আমার মনে আছে শহীদ সাহেবকে সকালবেলা আমি বলেছিলাম, “আমাদের এমএলএদের ওরা ভাগিয়ে নিয়ে শাহাবুদ্দীন সাহেবের বাড়িতে রেখেছে। আপনি কলকাতা মুসলিম লীগকে খবর দেন, আমরা ওদের কেড়ে আনব, আমাদের কাছে ওরা দাঁড়াতে পারবে না। শহীদ সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “না দরকার নাই, মানুষ হাসবে। তুমি ছেলেমানুষ বুঝবা না।” কলকাতায় তখনও দাঙ্গা চলছিল। ইচ্ছা করলে কারফিউ জারি করে নির্বাচন কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে পারতেন। কারণ, তখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী আছেন। পদের লোভ যে তার ছিল না, এটাই তার প্রমাণ। কোনোমতে পদ আঁকড়িয়ে থাকতে হবে, এটা তিনি কোনোদিন চাইতেন না। আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জিন্নাহ যতদিন বেঁচেছিলেন প্রকাশ্যে কেউ সাহস পায় নাই। যেদিন মারা গেলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পুরাপুরি প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল।
২৪.
নাজিমুদ্দীন সাহেব নেতা নির্বাচিত হয়েই ঘোষণা করলেন, ঢাকা রাজধানী হবে এবং তিনি দলবলসহ ঢাকায় চলে গেলেন। একবার চিন্তাও করলেন না, পশ্চিম বাংলার হতভাগা মুসলমানদের কথা। এমনকি আমরা যে সমস্ত জিনিসপত্র কলকাতা থেকে ভাগ করে আনব তার দিকেও ক্ষেপ করলেন না। ফলে যা আমাদের প্রাপ্য তাও পেলাম না। সরকারি কর্মচারীরা ঝগড়া গোলমাল করে কিছু কিছু মালপত্র স্টিমার ও ট্রেনে তুলতে পেরেছিলেন, তাই সম্বল হল। কলকাতা বসে যদি ভাগ বাটোয়ারা করা হত তাহলে কোনো জিনিসের অভাব হত না। নাজিমুদ্দীন সাহেব মুসলিম লীগ বা অন্য কারোর সাথে পরামর্শ না করেই ঘোষণা করলেন ঢাকাকে রাজধানী করা হবে। তাতেই আমাদের কলকাতার উপর আর কোনো দাবি রইল না। এদিকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, কলকাতা নিয়ে কি করবেন? মিশন উইথ মাউন্ডব্যাটেন’ বইটা পড়লে সেটা দেখা যাবে। ইংরেজ তখনও ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে, না হিন্দুস্তানে থাকবে। আর যদি কোনো উপায় না থাকে তবে একে ‘ফ্রি শহর’ করা যায় কি না? কারণ, কলকাতার হিন্দু-মুসলমান লড়বার জন্য প্রস্তুত। যে কোন সময় দাঙ্গাহাঙ্গামা ভীষণ রূপ নিতে পারে। কলকাতা হিন্দুস্তানে পড়লেও শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত পাকিস্তানে আসার সম্ভাবনা ছিল। হিন্দুরা কলকাতা পাবার জন্য আরও অনেক কিছু ছেড়ে দিতে বাধ্য হত।
এই বইতে আরও আছে, একজন ইংরেজ গভর্নর হয়ে ঢাকা আসতে রাজি হচ্ছিল, কারণ ঢাকায় খুব গরম আবহাওয়া। তার উত্তরে মাউন্টব্যাটেন যে চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানে দুনিয়ার অন্যতম পাহাড়ি শহর, থাকার কোন কষ্ট হবে না। অর্থাৎ দার্জিলিংও আমরা পাব। তাও নাজিমুদ্দীন সাহেবের এই ঘোষণায় শেষ হয়ে গেল। যখন গোলমালের কোনো সম্ভাবনা থাকল না, মাউন্টব্যাটেন সুযোগ পেয়ে যশোর জেলায় সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগা জংশন অঞ্চল কেটে দিলেন। নদীয়ায় মুসলমান বেশি, তবু কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন ওদের দিয়ে দিলেন। মুর্শিদাবাদে মুসলমান বেশি কিন্তু সমস্ত জেলাই দিয়ে দিলেন। মালদহ জেলায় মুসলমান ও হিন্দু সমান সমান তার আধা অংশ কেটে দিলেন, দিনাজপুরে মুসলমান বেশি, বালুরঘাট মহকুমা কেটে দিলেন যাতে জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং হিন্দুস্তানে যায় এবং আসামের সাথে হিন্দুস্তানের সরাসরি যোগাযোগ হয়। উপরোক্ত জায়গাগুলি কিছুতেই পাকিস্তানে না এসে পারত না। এদিকে সিলেটে গণভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতবর্ষকে দিয়েছিল। আমরা আশা করেছিলাম, আসামের কাছাড় জেলা ও সিলেট জেলা পাকিস্তানের ভাগে না দিয়ে পারবে না। আমার বেশি দুঃখ হয়েছিল করিমগঞ্জ নিয়ে। কারণ, করিমগঞ্জে আমি কাজ করেছিলাম গণভোটের সময়! নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়। যে কলকাতা পূর্ব বাংলার টাকায় গড়ে উঠেছিল সেই কলকাতা আমরা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলাম। কেন্দ্রীয় লীগের কিছু কিছু লোক কলকাতা ভারতে চলে যাক এটা চেয়েছিল বলে আমার মনে হয়। অথবা পূর্বেই গোপনে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী নেতা হলে তাদের অসুবিধা হত তাই তারা পিছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করতে চাইল। কলকাতা পাকিস্তানে থাকলে পাকিস্তানের রাজধানী কলকাতায় করতে বাধ্য হত, কারণ পূর্ব বাংলার লোকেরা দাবি করত পাকিস্তানের জনসংখ্যায়ও তারা বেশি আর শহর হিসাবে তদানীন্তন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা। ইংরেজের শাসনের প্রথমদিকে কলকাতা একবার সারা ভারতবর্ষের রাজধানীও ছিল।
২৫.
এই সময়ে আরও কয়েকটা ঘটনা ঘটে আমাদের কর্মীদের মধ্যে। আমাদের যে মিল্লাত প্রেসটা ছিল—সেটা হাশিম সাহেব পরিচালনা করতেন। কথা উঠল, সেটা কি করা যায়? হাশিম সাহেব পূর্বেই দেনা হয়ে পড়েছেন বলে একটা রঙিন মেশিন বিক্রি করে দেন, তাতে দায়দেনা শোধ হয়ে যায়। তিনি শামসুল হক সাহেবকে ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে বললেন, “কলকাতার কর্মীরাও অনেকে ঢাকা চলেছে, আমি পাকিস্তানে যাব না। তোমরা সেটা ঢাকায় নিয়ে একে কেন্দ্র করে দলটা ঠিক রাখ, আর কাজ চালিয়ে যাও।” শামসুল হক সাহেব আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজি হলেন, ঢাকার লীগ অফিস ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রেসটা বসানো হবে। মিল্লাত কাগজ চলবে, আমরা এক একজন এক একটা বিভাগের ভার নেব। শামসুল হক সাহেব ঢাকায় এসে সবকিছু ঠিক করে কলকাতা গেলেন। হাশিম সাহেব আবার কলকাতার কর্মীদের বললেন, “তোমরা তো কলকাতায় থাকলে, তোমাদেরই বোধহয় প্রেসটা থাকা দরকার। কারণ, হিন্দুস্তানে তোমরা কিইবা করবা! যাদের বাড়ি পাকিস্তানে পড়েছে তাদের আর প্রয়োজন কি, পাকিস্তান তো হয়েই গেছে। কলকাতার কর্মীরা বলে বসল, ঠিকই তো কথা। যখন হক সাহেব এই কথা শুনলেন, কিছুই না বলে ফিরে এলেন। আমি তখন হাশিম সাহেবের কাছে বেশি যাই না। কারণ, তিনি আমাকে শহীদ সাহেবের সমর্থক বলে বিশ্বাস করতেন না, আর আমিও শহীদ সাহেবের সাথে তার ব্যবহার সমর্থন করি না। একে আমি বিশ্বাসঘাতকতা বলতাম।
