মহিউদ্দিনের অবস্থাও ভাল না, কারণ পুৱিসিস আবার আক্রমণ করে বসেছে। আমার চিঠি চারখানা একজন কর্মচারীকে ডেকে তাঁর কাছে দিয়ে বললাম, আমার মৃত্যুর পরে চিঠি চারখানা ফরিদপুরে আমার এক আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি কথা দিলেন, আমি তার কাছ থেকে ওয়াদা নিলাম। বার বার আব্বা, মা, ভাইবোনদের চেহারা ভেসে আসছিল আমার চোখের সামনে। রেণুর দশা কি হবে? তার তো কেউ নাই দুনিয়ায়। ছোট ছেলেমেয়ে দুইটার অবস্থাই বা কি হবে? তবে আমার আব্বা ও ছোট ভাই ওদের ফেলবে না, এ বিশ্বাস আমার ছিল। চিন্তাশক্তিও হারিয়ে ফেলছিলাম। হাচিনা, কামালকে একবার দেখতেও পারলাম না। বাড়ির কেউ খবর পায় নাই, পেলে নিশ্চয়ই আসত।
মহিউদ্দিনের তো কেউ ফরিদপুর নাই। বরিশালের এক গ্রামে তার বাড়ি। ভাইরা বড় বড় চাকরি করেন। এক ভাই ছাড়া কেউ বেশি খবর নিতেন না। তিনি সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাঁকে আমি জানতাম। যাহোক, মহিউদ্দিন ও আমি পাশাপাশি দুইটা খাট পেতে নিয়েছিলাম। একজন আরেকজনের হাত ধরে শুয়ে থাকতাম। দুজনেই চুপচাপ পড়ে থাকি। আমার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে। সিভিল সার্জন সাহেবের কোন সময় অসময় ছিল না। আসছেন, দেখছেন, চলে যাচ্ছেন। ২৭ তারিখ দিনেরবেলা আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ল। বোধহয় আর দু’একদিন বাঁচতে পারি।
২৭ তারিখ রাত আটটার সময় আমরা দুইজন চুপচাপ শুয়ে আছি। কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছাও নাই, শক্তিও নাই। দুইজনেই শুয়ে শুয়ে কয়েদির সাহায্যে ওজু করে খোদার কাছে মাপ চেয়ে নিয়েছি। দরজা খুলে বাইরে থেকে ডেপুটি জেলার এসে আমার কাছে বসলেন এবং বললেন, “আপনাকে যদি মুক্তি দেওয়া হয়, তবে খাবেন তো?” বললাম, “মুক্তি দিলে খাব, না দিলে খাব না। তবে আমার লাশ মুক্তি পেয়ে যাবে।” ডাক্তার সাহেব এবং আরও কয়েকজন কর্মচারী এসে গেছে চেয়ে দেখলাম। ডেপুটি জেলার সাহেব বললেন, “আমি পড়ে শোনাই, আপনার মুক্তির অর্ডার এসে গেছে রেডিওগ্রামে এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের অফিস থেকেও অর্ডার এসেছে। দুইটা অর্ডার পেয়েছি। তিনি পড়ে শোনালেন, আমি বিশ্বাস করতে চাইলাম না। মহিউদ্দিন শুয়ে শুয়ে অর্ডারটা দেখল এবং বলল যে, তোমার অর্ডার এসেছে। আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ডেপুটি সাহেব বললেন, “আমাকে অবিশ্বাস করার কিছুই নাই। কারণ, আমার কোনো স্বার্থ নাই; আপনার মুক্তির আদেশ সত্যিই এসেছে।” ডাক্তার সাহেব ডাবের পানি আনিয়েছেন। মহিউদ্দিনকে দুইজন ধরে বসিয়ে দিলেন। সে আমাকে বলল, “তোমাকে ডাবের পানি আমি খাইয়ে দিব।” দুই চামচ ডাবের পানি দিয়ে মহিউদ্দিন আমার অনশন ভাঙিয়ে দিল। মহিউদ্দিনের কোনো অর্ডার আসে নাই এখনও। এটা আমায় আরও পীড়া দিতে লাগল। ওকে ছেড়ে যাব কেমন করে? মুক্তির আদেশ এলেও জেলের বাইরে যাবার শক্তি আমার নেই। সিভিল সার্জন সাহেবও ছাড়বেন না। মাঝে মাঝে ডাবের পানিই আমাকে খেতে দিচ্ছিল। রাত কেটে গেল। সকালে একটু খেলেও ডাব খেতে দিল। আমি অনেকটা সুস্থ বোধ করতে লাগলাম, কিন্তু মহিউদ্দিনকে ফেলে যাব কেমন করে? দু’জন একসাথে ছিলাম। আমি চলে গেলে ওর উপায় কি হবে, কে দেখবে? যদি ওকে না ছাড়ে! ওর অবস্থা তো আমারই মত, তবে কেন ছাড়বে না! আমি তো পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দলের। নেতাদের দুশমন’ হয়ে পড়েছি, কিন্তু মহিউদ্দিন তো জেলে আসার পূর্ব দিন পর্যন্তও মুসলিম লীগের বিশিষ্ট সদস্য ছিল। রাজনীতিতে দেখা গেছে একই দলের লোকের মধ্যে মতবিরোধ হলে দুশমনি বেশি হয়।
সকাল দশটার দিকে খবর পেলাম, আব্বা এসেছেন। জেলগেটে আমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই কর্তৃপক্ষ তাকে ভিতরে নিয়ে আসলেন। আমাকে দেখেই আব্বার চোখে পানি এসে গেছে। আব্বার সহ্য শক্তি খুব বেশি। কোনোমতে চোখের পানি মুছে ফেললেন। কাছে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং বললেন, “তোমার মুক্তির আদেশ হয়েছে, তোমাকে আমি নিয়ে যাব বাড়িতে। আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম তোমার মা, রেণু, হাচিনা ও কামালকে নিয়ে, দুই দিন বসে রইলাম, কেউ খবর দেয় না, তোমাকে কোথায় নিয়ে গেছে। তুমি ঢাকায় নাই একথা জেলগেট থেকে বলেছে। যদিও পরে খবর পেলাম, তুমি ফরিদপুর জেলে আছ। তখন যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ। নারায়ণগ এসে যে জাহাজ ধরব তারও উপায় নেই। তোমার মা ও রেণুকে ঢাকায় রেখে আমি চলে এসেছি। কারণ, আমার সন্দেহ হয়েছিল তোমাকে ফরিদপুর নেওয়া হয়েছে কি না! আজই টেলিগ্রাম করব, তারা যেন বাড়িতে রওয়ানা হয়ে যায়। আমি আগামীকাল বা পরশু তোমাকে নিয়ে রওয়ানা করব বাকি খোদা ভরসা। সিভিল সার্জন সাহেব বলেছেন, তোমাকে নিয়ে যেতে হলে লিখে দিতে হবে যে, আমার দায়িত্বে নিয়ে যাচ্ছি। আব্বা আমাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন, তিনি খবর পেয়েছেন মহিউদ্দিনও মুক্তি পাবে, তবে একসাথে ছাড়বে না, একদিন পরে ছাড়বে।
৬৬.
পরের দিন আব্বা আমাকে নিতে আসলেন। অনেক লোক জেলগেটে হাজির। আমাকে স্ট্রেচারে করে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল এবং গেটের বাইরে রেখে দিল, যদি কিছু হয় বাইরে গিয়ে হোক, এই তাদের ধারণা। আমাকে কয়েকজনে বয়ে নিয়ে গেল আলাউদ্দিন খান সাহেবের বাড়িতে। সেখানে কিছু সময় রাখল। বিকালে আমার বোনের বাড়িতে নিয়ে আসল। রাতটা সেখানে কাটালাম। আত্মীয়স্বজনসহ অনেক লোক আমাকে দেখতে আসল। আব্বা আমার কাছেই রইলেন। পরের দিন সকালে আমার এক বন্ধু ট্যাক্সি নিয়ে এল। সে নিজেই ড্রাইভ করে আমাকে ভাঙ্গায় নিয়ে আসল। আব্বা একটা বড় নৌকা ভাড়া করলেন। আমার ফুপুর বাড়ি রাস্তার পাশেই। তিনি রাস্তায় চলে এসেছেন আমাকে দেখতে। আব্বাকে বললেন, তাঁদের বাড়ি নূরপুর গ্রামে থাকতে। আব্বা বললেন, এখান থেকে নৌকায় ভেবোনের বাড়ি দত্তপাড়া যাবেন। সেখানে আরও একদিন থাকবেন। একটু সুস্থ হলে বড়বোনকে সাথে নিয়ে বাড়িতে যাবেন। আমি অনেকটা সুস্থ বোধ করছি, যদিও খুবই দুর্বল।
