তাসখন্দে ‘ফ্র’-এর সিকিউরিটি প্রিজন। রাজনৈতিক বিভাগের একটি সেল। তখন সকাল আটটা। ব্যয়াম সেরে শুয়ে পড়েছিল হাসান তারিক। ভোরে ফজরের পর সে মিনিট তিরিশ কুরআন তিলাওয়াত করে। কুরআন শরীফ পাওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। সে মুখস্থই তিলাওয়াত করে। তারপর ঘন্টা দেড়েক ব্যায়াম করে। ব্যায়ামের পরে পাওয়া যায় নাস্তা। নাস্তা সেরে হাসান তারিক চলে যায় প্রিজন লাইব্রেরীতে। ‘ফ্র’ তাকে লাইব্রেরীতে সময় কাটাবার সুযোগ দেয়ায় সে কৃতজ্ঞ। অবশ্য এ সুযোগ তাকে কেন দেয়া হয়েছে সে জানে। লাইব্রেরীর যে বিশেষ বিভাগে সে যেতে পারে, সে বিভাগ পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। মার্কস, এ্যাংগেলস, লেনিন এবং সমসাময়িক কম্যুনিস্ট সাহিত্যের সব বই সেখানে পাওয়া যায়। ইতিহাসের ওপর রয়েছে বিপুল বই। মানুষের ইতিহাস, দেশ ও জাতি সমূহের ওপর গ্রন্থ রয়েছে সেখানে প্রচুর। আর রয়েছে পর্ণ ম্যাগাজিনের স্ত্তপ। সব কিছুই কম্যুনিস্ট নিয়মে লেখা। মানুষের মগজ ও চরিত্র ধোলাইয়ের লক্ষ্য নিয়েই লাইব্রেরী সাজানো। লাইব্রেরীর পরিবেশ একেবারেই নিরিবিলি। এক পাঠকের সাথে অন্য পাঠকের দেখা না হয়, এই পাকা ব্যবস্থা সেখানে রয়েছে। এ পর্যন্ত লাইব্রেরীতে কারো দেখা পায়নি হাসান তারিক। শুরু থেকে লাইব্রেরীতে একজনেরই দেখা সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য পেয়েছে। সে হলো মিস আয়িশা আলিয়েভা। বয়স বাইশ-তেইশ। সুন্দরী ও অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। মস্কো ইউনিভার্সিটির একজন সেরা ছাত্রী, গোল্ড মেডেলিস্ট। মার্কসীয় তত্ব নিয়ে, পৃথিবী ও মানুষের ইতিহাস নিয়ে তার সাথে দিনের পর দিন আলোচনা হয়েছে। কোন জটিল জিনিসও অদ্ভুত দ্রুত সে হৃদয়ংগম করতে পারে, আর তা প্রকাশ করার মধ্যেও তার এক শৈল্পিক নৈপুণ্য রয়েছে। প্রথমদিকে তাকে লাইব্রেরী পরিচালনার একজন দায়িত্বশীল মনে করেছিল হাসান তারিক, কিন্তু পরে তার কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, সে গোয়েন্দা বিভাগের লোক।
একটু ঝিমুনি এসেছিল হাসান তারিকের। দরজানয় কড়া নাড়ার শব্দে উঠে বসল। দরজা খুলে দেখল ভীমকায় ভিকটর দরজায় দাড়িয়ে নাস্তা নিয়ে। সাত ফিট দৈর্ঘ্যের বিশাল বপু ভিকটরকে দেখলে প্রথম দিকে তার কৌতুক বোধ হতো। কিন্তু তার ঐ ভীম দেহের মধ্যে যে একটা নরম দিল আছে তার পরিচয় পেয়ে সে অবাক হয়ে গেছে। এ পরিচয়টা একদিন এভাবে মেলে।
হাসান তারিক সকালের নাস্তা হিসাবে পায় বেশ কয়েকটা রুটি, মাখন ও ফল-মূল যার অর্ধেকটাই সে খেত না। ক’দিন এটা দেখে একদিন সে ফিসিফিস করে হাসান তারিককে বলল, স্যার, আপনি তো অর্ধেকটাও খান না। একটা অংশ কি আমি আপনার পাশের কয়েদীকে দিতে পারি? বেচারা একটা রুটি ছাড়া আর কিছু পায় না।
কিন্তু, এটা বেআইনী হবে না? প্রশ্ন করল হাসান তারিক।
হবে, কিন্তু আপনি রাজি থাকলে কেউ টের পাবে না। চারিদিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে কথা ক’টি বলল ভিকটর।
অপরাধী আসামির প্রতি তোমার এ দরদ কেন ভিকটর? আরেকটা খোঁচা দিল সে ভিকটরকে।
সে কাঁচু মাচু হয়ে নরম কন্ঠে বলল, ও চোর, ডাকাত নয় স্যার।
তাহলে কি?
দাগি বিদ্রোহী?
কিসের বিদ্রোহী?
‘ফ্র’-এর রেড সরকারের বিপক্ষে, তুর্কি জাতির পক্ষে।
ভিকটরের কথা শোনার সাথে সাথে হাসান তারিকের শরীরে একটি উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। বলল, ওর নাম কি?
আজিমভ।
হাসান তারিক কিছুক্ষণ অপলকভাবে ভিকটরের দিকে চেয়ে রইল। কে এই ভিকটর? সে জিজ্ঞেস করল, তুমিও কি মুসলমান?
না, ল্যাটিভিয়ান। আমার জাতিও এখানকার তুর্কিদের মতই দুঃখী।
হাসান তারিক আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি ভিকটরকে। আর জিজ্ঞেস করারও কিছু ছিল না। শেষের একটা কথায় সে সব বলে দিয়েছে। সেদিন থেকে ভিকটর তারিকের কাছে অন্য মানুষ- একটি বন্দী মানবাত্মা রক্তের অশ্রু ঝরছে যার অন্তর থেকে অবিরাম। আর সেদিন থেকে তারিকের নাস্তা আর খানার অর্ধেক যেত আজিমভের কাছে।
লোহার পাতের দরজার পর মোটা লোহার শিকের তৈরী দ্বিতীয় আরেকটা দরজা। এ দরজার ছোট্ট জানালা দিয়ে খাবার নিতে হয়। প্রতি দিনের মত সেদিন সে জানালা দিয়ে নাস্তা নিল। হাসান তারিক দেখল আগের মতই সেই পুরো নাস্তা। ভিকটরকে জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার আজিমভকে দাওনি?
না স্যার, আজিমভ নেই। মুখটি ভারী ভিকটরের।
কোথায়?
ফায়ারিং স্কোয়াডে। গত রাত চারটায়। শুনলাম সব দোষ নাকি সে স্বীকার করেছে।
কথা শেষ করে একটা কাষ্ঠ হসি হাসল ভিকটর। বড় একটা খোঁচা লাগল হাসান তারিকের মনে। নাস্তা ধরা হাতটা কেঁপে উঠল। বুক থেকে উঠে আসা একটা ঢেউ যেন গলায় এসে ভেঙে পড়তে চাইল।
হাসান তারিক জিজ্ঞেস করল, চিন তুমি আজিমভকে ভিকটর?
না। এটুকু জানি, ‘ফ্র’-এর রেড আর্মির একজন রিটায়ার্ড মেজর সে। আফগান যুদ্ধ থেকে আসার পর সে বিদ্রোহী দলে যোগ দিয়েছে।
অর্ধেকটা নাস্তা ভিকটরকে ফেরত দেবার জন্য হাত বাড়িয়ে হাসান তারিক বলল, এগুলো খাব না, তুমি নিয়ে যাও।
না খেলে থাকবে স্যার, পরে নিয়ে যাব। আগাম ফেরত নেবার আইন নেই।
কাউকে দাও।
মাথা নিচু করে মুহুর্ত চিন্তা করে বলল, কাল থেকে দেখব স্যার। আজ থাক। তারপর একটু থেমে বলল, দেখে দেখে বুকটা পাথর হয়ে গেছে স্যার। প্রতি মাসে দশ বারটা ফায়ারিং স্কোয়াডে যায়।
ওরা কারা? জিজ্ঞেস করল হাসান তারিক।
চোর ডাকাতের কারাগার এটা নয়। সবাই ওরা বিদ্রোহী।
কি ধরনের লোক ওরা, ভিকটর?
সবাই নামী-দামী। হয় আমলা না হয় পার্টির, অথবা সেনা বা পুলিশের হোমরা-চোমরা ধরনের কেউ। কৃষক ও মোল্লা বিদ্রোহীদের কোন বিচারের প্রয়োজন হয় না। ওরা আকস্মাৎ একদিন হারিয়ে যায়।
একটা হুইসেলের শব্দ পাওয়া গেল। ভিকটর বলল, সুপার ভিজিটে বেরিয়েছে, যাই স্যার। বলে নাস্তার ট্রলি ঠেলে নিয়ে চলে গেল ভিকটর।
নাস্তা সেরে আজ তাড়াতাড়িই লাইব্রেরীতে চলে এল হাসান তারিক। মনটা তার ভাল নেই। আজিমভের কথা ভুলতে পারছে না সে। লোকটিকে সে দেখেনি কিন্তু না দেখলে কি হবে, ভাইকে তো দেখার প্রয়োজন হয় না।
লাইব্রেরীর গেটে পৌঁছতে গেট সিকিউরিটি রুটিন মাফিক লাইব্রেরী কার্ড চেক করে হাসান তারিককে তার নির্দিষ্ট কক্ষে পৌঁছে দিল। একমাত্র আলিয়েভার কক্ষ ছাড়া অন্য কোন কক্ষে যাবার অনুমিত তার নেই। নিয়ম হলো, বইয়ের ক্যাটালগ দেখে যে বই সে চাইবে সে বই তাকে এনে দেয়া হবে। আলিয়েভার কক্ষ পাশেই। কোন বইয়ের প্রয়োজন হলে তবেই সে আলিয়েভার কক্ষে যায়, তাছাড়া আলিয়েভাই তার কক্ষে আসে। খোঁজ খবর নেয়, কথাবার্তা বলে। প্রথম দিকে বাইরের কোন খবরই তার কাছ থেকে পাওয়া যেত না। কিন্তু পরে সে কিছু কিছু করে বলত-মিন্দানাওয়ে ইসলামের অভ্যূন্থানের খবর সে তার কাছ থেকেই পায়। মনে হয়েছিল খবরটায় যেন আয়িশা অলিয়েভাও খুশী হয়েছে। হাসান তারিক চট করে জিজ্ঞেস করেছিল আপনাকে তো খুশী মনে হচ্ছে।
