গভীর রাত। শয্যা থেকে উঠে বসল স্মার্থা। চোখ মুখ হাত দিয়ে একটু রগড়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাতের পোশাক বদলে ফেলল সে। এ বন্দীশালায় তার নিজস্ব বলতে ছিল একটি মাত্র ব্যাগ, কিন্তু তার স্পাই ব্যাগটি আজ শূণ্য। কয়েকটি কাপড়-চোপড় রয়েছে মাত্র। তবু আপাতঃ শূন্য ব্যাগটিতেই রয়েছে তার শেষ সম্বলটুকু। স্মার্থা ব্যাগটি হাতে তুলে নিয়ে ওর তলাটা ফেড়ে ফেলল। তলার চারপ্রান্ত ঘিরে রয়েছে লোহার ফাপা নল। ব্যাগের তলাকে শক্ত ও এর আকার ঠিক রাখার জন্যই এটা ব্যবহৃত হয়েছে বলে আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয়। স্মার্থা নলগুলো খুলে নিয়ে ছোট ধরণের দু’টি পকেটে পুরল এবং অন্য দু’টি থেকে বেরুল কয়েকটি দামী ফিল্টার টিপ্ড সিগারেট। সিগারেটগুলো পকেটে পুরে ব্যাগটি ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর টেবিলে বসে একখন্ড কাগজে লিখলঃ
আলী কাওছারের হত্যার প্রতিশোধ পরে নেয়া যাবে। এখন হাঙ্গামা করতে গেলে আমরা আপো পর্বত থেকে বেরুতে পারবো না।
কাগজটি ভাঁজ করে পকেটে পুরে উঠে দাড়াল স্মার্থা। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগুলো। দ্বিধাহীন চিত্তে সে দরজায় করাঘাত করলো। একবার, দুইবার-কয়েকবার। দরজার চাবি খোলার শব্দ পাওয়ার পরই শুধু সে থামল।
দরজা খুলে গেল। দু’জন প্রহরী। দু’জনের একজনের হাতে উদ্যত স্টেনগান, অন্যজনের হাতে রিভলভার। তারা কোন কথা বলার আগেই স্মার্থা বলল, ক্যাপ্টেন জুমলাককে এক্ষুনি ডাকুন। খুব জরুরী।
স্মার্থার কন্ঠে উদ্বেগ। চোখে-মুখে কেমন বিভ্রান্ত ভাব। সেদিকে মুহূর্তকাল চেয়ে একজন প্রহরী অপর জনকে বলল, তুমি একে দেখো, আমি তাঁকে ডেকে আনি।
মিনিট চারেকের মধ্যেই প্রহরীটি ক্যাপ্টেন জুমলাককে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো।
জুমলাককে দেখেই স্মার্থা প্রায় আর্ত কন্ঠে বলে উঠল, সর্বনাশ হয়ে গেছে মিঃ জুমলাক, শিরীকে ঔষধ দিতে ওল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে। ঔষধটি খেলে তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এক্ষনি আমার যাওয়া দরকার। আপনি দু’জন প্রহরী দিন আমার সাথে।
বলতে বলতে স্মার্থা প্রায় কেঁদে ফেলল। তার চোখে আতংক। জুমলাক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। প্রথমতঃ তার মুখে কোনই কথা সরল না। শেষে বলল সে, তাহলে আমি খোঁজ নিতে পাঠাই?
স্মার্থা চোখ মুছে বলল, তা করতে পারেন মিঃ জুমলাক, কিন্তু দেরীর জন্য কিছু ঘটলে সে দায়িত্ব তাহলে আপনাকেই নিতে হবে।
জুমলাক পড়ল মহাবিপদে। একদিকে রাত্রিবেলা বন্দীকে দু’জন প্রহরীর উপর ভরসা করে ছেড়ে দেয়া যায় না, অপরদিকে শিরীর সত্যই কিছু ঘটলে তাকেই দায়ী হতে হবে। পরিশেষে জুমলাক ভাবল, আহমদ মুসাই যখন স্মার্থাকে দিয়ে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন , তখন স্মার্থার মধ্যে নিশ্চয় বিপদের তেমন কিছু নেই।
জুমলাক বলল, চলুন, আমিই যাচ্ছি সাথে। বলে জুমলাকে আর একজন প্রহরীকে সাথে ডেকে নিল।
তিনজনেই পর্বতের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। সবার আগে স্মার্থা, তারপর প্রহরীটি এবং সবার শেষে জুমলাক।
তারা পর্বতের সমতলে এসে পৌছল। দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে আর একটি রাস্তা এসে এখানে মিলিত হয়েছে। ঐ রাস্তাটি পর্বতের পশ্চিম ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে। আপো পর্বত থেকে সোলো সাগরে পৌছার এটাই পথ।
এখানে পৌছার পর স্মার্থা সবার অলক্ষে একখন্ড কাগজ ফেলে দিল হাত থেকে। পরক্ষনেই স্মার্থা হোচট খাওয়ার মত হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। লক্ষ্য করলে দেখা যেত স্মার্থা উঠার সময় দলা পাকানো এক টুকরা কাগজ তুলে নিল। সাবধানতাবশতঃ জুমলাকের রিভলভার উদ্যত হয়ে উঠেছিল স্মার্থার দিকে, কিন্তু কোন প্রকার সন্দেহ তার মনে স্থান পেল না।
তারা এগিয়ে চলেছিল। সামনেই মূল ঘাঁটি মুর হামসারের আবাস স্থল। প্রধান গেটের সামনে পৌছতেই সেখান থেকে কঠোর নির্দেশ এলো হাত তুলে দাঁড়ানোর জন্য। দ্বার রক্ষীর অটোমেটিক কারবাইনের নল হা করে আছে তাদের দিকে। হাত তুলে দাঁড়াল তিনজন।
গেট-ক্যাম্প থেকে প্রধান দ্বাররক্ষী আহমদ জালূত তাদের কাছে এলো জুমলাক তাকে সব ঘটনা বুঝিয়ে বলল। আহমদ জালূত একবার ভ্রূ কুচকে স্মার্থার দিকে তাকাল। বলল, চল আমিও যাব।
চারজনেই চলল এবার।
ভিতরের গেটেও প্রহরী দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জুমলাক ও আহমদ জালুতকে দেখে একপাশে সরে দাঁড়াল। দরজা একটু ঠেলতেই খুলে গেল। বিস্মিত হল জালুত। প্রহরীর দিকে প্রশ্নবোধক চোখ তুলে ধরতেই বলল, দরজা বন্ধ না করেই আজ ওঁরা শুয়ে পড়েছেন।
স্মার্থা গিয়ে তাড়াতাড়ি শিরীর ঘরে প্রবেশ করল। ওরাও তিনজন তার পিছু পিছু প্রবেশ করলো সেই ঘরে। শিরী বিছানায় পড়ে আছে। ঠিক শুয়ে থাকা নয় ওটা। দেখে মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়েছে বিছানায়।
স্মার্থা তাকে পরীক্ষা করলো। জুমলাক, আহমদ জালুত ও প্রহরী তিনজনেই গজ তিনেক দুরে দাড়িয়ে থেকে উদগ্রীবভাবে দেখছে স্মার্থার কাজ। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগ। তারা বুঝতে পারছে শিরীর একটা কিছু হয়েছে।
স্মার্থা উঠে দাড়াল। আহমদ জালুত বলল, কি দেখলেন?
স্মার্থা কোন উত্তর না দিয়ে কপালের ঘাম মুছে পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে মুখে পুরল, টেবিল থেকে দেশলাই নিয়ে অগ্নি সংযোগ করল তাতে। তারপর ওদের দিকে ফিরে সিগারেটে একটি লম্বা টান দিয়ে বলল, শিরী অজ্ঞান হয়ে আছে।
স্মার্থা আবার সিগারেটটি মুখে পুরল।
আহমদ জালুত কিছু বলতে গিয়েছিল। কেবল মুখ হা করেছিল সে, কিন্তু কিছু বলতে পারল না। স্মার্থার সিগারেট থেকে এক ধরনের নিলাভ ধোঁয়া তীরের মত ছুটে গেল ওদের দিকে। পরক্ষণেই তাদের তিনটি দেহই কলাগাছের মত আছড়ে পড়ল মাটিতে। সিগারেটটি আসলে মারাত্মক একটি গ্যাস পাইপ তামাকের ক্যামোফ্লোজে ঢাকা মুখের পর্দাটি পুড়ে গেলে গ্যাস বেরিয়ে ছুটে যায় সামনে। সামনের দুই বর্গ গজ পরিমিত স্থান মুহূর্তের জন্য বিষাক্ত করে দেয়।
স্মার্থা মুহূর্তকালও নষ্ট করলো না আর। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজ খন্ড সে মেলে ধরল চোখের সামনে। তাতে লেখাঃ ‘‘আমি পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে অপেক্ষা করছি দু’টি ঘোড়া নিয়ে। জাম্বুয়াঙ্গোর জন্য পেট্রোলও সংগৃহীত হয়েছে।’’
তাড়াতাড়ি কাগজটি মুড়ে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল স্মার্থা। তারপর কাঁধে তুলে নিল শিরীর সংজ্ঞাহীন দেহ। গেটে গিয়ে প্রহরীকে বলল, ছোট সাহেবও অসুস্থ। ওঁরা তাঁকে নিয়ে আসছেন। তুমি আমার সাথে এসো, শিরীকে ব্যারাকের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
প্রহরীটি মুহূর্তকাল দ্বিধা করলো, তারপর পিছু নিল। প্রধান ফটকে গিয়েও স্মার্থা এই একই কথা বলল। মনে হয় তারাও কোন সন্দেহ করলো না। বিশেষ করে ভিতরের দ্বাররক্ষীকে সাথে দেখে তাদের মনে কোন প্রশ্নেরও উদয় হলো না। তাছাড়া আহমদ মুসার নির্দেশ মোতাবেক স্মার্থা শিরীর চিকিৎসা করছে এটাও সবাই জানত।
স্মার্থা এগিয়ে চলল শিরীকে নিয়ে। পিছনে প্রহরী। তারা পর্বতের সেই সমতলে এসে পৌছল। স্মার্থা শিরীকে কাঁধ থেকে নামিয়ে শেষে একবার পিছনে ফিরে দেখল, না ……… কেউ এদিকে আসছে না। প্রহরীটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, কি হল চলুন তাড়াতাড়ি।
-যাই। বলে স্মার্থা পকেট থেকে সিগারেট বের করলো। সিগারেটে আগুন দিল। সেই আগর নিয়মে নিলাভ ধোঁয়া ছুটে গেল এক ফলা তীরের মত। মুহূর্তের মধ্যে প্রহরীটির হাত থেকে খসে পড়ল স্টেনগান। সেও আছড়ে পড়ল মাটিতে।
স্মার্থা শিরীকে কাঁধে তুলে নিয়ে এবার ছুটল দক্ষিণ-পশ্চিম পথ দিয়ে পাহাড়ের পশ্চিম ঢালের দিকে। ঘামে ভিজে গেছে তার গোটা দেহ। কিন্তু উপায় নেই জিরিয়ে নেবার। ক্যাপটেন জুমলাক ও আহমদ জালুতকে বেরুতে না দেখে এতক্ষণে নিশ্চয় প্রহরীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। তারা জুমলাক ও আহমদ জালুতের খোজে গৃহে প্রবেশ করার পরই ছুটে আসবে এদিকে শিকারী কুকুরের মত। সুতরাং যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি তাকে পৌছতে হবে আলী আকছাদের কাছে। একবার ঘোড়ায় চড়তে পারলেই হলো। আধ ঘন্টা মধ্যেই তারা পৌছে যাবে সোলো সাগরের তীরে।
কতদূরে আলী আকছাদ? আর চলতে পারে না স্মার্থা শিরীকে নিয়ে। হঠাৎ সামনেই জমাট অন্ধকারের মত মনুষ্য মুর্তিকে নড়ে উঠতে দেখে স্মার্থা থমকে দাঁড়াল। ওকি আলী আকছাদ? বলল সে, কে?
-আমি আলি আকছাদ। বলে সে এসে দাড়াল।
-কোথায় তোমার ঘোড়া?
-এই আর একটু যেতে হবে।
এবার দু’জনে ধরাধরি করে শিরীকে নিয়ে গিয়ে ঘোড়ায় তুলল। স্মার্থা শিরীকে নিয়ে এক ঘোড়ায় উঠল। আলী আকছাদ উঠল আর এক ঘোড়ায়। পর্বতের ঢাল বেয়ে সাবধানে ঘোড়া দু’টি সামনে এগিয়ে চলল। আলী আকছাদের হাতে টর্চ জ্বালাতে সাহস পাচ্ছে না সে। ওদের চোখে পড়ে গেলে নির্ঘাত মারা পড়তে হবে।
ওরা তখন পর্বতের পাদদেশে নেমে এসেছে। এ সময় পর্বতের উপরে বিপদ-ঘণ্টা বেজে উঠল। উপরে তাকিয়ে ওরা টর্চের আলোয় ইতঃস্তত ছুটাছুটি দেখতে পেল।
স্মার্থার ঠোটে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি। আহমদ মুসা নেই। মুর হামসারের ঘুম কাল সকালের আগে ভাঙ্গবে না। ক্যাপটেন জুমলাক ও আহমদ জালুতকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে হবে আরও কয়েক ঘণ্টা। আর আপোয়ান উপত্যকার ব্যারাক থেকে তাদের সন্ধানে ওরা যখন পর্বতের এ প্রান্তে এসে পৌছবে, ততক্ষণ তারা অর্ধেকটা পথ পার হয়ে যাবে।
নিঃশঙ্ক চিত্তে দু’টি ঘোড়া তিনটি আরোহী নিয়ে এগিয়ে চলল সামনে। পাথরের বুকে মাঝে মাঝে শব্দ উঠল খট-খট্-খট।
১১
আহমদ মুসা শুয়েছিল।
ক্লান্ত সে। কাগায়ান থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ ঘোড়া খেদিয়ে এসেছে সে আপো পর্বতে শিরীর অপহরণের সংবাদ পেয়ে। মুহূর্তও সে নষ্ট করেনি কাগায়ানে। আহমদ মুসা এ্যালেনটোর হাতে কাগায়ানের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ছুটে এসেছে এখানে। চোখ দু’টি তার বুজে আছে, কিন্তু বড় অশান্ত তার মন। পিছনের এমন আঘাত আসবে কল্পনাও করেনি কোনদিন আহমদ মুসা।
মুর হামসার আহমদ মুসার পাশেই বসেছিল। তার চোখে দুর্ভাবনার কালো ছায়া। একদিন এক রাত্রির মধ্যে বয়স যেন বিশ বছর বেড়ে গেছে মুর হামসারের।
অপহরণের কাহিনী ধীরে ধীরে সে বলে যাচ্ছিল আহমদ মুসার কাছে।
অবশেষে সে বলল, ভুল আমারই হয়েছে মুসা ভাই শেষের দিকে স্মার্থার ব্যাপারে আমি বেশ linient হয়ে পড়েছিলাম। যদি আমি তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম, তাহলে ডাইনিং রুমের পানির ট্যাংকে ঘুমের ঔষধ মেশানোর সুযোগ সে পেত না।
আহমদ মুসা চোখ খুলল। বলল, ভুল তোমার নয় বন্ধু। ভুল আমিই করেছি। প্রথম ভুল করেছিলাম জাহাজে ওকেও কামরায় বেঁধে রেখে না এসে। সে ভুলের জন্য অনেক প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাকে। দ্বিতীয় ভুল করলাম ওর দ্বারা শিরীর চিকিৎসার নির্দেশ দিয়ে। জানি না এ ভুলের জন্য কি খেসারত দিতে হবে আমাদের।
আহমদ মুসার কথা শুনে কেঁপে উঠল মুর হামসার। অন্ধকার এসে যেন ছায়া ফেলল তার চোখে মুখে। আহম মুসার তা দৃষ্টি এড়ালো না। মুর হামসারের একটি হাত তুলে নিয়ে সে বলল, জানি, তোমার ব্যথা বুঝতে পারছি। কিন্তু ভেবনা বন্ধু। মনে রেখ, আহমদ মুসাকে ফাঁদে ফেলার জন্যই শিরীকে অপহরণ করা হয়েছে। তারা ভেবেছে…………। আহমদ মুসা কথা শেষ করতে পারলো না। অভাবনীয় সংকোচ এসে তার কন্ঠ রোধ করে দিল।
-তারা কি ভেবেছে মুসা ভাই?
-অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই মুর হামসার। চলো উঠি। সবগুলো জায়গা আমাকে দেখতে হবে আর একবার। বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। মুর হামসারও উঠল। যেতে যেতে আহমদ মুসা বলল, স্মার্থা চুরি করা স্পিড বোটে চড়ে শিরীকে নিয়ে পালিয়েছে। সাথে ছিল আলী আকছাদ। প্রশ্ন হলো কোথায় গেল তারা?
আহমদ মুসা মুর হামসারকে নিয়ে শিরীর ঘরে প্রবেশ করল।
বাহুল্য বর্জিত ঘর। একটি খাট। মাথার কাছে একটি ছোট টেবিল। পাশে একটি চেয়ার। খাটের পিছন দিকের চাদর অনেক খানি নীচে ঝুলে পড়েছে।
আহমদ মুসা বলল, সংজ্ঞাহীন শিরীকে টেনে তোলার সময় চাদর এমনভাবে নীচে নেমে গেছে নিশ্চয়।
মুর হামসার দেখাল জুমলাক ও আহমদ জালুত কোথায় পড়েছিল। সেদিকে চাইতে গিয়ে খাটের কোণায় পড়ে থাকা একখন্ড দলা পাকানো কাগজের দিকে আহমদ মুসার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো।
কৌতুহলবসে কাগজ খন্ডটি তুলে নিয়ে ভাজ ভেংগে চোখের সামনে মেলে ধরলো। কাগজের লেখার দিকে চোখ বুলাতেই চোখ দু’টি তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘ইউরেকা’ ‘ইউরেকা’ বলে সে চিৎকার করে উঠল।
মুর হামসার আহমদ মুসার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। আহমদ মুসার এ ধরনের উচ্ছাস স্বাভাবিক নয়। উদগ্রীব কন্ঠে সে বলল, কি পেয়েছেন, কি আছে ওতে মুসা ভাই?
-শিরীর সন্ধান পেয়ে গেছি মুর হামসার।
-শিরীন সন্ধান? কোথায় শিরী?
আহমদ মুসা কাগজটি মুর হামসারের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, শিরীকে জাম্বুয়াঙ্গোতে নিয়ে গেছে ওরা।
মুর হামসার কাগজটির উপর নজর বুলিয়ে বলল, কাগজ তো তাই বলছে।
-আসলেও তাই। শিরীকে মিন্দানাওয়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি। ওদের ষড়যন্ত্র তেমন ডিপ রুটেড ছিল না। যদি তা হতো তাহলে ওদের জন্য জাহাজের ব্যবস্থা হতো। আলী আকছাদকে স্পিড বোট চুরি করতে হতো না। আর মিন্দানাওয়ে জাম্বুয়াঙ্গো ছাড়া তাদের আর কোন নিকটবর্তী ঘাটি আমি দেখি না।
থামল আহমদ মুসা । পরে আবার বলল, ভালই হলো মুর হাসমার।
-কি ভাল হলো?
-আমাদের জাম্বুয়াঙ্গো অপারেশন পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখন আমি নিজেই যাব জাম্বুয়াঙ্গোতে।
-মুসা ভাই?
-বলো।
-আমিও যাব জাম্বুয়াঙ্গো।
-যেতে চাও?
-যদি আপনার অনুমতি মিলে।
-আমি জানি সেখানে তুমি উপস্থিত থাকলে অনেক কাজ হবে, কিন্তু আপো পর্বত তো অরক্ষিত থাকবে। এখানকার ষড়যন্ত্রের মুলোচ্ছেদ করা গেল না এখনো। দেখ, রুনার মার মুখ থেকে কোন কথা বের করতে না পারলেও এখন বোঝা যাচ্ছে রুনার মার সাথে আলী আকছাদের কোন প্রকার যোগাযোগ ছিল। সম্ভবতঃ আলী আকছাদই কাগায়ানে খবর পাঠিয়েছে আমাদের সম্পর্কে।
-রুনার মাকে তাহলে আর কি করা যায়?
আহমদ মুসা হাসল। বলল, শিরী রুনার মাকে খুব ভালবাসে। রুনার মা’র মুখ থেকে কথা বের করার ক্ষেত্রে এই ভালবাসাই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু জাতীয় প্রয়োজনের স্থান ব্যক্তিগত ভালো লাগা না লাগার অনেক উর্ধে মুর হামসার।
মূহূর্তকাল থেমে আহমদ মুসা বলল, আমি ঘুরে আসি জাম্বুয়াঙ্গো থেকে। তার পর দেখব কি করা যায় রুনার মাকে নিয়ে।
-আপনি জাম্বুয়াঙ্গোতে কবে যাত্রা করছেন তাহলে?
-কবে নয় আজই।
-কিন্তু এই আহত শরীর নিয়ে, এইভাবে………..
-তাতে কি হলো। সময় নষ্ট করা যায় না একমুহূর্তও। ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের মত নরপিশাচের চক্র আর দু’টি নেই মুর হামসার। আমার উপর ওরা ক্ষেপে আছে ভয়ানকভাবে।
আহমদ মুসার কথা শুনে মুর হামসারের চোখে দু’টি উদ্বেগাকুল হয়ে উঠল। পিতৃ-মাতৃহারা ছোট বোনটি তার কোথায় কিভাবে আছে কে জানে। নরপিশাচদের হাতে যদি কিছু হয়ে যায় ওর? আর ভাবতে পারে না মুর হামসার। চোখের কোণ দু’টি তার চিক চিক করে উঠে।
আহমদ মুসা সেদিকে চেয়ে বলল, চিন্তা করো না মুর হামসার। বলেছি তো আমাকে ফাঁদে ফেলার টোপ হিসাবে শিরীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যদিও আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না, তবু আমার বিশ্বাস আমাকে ফাদে ফেলার পূর্বে শিরীর গায়ে হাত তুলতে তারা সাহস পাবে না। তারা জানে এর পরিণাম কত ভীষণ হতে পারে।
কথা বলতে বলতে আহমদ মুসার চোখ দুটি জ্বলে উঠল। এক অজেয় শপথে দৃঢ় হয়ে উঠল তার মুখ।
ফিলিস্তিন বিজয়ী আহমদ মুসা পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে যেন প্রতিভাত হল মুর হামসারের চোখে। আর এর মাঝে মুর হামসার যেন খুঁজে পেল এক পরম নির্ভরতা।
