নেহরু আর কিছু বলতে পারেননি।
সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ এই রকমই সুবিবেচক ছিলেন। বাহ্যিক আড়ম্বর বা ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধার জন্য জনসাধারণের অর্থের অপ ব্যবহার করতে তিনি আদৌ অভ্যস্ত ছিলেন না। পরবর্তী কালে দিল্লীতে ও বিভিন্ন রাজ্যে কত প্রগতিবাদী জনদরদী নেতাই তো দেখলাম কিন্তু তাদের অধিকাংশের মধ্যেই এই রকম সুবিবেচনার ছিটে-ফোঁটাও দেখতে পেলাম না।
সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের ছাত্ৰপ্ৰীতি দেখেও স্তম্ভিত হয়ে যেতাম। মনে পড়ছে লক্ষ্ণৌয়ের একটা ঘটনা।
মাত্র একদিনের সফর। সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরবেন। একটির পর একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা। মাঝে রাজভবনে মধ্যাহ্ন ভোজন এবং সামান্য কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম। রাজভবনের মধ্যাহ্ন ভোজনে আমন্ত্রিত হয়েছেন লক্ষৌয়ের বহু রথী-মহারথী কেষ্টবিষ্টুর দল। রাধাকৃষ্ণণ অথা কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট না করে আমন্ত্রিতদের সবাইকে নমস্কার করেই সোজা খাবার টেবিলে বসলেন। খাওয়া দাওয়া শেষ করেই উনি আমাকে বললেন, চল, একটু ঘুরে আসি।
বললাম, চলুন।
উত্তরপ্রদেশ সরকারের চীফ সেক্রেটারি পাশেই ছিলেন। এবার রাধাকৃষ্ণণ তাকে বললেন, আমি একটু বেরুব।
তখনই কোথাও বেরুবার প্রোগ্রাম ছিল না। তাই চীফ সেক্রেটারি সবিনয়ে দিবেদন করলেন, বাট স্যার, ইওর নেক্সট প্রোগ্রাম ইজ…
ইয়েস আই নো। ঠিক সময়েই আমি আবার রাজভবনে ফিরে আসব।
চীফ সেক্রেটারি আর কোন কথা বলতে সাহস করলেন না। তাড়াতাড়ি দু-চারজনের সঙ্গে ফিস ফিস করে কথা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণও অতিথিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
নির্দিষ্ট গাড়িতে চড়তে গিয়েই রাধাকৃষ্ণণ দেখলেন, সামনে পিছনে পুলিশের বেতার গাড়ি, সশস্ত্র পুলিশের জীপ, স্বরাষ্ট্র সচিব ও প্রটোকল অফিসারের গাড়ি-টাড়ি ছাড়াও পুলিশের মোটর সাইকেল আউট রাইডার। এ সব দেখেই রাধাকৃষ্ণণ পাশে দাঁড়ানো চীফ সেক্রেটারিকে বললেন, আমি এক ছাত্রের বাড়ি যাচ্ছি। কোন পুলিশের গাড়ি যেন এই গাড়ির সামনে পিছনে না থাকে।
চীফ সেক্রেটারি হতভম্ব কিন্তু কী করবেন? রাজভবনের চত্বরে পড়ে রইল পুলিশের সব গাড়ি।
আমাদের গাড়ি রাজভবন থেকে বেরুতেই রাধাকৃষ্ণণ ড্রাইভারকে বললেন, টার্ন রাইট।
কিছু দূর যাবার পর উনি আমাকে বললেন, বাঁদিকের থার্ড রাস্তায় ঢুকেই ডানদিকে ঘুরতে হবে।
গাড়ি সে রাস্তায় ঢোকার পর কখনো সোজা, কখনো ডাইনে বয়ে করে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি নজরে পড়তেই রাধাকৃষ্ণণ আমাকে বললেন, ঐ পুরানো বাড়িটার সামনে গাড়ি থামাও।
গাড়ি থামল ঐ বাড়ির সামনে।
এবার উনি আমাকে বললেন, দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই দেখবে দড়ি ঝুলছে। ঐ দড়ি টানলে ওপরে ঠং ঠং করে ঘণ্টা বাজবে। ঘণ্টা বাজলেই একটা মেয়ে বেরিয়ে আসবে। ওকে বলবে, আমি এসেছি। সব শেষে বললেন, বাংলাতেই কথা বোলো। ওরা বাঙালী।
গাড়ি থেকে নামলাম। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখি, হ্যাঁ, দড়ি ঝুলছে। দড়িটা টানতেই ওপরে ঠুং ঠাং আওয়াজ হল। মধ্য বয়সী একজন মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে চাই?
বললাম, ভক্টর রাধাকৃষ্ণণ এসেছেন।
আনন্দে, খুশিতে ভদ্রমহিলা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, স্যার এসেছেন! উত্তেজনায় সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমেই আবার ওপরে উঠে গেলেন। চিৎকার করে কাকে যেন বললেন, স্যার এসেছেন। আমি নিয়ে আসছি। তারপর উনি তর তর করে নেমে এলেন।
ওকে দেখেই রাধাকৃষ্ণণ গাড়ি থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলেন, গৌরী (?) হাউ আর ইউ? হাউ ইজ অমল (?)?
ভদ্রমহিলা ওঁকে প্রণাম করে বললেন, এখন একটু ভাল।
তারপর রাধাকৃষ্ণণ ওপরে উঠলেন।
মাঝারি সাইজের একখানা ঘর। ঘরের একপাশে চৌকির ওপর অমলবাবু শুয়ে। ঘরের চারদিকে কয়েকটা আলমারী ও শেলফে বই। পড়ার টেবিলেও অনেক বই ও কাগজপত্র। রাধাকৃষ্ণণকে দেখে অমলবাবু উঠে বসার চেষ্টা করতেই উনি বাধা দিলেন। চেয়ারটা চৌকির পাশে টেনে নিয়ে বসে রাধাকৃষ্ণণ ওর মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর গৌরীদেবীর কাছ থেকে মেডিকেল রিপোর্টগুলো নিয়ে বললেন, আমি দিল্লীর দু-একজন ভাল ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ওদের মতামত জানিয়ে দেব। আর ওরা যদি বলেন, দিল্লী যেতে, তাহলে চলে এসো। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। আমি নীরবে মুগ্ধ হয়ে সব কিছু শুনি।
রাধাকৃষ্ণণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। অমলবাবু শুয়ে শুয়েই ওঁকে প্রণাম করার চেষ্টা করলেন। উনি বাধা দিয়ে বললেন, থাক যাক। আগে সুস্থ হয়ে নাও, তারপর প্রণাম করো।
গৌরী একে প্রণাম করলেন, রাধাকৃষ্ণণ ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, তোমার শরীর যেন ঠিক থাকে।
পনেরো-বিশ মিনিট। না, আর সময় নেই। ধীরে ধীরে রাধাকৃষ্ণণ নেমে এলেন।
রাজভবনে ফেরার পথে গাড়িতে রাধাকৃষ্ণণ আমাকে বললেন, এরা দুজনেই আমার কাছে পড়েছে।
এবার আমি বলি, তা বুঝেছি। তাছাড়া এত অলি-গলি পার হয়ে ও বাড়িতে যেতেই বুঝলাম, ওখানে আপনার যাতায়াত আছে।
রাধাকৃষ্ণণ একটু হেসে বললেন, ছাব্বিশ সাতাশ বছর আগে একবারই এই বাড়িতে এসেছি। তারপর ওরাও অনেক ঘুরেফিরে এখানে ফিরে এসেছে।
ছাব্বিশ-সাতাশ বছর আগে ওই একবারই এসেছিলেন? আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি।
