছানা, বালিশ, পানির কলস, আলনা সব কিছুর উপর দিয়েই তার চোখ একবার ঘুরে এল।
বুকটা দুরুদুরু করে উঠল আলিয়েভার। কোন সন্দেহ করেছে কি সে? সন্দেহজনক কোন কিছুর সন্ধান করছে কি? গত পরশু লেখা দশজন বন্দীর জীবন বৃত্তান্ত বালিশের মধ্যে আছে। বালিশটা দেখবে নাকি সে?
মূর্তির মত দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিল আলিয়েভা। তার দিকে ফিরে আলেকজায়া বলল, খুব কষ্ট না?
আলেকজায়ার বাজখাই গলা আজ কেমন মসৃণ মনে হলো। বিস্মিত হল আলিয়েভা। এমন করে কথা বলতে পারে আলেকজায়া! বন্দীকে কষ্ট দিয়েই যার আনন্দ, কোন বন্দীর কষ্টের উপলব্ধি তার আসল কি করে?
বিস্মিত আলিয়েভা চকিতে আর একবার মুখ তুলল আলেকজায়ার দিকে। আলেকজায়া তার মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হয়ে গেল। আলিয়েভা দেখল আলেকজায়ার ছোট চোখে কেমন একটা কুৎকুতে ঔজ্জ্বল্য। ঠোঁটের কোণায় কেমন একটা ধারাল অফোটা হাসি। আলিয়েভার চোখকে তার চোখ দিয়ে যেন অনেকটা আটকে রেখেই বলল, তুমি মস্কো বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রী, তুমি সুন্দরী, তুমি একটা অনাঘ্রাতা ফুল। তোমার এ কষ্টতো সাজেনা আলিয়েভা।
আলেকজায়ার এই প্রশংসা এবং কথার ঢংগে চমকে উঠল আয়েশা আলিয়েভা। কি মতলব তার, কি বলতে চায় সে।
আলিয়েভাকে আর চিন্তার সুযোগ না দিয়ে আলেকজায়া বলল, তোমার সুদিন আসছে। পার্টির সর্বোচ্চ কর্তা ফার্স্ট সেক্রেটারী স্বয়ং তোমাকে স্মরণ করেছেন। তোমার শিক্ষা জীবনের রেকর্ড তাকে খুব খুশী করেছে, তোমার সুন্দর ফটো তাকে মোহিত করেছে। থামল আলেকজায়া। আলেকজায়ার কথা বুঝতে আর বাকী রইল না আলিয়েভার। দপ করে চারদিকের আলো যেন নিভে গেল আলিয়েভার কাছে। গোটা দেহটা তার অবশ হয়ে এল। চিন্তা শক্তি ভোতা হয়ে গেল তার। সামনে আলেকজায়ার অস্তিত্ব তার কাছে বড় বলে মনে হলো না। সে দাঁতে দাঁত চেপে টলতে টলতে গিয়ে বিছানায় বসল।
আলেকজায়ার মানচিত্রের মত মুখটা খুশীতে যেন আরও বিকৃত হয়ে উঠল। মনে হলো পরিস্থিতিটাকে সে উপভোগ করছে।
এই সময় ব্যাগ হাতে ঘরে প্রবেশ করল আলেকজায়ার সহকারিনী নভোস্কায়া। সে ব্যাগ খুলে আলিয়েভার বিছানায় নতুন পোশাক ও প্রসাধনী দ্রব্য সাজিয়ে রাখল। তারপর সে বেরিয়ে গেল।
আলেকজায়া কয়েক পা এগিয়ে আলিয়েভার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, মহামান্য ফার্স্ট সেক্রেটারী ভ্লাদিমির জিভকভ আজ রাতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। এই বন্দী শিবিরের আর কারও এর আগে এ ভাগ্য হয়নি। তুমি ভাগ্যবান আলিয়েভা।
থামল আলেকজায়া। তারপর হাতের ব্যাগ থেকে একটা সিকুইরিটি কার্ড বের করে আলিয়েভার পাশে রেখে বলল, এ পাশ আজ রাতে তোমার সাথে থাকবে। এর ফলে আজ রাতে তুমি সিকুইরিটির কাছে সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা পাবে। তারপর যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল আলেকজায়া। অনুভুতিশুন্য অভিভুতের মত বসে ছিল আলিয়েভা।
আলেকজায়া দরজায় গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বাথরুমে তোমার জন্য গরম পানি রাখা হয়েছে। সাবান আছে। গোসল করে রাত সাড়ে ৯ টার আগে তৈরী হয়ে নাও। আমি ঠিক সাড়ে ৯টায় আসব। এবার কথাগুলো আলেকজায়ার তীক্ষ্ম ছুরির মত ধারাল। বেরিয়ে গেল আলেকজায়া।
দরজা বন্ধ করে দেবার জন্যও উঠলোনা আলিয়েভা। চার দিকের সব কিছুই তার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে। যেন গোটা জগৎ একটা দ্বীপ। সে দ্বীপে সে একা অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে। অসহায়ত্বের এক অসহ্য যন্ত্রণা তার সত্তাজুড়ে।
আলেকজায়া বেরিয়ে যাবার পরপরই ঘরে প্রবেশ করল নাতালোভা। নাতালোভাকে দেখেই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আলিয়েভা। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল। নাতালোভা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করল। সান্ত্বনা দিল। তারপর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, মা কাঁদিসনা, এখন কাঁদার সময় নয়।
-না আমি কাঁদতে চাই, কাঁদতে কাঁদতে মরে যেতে চাই। আমি আর এক মুহূর্ত বাঁচতে চাই না।
-অবুঝ হোসনা। আমি থামের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম। সব শুনেছি। সব শুনেই আমি বলছি তোকে বাচতে হবে।
-সব শুনে কেমন করে তুমি আমাকে বাঁচতে বলছ খালাম্মা?
-সব শুনেই আমি বলছি। আমিও প্রথমে চমকে উঠেছিলাম, মনটা আমারও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পরে চিন্তা করে এর মাঝে জীবনের ইংগিত অবলোকন করছি।
-এ জীবন কি মারিয়া, নাদিয়ার জীবন খালাম্মা? এক মিনিট বাচবোনা আমি এ জীবন নিয়ে।
নাতালোভা আলিয়েভাকে এনে বিছানায় বসিয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল, আলিয়েভা তুই মারিয়া, নাদিয়া নস। তোর মধ্যে আল্লাহ বিশ্বাসের যে অজেয় আগুন জ্বলছে তা তাদের মধ্যে ছিল না।
আলিয়েভা নাতালোভার চোখে চোখ রেখেই বলল, তুমি কি বলতে চাও খালাম্মা?
-আমি বলত চাই এ বন্দী শিবির থেকে বেরোবার এক সুযোগ তুই পেয়েছিস। একে মুক্তির সুযোগ হিসেবে তোর ব্যাবহার করতে হবে।
-কেমন করে? চোখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল আলিয়েভার।
-কেমন করে আমি জানিনা। তবে এটুকু জানি, তুই ফার্স্ট সেক্রেটারীর মেহমান, সিকিউরিটির লোকজন তোকে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখবে। এর সুযোগ গ্রহণ করে ফার্স্ট সেক্রেটারীর কাছে পৌছার আগেই যে কোন উপায়ে নিজেকে তোর মুক্ত করতে হবে।
চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আয়েশা আলিয়েভার। দুনিয়ার এ জাহান্নাম থেকে মুক্তির একটা পথ যেন খুঁজে পেল সে। যে দেহ মনকে এতক্ষন তার নিঃসাড়-নির্জীব মনে হচ্ছিল তাতে শক্তির প্রবাহ যেন ফিরে এল। নাতালোভার সেই কথা ‘তুই মারিয়া, নাদিয়া নস, তোর মনে আল্লাহ বিশ্বাসের অজেয় শক্তি আছে।‘ আলিয়েভার মনে শক্তি-সাহসের এক দিগন্ত খুলে দিল। আলিয়েভা লজ্জা পেল মনে, আল্লার সাহায্য থেকে মুখ ফিরিয়ে তার এমন ভাবে হতাশ হওয়া ঠিক হয়নি। এমন দেখলে হাসান তারিক নিশ্চয় তাকে তিরস্কার করতো। হাসান তারিকের কথা মনে হতেই বাঁচার আকাঙ্খা তার মধ্যে আরও বাড়ল।
বিছানায় পড়ে থাকা কার্ডটা দেখছিল নাতালোভা। খুশিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল, তুই সত্যিই ভাগ্যবান আলিয়েভা, আল্লাহ তোকে সাহায্য করেছেন। এ সিকুইরিটি কার্ড সবার ভাগ্যে জোটেনা। তুই ওদের কাছ থেকে খসতে পারলে কার্ড তোকে অনেক সাহায্য করবে।
তারপর দু’জনে মিলে অনেক পরামর্শ করল। নাতালোভা জানেনা তার মেয়ে কোথায় থাকে। তবু মেয়ের জন্য একটা চিঠি লিখল এবং তার মেয়েকে সন্ধান করার কয়েকটা ঠিকানা দিল। বন্দীদের যে জীবন বৃত্তান্ত তৈরী হয়েছে, তা কিভাবে মুক্ত বিশ্বে পাঠানো যাবে, তার নির্দেশনাও দান করল নাতালোভা।
বন্দী শিবিরের ঘড়িতে সাড়ে ৮টা বাজার শব্দ অনেকক্ষণ হল হয়েছে। নাতালোভা উঠে দাঁড়াল। আলিয়েভা তাকে জড়িয়ে ধরল। আবার কাঁদার পালা। আলিয়েভা বলল, খালাম্মা আর কোন দিন তোকে দেখতে পাবনা।
আলিয়েভার দুগন্ড বেয়ে নামছে অশ্রুর বাঁধ ভাংগা স্রোত। এবার নাতালোভার চোখও শুকনো থাকলোনা। তারও দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। নাতালোভা বলল, না দেখা হোক, প্রার্থনা করি তুই মুক্ত জীবন ফিরে পা। তোরা যদি এই কম্যুনিষ্ট ব্যবস্থাকে আঘাত দিতে পারিস, এই জুলুমবাজির বাহুটা যদি তোরা ভেংগে দিতে পারিস, রুশ অঞ্চলের অগনিত আদম সন্তানকে যদি তোরা কমুনিজমের অমানুষিক ব্যবস্থার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য কিছুও করতে পারিস, তাহলে যেখানে থাকি, যে অবস্থায় তাকি আমার আত্না শান্তি পাবে।
নাতালোভা আলিয়েভার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বেরিয়ে গেল। নাতালোভার কয়েকফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল আলিয়েভার কপালে।
কপাল থেকে অশ্রু মুছলনা আলিয়েভা। ঘরের চৌকাঠ ধরে আলিয়েভা নাতালোভা যে পথে চলে গেছে সেই অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। অন্ধকারে তাকিয়ে মনে পড়ল রোকাইয়েভার কথা, আলুলিয়েভা, মারিয়া, নাদিয়া, তানিয়া অনেকের কথা। রেকাইয়েভার কথা মনে হতেই মনটা তার মোচড় দিয়ে উঠল। ওর সাথে যদি দেখো হতো।
দরজা বন্ধ করল আলিয়েভা। সেই সাথে ৯টা বাজার ঘন্টা ধ্বনি হলো মস্কোভা বন্ধী শিবিরের ঘড়িতে। সাড়ে ৯টার বেশী দেরী নেই। তৈরী হবার জন্য ফিরো দাঁড়াল আলিয়েভা।
ছয় দরজার একটা বড় কার। সামনে ড্রাইভার এবং তার পাশে একটা সিট। পিছনে ২টা করে ৪টা সিট। নীচের বারান্দায় গাড়ী দাড়িয়েছিল। আলিয়েভা পৌঁছতেই ড্রাইভার ত্রস্ত হাতে মাঝের দরজাটা খুলে ধরল। ড্রাইভার মাঝারি বয়সের। খাস রাশিয়ান। রাজধানীর সরকারী ড্রাইভার রাশিয়ান না হবার প্রশ্নই ওঠেনা।
গাড়ীতে পা দিয়েই বুঝল আলিয়েভা এয়ারকন্ডিশন গাড়ী। দামী ভেলভেট মোড়া আরামদায়ক গদী। গাড়ীতে উঠে বসে দেখল পাশেই আরেকটা মেয়ে। বাইরে আলো থাকলেও গাড়ীর ভেতর অন্ধকার। কালো রঙের শেড়ে ঢাকা কাঁচ। ভাবল, মেয়েটা তার মতই একজন কি?
আলিয়েভা উকি দিয়ে পিছন ফিরে দেখল পিছনের সিটে দু’জন বসে। যতটা বুঝা গেল দুজনই পুরুষ। নিশ্চয় সিকিউরিটির লোক। সামনের দুটি সিটই খালি। ড্রাইভার তখনো সিটে আসেনি। অল্পক্ষণ পরেই ড্রাইভারের দরজা খুলে গেল। সংগে সংগে ভেতরের লাইটটা জ্বলে উঠল। সেই আলোতে পাশের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠল আলিয়েভা। এযে রেকাইয়েভা। রোকাইয়েভাও চমকে উঠল আলিয়েভাকে দেখে। প্রথম চমকটা দূর হযে গেলে খুশী হলো আলিয়েভা। একজন সাথী পাওয়া গেল। আর রোকাইয়েভার চেয়ে যোগ্য সাথী কেউ আর হতে পারতোনা।
আলিয়েভা দু’টি হাত তুলে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ তুমি হাফেজ, ক্বাদের। ইহকাল এবং পরকালের তুমিই একমাত্র অভিভাবক। আমি তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি।
প্রার্থনা শেষ করে আলিয়েভা হাত বাড়িয়ে একটা হাত তুলে নিল রোকাইয়েভার। হাতটা মনে হল নিঃসাড়। আলিয়েভা বুঝতে পারল, বেচার রোকাইয়েভার অবস্থা। সান্ত্বনা দেবার জন্য হাতটা তুলে নিয়ে চুম্বন করল আলিয়েভা।
তারপর একটু এগিয়ে গেল রোকাইয়েভার দিকে। কিছু কথা রোকাইয়েভাকে বলা দরকার মনে করল আলিয়েভা। গাড়ী চলতে শুরু করায় হিস হিস শো শো শব্দ হচ্ছে। কানে কানে কথা বলা যায়, কেউ শুনতে পাবেনা।
আস্তে রোকাইয়েভার মাথা একটু টেনে নিয়ে আলিয়েভা ওর কানে মুখ লাগিয়ে বলল, ভেবনা রোকাইয়েভা, ওরা আমাদের লাশ নিয়ে যেতে পারে, জীবিত নয়। মস্কোতে পৌছার আগেই হয় পালাব, না হয় মরব-হয় শহীদ নয় গাজী। এর বাইরে কিছু নয় রোকাইয়েভা। প্রস্তুত থেকে, আমাকে অনুসরণ করো এবং সাধ্যে যা কুলায় তা করো।
আলিয়েভার কথা শেষ হতেই রোকাইয়েভা আলিয়েভার একটা হাত তুলে নিয়ে জোরে চাপ দিল। এর মধ্যে দিয়ে বোধ হয় রোকাইয়েভাও তার দৃঢ় সংকল্পের কথা জানিয়ে দিল আলিয়েভাকে। খুশী হল আলিয়েভা।
গাড়ী একটু ঝাঁকুনি খেয়ে দুরে উঠল। আলিয়েভা বুঝল দ্বীপ থেকে গাড়ী ফেরি বোটে উঠেছে। বোট থেকে গাড়ী সড়কে নামার পর তিন মাইল পেরুলেই মস্কো। সব মিলিয়ে সময় পনর মিনিটের বেশী লাগবেনা। যা করার এই পনর মিনিটের মধ্যেই তাকে করতে হবে।
আলিয়েভা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল, বড় কোন সিকিউরিটি ব্যবস্থা তাদের জন্য রাখা হয়নি। দু’জন সিকিউরিটির লোক, একজন ড্রাইভার। ড্রাইভারও যে সিকিউরিটির লোক আয়েশা আলিয়েভা তা প্রথমে দেখেই বুঝতে পেরেছে। ড্রাইভারের কোমরে ঝোলানো আছে পিস্তল। আর পিছনের সিটে দু’জন সিকিউরিটির হাতে স্টেনগান।
সিকিউরিটির এই হালকা ব্যবস্থা দেখে আলিয়েভার মনে হল, অসহায় মহিলা বন্দীদের আনা-নেয়ায় তারা কোন দিনই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি, অনেক দেখার পর এ রকমটা যে হতে পারে তারা বোধ হয় এমনটা এখন কল্পনাও করেনা। তাদের যে এই শিথিল চিন্তাকে আলিভেয়া তার পরিকল্পনার জন্য একটা বড় শুভ দিক বলে মনে করল।
আরেকটা স্থির বিশ্বাস আলিয়েভার আছে। সেটা হলো, তারা যেহেতু খোদ পার্টি কর্তাদের শিকার তাই সিকিউরিটির লোকেরা যতটা সম্ভব তাদের গুলি করবেনা, হত্যা করতে সাহস পাবেনা। একটা তাদের জন্য একটা বাড়তি সুযোগ। সে আরেকবার আল্লার কাছে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ! এ সুযোগ সদ্ব্যবহারের তৌফিক দান করুন।
কি করলে কি ঘটতে পারে সবগুলো বিষয় আয়েশা আলিয়েভা এক এক করে বিশ্লেষণ করল। তার আত্নবিশ্বাস দৃঢ় হলো, উপরোক্ত সুযোগ-সুবিধা থাকার কারণে পরিস্থিতি তার অনুকুলেই থাকবে। আজ প্রথম বারে আয়েশা আলিয়েভা তার গোয়েন্দা ট্রেনিংকে মূল্যবান মনে করল। ট্রেনিং গ্রহণকালে ভালো অস্ত্র চালনার জন্য বিশেষ অনার পেয়েছিল সে। আজ একে আল্লার মুর্তিমান রহমত বলেই তার মনে হতে লাগল।
গাড়ী ফেরী বোট থেকে নামল। শক্ত মাটির উপরে মৃদু কাঁপুনি তুলে যাত্রা শুরু করল গাড়ী।
মস্কোভো নদীর তীর ধরে গাড়ি এগিয়ে যাবে মস্কো পর্যন্ত। এখান থেকে মস্কো পর্যন্ত জায়গাটা অপেক্ষাকৃত নীচু একটা বিশাল উপত্যাকা। এখানে কোন সিভিলিয়ান বসতি নেই। বলা হয় এ এলাকায় কয়েকটা আন্ডার গ্রাউন্ড ক্ষেপনাস্ত্র সাইলো রয়েছে।
গাড়ী ফুল স্পীডে চলতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই মাইল খানেক চলে এসেছে গাড়ী। আর দেরী নয়, সিদ্ধান্ত নিল আলিয়েভা। হঠাৎ কয়েকবার ওয়াক ওয়াক করে উঠল। যেন প্রবল বমনের বেগ এসেছে তার।
-বমন করব, গাড়ী থামাও।
তার কথা শুনে মনে হল মুখ ভর্তি তার বমন।
মুখ বন্ধ করে ওয়াক ওয়াক সে করেই চলল। মনে হচ্ছে সে জোর করে বমন চেপে রেখেছে। তার দুই চোখ বিষ্ফোরিত। পাশে কিংকর্তব্যবিমুঢ় রোকাইয়েভা।
ড্রাইভার কেবিন লাইট জ্বেলে দিয়েছে গাড়ির। সে আলিয়েভার অবস্থা দেখে বুঝল, হঠাৎ গাড়ীর গতিতে তার বমনের বেগ হয়েছে। গাড়ী থামাল সে। সে তাড়াতাড়ি গাড়ী থেকে বেরিয়ে আলিয়েভার দরজা খুলে দরজার পাল্লা ধরেই দাড়িয়ে থাকল।
আলিয়েভা বাম হাতে মুখ চেপে গাড়ি থেকে বেরুল। গাড়ীর দরজা ধরে দাড়িয়ে থাকা ড্রাইভারের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলিয়েভা বিদ্যুৎ গতিতে তার কোমরের খাপ থেকে পিস্তল তুলে নিল এবং তুলে নিয়েই গুলি করল তার বুকে। কিছু বোঝার আগেই ড্রাইভার ঢলে পড়ল মাটিতে।
ওদিকে পেছনের দরজা খুলে একজন সিকিউরিটি সবে মাটিতে পা রেখেছে, স্টেনগান তখনও তার কোলে। আলিয়েভার পিস্তল এবার তাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষন করল। লোকটি উঠতে যাচিছল। উঠা আর হলোনা, দরজার উপরেই সে ঢলে পড়ল। মুহূর্তও বিলম্ব না করে আলিয়েভা গাড়ীর পেছনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, ওদিকের দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে ওপাশের সেই সিকিউরিটি। আলিয়েভার উদ্যত পিস্তল আবার গুলি বর্ষণ করল। লোকটির মাথায় গিয়ে আঘাত করল বুলেট। দরজার উপরেই লোকটি ঢলে পড়ল।
রোকাইয়েভা ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। উদ্বেগ-উত্তেজনায় কাঁপছে সে। আলিয়েভা গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছে রোকাইয়েভা। আয় আলস্নাহর শুকরিয়া আদায় করি।
বলে আয়েশা আলিয়েভা ঐখানেই সিজদায় পড়ে গেল। তার সাথে রোকাইয়েভাও।
সিজদা থেকে মাতা তুলেই আলিয়েভা বলল, চল এখানে আর এক মুহূর্ত নয়। সন্ধানী দল কিছুক্ষণের মধ্যেই ছুটে আসবে।
আয়েশা আলিয়েভা ঠিক করল, এই বিরান উপত্যকা ধরেই তাদেরকে পশ্চিমে এগুতে হবে। মানচিত্র তার যতদূর মনে পড়ে এখান থেকে মাইল চারেক পশ্চিমে গেলেই মস্কো লেলিনগ্রাদ রোডে তারা উঠতে পারবে। রাতেই তাদেরকে মস্কো শহরে পৌছতে হবে। আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা দু’জনেই মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। মস্কো শহর তাদের পরিচিত। নাতালোভার দেয়া ঠিকানা তাদের কাছে আছে। কোথাও প্রাথমিক একটা আশ্রয় তাদের মিলবেই।
যাবার আগে আলিয়েভা সিকিউরিটি দু’জনের পিস্তলও নিয়ে নিল। তারপর তাদের পকেট হাতড়িয়ে তিনজনের মানিব্যাগ বের করে তার থেকে টাকাগুলোও নিয়ে নিল। তিনজনের মিলিয়ে প্রায় কয়েক হাজার রুবল হবে। খুশী হলো আলিয়েভা।
তারপর আলিয়েভা রোকাইয়েভার হাত ধরে পশ্চিম দিকে ছুটলো।
৫
মস্কোতে ফিরে আসার পর ফাতেমা ফারহানা লাইব্রেরীতে আগের চেয়ে নিয়মিত। প্রতিদিন উম্মুখ হয়ে লাইব্রেরীতে যায়, তারপর সুযোগ বুঝে সন্ত্মর্পনে গিয়ে ঐ বইটি খোলে। না, সাইক্লোষ্টাইল করা ‘তুর্কিস্তান’ নামের সেই পত্রিকা আগের মত আর পায়না। বইটি খুললেই তার শূন্য বুক ফাতিমা ফারহানার হৃদয়কে নিদারুন ধাক্কা দেয়।
ফাতিমা ফারহানা অস্থির হয়ে পড়ল। কেন এমন হচ্ছে? পত্রিকা কি বন্ধ হয়ে গেছে? কিংবা পত্রিকাটি তারা পৌছাতে পারছে না! না এখানকার নেট ওয়ার্ক তাদের ভেঙে গেছে? তার ছুটিতে থাকাকালে কি কোন অঘটন ঘটে গেছে এখানে?
ইত্যাকার চিন্তা ফাতেমা ফারহানাকে যেন পাগল করে তুলল। যেন সে গোটা জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে সে এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে, আর সবাই তাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। আবেগে ক্ষোভে উপায়হীনতায় টস টস করে তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। তার বড় আশা ছিল, ঐ ‘তুর্কিস্তান’ এর মাধ্যমে সে আহমদ মুসার খবর পাবে, তার নির্দেশও সে পাবে এই পথে। উনি সেদিন বলেছিলেন, যথাসময়ে নির্দেশ তিনি পৌছাবেন। কিন্তু কিভাবে? পথই যে তার সামনে বন্ধ হয়ে গেল।
অনেক সময় সে ভাবে, তার কি দোষ হয়েছে? সেদিনের অন্ধকার রাতের কথা মনে পড়ে ফাতিমা ফারহানার। সেদিন অহেতুক কোন প্রশ্ন করে কি তাকে বিরক্ত করেছে ফারহানা? বিশ্ব বিপ্লবের সিপাহসালার তিনি। তার মত ছোট মানবী তার কাছে কিছুই নয়। তার কোন দুর্বলতায় কি সেদিন তিনি রাগ করেছেন? বিদায়ের সময় নিজের অপ্রতিরোধ্য কান্নার কথা মনে পড়ল ফাতিমা ফারহানার। আমি তো কাঁদতে চাইনি। কান্না এল কেন? আমি তো ওঁকে চিনতাম না, কিন্তু মনে হলো কেন সেদিন ও আমার সব! ও চলে যাবার সময় কেন হৃদয়ের সব গ্রন্থিতে অমন করে টান পড়ল আমার। ছিড়ে গেল কেন সব গ্রন্থি? ওগুলো তো সেদিন কান্না ছিল না, সেই রক্তাক্ত হৃদয়েরই অশ্রু ছিল ওসব।
পড়াশুনায় মন বসে না ফাতিমা ফারহানার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশে যায়, লাইব্রেরীতে যায়, নিজের রুমে টেবিলে পড়তে বসে, কিন্তু পড়ায় মন বসাতে পারেনা।
কত চিন্তা তার মনে? আহমদ মুসা এসেছে, কাজতো এখন বাড়ার কথা, কাজ বন্ধ হলো কেন? কোন বড় অঘটন কিছু ঘটে যায়নি তো? আহমদ মুসা কোথায় কেমন আছে? সেদিন আহত অবস্থায় জ্বর নিয়ে তিনি চলে গেলেন। কিছু হয়নি তো তার? এমনটা ভাবতেই তার মন কেঁপে ওঠে। এখানে নিজের স্বার্থ চিন্তার চেয়ে জাতির স্বার্থ চিন্তাই তার কাছে বড় হয়ে ওঠে। মধ্য এশিয়ার হতভাগ্য মুসলমানদের জন্য আজ তার বড় প্রয়োজন। যুগ যুগান্তের অত্যাচারে সংগ্রামী এই জাতির ঐতিহ্যবাহী প্রতিরোধ কাঠামোর মেরুদন্ড ভেংগে গুঁড়ো হয়ে গেছে। লাখ লাখ সংগ্রামী যুবক কম্যুনিষ্ট বাহিনীর হাতে জীবন দিয়েছে। লাখো মা বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে। তুর্কিস্তান থেকে চালান দেয়া কত লাখ তুর্কি মুসলিম যুবক যে সাইবেরিয়ার সাদা বরফের তলে ঘুমিয়ে আছে, এ হিসাব কোন দিনই মিলবেনা। বিপর্যয়ের এ গোরস্তান থেকে আজ সংগ্রামের নতুন জেনারেশন মাথা তুলেছে। জেঁকে বসা কম্যুনিষ্ট ব্যবস্থা ভাষা পাল্টিয়ে, ইতিহাস পাল্টিয়ে, ধর্মশিক্ষা বন্ধ করে, চাকুরী, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভোগবাদী জীবনের মায়াজালে আটকিয়ে মুসলমানদের হজম করে ফেলেছে ভেবেছিল। কিন্তু তাদের আশা মিথ্যা হয়েছে। গোটা মধ্য এশিয়ার মুসলমানরা মুক্তির আশায়, মুক্ত বাতাসে স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নেবার জন্য আজ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সংগ্রামী কাফেলার যাত্রা শুরু হয়েছে। আজ তার নেতৃত্ব প্রয়োজন। ফিলিস্তিন বিজয়ী, মিন্দানাও বিজয়ী আহমদ মুসাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এদের নেতৃত্বের জন্য পাঠিয়েছেন। তিনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
সেদিন ফাতিমা ফারহানা লাইব্রেরীতে যাবার জন্য হল থেকে বেরিয়েছে। যাচ্ছিল সহপাঠিনী বান্ধবী কিরঘিজিস্তানের মেয়ে সুমাইয়া সুলতানাভার রুমের পাশ দিয়ে।
একটা ঢু মেরে যাবে মনে করে ঢুকে পড়ল তার রুমে। দেখল সেখানে সুমাইয়া ছাড়াও রয়েছে সুফিয়া সভেৎলানা, খোদেজায়েভা, কুলসুম ত্রিফোনভা, রইছা নভোস্কায়া এবং তাহেরভা তাতিয়ানা। এদের মধ্যে খোদেজায়েভা, তাহেরভা তাতিয়ানা উপরের ক্লাসে পড়ে। সুফিয়া সভেৎলানা নীচের ক্লাসে, আর কুলসুম ও রইছা তার সাথে পড়ে। কুলসুম তাতার মেয়ে। তাজিক মেয়ে সুফিয়া। তাহেরভার বাড়ী হলো কাজাকিস্তানে। আর বাকি খোদেজায়েভা এবং রইছা উজবেক। এরা সবাই আঞ্চলিক পার্টির বড় বড় কর্মকর্তার মেয়ে। বিলাসী জীবন এদের। সবার সাথেই ফারহানা পরিচিত।
সবাইকে এখানে একসাথে দেখে ফাতিমা ফারহানা বিস্মিত হলো, কিন্তু তার চেয়ে বেশী হলো অপ্রস্তুত। ওরা আলাপ করছিল। ফারহানার আগমনে ওদের আলাপটা হঠাৎ থেমে গেল। ওদের মুখ চোখ দেখে নিজেকে বড় অনাহূত মনে হলো তার।
তবু মুখে হাসি টেনে ফারহানা বলল, এদিক দিয়ে লাইব্রেরীতে যাচ্ছিলাম তাই একবার এলাম। চলি, তোদের ডিসটার্ব করবোনা। বলে রুম থেকে বেরুবার জন্য উদ্যত হলো ফারহানা। সুমাইয়া হেসে হাত তুলে বলল, দাঁড়া, দাঁড়া, আমরা কম পড়ি বলে কি আমাদের সাথে বসতে তোর আপত্তি?
-কোন আপত্তি নেই। কম পড়ার কথা বলছিস কেন? কম পড়েই বুঝি তোরা তোদের ডিষ্টিংশন গুলো পেয়েছিস? কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে বলল ফারহানা।
-তর্ক রেখে বস না। বলল সুমাইয়া।
-না, বসবনা এখন। সবাইকে এক সংগে পেয়ে কথা বলতে লোভ হচ্ছে, কিন্তু লাইব্রেরীতে যাওয়া দরকার।
বলে সবার কাছে বিদায় নিয়ে ফারহানা বেরিয়ে এল রুম থেকে। চলল লাইব্রেরীর দিকে। কিন্তু রুমে ঢোকার সময় যে বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা তাকে পেয়েছিল তা দূর করতে পারলোনা। সে যখন ঘরে ঢুকছিল, ‘আহমদ মুসা’ শব্দটা তখন তার কানে আসে। এ নাম এখানে কেন? ওরা কি আলোচনা করছিল? অমনভাবে ওরা থেমে গেল কেন? ওরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্র’ এর এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে? এটা হওয়া স্বাভাবিক। ওরা সকলেই সরকারী সুবিধাভোগীদের সন্তান। ফারহার দুঃখ হলো মুসলিম নামের এ মেয়েদের জন্য। আবার ভেবে খুশী হলো, এদের থেকে সাবধান থাকা যাবে।
লাইব্রেরীতে এসে বসল ফারহানা। বই এবং নোটখাতা নিয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। না, মন বসছেনা। কিছুক্ষণ বসে এদিক-ওদিক চেয়ে শেষ পর্যন্ত সে উঠে গেল এ বইটির কাছে। ভিতরের একটি সেলফে বিশ্ব-ভূগোলের উপর একটা পুরোনো বই। এর বহু নতুন এডিশন হয়েছে, এ পুরোনো এডিশন আর পড়েনা কেউ।
অনেকটা হতাশ ভাবেই বইটা সেলফ থেকে নামাল। বইটা খুলল সে। খুলেই চোখ দু’টি তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘তুর্কিস্তান’ নেই বটে কিন্তু একটা চিরকুট। তাতে লেখা, ‘তুর্কিস্তানের বার্ষিক চাঁদা একহাজার রুবল।’
লেখাটা কয়েকবার পড়ল ফারহানা। হারিয়ে যাওয়া কিছু পাওয়ার মত আনন্দে মুখটা তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কোটের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখল। হ্যাঁ টাকা আছে। সে এক হাজার রুবলের একটা নোট বইয়ের ঐ পাতাতেই রেখে দিল। বইটা যথাস্থানে রেখে চলে এল ফারহানা। খুশিমনে অনেকক্ষণ ধরে পড়ল, নোট করল ফারহানা। ফারহানা উঠতে যাবে এমন সময় তার সহপাঠি ইউরি অরলভ ধীরে ধীরে এল। বলল, তোমার পাশে কি বসতে পারি?
-হাঁ। সম্মতি দিল ফারহানা। যদিও মনে মনে বিরক্ত হল ভীষণ। ওর শরীর থেকে মদের গন্ধ আসছিল। অরলভ বসল। বসে চেয়ারটায় একটু হেলান দিয়ে বলল, আচ্ছা কম্যুনিটি হলে তোমাকে আজ-কাল দেখছিনা কেন?
-আমি কোন সময়ই তো নাচের আসরে যাইনি অরলভ।
-ঠিক, কিন্তু যাওনা কেন?
-এটা পড়াশুনার সময়, পড়াশুনা করে আমি সময় পাইনা। হো হো করে হাসল অরলভ। বলল, হাসালে খুব। বিনোদনের একটা সময় আছে না! তখন বুঝি কেউ পড়ে?
-বিনোদনের সংজ্ঞা বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম।
-যেমন?
-যেমন আমি পড়ায় আনন্দ পাই, কেউ নাচে আনন্দ পায়।
-বিনোদনের একটা কম্যুনিষ্ট সংজ্ঞা আছে, জানত?
-জানি।
-মানোনা?
-সংজ্ঞাকে তো আইনে পরিণত করা হয়নি।
আবার হাসল ইউরি অরলভ। বলল, হাঁ ফাঁক একটা আছে। একটু থামল অরলভ। তারপর বলল, তোমাদের কি একটা ইথিকস ছিল, এমন নাচ-গান নাকি সেখানে অবৈধ। এ সন্মন্ন্ধে তোমার মত কি?
ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠেছিল ফাতিমা ফারহানা। কম্যুনিষ্ট যুব সংগঠন ‘কমসমল’ এর সদস্য এই ইউরি অরলভ সে জানে। এরা বিশ্ব কম্যুনিষ্ট সংস্থা ‘ফ্র’ -এর এজেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পাহারা দেয়া এবং রিপোর্ট করাই এদের কাজ। বন্ধু সেজে গল্প-গুজবের মাধ্যমে এরা কথা জেনে নেয়, তারপর রিপোর্ট করে। ছাত্ররা এদেরকে পুলিশের চেয়েও বেশী ভয় করে। কারণ, পুলিশকে চেনা যায়, এদের চেনা যায় না।
-ওটাও একটা মূল্যবোধ।
-আমি জানতে চাচ্ছি তোমার মত।
-যা চালু নেই, যাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনায় সময় নষ্ট না করে জীবিত বিষয় নিয়েই আমাদের আলোচনা করা উচিত।
-ঠিক আছে। বলল অরলভ।
তারপর একটু থেমে আবার বলল, আচ্ছা বলত ফারহানা, তোমাদের দক্ষিণাঞ্চলে নাকি বাতাস গরম?
-বুঝলাম না।
-বলছি, সে অঞ্চলে অসন্তোষ, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ নাকি দ্রুত ছড়াচ্ছে?
মনে মনে ভীষণ চমকে উঠল ফারহানা। এসব প্রশ্ন কেন করা হচ্ছে তাকে, সে জানে। সে উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, এসব খবর কি ঠিক? তুমি পেলে কোথায় এমন সব উদ্বেগজনক কথা?
অরলভ কোন উত্তর দিলনা। প্রসংগ পাল্টিয়ে বলল, সেখানে অসন্তোষের কি কোন কারণ আছে ফারহানা?
ফারহানার জন্য এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। মিথ্যা না বলে কেমন করে এর উত্তর দেয়া যায়? কিন্তু কেমন করে মিথ্যা বলবে সে? দিনের আলোর মত যা সত্য তাকে মিথ্যার আবরণে সে চাপা দেবে কেমন করে? আহমদ মুসার মত জাতিগতপ্রাণ নেতারা হলে এখানে কি করতেন? ওরা তো মিথ্যা বলে নিজেদের রক্ষা করেন না। সে এ পরীক্ষায় কি করবে? মন বলছে, এসময় নিজেকে প্রকাশ করাও তার ঠিক হবে না।
ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করার ভান করছিল ফারহানা। তারপর চেয়ারে একটু গা এলিয়ে বলল, এ ব্যাপারে তোমার চেয়ে বেশী কিছু আমি জানিনা।
এমন উত্তর দিতে পেরে খুশী হলো ফারহানা। মিথ্যা বলতে হয়নি।
-জানা দরকার ফারহানা। নিজেদের অঞ্চল সম্পর্কে জানবেনা?
-আমার পনর আনা সময় আমি লেখাপড়া নিয়ে মস্কোতেই থাকি।
আর কোন কথা বলল না অরলভ। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দুঃখিত, তোমার পড়ার অনেক ক্ষতি করলাম।
অরলভ চলে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ফারহানা। একটু নড়েচড়ে বসল সে। তারপর হিসেব কষে দেখল ঠিকঠিক রিপোর্ট করার মত কিছু নিয়ে যেতে পেরেছে কি না। হিসেব কষে সে খুশীই হল,কিন্তু উদ্বিগ্ন হল এই ভেবে যে, এমন প্রশ্ন আর কোন সময় এদের তরফ থেকে আসেনি। ওরা কি তাহলে সব মুসলিম ছাত্রকেই আজ সন্দেহ করছে? তাই কি এমন ভাবে বাজিয়ে দেখছে তাদের? হাসিও পেল ফারহানার। এসব প্রশ্ন করে ওরা তাদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে। মুসলিম ছাত্ররা এতে উৎসাহিত হবে বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে ফারহানা একটু মার্কেটিংয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফিরল রুমে। কাপড়-চোপড় ছাড়ার পর অভ্যাস অনুযায়ী দরজার ভেতরের অংশে লেটার বক্স পরীক্ষা করল ফারহানা। ভাঁজ করা বড় একটা কাগজ পেয়ে তাড়াতাড়ি মেলে ধরল। বিস্ময় ভরা চোখে দেখল তার ‘তুর্কিস্তান’। ফুল স্কেপ সাইজের চার পৃষ্ঠার কাগজ।
ভেবে পেল না সে, পত্রিকাটি এখানে এত তাড়াতাড়ি এল কি করে? চাঁদা পরিশোধের পর তিন ঘন্টাও যায়নি। এর মধ্যে চাঁদা পরিশোধের কথা জানল কি করে? তার হলের রুম নাম্বারই বা তাদের দিল কে? সে ভাবল, অত্যন্ত শক্তিশালী নেট ওয়ার্কেই মাধ্যমেই শুধু এটা সম্ভব।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল ফারহানা। তারপর দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে সে পত্রিকা নিয়ে বসল টেবিলে।
কয়েক দিন পর-
ক্লাসের অবসরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে এক কোণায় বসেছিল ফারহানা। একাই এক বেঞ্চে বসে ছিল। সামনে আরও একটা বেঞ্চ। প্রায়ই সে এখানে বসে। অনেকেই থাকে। কিন্তু আজ কেউ গেছে টিভির নতুন সিনেমা দেখতে, কেউ গেছে স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ব্যালে প্রতিযোগিতা দেখতে। পিছন থেকে সুমাইয়া, খাদিজায়েভা, তাতিয়ানা এবং রইছা চুপি চুপি ফারহানার দিকে আসছিল।
ফারহানা আসলেই চোখ বুজে বিশ্রাম নিচ্ছিল। একেবারে পিছনে এসে ঘাড়ে একটা চিমটি কেটে রইছা বলল, লক্ষণ তো ভাল নয় ফারহানা?
ফারহানা চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে ওদের দেখতে পেল। ওদের সাথে সাথে হেসে উঠল ফারহানাও। সে সংগে ওদেরকে একসাথে দেখে ফারহানার সেদিনকার কথা মনে পড়ল। অস্বস্তির একটা কাল মেঘও তার মনে ঘনীভূত হল। সামনে ফারহানার এক পাশে রইছা ও অন্য পাশে সুমাইয়া বসল। সামনের বেঞ্চিতে বসল খাদিজায়েভা এবং তাহেরভা তাতিয়ানা।
প্রথম কথা বলল রইছা। বলল, কখন মানুষ একা থাকতে ভালোবাসে ফারহানা।
-জানি না। বলল, ফারহানা।
-আমি জানি। বলল রইছা।
-কখন?
-যখন মানুষ প্রেমে পড়ে।
ফারহানার মুখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। খাদিজায়েভা রইছাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, সময় নষ্ট করোনা রইছা। অনেক কথা আছে। তারপর গম্ভীর ভাবে বলল, তুমি কেমন আছ।
-ভাল।
-‘তুর্কিস্তান’ তুমি পাচ্ছ।
চমকে উঠল ফারহানা। চমকে উঠে তাকাল খাদিজায়েভার দিকে। ভয়মিশ্রিত বিমূঢ়তা এসেছে ফারহানার মধ্যে। সেদিনের সে আশংকার কথা তার মনে হল। সরকারের লোক সে মনে করেছিল এদেরকে। তার উপর সেদিন অরলভের জিজ্ঞাসাবাদ। সব মিলিয়ে নিদারুণ একটা উদ্বেগের ভাব ফুটে উঠল ফারহানা চোখে মুখে।
খাদিজায়েভা সেটা বুঝতে পারল। সে হেসে বলল, ‘তুর্কিস্তান’ আমরাও পাই। ভয় করোনা। আমরা সবাই একদল।
এতক্ষণে খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ফারহানার মুখ। সে খুশীতে উঠে দাঁড়িয়ে কোলাকুলি করল সবার সাথে। তারপর সে প্রশ্ন করল, সুফিয়া, সভেৎলানা এবং কুলসুম ত্রিফোনোভাও?
-তারাও আমাদের সাথে। শুধু তারা নয়, এখানকার মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের আঙ্গুলে গোনা কিছু ছাড়া সবাই আমরা এক সাথে। বলল খাদিজায়েভা।
ফারহানা হেসে বলল, সেদিন সুমাইয়ার রুমে তোমাদের দেখে আমি তোমাদেরকে কম্যুনিষ্টদের চর মনে করেছিলাম।
-কেন?
-আমার মনে হয়েছিল তোমরা কোন গোপন শলা-পরামর্শ করছিলে, তাছাড়া তোমাদের মুখে একটা নাম শুনেছিলাম আমি। আরেকটা কারণ ছিল, সবাই তোমরা বড় বড় পার্টি ও সরকারী কর্মকর্তার সন্তান।
খাদিজায়েভা প্রশ্ন করল, কোন নাম শুনেছিলে আমাদের মুখে?
-আহমদ মুসা।
সুমাইয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাহেরভা তাতিয়ানা তাকে বাধা দিয়ে ফারহানাকে জিজ্ঞাসা করল, বড় বড় পার্টি ও সরকারী কর্মকর্তাদের সন্তান হওয়ায় আমাদের উপর তোমার সন্দেহ হলো কেন?
-তোমরা সুবিধাভোগীর দল। তোমরা সরকারকে সহযোগিতা করবে এটাই স্বাভাবিক।
তাহলে তুমি আসল অবস্থা জান না ফারহানা, বলল তাহেরভা তাতিয়ানা, তুমি যে সুবিধাভোগীদের কথা বলছ তাদের ছেলেমেয়েরাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসছে এ আন্দোলনে। কারণ, কম্যুনিস্ট সরকারের পলিসি প্রোগ্রাম এবং তাদের সব কীর্তিকথা তাদের কাছে পরিষ্কার থাকায় তাদেরকে বোঝানো সহজ হচ্ছে। অবশ্য জীবন দেয়ার মত ঝুকিপুর্ণ কাজে শ্রমিক কৃষক এবং গ্রামাঞ্চলের কর্মীরাই এগিয়ে আসছে বেশী। থামল তাহেরভা তাতিয়ানা।
এবার কথা বলল সুমাইয়া। বলল, তুই আহমদ মুসাকে জানিস ফারহানা?
-জানি! মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল ফারহানার।
প্রায় সমস্বরেই সকলে বলে উঠল, কি জান? কেমন করে জান?
-সে এক কাহিনী।
-কি সে কাহিনী? বলল রাইছা।
সকলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ঘিরে ধরল ফারহানাকে। ফারহানা ধীরে ধীরে গোটা কাহিনীটা বলল। শুধু বিদায় দেয়ার মুহুর্তের কথা ছাড়া। কাহিনী শেষ হলো, কিন্তু কেউ সহসা কথা বলতে পারলো না। কথা বলল প্রথমে খাদিজায়েভা। বলল, আল্লাহ্ চাইলে এইভাবেই মানুষকে বাঁচান। আমার মনে হচ্ছে ফারহানা, আল্লাহ্ তাকে হাত ধরে এনেছেন এদেশে আমাদের মধ্যে। আল্লাহ্ আমাদের আন্দোলনকে কবুল করেছেন। তা না হলে তাকে এমন এক অকল্পনীয় পথে আমাদের মধ্যে এনে দেবেন কেন?
-অন্য কোথাও, অন্য কোন মানুষের ব্যাপারে হলে এ গল্প আমি বিশ্বাসই করতাম না। সত্য ঘটনার এ এক অপরূপ রূপকথা। বলল সুমাইয়া।
-কিন্তু এ রূপকথার শুধু নায়ক আছে, নায়িকা নেই। বলল রইছা। তার চোখে একটা দুষ্টুমী।
-নায়িকা আছে। সুমাইয়া জবাব দিল।
তারপর একটু মুখ টিপে হেসে ফারহানার হাত দুটি ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলল, নেই ফারহানা?
রইছা কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিল। তাকে বাধা দিয়ে খাদিজায়েভা বলল, এ সব কথা তোমরা থামাও।
বিব্রত ফারহানা রক্ষা পেল। কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাল সে খাদিজায়েভার দিকে। আহমদ মুসাকে সে এসব আলোচনার অনেক উর্ধে মনে করে। তার মর্যাদা সম্পর্কে সে সচেতন। আর আশা নিরাশায় ক্ষত বিক্ষত ফারহানা তার হৃদয়ের এই স্পর্শকাতর এলাকায় একাই থাকতে চায়, কাউকে নাক গলাতে দিতে চায় না।
খাদিজায়েভা আবার মুখ খুলল। বলল, আসল কথায় আসি ফারহানা। আহমদ মুসা মধ্য এশিয়ার মুসলিম মুক্তি আন্দোলন সাইমুমের নেতৃত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম সার্কুলার আমরা পেয়েছি। তাতে তিনি তোমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তুমি কেমন আছ, কোথায় আছ। আর মস্কোর সাইমুম ইউনিটের ছাত্রী শাখায় তোমাকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
-তিনি জানতে চেয়েছেন আমার কথা? কথাগুলোর সাথে বন্ধ একটা আবেগ যেন বুক ফেড়ে বেরিয়ে এলো ফারহানার। বলেই কিন্তু লজ্জায় লাল হয়ে গেল সে।
রইছা কথাটা লুফে নিয়ে মুখ টিপে হেসে বলল, খুশি হয়েছিস ফারহানা?
ফারহানা নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর হলো। বলল, তার মত বিশ্ব বিপ্লবের একজন সিপাহসালারের কথায় তুই খুশী হতিস কিনা?
-অবশ্যই খুশী হতাম। তুই খুশী কিনা?
বিব্রত ফারহানাকে বাঁচিয়ে খাদিজায়েভাই আবার কথা বলে উঠল। বলল, আমাদের সংগঠনের নিয়ম অনুসারে আমরা পরোক্ষ কোন পথে একজনের কাছে ‘তুর্কিস্তান’ পৌছাই। তারপর দেখি সে নিয়মিত তা পড়ছে কিনা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করছে কিনা। অতঃপর তুর্কিস্তান বন্ধ করে দিয়ে আমরা তার আবেগ, আন্তরিকতা, স্বভাব-চরিত্র, ইসলামী অনুশাসনের প্রতি আনুগত্য, ইত্যাদি পরীক্ষা করি। এরপর তার সাধ্য বিচার করে তার কাছ থেকে তুর্কিস্তানের জন্য টাকা চাওয়া হয়। সে যদি এ কোরবানী স্বীকার করে, তাহলে আমরা বুঝতে পারি সে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের পর্যায়ে এসেছে। তুমি এ পর্যায়গুলো পার হয়েছ ফারহানা। তার উপর নেতার তরফ থেকে এই সার্কুলার। আমরা তোমাকে সংগঠনের সদস্য করে নিয়েছি।
ফারহানা ঝুঁকে পড়ে খাদিজায়েভার হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে নিরব আনুগত্য জ্ঞাপন করল। খাদিজায়েভা সহ সবাই চুমু খেল ফারহানাকে।
রইছা বলল, আমার খুব ভাল লাগছে ফারহানা। তুই আমাদের নেতাকে দেখেছিস, তার সাথে কথা বলেছিস। ইয়ার্কি নয়, তোর মধ্য দিয়ে তাকে আমাদের খুব নিকটে মনে হচ্ছে। রইছার চোখ দু’টি বোজা, একটা আবেগ তার কথায়।
ফারহানার মুখ নিচু। তাহেরভা তাতিয়ানা বলল, ঠিক বলেছ রইছা। এটা আমাদেরকে কাজে উৎসাহ দেবে। খাদিজায়েভা আবার শুরু করল, সময় হাতে বেশী নেই, সার্কুলারে আরেকটা জরুরী বিষয় আছে। মস্কোভা বন্দী শিবিরে, সরকারীভাবে যার নাম মস্কোভা স্কুল অব রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম, আমাদের দু’জন বোন বন্দী হয়ে এসেছে। তারাও এ মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ছিল। নাম আয়েশা আলিয়েভা এবং রোকাইয়েভা। দু’জনের বায়োডাটাও সার্কুলারে আছে। এদের কাছে সাধ্যমত সাহায্য পৌছানো এবং মুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা করার জন্য এখানকার সাইমুমের সব ইউনিটকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তাহেরভা তাতিয়ানা বলল, মস্কোভা বন্দী শিবির সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করা দরকার এবং এ অঞ্চলটায় একবার আমাদের যাওয়া প্রয়োজন। তারপর আমরা কর্মপন্থা নিয়ে যদি চিন্তা করি তাহলে ভাল হয়।
খাদিজায়েভা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, এস সবাই মিলে আমরা চেষ্টা করি তথ্য যোগাড়ের, আর খুব সত্ত্বর ওদিকে বেড়াবার একটা প্রোগ্রামও আমাদের করতে হয়।
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। খাদিজায়েভা বলল, ক্লাশের সময় হয়ে গেছে। চল এখনকার মত ওঠা যাক।
সবাই উঠে দাড়াল।
