হ্যাঁ, দার্শনিক উপ-রাষ্ট্রপতি ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ শোবার ঘরেই সবার সঙ্গে দেখাশুনা করতেন। একজনের শোবার মত পুরনো আমলের খাট। মাথার দিকে গোটা দুয়েক বালিশে হেলান দিয়ে বসে রাধাকৃষ্ণণ সব সময় পড়তেন। বিছানার সর্বত্র বই আর অসংখ্য পত্র-পত্রিকা। ঘরের মধ্যেও সর্বত্র বই আর বই। হাতের কাগজ বা বই পাশে সরিয়ে রেখেই উনি লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। পরণে একটা ধুতি আর শার্ট। হয়তো একটা চাঁদরও। চোখে পুরু লেন্সের সোনালী ফ্রেমের চশমা! সৌম্যদর্শন জ্ঞানপিপাসু রাধাকৃষ্ণণ উপ-রাষ্ট্রপতি হয়েও সেই অতীত দিনের অধ্যাপকই ছিলেন। মাদ্রাজ, অন্ধ্র, কলকাতা, বেনারস আর অক্সফোর্ড, শিকাগো, হাবার্ট, প্রিন্সটন, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করার সময়ও ঠিক একই ভাবে জীবন কাটাতেন। কুশ্চেভ, বুলগানিন, লেডী মাউন্টব্যাটনের মত রাষ্ট্রীয় অতিথিরা এলেই রাধাকৃষ্ণণ শুধু ড্রইংরুমে বসে কথাবার্তা বলতেন। অনেক বিদেশী রাষ্ট্রদূতরাও শোবার ঘরে বসেই ওঁর সঙ্গে কথাবার্তা আলাপ-আলোচনা করতেন। সমিতি বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যাবার সময় মাথায় পরতেন বিখ্যাত পাগড়ী আর গায়ে চড়াতেন ঘিয়ে রঙের সেই বিখ্যাত লম্বা কোট। ব্যস। মোটর গাড়ি চড়তেন ঠিকই কিন্তু তাতে না থাকত লাল আলো বা রাষ্ট্রীয় পতাকা। সামনে পিছনে থাকত না পুলিশের কোন গাড়ি বা পাইলট।
উপ-রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণের বাংলোয় চাকর-বাকর বেয়ারা-চাপরাশী বা অর্ডারলী দেখা যেত না। পুত্র ডাঃ গোপালকে মাঝে মাঝে দেখা গেলেও স্ত্রী বা পুত্রবধূ নিজেদের কাজেই ব্যস্ত থাকতেন বাড়ির ভিতরে। কোন দিন কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বা সরকারী সফরে ওঁরা কেউই রাধাকৃষ্ণণের সঙ্গে যাননি। শুধু দুবেলা খাবার সময় রাধাকৃষ্ণণ বাড়ির ভিতরে যেতেন, অন্য সব সময় ঐ নিজের শোবার ঘরে। কদাচিৎকখনও পায়চারী করতেন বারান্দায় বা সামনে-পিছনের লনে।
অধ্যাপনা জীবনের ব্যক্তিগত সচিব নাটা শাস্ত্রী ঐ বাড়িতেই আউট হাউসে থাকতেন এবং রাধাকৃষ্ণণের বইপত্তর ও অন্যান্য লেখালেখির ব্যাপারে সাহায্য করতেন। নাটা শাস্ত্রী কোন সরকারী কাজ করতেন না বা উপ-রাষ্ট্রপতির ঐ এক ঘরের সেক্রেটারিয়েটেও বসতেন না। বস্তু বা ফাঁদকে বাড়ি থেকে যাতায়াত করতেন সাইকেলে। নাটা শাস্ত্রী, বসু বা ফাঁদকের বাড়িতে কোন টেলিফোনও ছিল না। এক কথায় সব মিলিয়ে এক অতি অনাড়ম্বর ছবি।
এলো ১৯৬১। সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ রাষ্ট্রপতি হয়ে চলে গেলেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। গান্ধীজির বুনিয়াদী শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম রূপদাতা জামিয়া মিলিয়া খ্যাত বিহারের রাজ্যপাল ডাঃ জাকির হোসেন হলেন উপ-রাষ্ট্রপতি। ইতিমধ্যে ২ নম্বর কিং এডওয়ার্ডে রোডের বাংলোর জায়গায় নির্মান ভবন তৈরি হবে বলে ঠিক হওয়ায় ৬ নম্বর কিং এডওয়ার্ড রোডের বাংলো হল নতুন উপ-রাষ্ট্রপতি ভবন।
ডাঃ জাকির হোসেনও শিক্ষাজগতের মানুষ ছিলেন। পাণ্ডিত্যও ছিল যথেষ্ট। তবে ওঁর মত সৌন্দর্য ও রুচিবোধ শুধু নেহরুরই ছিল। তাই উপ-রাষ্ট্রপতি ভবনের চেহারা বদলে গেল। জাকির হোসেনের নিজস্ব তত্বাবধানে ও পছন্দমত তৈরি হল সুন্দর ফুলের বাগান। ওঁর গোলাপ প্রীতি সর্বজনবিদিত। অশ্য ও বিচিগোলাপে ভরে গেল চারদিকের বাগান। নিজে পরিচর্যা করে তৈরি করলেন আরো কত ফল-মূলের গাছ। ঘরদোরের চেহারাও বদলে গেল। সুন্দর কার্পেট ও দামী সোফার চাইতে জাকির হোসেন সাহেবের ব্যক্তিগত সংগ্রহের পেন্টিং ও আর্ট কালেকশন সবার দৃষ্টি কেড়ে নিত। কথাবার্তা, পড়াশুনা, চালচলন, ঘরদোর, বাগান, কাজকর্ম-জাকির হোসেন সাহেবের সব কিছুতেই সৌন্দর্যপ্রীতি ও রুচিবোধের পরিচয় ছিল। দর্শনপ্রার্থীদের বিদায় জানানোর জন্য উনি সব সময় বাংলোর শেষ দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। বাধাকৃষ্ণণের মত জাকির হোসেন সাহেবেরও পরিবারের কারুর সঙ্গে সরকারী কোন ব্যাপারে সম্পর্ক ছিল না।
এলো ১৯৬৭। ডাঃ জাকির হোসেন রাষ্ট্রপতি হলেন। বিখ্যাত শ্রমিক নেতা প্রগতিশীল ভি. ভি. গিরি উপ-রাষ্ট্রপতি হয়েই সব উল্টে দিলেন। যে সব বৈশিষ্ট্যের জন্য উপ-রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি ভবন সবার মন জয় করেছিল, তার কিছুই রইল না এই জনদরদী প্রগতিবাদী শ্রমিক নেতার আমলে।
ডক্টর রাধাকৃষ্ণণ বা ভক্টর জাকির হোসেন সাহেবের পাণ্ডিত্য বা বিমুগ্ধ মন সবার হতে পারে ন–কিন্তু সারল্য, রুচি, সৌজন্য?
গদীতে বসার পরই ভি. ভি. গিরি জানালেন, এই বাংলোয় তার অফিস ও বাসস্থানের স্থান সঙ্কুলান সম্ভব নয়। সুতরাং লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হল নতুন অফিস-বাড়ি। হোম মিনিস্ট্রিতে চিঠি দিলেন, আরো কয়েকটা এয়ার-কণ্ডিশনার চাই; চিঠি পেয়ে হোম মিনিস্ট্রি অবাক। সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করে হোম মিনিস্ট্রি নতুন উপ-রাষ্ট্রপতিকে জানাল, উপ-রাষ্ট্রপতি রাজ্যসভার চেয়ারম্যান এবং তাই তাঁর অফিস ইত্যাদির ব্যাপারে বিধি-ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাজ্যসভার। সুতরাং আপনি অনুগ্রহ করে এই রাজ্যসভার সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। চিঠি গেল রাজ্যসভার সচিবের কাছে। সচিবও অবাক। প্রচলিত নিয়মানুসারে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান অফিসে একটি ও বাড়িতে একটি এয়ারকসিনার পেতে পারেন কিন্তু তার বেশি কী করে দেওয়া যায়? রাজ্যসভার সচিব গোপনে প্রধানমন্ত্রী শ্ৰীমতী গান্ধীকে ব্যাপারটি জানালেন। শ্রীমতী গান্ধী একটু মুচকি হেসে বললেন, স্বয়ং ভাইস-প্রেসিডেন্ট যখন চাইছেন, তখন না বলবেন কী করে?
