রাত এগারোটায় ঘরে ঢোকেন ছোটদা, পেছনে বাবা, বাবার পেছনে গীতা। বাবাকে দেখে আমি ছুটে যাই তাঁর কাছে। তিনি আমাকে বুকে টেনে মাথায় পিঠে হাত বুলোতে থাকেন। কোনও শব্দ বেরোয় না তাঁর মুখ থেকে। কেউ কোনও কথা বলছে না। আমি চেপে আছি আমার কান্না আমার বুকের ভেতর, আমার কণ্ঠদেশে। ছোটদা চোখ মোছেন। আমি যদি জোরে কাঁদতে পারতাম, খুব জোরে, তবে হয়ত একটু স্বাভাবিক হতে পারতাম। বাবার হাত ধরে আমি মেঝের বিছানায় বসাই। পাশে বসি।
—কেমন আছো মা? বাবা জিজ্ঞেস করলেন। কণ্ঠ কাঁপছে তাঁর।
আমি কেমন আছি তা আমাকে জিজ্ঞেস করার কোনও অর্থ হয় না। মনে মনে বলি, আমি কেমন আছি তা তো তোমরা সব জানোই, কেন খামোকা জিজ্ঞেস করছ। আমি কোনও উত্তর দিই না।
— তোমার ভয় করে মা? ভয় কইর না। মনে সাহস রাখো।
ঝ বলেন—ওকে আমি অনেক বলেছি ভয় না পেতে। যা হয় হবে। মোল্লারা মেরে ফেলবে, এত সোজা নাকি! আমরা কি নেই নাকি?
ছোটদা বলেন—নাসরিন, বিদেশ থেইকা, ইউরোপ আমেরিকা থেইকা দিনে হাজারটা ফোন আসে তর খবর নিতে। আমরা কইয়া দিই আমরা কিছু জানি না কই আছে। কয়, হেল্প করতে চায়। ইন্ডিয়া থেইকা সানাল এডামারুকু নামে এক লোক যে কত ফোন করছে।
বাবার বেদনার্ত মুখের দিকে তাকানো যায় না। কিন্তু কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না। আমিই বা কি বলব। ছোটদাই বলেন কথা। বলেন যে পুলিশ এসে তাণ্ডব চালিয়েছে বাড়িতে। বিপদ আঁচ করে তিনি আমার কমপিউটারের হার্ডডিস্ক রাতের অন্ধকারে শফিক আহমেদের বাড়িতে রেখে এসেছেন। আর যা কিছুই হোক, লেখাগুলো বেঁচে থাকবে।
গীতার হাতে কিছু বাটি। খুলে বলল—মা রান্না কইরা দিছে। এইগুলা খাইয়া নে।
ছোটদা বলেন— হ খা। মা কইছে তরে মুখে তুইল্যা খাওয়াইয়া দিয়া যাইতে।
বাবা আমাকে কাঁটা চামচে তুলে আম খাওয়াতে থাকেন। মা ল্যাংরা আম কেটে পাঠিয়েছেন। পছন্দের খাবারগুলো পাঠিয়েছেন। রুই মাছ ভাজা, বড় বড় গলদা চিংড়ির ঝোল, খাসির মাংস, পোলাও। ছোটদা বললেন—আজকে কইলাম মারে যে দেখা করার একটা সম্ভাবনা আছে। মা দৌড়াদৌড়ি কইরা বাজার কইরা রাইন্দা ফেলল। মা তো সারাদিন কান্দে। খায় না। ঘুমায় না। মারে কত কই কাইন্দা কোনও লাভ নাই। মা তবুও কান্দে।
—চেম্বারের কি অবস্থা? অবকাশেও নাকি ..
আমার প্রশ্ন শেষ হয় না, ছোটদা বললেন—বাবার চেম্বার তো অর্ধেক ভাইঙ্গা ফেলছে। ভেতরে যন্ত্রপাতি রাখার আলমারি ভাঙছে, টেবিল ভাঙছে। বাবা তো এখন চেম্বারে যাইতেই পারে না। নতুন বাজার দিয়া মিছিল যায় প্রত্যেকদিন। দৌড়াইয়া লুকাইতে হয় আশেপাশের দোকানে। অবকাশের বাইরের ঘরের দরজা জানালা ভাইঙ্গা ফেলছে। বাইরের গেটে এখন তালা দেওয়া থাকে। এখন তো পুলিশ আইছে। পুলিশ থাকে বাসায়।
বাবার হাত স্থির হয় না। হাতটি দ্রুত তিনি বুলোতে থাকেন আমার পিঠে, মাথায়।
—পুলিশ? সরকার পুলিশ দিল?
—হামলার পরে ত আমরা ডঃ কামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করছি। উনিই বলছেন যেন পুলিশের প্রটেকশান চাই। চাওয়ার বেশ কিছুদিন পর পুলিশ আইছে। তাছাড়া এমনিতেই তো সব সময় যাইতাছি, সারা হোসেনের সাথে জামিনের ব্যাপারে কথা হইতাছে। উনারা তর জামিনের ব্যাপারে খুব চেষ্টা করতাছেন। আমারে বলছে, সব সময় রেডি থাকতে, কোর্টে যাইতে হইব এমন খবর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমরা তরে হাজির করি।
—তুমি ত আর জানতা না আমি কই আছি। হাজির করতা কেমনে?
—ক ত জানত। ক মাঝে মাঝে ডঃ কামাল হোসেনের সাথে দেখা করতে যায় জামিনের খবরাখবর নিতে। ওইখানেই দেখা হইছে কয়দিন।
—ময়মনসিংহে কারা মিছিল করে? আমি ময়মনসিংহের মেয়ে জাইন্যাও করে?
—হুহ, তর মামারাই করে।
—মামারা?
গীতা বলে—শরাফ মামা তো মিছিল করে।
বাবা বলেন—পীর বাড়ির সব লোকই মিছিলে যায়।
—নান্দাইলের মিছিলে তো কাকারাও যায়। ছোটদা বলেন।
হঠাৎ একটি ভয় আমার মাথার ওপর বাদুরের মত ঝুপ করে পড়ে। মৃত্যুভয়। আমি কাগজ কলম টেনে নিয়ে দ্রুত লিখি আমার ব্যাংকের টাকা পয়সা যেখানে যা আছে সব কিছু এখন রেজাউল করিম কামালের তত্ত্বাবধানে থাকবে, তাঁকে টাকা তোলার সব রকম অধিকার দেওয়া হল। কাগজটি ছোটদার হাতে দিই। ছোটদা পড়ে বলেন, —আমারে সব অথরাইজ কইরা দিলি যে! তুই কি বাঁচবি না নাকি!
—কথা কইও না। কাগজটা রাখো পকেটে। আমি বলি।
ছোটদা কাগজ পকেটে রেখে বলেন—এত বেশি ভাবিস না তো! সব ঠিক হইয়া যাইব, দেখিস।
বাবা হাত বুলিয়েই যাচ্ছেন আমার মাথায়, পিঠে, বাহুতে। ছোটদা বললেন, বাবারে তো মারছে মোল্লারা। মাইরা ধাককা দিয়া ফালাইয়া দিছে ড্রেনে।
—কি কও? আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠি।
—হ। মোল্লাগোর মিটিং হইতাছিল বড়বাজারে। বাবা শুনতে গেছিল।
বাবা অপ্রস্তুত হেসে বললেন— না মা, তেমন কিছু না। চিন্তা কইর না। তেমন কিছু হয় নাই।
প্রসঙ্গটি তিনি চাননা উঠুক। কিন্তু আমি শুনবই। বললেন—ওই একটু গেছিলাম শুনতে।
—কেন?
—কী ওদের প্রোগ্রাম, কি করতাছে .. মিটিংএর ভিতরে যাই নাই। দূরে দাঁড়াইয়া ছিলাম।
—তারপর?
—তারপর আর কী! দুইটা লোক চিনে ফেলছে আমারে যে আমি তোমার বাবা..
ছোটদা পেছন থেকে বললেন—তারপর তো ধইরা দিল মাইর। −ড্রনএ পইড়া গেছিল। পরে দৌড়াইয়া একটা চেনা লোকের ফার্মেসিতে ঢুইকা পইড়া বাচছে। নাইলে কি হইত কে জানে।
