আজকাল রীতিমত বিকালে বেড়াই। হিসাব করে এক মাইল থেকে দুই মাইল হাঁটি। অল্প জায়গা কত বার হাঁটলে এক মাইল হয় হিসাব করে নিয়েছি, তাই ঘুরে ঘুরে হাঁটি।
২৩শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ শনিবার
সকালে বারান্দায় বসে কাগজ পড়ছিলাম। একজন কয়েদি সেলের দরজায় দাঁড়ায়ে আছে। কি যেন বলতে চায়। সাধারণ কয়েদিদের মধ্যে অনেক বিচক্ষণ লোকও আছে। রাজনীতি সম্বন্ধে সাধারণ জ্ঞানও আছে। এই কয়েদিটি সাংঘাতিক প্রকৃতির। জেলের আইন-টাইন বেশি মানে না। অনেক মারধোর খেয়েছে জীবনে। লেখাপড়া কিছুটা জানে। দু’একটা ইংরেজিও মাঝে মাঝে বলে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলতে চাও? বয়স বেশি না, ২৫-২৬ হবে, তাই ‘তুমি’ বললাম। বলল, আপনি পূর্ব বাংলার কথা বলেন, আর আমাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেন, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও বলে থাকেন কিন্তু শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারাই দায়ী না, পূর্ব পাকিস্তানিরাও দায়ী আছে। আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। বললাম, আরও কিছু বলবে? উত্তর দিল, না। বাধ্য হয়ে আমাকে বলতে হলো, পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে আমাদের এই সংগ্রাম নয়; পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সুখে থাকুক, আমরাও সেটা চাই। তবে, পশ্চিম পাকিস্তানে একদিকে শক্তিশালী শোষক শ্ৰেণী আছে, তাদের সাথে আছে একশ্রেণীর সরকারি কর্মচারী তাহারাই দায়ী। তারাই প্রথম থেকে ষড়যন্ত্র করেছে, ছলে বলে কৌশলে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতে হবে। তাদের সূক্ষ্ম বুদ্ধিও আছে। পূর্ব বাংলার নেতারাও দায়ী অনেকখানি। আমাদের নেতারা ১৯৪৭ সাল থেকে বুঝেও স্বার্থের লোভে সুযোগ দিয়েছে শোষণ করতে বাধা দেয় নাই, প্রতিবাদ করে নাই, যদি বড়কর্তারা বেজার হন! মন্ত্রীত্ব ও চাকরি যদি না থাকে! ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত যারাই এই শোষকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের খুশি করার জন্য, তাহাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে। এদের দিয়েই স্বায়ত্তশাসনের দাবি, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগে বাধা সৃষ্টি করেছে। এরা বুঝেও বুঝতে চাইতো না। এমনকি দু’একজন উর্দু হরফে বাংলা লেখার জন্য প্রচার করে বেড়াতো। যখন নৌ-ঘাটি চট্টগ্রামে চেয়েছি তখন কেবলমাত্র মন্ত্রীত্ব রক্ষা করার জন্যই এরাই বাধা দিয়েছে বেশি।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর যখন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক শ্ৰেণী বুঝলো এবার বোধহয় আর শোষণ করা চলবে না, তখন আবার ষড়যন্ত্র করল সেই লোকগুলিকে দিয়ে-যারা ইলেকশনের পূর্বে হক সাহেবের মাথায় চেপে, আওয়ামী লীগের কাঁধে পা রেখে ইলেকশনে পার হয়ে এসেছে। বৃদ্ধ হক সাহেবকে ব্যবহার করল এরা। যখন দ্বিতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলী শাসনতন্ত্র তৈয়ার করতে শুরু করল, আওয়ামী লীগের সদস্যরা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে ভিতর ও বাহিরে স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে সংগ্রাম শুরু করল, তখন এই বাঙালিদের ভোট দিয়ে আমাদের দাবিকে ভোটে পরাজিত করে নতুন শাসনতন্ত্র গঠন করল। তখনও যদি বাঙালিরা এক হতে পারতাম তাহলে নিশ্চয়ই স্বায়ত্তশাসন দাবি আদায় করতে পারতাম। আজও যে আমাদের ওপর জুলুম হচ্ছে-মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) সাহেব যদি আইয়ুব সাহেবের হাতে মন্ত্রীত্বের লোভে ধরা না দিতেন, তবে অনেকগুলি দাবি আদায় হতো। আজও দেখুন, আওয়ামী লীগ যখন ৬ দফার দাবি তুলল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য তখন এই বাঙালিরাই বেশি বাধা দিতেছে। মোনায়েম খাঁ সাহেব গভর্নর আছেন, কে তাকে তাড়াচ্ছে? তিনি চরম অত্যাচার করে চলেছেন। আমাদের গ্রেপ্তার, ইত্তেফাক কাগজ বন্ধ, নিউনেশন প্রেস বাজেয়াপ্ত, তার মালিককে গ্রেপ্তার, নারায়ণগঞ্জ ও তেজগায় গুলি করতে একটুও মনে বাধলো না তার। কাদের গ্রেপ্তার করছে? কাদের গুলি করে হত্যা করা হলো? কে বা কারা শত শত ছাত্রের জীবন নষ্ট করল? তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিশ্চয়ই আসে নাই। যদি এই স্বায়ত্তশাসনের দাবি কৃতকার্যতা লাভ করে, তবে যারা অত্যাচার করল, তাদের ছেলেমেয়ে বংশধররা তার সুবিধা ভোগ করবে কিনা? যারা জীবন দিল তাদের বংশধররাই কি শুধু ভোগ করবে? আমাদের দুঃখের জন্য আমরাই দায়ী বেশি। আমার ঘর থেকে যদি চুরি করতে আমিই সাহায্য করি সামান্য ভাগ পাওয়ার লোভে তবে চোরকে দায়ী করে লাভ কি?
এই সব কথা বলতে বলতে জমাদার চলে এল, আর সিপাহিও এগিয়ে এল। কয়েদিটা তাড়াতাড়ি সেলে চলে গেল। আমি চুপ করে অনেকক্ষণ বসে থেকে আবার খবরের কাগজ নিয়ে পড়তে লাগলাম।
বিকালে জেলার সাহেব এলে তাকে বললাম, তিনি যেন ১০ সেলের আওয়ামী লীগের লোকদের জন্য এক জায়গায় পাক করার ব্যবস্থা করেন। ১/২ ওয়ার্ডে, সেখানে আরও ডিপিআর আসামি আছে তাদের পাকের বন্দোবস্ত আলাদা করেছে। তারা ডিপিআর-এর বন্দি। ১/২ ওয়ার্ডের রাজবন্দিরা মনে করবে কি? পূর্বে এক জায়গায় পাক হতো। যদি আলাদা পাকের বন্দোবস্ত করতে হয়, তবে যেখানে তাদের রাখা হয়েছে সেখানেই করুন, সেটাই তো আওয়ামী লীগের রাজবন্দিদের দাবি ছিল। তারা তো এক জায়গায় দুই পাক করতে বলে নাই। ১/২ খাতার রাজবন্দিরা নিশ্চয়ই দুঃখ পেয়েছে। মনে করবে, সহকর্মীদের কি করে আলাদা পাক করার বন্দোবস্ত করা হয়েছে?
