অন্যদিকে গত ৩ জুন কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠায় এক খবর প্রকাশ করেছে। এ খবরে বলা হয় বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বাগে আনতে মুসলিম মৌলবাদীরা এবার তাঁর বাবার ওপর চাপ দিতে শুরু করেছে। পত্রিকা জানায়, তসলিমার বাবা হওয়ার জন্য ডাঃ রজব আলীকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অবশ্য আনন্দবাজার পত্রিকা তসলিমা সম্পর্কে তার আব্বার মন্তব্যও তুলে ধরেছে। জনাব রজব আলী বলেছেন যে আমি ধর্ম বিশ্বাসী মুসলমান হিসেবে ওর(তসলিমা) ধর্মবিরোধী লেখা সমর্থন করি না। ধর্ম সম্বন্ধে ওর বক্তব্যের বিরোধী আমি। লক্ষণীয় যে, তসলিমার আব্বার এ সুস্পষ্ট বক্তব্য এবং অবস্থান সত্ত্বেও ধর্মবিরোধী লেখা থামাতে তসলিমার বাবাকে চাপ শিরোনামে খবরটি চিহ্নিত করার মধ্যে ভারতের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী বিশেষ মহলটির সাথে আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর বিশেষ উদ্দেশ্যটিরই নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে।’
________________________________
লেখাটি প্রায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে আমি ভাবতে বসি, ক্রিশ্চান বেস এর পাঠানো ফ্যাক্স ইনকিলাবের লোকদের হাতে পড়ল কি করে! এই ফ্যাক্স আমি পাইনি। আমার যেহেতু ফ্যাক্স মেশিন নেই, ইয়াসমিনের আপিসের ফ্যাক্স নম্বরটিই ক্রিশ্চান বেসকে দিয়েছিলাম। ফ্যাক্সটি ইয়াসমিনের হাতে না পড়ে নিশ্চয়ই অন্য কারও হাতে পড়েছে। যার হাতেই পড়েছে, দিয়েছে ইনকিলাবের লোকদের। নাকি ক্রিশ্চান ফ্যাক্স নম্বর লিখতে ভুল করেছেন, আর গিয়ে পড়েছে কোনও ইনকিলাবের লোকের হাতে, অথবা অন্য কারও হাতে যে কি না ইনকিলাবের লোককে দিয়েছে! কিছু একটা হবে। তবে নিউইয়র্ক থেকে অবশ্যই এই ফ্যাক্স পাঠানো হয়নি। ফরাসি দেশের ফ্রাঁ নিউইয়র্কের ব্যাংকে ডলার হয়ে পরে বাংলাদেশের ব্যাংকে এসে টাকা হয়। এরকই নিয়ম। কিন্তু ইনকিলাব নিউইয়র্কের ব্যাংকের নাম দেখেই ভেবে নিয়েছে ফ্যাক্স নিউইয়র্ক থেকে এসেছে। ভেবে নিয়েছে অথবা ইচ্ছে করেই বানিয়ে লিখেছে। পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে দেখি বিএনপি দলের পত্রিকা দৈনিক দিনকালে এই চিঠি ছেপে বিশাল করে লিখেছে তসলিমার কাছে ভারত থেকে সরাসরি নয়, ভায়া আমেরিকা হয়ে মোটা অংকের ডলার আসছে। ইয়াসমিন একবার বলেছিল, তার আপিসের মালিকের বড় ভাই মাইদুল ইসলাম বিএনপির সঙ্গে যুক্ত, জিয়ার আমলে মন্ত্রী ছিলেন। তিনিই কি তবে তাঁর দলের পত্রিকায় ছাপার জন্য চিঠিটি পাঠিয়ে দিয়েছেন! হতে পারে! আরেকটি পত্রিকায় আজকের খবর—
ধর্মদ্রোহী নাস্তিক তসলিমার আন্তর্জাতিক মদদদাতাদের আংশিক সন্ধান পাওয়া গেছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে ফ্রান্স থেকে পাঠানো এক ফ্যাক্স অনুযায়ী দেখা যায় ফ্রান্সের খ্রিস্টান বিশি তসলিমাকে তার লজ্জার জন্য অগ্রিম বাবদ পাঁচ হাজার ১৪৪ দশমিক ২১ ডলার পরিশোধ করেছে। এছাড়াও গত ১৫ ও ১৬ মে আরো দু দফায় অর্থ প্রদান করা হয়েছে। প্রাপ্ত ফ্যাক্স অনুযায়ী ১৫ এপ্রিলে পাঠানো প্রথম কিস্তির টাকা গায়েব হয়ে গেছে। এ নিয়ে দু পক্ষে ২৫ মে বিকেলে ফোনে আলোচনা হয়েছে। অর্থ গায়েব হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে ফ্রান্সের বিশি খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই তিনি লিখেছেন, আমাদের ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখা থেকে উল্লিখিত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে। এ কারণে মিঃ বিশি তাঁদের ব্যাংক বিএনপিকে চেকের কপি পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর ধারণা স্বাক্ষর জাল অথবা চেকটি চুরি না হলে এ ঘটনা ঘটতে পারে না। কারণ চেকটি সরাসরি তসলিমার ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। চেকটি ভুলবশত তসলিমার ব্যাংকের অ্যাকাউণ্টে না গিয়ে বাসায় গিয়েছে বলে ফ্যাক্সে বলা হয়েছে। ফ্যাক্সে উল্লেখ করা হয়েছে মিঃ বিশি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন রয়েছেন। উল্লেখ্য, তসলিমা নাসরিন তার বৈধ পাসপোর্ট ফেরত পাবার পর প্রথমে ফ্রান্স পরে নিউইয়র্ক ও কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে আসেন। তসলিমার লজ্জা উপন্যাস ভারতে বিজেপির মুখপত্র হিসেবে কাজ করছে।
এই পত্রিকার লোকের হাতেও ফ্যাক্স টি গেছে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। অন্তত এই লোকেরা জানে যে ফ্যাক্সটি পাঠানো হয়েছে ফ্রান্স থেকে। তবে কোন কোন দেশ হয়ে আমি বাংলাদেশে এসে পৌঁচেছি তা বলতে গিয়ে নিউইয়র্ক উল্লেখ করার সম্ভবত একটি কারণ, ফ্যাক্সে নিউইয়র্কের ব্যাংক প্রসঙ্গটি আছে, আমি ও শহরটা হয়ে এলে অর্থযোগের ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়। সুতরাং আমি ও শহরে না গেলেও পত্রিকাটি আমাকে ও শহরে ঘুরিয়ে আনবে, কার কি বলার আছে! বিজেপি আমাকে ৪৫ লক্ষ টাকা দিয়েছে লজ্জা লেখার জন্য, এটি যারা এতকাল বিশ্বাস করেনি, তাদের বিশ্বাস করাবার জন্য চমৎকার একটি প্রমাণ দেওয়া হল। অনেকে বলে, যা রটে, তা কিছুটা বটে। সুতরাং ৪৫ লক্ষের রটনা যে কিছুটা বটেও, সে ব্যাপারে আজ দেশের কত লক্ষ লোক নিশ্চিত হবে, অনুমান করতে চেষ্টা করি। মাথা বন বন করে ঘুরে ওঠে। আজ যদি ঙ আসেন, চ এসে সামনে দাঁড়ান, অথবা ক, অথবা খ, তাঁরা কী চোখে তাকাবেন আমার দিকে? নিশ্চয়ই বলবেন, যে, না, তোমাকে আমরা আর সাহায্য করতে পারছি না। তুমি এবার নিজের পথ দেখ। তবে কী করব আমি? বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা নেব? রিক্সায় আমি কতদূর যেতে পারব আমাকে রিক্সা থেকে টেনে নামিয়ে রাস্তায় যখন পিষে মারবে? আমার লাশ নিয়ে বড় একটি জয়ের মিছিল হবে সারা শহরে! ঠিক কতক্ষণ পর তা হবে, আমি বেরোনোর কত মিনিট পর! অনুমান করতে চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি বমির উদ্রেক হচ্ছে। পেচ্ছ!বখানায় গিয়ে বল্টুর গু মুতের তীব্র গন্ধের মধ্যে দরজা বন্ধ করে মেঝেয় বসে থাকি। বমি আসছে কিন্তু আসছে না। গা জ্বলছে, গলা জ্বলছে। গোঙানোর শব্দ শুনতে থাকি নিজের। একসময় নিজেকে টেনে তুলে বিছানায় নিয়ে যাই। বিছানায় ছড়িয়ে আছে পত্রিকার স্তূপ। এক একটি হাতে নিই, চোখ বুলোই।
