আস্তে আস্তে সকল কিছুতেই ভাটি লাগল, শুধু সরকারের নীতির জন্য। তারা জানত, কি করে একটা জাগ্রত জাতিকে দেশের কাজে ব্যবহার করতে হয় এবং জাতিকে গঠনমূলক কাজে লাগান যায়। হাজার হাজার কর্মী এদিক ওদিক ছিটকে পড়ল। কাজও ছিল এবং কর্মীও ছিল কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হল না। এর একটা বিশেষ কারণ হল, যাদের কাছে ক্ষমতা এল তারা জনসাধারণের ওপর আস্থা রাখতে পারেন নাই। কারণ, জনসাধারণের সাথে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যে কয়েকজন লোক প্রদেশের শাসন ক্ষমতা হাতে পেলেন, তারা সকলেই প্রায় ইংরেজ ঘেঁষা নেতা ছিলেন। ইংরেজকে তেল দিয়ে স্যার, খান বাহাদুর, খান সাহেব উপাধি নিয়েছেন। এরা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে শুরু করলেন ইংরেজ আমলের আমলাতন্ত্রের উপর। আমলাতন্ত্রের কর্ণধাররা যা বলতেন তাই শুনতেন। এই সকল কর্মচারীরা অনেকেই ইংরেজকে খুশি করার জন্য গায়ে পড়ে প্রমোশনের লোভে স্বাধীনতার জন্য যে সমস্ত নিঃস্বার্থ কর্মী সংগ্রাম করেছে তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার করেছেন, যার ভূরি ভূরি প্রমাণ আজও আছে।
স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে এরা অনেকেই দুই তিন ধাপ প্রমোশন পেলেন এবং এতে মাথা অনেকের খারাপ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আর স্যার ও খান বাহাদুরের দল এদের হাতের পুতুলে পরিণত হল। স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণকে গড়তে হলে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে হলে যে নতুন মনোভাবের প্রয়োজন ছিল তা এই নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করতে পারলেন না। এদিকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগকে তাদের হাতের মুঠায় নেবার জন্য এক নতুন পন্থা অবলম্বন করলেন। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পরে মুসলিম লীগও দুই ভাগ হল। এক ভাগ রইল ভারতবর্ষে নাম হল। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, আরেক ভাগের নাম হল পাকিস্তান মুসলিম লীগ।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বড়লাট হওয়ার ফলে আর মুসলিম লীগের সভাপতি থাকতে পারেন নাই। তাই চৌধুরী খালিকুজ্জামান সাহেবকে পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভার দেওয়া হল। তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে একটা এডহক কমিটি গঠন করলেন। পাঞ্জাবও ভাগ হয়েছিল, কিন্তু পাঞ্জাব মুসলিম লীগ ভাঙলেন না। সিন্ধুও না, সীমান্তও না, একমাত্র বাংলাদেশ। কারণ, এখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থক বেশি। তাই নতুন করে লীগ গঠন করতে হবে নাজিমুদ্দীন সাহেবের সমর্থকদের নিয়ে। মওলানা আকরম খাঁ সাহেবকে চিফ অর্গানাইজার করলেন। আমরা তাড়াতাড়ি একশত বারজন কাউন্সিল সদস্যের দস্তখত নিয়ে একটা রিকুইজিশন সভা আহ্বান করার দাবি করলাম। মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী, ডাক্তার মালেক, আবদুস সালাম খান, এম. এ. সবুর, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দিন, শামসুল হক, আনোয়ারা খাতুন, খয়রাত হোসেন ও অনেকে এতে দস্তখত করলেন। আমি ঘুরে ঘুরে দস্তখত জোগাড় করলাম। দু’একটা জেলায়ও আমাকে যেতে হয়েছিল। রিকুইজিশন সভার জন্য যে কয়েকজন সদস্যের দরকার তাদের দস্তখত নিয়ে নোটিশ তৈরি করা হল। মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের কাছে পৌঁছাতে হবে এই নোটিশটা। কেউই যেতে রাজি হল না। শেষ পর্যন্ত আমার উপরই ভার পড়ল। এই সময় আমাদের আলোচনা সভা জনাব তোফাজ্জেল আলী সাহেবের বাড়িতেই হত। কি করি আমারও লজ্জা করতে লাগল তার সামনে যেয়ে নোটিশটা দিতে। আমি শেষ পর্যন্ত তার কলতাবাজার আজাদ অফিসে হাজির হলাম। খবর দিলে তিনি আমাকে কামরায় ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁকে সালাম করে তার হাতে নোটিশ দিলাম এবং তিনি যে নোটিশটা পেলেন তা লিখে দিলে খুশি হব বললাম। মওলানা সাহেব লিখে দিলেন। তিনি আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করলেন এবং কেমন আছি জিজ্ঞাসা করলেন। আমি তার কাছ থেকে ভাগতে পারলে বাচি। তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে ছুটলাম।
পরের দিন আজাদ কাগজে তিনি নোটিশটা এবং যারা দস্তখত করেছে তাদের নাম ছেপে দিলেন এবং এক বিবৃতির মারফত ঘোষণা করলেন যে, রিকুইজিশন সভা আহ্বান করার ক্ষমতা কারও নাই, কারণ পুরানা প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের এডহক কমিটির সভাপতি। অর্থাৎ আমরা কেউই আর মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সভ্য নই। এভাবে মুসলিম লীগ থেকেও আমরা বিতাড়িত হলাম। অনেকেই চুপ করে গেল, আমরা রাজি হলাম না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে দেখব।
৩০.
ফেব্রুয়ারি ৮ই হবে, ১৯৪৮ সাল। করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার (কন্সটিটিউয়েন্ট এ্যাসেম্বলি) বৈঠক হচ্ছিল। সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ও আলোচনা চলছিল। মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লীগ সদস্যেরও সেই মত। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কারণ, পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা হল বাংলা। মুসলিম লীগ সদস্যরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দুন মজলিস এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কিছু শাখা জেলায় ও মহকুমায় করা হয়েছে। তদুন মজলিস একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যার নেতা ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম সাহেব। এদিকে পুরানা লীগ কর্মীদের পক্ষ থেকে জনাব কামরুদ্দিন সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও অনেকে সংগ্রাম পরিষদে যোগদান করলেন। সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম। দৌলতপুরে মুসলিম লীগ সমর্থক ছাত্ররা আমার সভায় গোলমাল করার চেষ্টা করলে খুব মারপিট হয়, কয়েকজন জখমও হয়। এরা সভা ভাঙতে পারে নাই, আমি শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা করলাম। এ সময় জনাব আবদুস সবুর খান আমাদের সমর্থন করছিলেন। বরিশালের জনাব মহিউদ্দিন আহমদ তখন নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য, মুসলিম লীগ ও সরকারের পুরা সমর্থক। কাজী বাহাউদ্দিন আহমদ আমাদের দলের নেতা ছিলেন। আমি কলেজেই সভা করেছিলাম। মহিউদ্দিন সাহেব বাধা দিতে চেষ্টা করেন নাই। ঢাকায় ফিরে এলাম। রাতে কাজ ভাগ হলকে কোথায় থাকব এবং কে কোথায় পিকেটিং করার ভার নেব। সামান্য কিছু সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়া শতকরা নব্বই ভাগ ছাত্র এই আন্দোলনে যোগদান করল। জগন্নাথ কলেজ, মিটফোর্ড, মেডিকেল স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বিশেষ করে সক্রিয় অংশগ্রহণ করল। মুসলিম লীগ ভাড়াটিয়া গুণ্ডা লেলিয়ে দিল আমাদের উপর। অধিকাংশ লোককে আমাদের বিরুদ্ধে করে ফেলল। পুরান ঢাকার কয়েক জায়গায় ছাত্রদের মারপিটও করল। আর আমরা পাকিস্তান ধ্বংস করতে চাই এই কথা বুঝাবার চেষ্টা করল।
