তারা আমার কাছে থাকার জন্য কত ব্যস্ত। অন্তত দূর থেকে হলেও আমাকে দেখতে পেত, এখন আর তা-ও হবে না। তাদের চোখে মুখে বেদনার ছাপ আমি দেখতে পেলাম। হাফেজ মুছা এখনও হাসপাতালে আছে। তার শরীরও ভাল না।
ভেবেছিলাম আজ রেণু ও ছেলেমেয়েরা দেখতে আসবে আমাকে। হিসাবে পাওয়া যায় আর রেণুও গত তারিখে দেখা করার সময় বলেছিল, ২০ বা ২১ তারিখে আবার আসব। চারটা থেকে চেয়েছিলাম রাস্তার দিকে। মনে হতেছিল এই বোধহয় আসে খবর। যখন ৫টা বেজে গেল তখন ভাবলাম, না অনুমতি পায় নাই। আমিও ঘর থেকে বের হয়ে স্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য হাঁটতে শুরু করলাম। ভীষণ গরমও পড়েছে। কিছু কিছু ব্যায়ামও করা শুরু করেছি। কারণ, রাতে ঘুম হয় না ভালভাবে। সন্ধ্যার পূর্বে কিছু বেগুন গাছ লাগালাম নিজের হাতে।
সৈয়দ শরীফুদ্দিন পীরজাদা নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। ইনি পাকিস্তানের এটর্নি জেনারেল ছিলেন। এডভোকেট হিসেবে যথেষ্ট নাম করেছেন। এই তো শাসনতন্ত্র ! যখন ইচ্ছা মন্ত্রী, যখন ইচ্ছা বিদায়-প্রায় বাদশাহি কায়দায়। অনেক খেলা দেখলাম, আরও কত দেখতে হবে খোদাই জানে।
উত্তর ভিয়েতনাম ঘোষণা করেছে মার্কিন পাইলটদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে বিচার করা হবে না, বিচার করা হবে যুদ্ধ-অপরাধী হিসেবে। অন্যায়ভাবে অন্যের দেশে বোমাবর্ষণ করা-যুদ্ধ ঘোষণা না করে, এর চেয়ে ভাল ব্যবহার আশা করতে পারে কি করে?
বিচারপতি বি এ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ঢাকা হাইকোর্টের এক বিশেষ বেঞ্চ সমীপে বিচারাধীন জনাব নূরুল ইসলাম চৌধুরী, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও আমার হেবিয়াস করপাস মামলার শুনানি গতকাল শেষ হয়ে গেছে। বিচারপতি উপরোক্ত মামলাগুলির রায় দান স্থগিত রেখেছেন। আবদুস সালাম খান সাহেব ও অন্যান্য এডভোকেটগণ মামলা পরিচালনা করেন।
২২শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
রাত্রে এমনিই একটু ঘুম কম হয়। তারপর আজ আবার দুইটা পাগল একসাথে চিষ্কার করতে শুরু করে। একজন পাগল ৪০ সেল থেকে চিৎকার করতে থাকে। সে একটু চুপ করলে আর একজন ঠিক কুকুর, বিড়ালের মতো ডাকতে থাকে। এইভাবে চলতে থাকে। প্রথমে খুব রাগ হয়েছিল। পরে মশারির ভিতর থেকে হেসে উঠি। কারণ, একজন পাগল সত্য সত্যই একদম কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে পারে। ভোররাতে একটু ঘুম লাগলে আবার শুরু হয় গণনা। জমাদার সাহেবরা গণনা করে দেখে রাত্রে কয়েদিরা ঠিক আছে কিনা। উঠেই পড়লাম বিছানা থেকে উঠেই দেখি, আমার তিনটা মুরগির মধ্যে একটা মুরগির ব্যারাম হয়েছে। দুইটা ডিম দেয়। যে মুরগিটার ব্যারাম হয়েছে, সেটা দুই-চারদিনের মধ্যেই ডিম দিবে। মুরগিটা দেখতে খুব সুন্দর। ওকে ডেকে আমি নিজেই খাবার দিতাম। ওষুধ দেওয়া দরকার। প্রথমে পিঁয়াজের রস, তারপর রসুনের, যে যাহা বলে তাহাই খাওয়াইতে থাকি। দেখলাম, এত অত্যাচার করলে ও শেষ হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে পানি, কিছু খাবার খেতে দেই ও মাথা বোয়াইয়া দেই। বিকালের দিকে অবস্থা বেশি ভাল লাগে নাই। কি হয়, বলা যায় না।
মনটা খারাপ করে ছয় সেলের কাছে যেয়ে দাঁড়াই। হঠাৎ দেখি পায়ে ডান্ডাবেড়ি দিয়ে একজন হাঁটাচলা করছে। বললাম, ‘ব্যাপার কি?’ জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাকে ডান্ডাবেড়ি দিয়েছে কেন?’ বলল, স্যার কোর্টে যেতে হবে, ৫৩ বৎসর জেল দিয়ে দিয়েছে, খাটতে হবে ২৫ বৎসর। আরও ১৯৩টা কেস চলছে। যাকে বলা হয় মুন্সীগঞ্জ ‘গ্যাং কেস। কতদিন জেল হয় খোদায় জানে! জেল থেকে একবার পালাইয়া ছিলাম। তারপর আবার এত বছর জেল, তাই ডান্ডাবেড়ি লাগাইয়া কোর্টে যেতে হয়। বললাম, কেন ডাকাতি করে জীবনটা নষ্ট করলেন? আপনার কে আছে?’ তখন তিনি বলতে শুরু করলেন, মা-বাবা ছোট বয়সে মারা যায়। এক ফুপাতো ভাই ডাকাত ছিলেন। বোধহয় নাম শুনেছেন, মুন্সীগঞ্জের ফেলু ময়াল। আমাকে ফুসলাইয়া ডাকাতি করতে নিয়ে যায়। তখন আমার বয়স অল্প, কিছু টাকাও আমাকে দেয় ডাকাতি করে এনে। তারপর লোভ হয়, তার সাথেই ডাকাতি করা শুরু করি। তাকে ছাড়াও দু’একবার করেছি। মোট ১০-১২টা ডাকাতি করেছি সত্য, আজ বুঝতে পেরেছি কি ভুলই না জীবনে করেছি! আজ সেই ফেলু ময়াল, আমার ফুপাতো ভাই সরকারি সাক্ষী (একরারী) হয়েছে। সাত বৎসর মামলা চলেছে আরও কতকাল চলবে খোদাই জানে। তবে আমার জীবনের আর কি আছে? ৫৩ বৎসর জেল! কনফার্ম করে ২৫ বৎসর খাটতে হবে। এ মামলায়ও কয়েক বৎসর জেল হবে। মানে, জীবন এই জেলের সেলের মধ্যেই কাটাতেই হবে। আমার একটা মেয়ে আছে ও স্ত্রী আছে। আর কি কোনোদিন ওদের কাছে থাকতে পারব। মা-বাবা না মরে গেলে বোধহয় এ পথে আসতে হতো না। জীবনে বহু অন্যায় ও পাপ করেছি। খোদা কি মাফ করবে? চুপ করে আবার বলল, ‘মেয়েটা ও স্ত্রীর কি হবে? কিছু তো আর রেখে আসতে পারি নাই। বাহিরে গেলেও আর উপায় নাই। ডাকাতি না করলেও জেলে আসতে হবে। কারণ, দাগী খাতায় নাম উঠেছে। ডাকাতি হলেই পুলিশ আমাদেরই ধরে আনবে। লোকটির নাম ছোটন। সুগঠিত শরীর, ছোটখাটো লোকটা। অটুট স্বাস্থ্য। মনে হয়, বুলেটও ঢুকবে না ওর শরীরে। কারাগারের এই নিষ্ঠুর ইটের ঘরেই জীবনটা দিতে হবে। তবুও আশা করে পঁচিশ বৎসর খেটে বের হতে পারবে। আবার মুক্ত বাতাস, মুক্ত হাওয়ায় বেড়াতে পারবে। ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার করবে। মানুষের আশার শেষ নাই। অনেকে বিশ বৎসর জেল খেটে বের হয়ে যায়। কিন্তু বাইরে যেয়ে বেশিদিন বাঁচে না। এখানে বেশিদিন থাকলে ভিতরে কিছুই থাকে না, শুধু থাকে মানুষের রূপটা।
