সমাজতান্ত্রিক দলের যাঁরা আমার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে আমার কোনওদিন আলাপ হয়নি। তাঁদের সঙ্গে কখনও আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করিনি দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থা নিয়ে কথা বলে, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা নিয়ে। কিন্তু করেছিলাম তো অনেকের সঙ্গে। আমরা তো অনেকেই একই আদর্শের জন্য লড়াই করছিলাম, তাঁরা আজ হঠাৎ হারিয়ে গেলেন কেন? তাঁরা আজ কেউ আমার সঙ্গে নেই কেন!
বুকের ভেতর হু হু করে। আচমকা একটি আশঙ্কা আমাকে আঁচড় কাঁটতে থাকে। বন্ধ জানালাটির দিকে চোখ রেখে শুয়ে থাকি। জানালার ছিদ্র দিয়ে যে সরু একটি আলো ঘরে ঢুকছিল, ধীরে ধীরে সেটি দেখি কমে যাচ্ছে। বাইরে অন্ধকার। ভেতরেও অন্ধকার। দুই অন্ধকারের মাঝখানে আমি, আমি আর আশঙ্কা।
৩. অতলে অন্তরীণ – ০৪
সাত জুন, মঙ্গলবার গতকাল জামাতে ইসলামী আমার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছে। হাজার হাজার মানুষ ছিল সে মিছিলে। মিছিলের সামনে যে ব্যানারটি নিয়ে তারা হেঁটেছে, ওতে তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চাই লেখা নয়, লেখা ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইন চাই। বিপদের ঘন্টাধ্বনি বাজছে। শুনতে পাচ্ছে! কেউ, শুনতে পাচ্ছে!! জামাতে ইসলামি কেবল তসলিমার ফাঁসি দিয়ে তুষ্ট হতে চাইছে না। সংসদে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শাস্তির আইনের জন্য বিল পাস করার দাবি করছে। জামাতের সভায় বলা হচ্ছে, খোমিনীর ফতোয়ার ভয়ে রুশদি পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তসলিমারও তাই অবস্থা। তসলিমাদের খুঁটির জোর আধিপত্যবাদী ভারত, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা এবং খ্রিস্টীয় সাম্রাজ্যবাদীদের ঐক্যবদ্ধ জেহাদের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। গোলাম আযমের প্রতিটি দিনই এখন স্বর্ণালী দিন। তিনি এখন দিন রাত ব্যস্ত। সরকারকে চাপ দিয়ে অনেক কিছু তো করানো হল, এটি হয়ে গেলে রাজ্যজয় হবে গোলাম আযমের জামাতের। মুসলিম লীগও নেমেছে আন্দোলনে, ইসলাম বিষয়ে তসলিমার অমার্জনীয় ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তির বিরুদ্ধে বিবৃতির ঝড় বইছে পত্রিকায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ১০১ জন ছাত্রও বিবৃতি দিয়েছে, তারাও তসলিমার ফাঁসি চায়। ফাঁসি চায় জাতীয় ইসলামিক দল। তাহাফফুজে হারমাইন কমিটি। ইসলামি ছাত্র মজলিশ। একশ রকম দল। কেবল ঢাকায় নয়। সারা দেশে। এত যে ইসলামি দল আছে দেশে, আমার জানা ছিল না। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীর অনেকে বলতেন, মৌলবাদীরা খুবই ক্ষুদ্র একটি শক্তি, এদের নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার কোনও মানে নেই। এরা লাফায় বেশি কিন্তু ভোট তো পায় না। ঠিক, এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। কিন্তু আগে পেত তিনটে আসন, এখন পায় বারোটি আসন। কিন্তু যত কম আসনই পাক, এরা যা দাবি করছে, সরকার তো তার সবই মেনে নিচ্ছে। এরা আজ যে ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আইনএর জন্য দাবি তুলছে, সরকার যদি এক সময় এটিও মেনে নেয়! এরা ক্ষুদ্র দল, তা জানি। কিন্তু ক্ষুদ্র দল সবসময় ক্ষুদ্রই থাকে না। ক্ষুদ্র দল অলক্ষ্যে দানবের মত বড় হতে থাকে। বিশেষ করে এদের যদি শুরু থেকেই প্রতিহত না করা যায়। ক্ষুদ্র বলে তুচ্ছ করে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে অনেকে, অনেক মৌলবাদ বিরোধী প্রগতিশীল মানুষ। মৌলবাদীদের ভিন্ন ভিন্ন দল থাকতে পারে কিন্তু এরা সঙ্ঘবদ্ধ। প্রগতিশীলদের দলে বিরোধ লাগে, কোন্দল হয়, দল শত টুকরো হয়, মতের অমিল হলে জন্মের শষনু বনে যায়। মৌলবাদীদের মধ্যে তা হয় না। তারা বৃহৎ স্বার্থে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে। বৃহৎ স্বার্থটি, দেশে ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েম করা — দেশটির আগপাশতলা ইসলামে মোড়ানো — দেশটির বুকে ইসলামের পেরেক গাঁথা। ইসলাম এখন আর কোনও ধর্ম নয়, ইসলাম এখন রাজনীতি। এই রাজনীতি জনপ্রিয় হওয়ার দিন আসছে। ঢেউ উঠছে ইসলামি জিগিরের। আশংকাটি এখন আর আঁচড় কাটে না, এখন ধারালো দাঁতে কামড়াতে থাকে। আর কতদিন ভেবে সুখ পাবে মানুষ যে মৌলবাদী দলটি একটি ক্ষুদ্র দল! ক্ষুদ্র দল ভেবে যে এদের মাঠে ছেড়ে দিয়েছো, ভেবেছো তোমার আঙিনায় এরা দখল বসাবে না, আহা তোমার দেখা হয়নি গায়ে গতরে কেমন বেড়েছে এ, কেমন ধারালো হয়েছে এর দাঁত নখ! কেবল তোমার আঙিনায় নয়, দরজা ভেঙে তোমার ঘরে ঢুকে পড়েছে! ধর্মের দৈত্যটি দেখ কেমন তোমার ঘাড়ের ওপর চড়ে বসেছে, এখন দেখ কেমন তোমার গলা টিপে ধরেছে। শ্বাস নিতে এখন কেমন লাগছে, বল তো!
পুলিশ আমাকে খুঁজে পাচ্ছে না। সারা দেশে খোঁজা হচ্ছে আমাকে। ময়মনসিংহের বাড়িতে, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব চেনা পরিচিতদের যত বাড়ি আছে, খোঁজা হচ্ছে। শান্তিনগরের বাড়িতে নাস্তানাবুদ হচ্ছে একেকজন। মোতালেবকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। আমি কোথায় আছি, বাড়ির কেউ জানে না, কিন্তু পুলিশের ধারণা, জানে। তাদের পেট থেকে আমার খোঁজ খবর বের করার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। আমার আত্মীয়রা আমার উকিলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। আমি আজ যাবো কাল যাবো উμচ আদালতে বা নিম্ন আদালতে, এরকম খবর প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে আর ভিড় বেড়ে যাচ্ছে আদালত প্রাঙ্গনে। কিন্তু বৃথাই ভিড়, আমার টিকিটি কোথাও দেখা যায়নি। আরেকটি খবর পিলে চমকে দেয়, আমি যেহেতু ধরা দিচ্ছি না, আমার সম্পত্তি ক্রোক করার কথা ভাবছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়।
