বাদশা মিয়া খুব ভাল বংশের থেকে এসেছে, কিন্তু দলে পড়ে এবং ঢাকার হিন্দুমুসলমান দাঙ্গায় শরিক হয়ে খারাপ রাস্তায় চলে গিয়েছিল। দাঙ্গা করে অনেক মামলার আসামিও হয়েছিল। সভায় গোলমাল করে সে চলে গেলে ঐ মহল্লার বাসিন্দা জনাব আরিফুর রহমান চৌধুরী তার কাছে গিয়ে বললেন, “বাদশা মিয়া, আমাদের সভা একবার ভেঙে দিয়েছেন। আমরা আবার সব কিছু ঠিক করে সভা আরম্ভ করছি। আপনি আমাদের কথা প্রথমে শুনুন, যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলি বা দেশের বিরুদ্ধে বলি তারপরে সভা ভাঙতে পারবেন।” চৌধুরী সাহেবের ব্যবহার ছিল অমায়িক। খেলাফত আন্দোলন থেকে রাজনীতি করছেন। দেশের রাজনীতি করতে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের উলানিয়ার জমিদারি বংশে। বাদশা মিয়া তার দলবল নিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সভার বক্তৃতা শুনতে লাগল। কয়েকজন বক্তৃতা করার পরে বাদশা মিয়া প্রাটফর্মের কাছে এসে বলল, “আমার কথা আছে, আমাকে বলতে দিতে হবে।” কে তাকে বাধা দেয়, বলতে গেলে আরমানিটোলা ময়দান তার রাজত্বের মধ্যে। বাদশা মিয়া মাইকের কাছে যেয়ে বলল, “আমাকে মুসলিম লীগ নেতারা ভুল বুঝিয়েছিল আপনাদের বিরুদ্ধে। আপনাদের সভা ভাঙতে আমাকে পাঁচশত টাকা দিয়েছিল, এ টাকা এখনও আমার পকেটে আছে। আমার পক্ষে এ টাকা গ্রহণ করা হারাম। আমি এ টাকা আপনাদের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।” এ কথা বলে টাকাগুলি (পাঁচ টাকার নোট) ছুঁড়ে দিল। সভার মধ্যে টাকাগুলি উড়তে লাগল। অনেকে কুড়িয়ে নিল এবং অনেক ছিঁড়ে ফেলল। বাদশা মিয়া আরও বলল, “আজ থেকে আমি আওয়ামী লীগের সভ্য হলাম, দেখি আরমানিটোলায় কে আপনাদের সভা ভাঙতে পারে?” জনসাধারণ ফুলের মালা বাদশা মিয়ার গলায় পরিয়ে দিল। জনগণের মধ্যে এক নতুন আলোড়নের সৃষ্টি হল। মুসলিম লীগ গুণ্ডামির প্রশ্রয় নিয়েছিল একথা ফাঁস হয়ে পড়ল। আওয়ামী লীগের সভা ভাঙতে টাকাও দিয়েছিল একথাও জনগণ জানতে পারল। যদিও এতে তাদের লজ্জা হয় নাই। এই গুণ্ডামির পথ অনেক দিন তারা অনুসরণ করেছে যে পর্যন্ত না আমরা বাধ্য করতে পেরেছি তাদের তা বন্ধ করতে। তারা ঠিক করেছিল, বিরুদ্ধ দল গঠন করতে দেওয়া হবে না। তারা যে জনসমর্থন হারাচ্ছে, কেন তার সংশোধন না করে তারা বিরুদ্ধ দলের উপর নির্যাতন শুরু করল এবং গুণ্ডামির আশ্রয় নিল?
৪৩.
আমি জেল থেকে বের হয়েছি, আব্বা আমার জন্য ঢাকায় এসেছেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেন। আমি আব্বাকে বললাম, “আপনি বাড়ি যান, আমি সাত-আট দিনের মধ্যে আসছি।”
আমার টাকার দরকার, বাড়ি না গেলে টাকা পাওয়া যাবে না। বৃদ্ধা মা, আর স্ত্রী ও মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছা করছিল। আমি ফরিদপুরের সালাম সাহেবকেও খবর দিলাম গোপালগঞ্জে একটা সভা করব, তিনি যেন উপস্থিত থাকেন। গোপালগঞ্জে আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠন হয়ে গেছে। পুরানা মুসলিম লীগ কমিটিকেই আওয়ামী লীগ কমিটিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। কারণ, পাকিস্তান সরকার আমাদের বিরোধীদের দিয়ে একটা মহকুমা মুসলিম লীগ অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করেছিল।
গোপালগঞ্জে খবর দিয়ে আমি বাড়িতে রওয়ানা করলাম। বোধহয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি হবে, জনসভা ডাকা হয়েছিল। সালাম খান সাহেব উপস্থিত হলেন, আমিও বাড়ি থেকে আসলাম। সভায় হাজার হাজার জনসমাগম হয়েছিল। হঠাৎ সকালবেলা ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আমরা সভা মসজিদ প্রাঙ্গণে করব ঠিক করলাম। তাতে যদি ১৪৪ ধারা ভাঙতে হয়, হবে। বিরাট মসজিদ এবং সামনে কয়েক হাজার লোক ধরবে। সালাম সাহেবও রাজি হলেন। আমরা যখন সভা শুরু করলাম, তখন এসডিও মসজিদে ঢুকে মসজিদের ভিতর ১৪৪ ধারা জারি করলেন। আমরা মানতে আপত্তি করলাম, পুলিশ মসজিদে ঢুকলে মারপিট শুরু হল। পুলিশ লাঠিচার্জ করল এবং দুই পক্ষেই কিছু আহত হল। আমি ও সালাম সাহেব সভাস্থান ত্যাগ করতে আপত্তি করলাম। আমাদের গ্রেফতার করা হল। জনসাধারণও মসজিদ ঘিরে রাখল। গুলি করা ছাড়া আমাদের কোর্টে বা থানায় নেওয়া সম্ভবপর হবে না, পুলিশ অফিসার বুঝতে পারল। যতদূর জানা গিয়েছিল, পুলিশ কর্মচারীরা মসজিদের ভিতর ১৪৪ ধারা জারি করতে রাজি ছিল না। এসডিও সাহেব জোর করেই করেছিলেন। মহকুমা পুলিশ অফিসার যখন বুঝতে পারলেন অবস্থা খুবই খারাপ, গোলমাল হবেই, জনসাধারণ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে, তখন আমার ও সালাম সাহেবের কাছে এসে অনুরোধ করলেন, “গোলমাল হলে অনেক লোক মারা যাবে। আপনারা তো এখনই জামিন পেয়ে যাবেন, এদের বলে দেন চলে যেতে এবং রাস্তা ছেড়ে দিতে। আমরা আপনাদের কোর্টে নিয়ে যাব এবং এখনই জামিন দিয়ে দেব।”
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বহুদূর থেকে লোকজন এসেছে। বৃষ্টি হচ্ছে, সন্ধ্যার অন্ধকারে কি হয় বলা যায় না। জনসাধারণের হাতেও অনেক লাঠি ও নৌকার বৈঠা আছে। মহকুমা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশেষ করে আমাকে বক্তৃতা করে লোকজনকে বোঝাতে বললেন। সালাম সাহেব ও গোপালগঞ্জ মহকুমার নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক হল আমি বক্তৃতা করে লোকদের চলে যেতে বলব। আমি বক্তৃত্ম করলাম, বলার যা ছিল সবই বললাম এবং রাস্তা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলাম। মসজিদ থেকে কোর্ট তিন মিনিটের রাস্তা মাত্র। পুলিশ ও আমরা কয়েক ঘণ্টা আটক আছি। জনসাধারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের রাস্তা দিল। আমাদের সাথেই জিন্দাবাদ দিতে দিতে কোর্টে এল। রাত আট ঘটিকার সময় আমাদের জামিন পিঁয়ে ছেড়ে দেয়া হল। তারপর জনগণ চলে গেল। এটা আমাদের আওয়ামী লীগের মফস্বলের প্রথম সভা এবং সে উপলক্ষে ১৪৪ ধারা জারি।
