এখানেই শেষ নয়। দ্বারে নিযুক্ত হল সশস্ত্র প্রহরী। নিযুক্ত হলেন এভি-সি। গাড়ির সামনে দেখা গেল পুলিশ পাইলট ও পিছনে পুলিশের নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি। আরো কত কি!
জীবনে বহু জ্ঞানী, গুণী ও বিখ্যাত মানুষের সাহচর্যে এসেছি কিন্তু সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের মত অনন্য পুরুষ খুব কম দেখেছি। স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম নাগরিক হয়েও তিনি যে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন; তা সত্যি বিস্ময়কর ছিল।
দু নম্বর কিং এডওয়ার্ড রোডের মত রাষ্ট্রপতি ভবনেও রাধাকৃষ্ণণ প্রায় সারা দিনই কাটাতেন তার নিজের ছোট্ট ঘরে। সেই একটি সিঙ্গল খাটে আধশোয়া অবস্থায় বসে বসে দুনিয়ার সবকিছু পড়া দেখে সত্যি অবাক হয়ে যেতাম। অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ, দার্শনিক রাধাকৃষ্ণণ, রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণের কাছে কত রকমের বই, পত্রপত্রিকা এবং রিপোর্ট আসত তার ঠিক-ঠিকানা নেই। অবিশ্বাস্য হলেও উনি সব কিছু পড়তেন। সিনেমা পত্রিকা? মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের মুখপত্র? হ্যাঁ, তাও পড়তেন।
একদিন সকালে আমি ওঁর ঘরে গেছি। উনি কি একটা পত্রিকা পড়ছিলেন। পাশে আরো অনেক রকমের পত্রপত্রিকা পড়ে আছে। হঠাৎ উনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, আর ইউ এ ফ্যান অব মীনাকুমারী অর বৈজয়ন্তীমালা?
প্রশ্ন শুনে আমি চমকে উঠি। হাসি।
হাসছ কী? এর পর তখনকার তিন-চারটে হিন্দী ছবির নাম করে গম্ভীর হয়ে বললেন, এই ছবিগুলোতে ওরা খুব ভাল অভিনয় করেছে, তা তুমি জানো?
আমি মীনাকুমারী বা বৈজয়ন্তীমালা সম্পর্কে কোন কথা না বলে বললাম, আপনি সিনেমার খবরও পড়েন।
কেন পড়ব না?
সিনেমা দেখার অবকাশ তাঁর ছিল না কিন্তু সব খবরাখবর রাখতেন এবং রাজ্যসভার কাজ পরিচালনার সময় কখনও কখনও এমন ছোটখাট টিকা-টিপ্পনী দিতেন যে এক মুহূর্তে সব উত্তেজনা থেমে যেত। ভূপেশদা (গুপ্ত) মাঝে মাঝে এমন তর্ক-বিতর্ক করতেন যে কংগ্রেস সদস্যরা ক্ষেপে উঠতেন। এই রকম তর্ক-বিতর্কের সময় একবার সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ হাসতে হাসতে বললেন, ভূপেশ, ডানদিকের সদস্যরা ( অর্থাৎ কংগ্রেসী) ভাবছে তুমি কে. এন. সিং-এর মত ভিলেনের ভূমিকায় নেমেছ কিন্তু আমি জানি তুমি অশোককুমারের মত আদর্শ নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে চাইছ। তাই না?
চারদিক থেকে হহহহ করে হাসি উঠতেই তর্ক-বিতর্কের যবনিকা।
আরেকবারের কথা মনে পড়ছে। এই রকমই তর্ক-বিতর্কের সময় রাধাকৃষ্ণণ গম্ভীর হয়ে কংগ্রেস সদস্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনারা বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করতে পারেন কিন্তু ভূপেশের যে সুযোগ নেই বলেই এখানে এসে চেঁচামিচি করে। তবে আমি নিশ্চিত যে আজকের মত ভূপেশ আর আপনাদের সঙ্গে ঝগড়া করবে না।
এক কথা লিখতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম, কিন্তু উপায় নেই। রাধাকৃষ্ণণ এবং জাকির হোসেন যত দিন উপ-রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ছিলেন, তত দিন বিরোধী পক্ষের এক চুল অধিকারও সরকার কেড়ে নিতে পারেননি। সরকারের কাজকর্মের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করার পূর্ণ সুযোগ তারা পেয়েছেন এবং এই দুজন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সামনে কোন সদস্যই কোন দিন অশালীন কিছু করতে সাহস করেননি। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলব, সরকারও বিরোধীদের গুরুত্ব পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করে তাদের দায়িত্ব পালনে অযথা বিঘ্ন সৃষ্টি করেননি। রাধাকৃষ্ণণ বা জাকির হোসেন আইনজ্ঞ ছিলেন না, কিন্তু তাদের ন্যায়-অন্যায় উচিত অনুচিতবোধ এত প্রখর ছিল যে সরকার ও বিরোধীপক্ষের কেউই কোন আক্ষেপ বা অভিযোগ করার অবকাশ পাননি। প্রকৃতপক্ষে এই দুজনের সময় রাজসভার আকর্ষণই অন্য রকম ছিল। ভি. ভি. গিরি এই গদীতে (উপ-রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ) বসার সঙ্গে সঙ্গেই সে আকর্ষণ শেষ হয়ে যায়, পাক ও জাত্তির আমলে অধঃপতন স্থায়ী রূপ নেয়।
যাই হোক, সৰ্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ যে কত অনাড়ম্বর জীবন পছন্দ করতেন, তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেখা যেত তাঁর বিদেশ সফরের সময়। উপ-রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণকে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় সফরে যেতে হত নানা দেশে এবং স্বাভাবিক ভাবেই উনি ওই সব দেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হতেন। সুতরাং দলবল নিয়ে সফরে গেলে কোন অসুবিধা হত না, কিন্তু না, তিনি কখনই তা করতেন না। সব সময় একা যেতেন। একবার নেহরু ওঁকে বললেন, হাজার হোক আপনি আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিদেশ সফরে আপনার সঙ্গে অন্তত দু-একজন অফিসার ও দু-একজন ব্যক্তিগত কর্মচারী থাকা একান্তই দরকার।
হোয়াই? রাধাকৃষ্ণণ বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, যাতায়াত করি এয়ার ইণ্ডিয়া প্লেনে এবং প্লেনে এত যত্ন পাই যে অন্য কারুর সাহায্য দরকার হয় না। আর বিদেশের মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় দূতাবাসের লোকজনই আমার দেখাশুনা করে। তাছাড়া সর্বত্রই আমার দু-চারজন ছাত্রছাত্রীকেও পেয়ে যাই। ওরাও কী আমার কম সাহায্য করে?
দ্যাট আই এগ্রি– নেহরু তবুও বললেন, এ সব সত্ত্বেও আপনার সঙ্গে দু-একজন থাকা দরকার। তাছাড়া এতে তো আমাদের বিশেষ খরচা নেই। আপনি তো সর্বত্রই স্টেট গেস্ট।
রাধাকৃষ্ণণ এবার হেসে বললেন, কিন্তু যাতায়াতের প্লেন ভাড়া তো আমাদের সরকারকেই দিতে হয়। সুতরাং লোকজন সঙ্গে নিয়ে সরকারের সে টাকাটাই বা নষ্ট করি কেন?
