এই সব খবরের মধ্যে একটি অবাক করা খবর হল, শ্রীলঙ্কায় লজ্জা বইটি নিষিদ্ধ। ও দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে বলে নাকি বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লজ্জা পড়লে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে তা আমার, কোনও চরম শত্রুও বলবে না। শ্রীলঙ্কায় পেঙ্গুইন ইণ্ডিয়ার ইংরেজি অনুবাদটি গিয়েছে। পেঙ্গুইন ইণ্ডিয়া এই কদিনে নাকি ২০ হাজার লজ্জা বিক্রি করে ফেলেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। শ্রীলঙ্কায় একশরও বেশি বই বিক্রি হওয়ার পরই এই নিষেধাজ্ঞা জারি হল।
ইনকিলাব এ দেশের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পত্রিকা। তার মানে সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা। ইনকিলাব প্রতিদিন লং মার্চ লং মার্চ জপছে। সাধারণ মানুষকে লং মার্চে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। সত্যি কথা, ২৯ জুলাই লং মার্চ সফল করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে মৌলবাদীরা। রাজনৈতিক অরাজনৈতিক সবাই এক মঞ্চ থেকে চিৎকার করছে। পুরো দেশটি তাদেরই হাতের মুঠোয় বলতে গেলে। মুঠো থেকে দেশ ছাড়াতে দেশের প্রথম ফতোয়াবাজ বিরোধী লেখক শিল্পী সমাবেশ হতে যাচ্ছে আগামীকাল। এই হতে যাওয়া সমাবেশ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন, শামসুর রাহমান বলেছেন, লেখক শিল্পীদের এ ধরনের একটি সমাবেশের অবশ্যই সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। লেখক শিল্পীদের অনেকেই শিক্ষিত কিন্তু মৌলবাদ ফতোয়াবাজ প্রসঙ্গে তারা সচেতন নন। সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেষেন এ ধরনের সমাবেশের একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। লেখালেখি, শিল্প চর্চা যাদের কাজ, তাদেরও আজকে মাঠের আন্দোলনে নামতে হচ্ছে, এটা দেশের একটি বিশেষ পরিস্থিতিকেই ফুটিয়ে তোলে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, লেখক শিল্পীদের সমাবেশের একটা সামাজিক প্রভাব আছে। মৌলবাদ ফতোয়াবাজ বিরোধী এ ধরনের সমাবেশ তো আগে কখনও হয়নি। সুতরাং তার সামাজিক প্রভাব থাকবেই। লেখালেখি শিল্পকর্ম চর্চার বাইরেও লেখক শিল্পীদের দায়িত্ব আছে। মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে তারা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে জনগণও মনে করবে যে, তাদের মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রাম আরও জোরদার হচ্ছে। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মন্তব্য, এই লেখক শিল্পী সমাবেশের উদ্যোগটি মহৎ। বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখক শিল্পীরা যে মৌলবাদ ফতোয়াবাজের বিরুদ্ধে, এই অনুষ্ঠান তাই প্রমাণ করবে। মৌলবাদ ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে তাদের ঘৃণা, প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এ সময়ে তাদের অবস্থান কি, তা পরিষ্কার করবে। সমাবেশটি সফল হোক, মনে মনে বলি।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪৮
একুশ জুলাই, বৃহস্পতিবার
ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ছাত্র সংসদের অভিষেকে শামসুর রাহমান বলেছেন, আমরা আজ চরম সংকটের মুখোমুখি। ছাত্র সমাজ সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর অংশ। আমাদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রসমাজকে এগিয়ে যেতে হবে। তারা ভুল করলে জাতির বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। আওয়ামী লীগ ঐতিহ্যবাহী দল। তারা ভুল করলে বিভ্রান্তি দেখা দিলে আমাদেরকে তা শুধরাবার চেষ্টা করতে হবে। ভুলকে অনুসরণ করলে জাতির বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। নতুন সভ্যতা, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। জাতি এগিয়ে যাবে প্রগতির দিকে, কল্যাণের দিকে।
আজকের কাগজের সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদও আজকাল বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা করছেন। নিজে তিনি আপাদমস্তক আওয়ামী-ভক্ত। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিতেছে বলে অভিষেকের আয়োজনে আছেন তিনি। অদ্ভুত কথা বলেছেন — নামাজ আমরা পড়ব। ইমামতি আমরাই করব। কোরান নিজেরাই তেলাওয়াত করব। যে রকম আজকে এখানে একজন ছাত্রলীগ কর্মীকে কোরান তেলাওয়াত করতে দেখলাম। এ জন্য জামাতের দরকার নেই। ধর্মের জন্য আমাদের কোনও রাজাকার লাগবে না, দালাল লাগবে না। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। আমরা বাঙালি। জাতির জন্মদাতা গর্ব সব কিছু বঙ্গবন্ধু। আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। এ সব কিছুই আজ আমরা হারিয়েছি। এত কিছু কোনও জাতি হারায়নি। এসব অর্জন আবার ফিরে পেতে হবে। সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যে আজকের কাগজে আমরা কাজ করছি, লিখছি।
তা ঠিক বলেছেন কাজী শাহেদ। মাঝে মাঝে মনেই হয় না আজকের কাগজ কোনও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করছে। মৌলবাদীদের আন্দোলনের মিছিলের কোনও খবরই পত্রিকায় ছাপা হয় না। ছাপা হয় কেবল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কথা, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের কথা। দশ হাজার মোল্লা রাস্তায় মিছিল করে এল, সেদিনই হয়ত দশজন মৌলবাদ বিরোধী লোক এক জায়গায় জমা হয়ে মোল্লাদের বিরুদ্ধে কিছু বলল। আজকের কাগজে ফলাও করে দ্বিতীয় ঘটনাটি ছাপা হবে। প্রথম ঘটনাটি কাজী শাহেদ বেমালুম উড়িয়ে দেবেন। সংবাদপষেনর নিরপেক্ষ চরিত্রটি আজকাল খুব কম পত্রিকারই আছে। বেশির ভাগ পত্রিকার মালিকই কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য বা ভক্ত। পত্রিকাগুলো এক একটি দলের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে। কোনও পত্রিকাই বলতে গেলে সত্যিকার নিরপেক্ষ নয়।
আরও অনেক খবর আজকে। আজকের পত্রিকায় খবরের শিরোনামগুলো পড়ি, ইত্তেফাক: প্রতিটি ঘরে তসলিমার সন্ধান করা হইবে। আজ মৌলবাদ বিরোধী লেখক শিল্পীদের সমাবেশ। ভোরের কাগজ: মৌলবাদীদের আস্কারা দেওয়া যায় না, ইসলামে মৌলবাদীদের স্থান নেই –তথ্যমন্ত্রী। আজ মৌলবাদ বিরোধী লেখক শিল্পীদের সমাবেশ। ইনকিলাব: তসলিমা নাসরিনকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে–ব্যারিস্টার রফিক। ইসলাম বিদ্বেষী হওয়ার কারণেই পশ্চিমারা তসলিমাকে সমর্থন দিচ্ছে — অ্যারাব নিউজ। বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র নিন্দা, তসলিমার পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। দেশে সৃষ্ট গণজাগরণের মাধ্যমেই ইসলামী শাসন কায়েম হবে–মুফতী আমিনী। ২৯ জুলাইর লং মার্চ সফল করার আহবান। লং মার্চে ইসলামী কাফেলার ঢাকা যাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। বাংলাবাজার: তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা দিতে সরকারের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবেদন। সংবাদ: তসলিমা সম্পর্কে ই-ইউর আবেদন সরকার পেয়েছে। মুসলিম সোসাইটির ঘোষণা, তসলিমাকে পৃথিবীর কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
