ইয়েস।
আমি ওঁর স্মৃতিশক্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই।
০৫. ভাইসরয় বড়লাট
দু হাজার আই-সি-এস. সৈন্যবাহিনীর দশ হাজার ইংরেজ অফিসার, ষাট হাজার সৈন্য ও দু লক্ষ ভারতীয় সৈন্য নিয়ে যিনি ইংল্যাণ্ডেশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে এই উপমহাদেশ শাসন করতেন, তিনি ছিলেন ভাইসরয় বড়লাট। বড়লাট কোন সম্রাট ছিলেন না কিন্তু তিনি যে বৈভবের মধ্যে জীবন কাটাতেন, তা বোধ হয় স্বয়ং ইংল্যাণ্ডেশ্বরও উপভোগ করতেন না। বড়লাটের বাসস্থানই ভাইসরয় হাউস; আরব্য উপন্যাসের ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ কথা সত্য যে এই একটি মানুষের সেবা ও স্বাচ্ছন্দ্যর জন্য ভাইসরয় হাউসে পাঁচ হাজার কর্মচারী ছিলেন। বিলাস-ব্যসনের জন্য পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় যে চতুর্দশ লুই ও জার সম্রাটের নাম চিরকালের জন্য লেখা থাকবে, তাদের সেবার জন্যও প্রত্যক্ষভাবে এত কর্মচারী ছিল না। ফরাসী সম্রাটের ভার্সাই প্রাসাদ বা জারের পিটারহফ, প্রাসাদের মতই ভাইসরয় হাউসও একটি বিরাট প্রাসাদ এবং আমাদের এই ভাইসরয় হাউসের পর পৃথিবীর কোন দেশে এমন বিশাল প্রাসাদ আর কোথাও তৈরি হয়নি। দিল্লীর ভাইসরয় হাউসই পৃথিবীর সর্বশেষ প্রাসাদ। আর সেদিনের সেই ভাইসরয় হাউসই স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন।
এই রাষ্ট্রপতি ভবন নিয়ে নিঃসন্দেহে হাজার পাতার ইতিহাস বই লেখা যায়। এ প্রাসাদে ৩৭টি অভ্যর্থনা কক্ষ আছে। ঘরের সংখ্যা ৩৪। মুঘল গার্ডেনে মালী ছিল ৪১৮ জন। ৫০ জন ছোকরা শুধু এই বাগান থেকে পাখি তাড়াত। চেম্বারলিন, খিদমতগার, স্টয়ার্ট, কুক, খানসাম, অর্ডালী ইত্যাদির সংখ্যা ছিল কম-বেশি দু হাজার। এর ওপর বডিগার্ডস, ঘোড়সওয়ার, সেক্রেটারিয়েট ও মিলিটারী সেক্রেটারির এলাহি দপ্তর। লর্ড মাউন্টব্যাটনের সময় এই চেহারাই ছিল ভাইসরয় হাউসের। সাইনবোর্ড বদলে রাষ্ট্রপতি ভবন হলে কিছু রদবদল হয়েছে ঠিকই কিন্তু এমন কিছু হয়নি, যা বিস্ময়কর বা বৈপ্লবিক।
যা বদলেছে তা হচ্ছে এই প্রাসাদের মুখ্য বাসিন্দার জীবনধারণ। রাজাগোপালাচারী ও রাজেন্দ্রপ্রসাদের মত সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণও অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবন যাপনে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজাজী যখন গভর্ণর জেনারেল ছিলেন তখনও পুরোদমে সাহেবী আমলের মত এই প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ হত। রাজেন্দ্রপ্রসাদের মত গান্ধীবাদী রাষ্ট্রপতি ভবনের মুখ্য বাসিন্দা হবার পর হাওয়া বদলে গেল। রাজেন্দ্রপ্রসাদ নিজের লেখাপড়া ও কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের কোন ব্যাপারেই উনি মাথা ঘামাতেন না। এ সব ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির মিলিটারী সেক্রেটারিই সর্বময় কর্তা ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি ভবনে এমন অসংখ্য জিনিস আছে যা বহু মিউজিয়ামেও নেই। ভারত ও ইংল্যাণ্ড ছাড়া পৃথিবীর নানা দেশের বহু বিখ্যাত শিল্পীর বহু অমূল্য পেন্টিং ও ভাস্কর্যও রাষ্ট্রপতি ভবনের সংগ্রহে আছে কিন্তু দুঃখের বিষয় রুচিহীন মিলিটারী সেক্রেটারির ও ঐসব অমূল্য সম্পদের তদারকী ভারপ্রাপ্ত শিল্পীদের ঔদাসীন্য ও গাফিলতিতে বহু পেন্টিং ও ভাস্কর্য মাটির নীচের সেলারের অন্ধকার গুদামে স্থান পেয়েছিল। রাধাকৃষ্ণণ রাষ্ট্রপতি ভবনে আসার কয়েকদিন পরেই ঐসব অমূল্য সম্পদ অন্ধকার সেলার থেকে উদ্ধার করাবার পর গম্ভীর হয়ে অফিসারদের বললেন, ইউ উইল গেট মেনি মোর প্রেসিডেন্টস কিন্তু এই সব অমূল্য পেন্টিং বা ভাস্কর্য আর পাওয়া যাবে না। কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর সাহায্যে এই সব পেটিং ও ভাস্কর্যের নিদর্শনগুলিকে পুরনো মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাধাকৃষ্ণণের নির্দেশে ও তাঁর পুত্রবধূর (ভঃ গোপালের স্ত্রী) ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে সেগুলি আবার যথাযথ স্থানে রাখা হয়।
পৃথিবীর নানা দেশের রাষ্ট্রনায়করা ভারত সফরে এলেই রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রীয় ভোজে আপ্যায়ণ করা হয়। প্রটোকল অনুযায়ী সে ভোজের উদ্যোক্তা কখনও স্বয়ং রাষ্ট্রপতি, কখনও প্রধানমন্ত্রী। কখনও আবার দুজনেই দুদিন রাষ্ট্রীয় ভোজে আপ্যায়ণ করেন সম্মানিত অতিথিকে। এ সব রাষ্ট্রীয় ভোজসভার পর কিছুক্ষণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় সম্মানিত অতিথিদের সম্মানে। এই সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তের বিখ্যাত শিল্পীদের আমণ জানানো হয়। তবে গানের চাইতে সেতার, সরোদ, বাঁশী বাজিয়ে শোনানোই হয় বেশি এবং তার কারণ গানের চাইতে এই সব বাজনাই সম্মানিত অতিথিরা বেশি উপভোগ করেন। এই সঙ্গে প্রায় সব সময়ই নাচের ব্যবস্থা থাকে। বলা বাহুল্য, ভারত বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীরাই শুধু আমন্ত্রণ পান এই ভিভিআইপি সমাবেশে নাচ দেখাবার। শিল্পীদের নির্বাচন করার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং শিল্পীরা পারিশ্রমিক পান ঐ মন্ত্রণালয় থেকে। সমালোচনার ভয়ে পররাষ্ট মন্ত্রণালয় সব সময়ই শুধু অতি-খ্যাত ও প্রবীণ শিল্পীদের নির্বাচন করেন। এই চিরাচরিত প্রথার ব্যতিক্রম ঘটালেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তিনি পররাষ্ট্র সচিব ও তাঁর নিজস্ব মিলিটারী সেক্রেটারিকে বললেন, তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া কী আমাদের কর্তব্য নয়? গুদের উৎসাহ না দিলে বহু প্রতিভাই হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া প্রবীণ শিল্পীরা কী চিরকাল বেঁচে থাকবেন? উই মাস্ট এনকারেজ ইয়াং ট্যালেন্ট।
