–এটুকু পড়ে ঝ শুয়ে পড়লেন। সিগারেট ধরিয়ে লম্বা একটি টান দিয়ে বললেন, কি মনে হচ্ছে তোমার?
ঝর বাড়িয়ে দেওয়া সিগারেটে একটি টান দিয়ে একটি বালিশ পিঠের পেছনে নিয়ে হেলান দিয়ে বলি— আমেরিকার অনেক কিছু আমি পছন্দ করি না। বিশেষ করে ওদের পররাষ্ট্র নীতি। কম্যুনিস্ট খতম করার জন্য হেন কুকাজ নেই যে করেনি। লাতিন আমেরিকার কতগুলো দেশে কি জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। ভিয়েতনামের নিরীহ মানুষকে কয়েক বছর ধরে খুন করল। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে। কিন্তু…
—কিন্তু কি? ঝর চোখে প্রশ্ন।
—বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে এখন যা বলল, তা কিন্তু হানড্রেড পারসেন্ট ঠিক। মুসলমান মৌলবাদীদের তারা একসময় পছন্দই করত, কারণ কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে এদের ভাল লেলিয়ে দেওয়া যায় বলে। এখন আর কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কিছু নেই, তাই বোধহয় মৌলবাদীদের পালা পোষার ব্যাপারটিও বাদ দিয়েছে। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে আমেরিকা যে মৌলবাদীদের আস্কারা দিয়ে বাড়িয়ে তুললে এটা তাদের জন্যও ভাল হবে না।
ঝ বললেন— শোনো, আমেরিকার রাজনীতি বাদ দাও, আপাতত নিজের কথা ভাব। যদি আমেরিকার চাপে বাংলাদেশের সরকার এখন তোমার জামিন দিয়ে দেয়, আর তোমাকে সিকিউরিটি দেয়, তাহলে তো বেঁচে গেলে।
—এত সুন্দর করে সবকিছু ঘটে যাবে, মনে হচ্ছে না। বিএনপি তো ইনটারনাল পলিটিক্সটা দেখবে। ধার্মিকদের ক্ষেপিয়ে দিলে তার তো ভোট পাওয়া হবে না নেক্সট ইলেকশানে। ধার্মিক ক্ষেপানোর কাজটা করতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। আমেরিকা দিয়ে তো বিএনপির নির্বাচনে জয়ী হওয়া নিশ্চিত হবে না, দেশের বেশিরভাগ মানুষের মন ভরিয়েই তো তাকে আসতে হবে ক্ষমতায়। আর এখানে তো নীতির রাজনীতি চলে না, চলে ক্ষমতার রাজনীতি।
ঝ বললেন—আজ সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ আমেরিকান অ্যামবেসিতে মিছিল নিয়ে যাচ্ছে।
—কেন?
—মোল্লারা ক্ষেপেছে। কারণ ক্লিনটন তোমাকে সমর্থন করেছেন। ক্লিনটন বলেছেন তিনি চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ সরকার যেন তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।
—ক্লিনটন কি আসলেই বলেছেন?
—ভয়েজ অব আমেরিকার খবর ছিল এটি। নিশ্চয়ই বলেছেন, তা না হলে খবর হবে কেন!
দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। মানুষ যখন চুপচাপ বসে থাকে, তখন কিন্তু মাথাটি চুপচাপ বসে থাকে না, বরং ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে কয়েক লক্ষ ভাবনাকে থরে থরে সাজাতে। সাজাতে কি আর সত্যিই পারে! সবই এলোমেলো হতে থাকে। বেশি ভাবনা থাকা মানেই একসময় একটির গায়ে আরেকটির ঠেলায় ধাককায় মুখ থুবড়ে পড়ে।
—চল ঘুরে আসি শহরটা। ঝ বলেন হঠাৎ।
—কি বললে?
—গাড়ি নিয়ে যাবো। চল।
আমি লাফিয়ে উঠি।
—কি হবে? কিছুই হবে না। সঙ্গে আমার পিস্তল থাকবে। কাকে আবার ভয় পাবো। ঝ বলেন।
—চল যাই।
—চল।
ঝ চল বললেন ঠিকই। আবার ভেবে বলেন—ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায়। যায় না কি?
—নিশ্চয়ই যায়। এত রাতে কে দেখবে! আমি তাল দিই। তাল দিয়েও মৃদু কণ্ঠে বলি—যদি কেউ দেখে ফেলে। চিনে ফেলে!
—তা হবে কেন, রাস্তা পুরো খালি থাকে,চল।
ঝ অকুতোভয়। আমার ভেতর উত্তেজনা।
ঝ উঠে দরজার কাছে গেলেন, পেছন পেছন আমি।
কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলেন ঝ দরজার কাছে। দরজাটির সিটকিনিতে হাত তাঁর। হঠাৎ ফিরে দাঁড়ালেন, ধীরে ধীরে বসে পড়ে বললেন—দরকার নেই অ্যাডভেঞ্চার করার। যাওয়া হয়নি। কিন্তু যাওয়ার প্রসঙ্গ যখন উঠেছিল, মুহূর্তের মধ্যে শহরটা মনে মনে বেড়িয়ে এসেছি বাইরে বেরোবার উত্তেজনায়, সেই আনন্দ আমাকে খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও আপ্লুত করে রাখে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪২
পনেরো জুলাই, শুক্রবার
বিশাল মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন দূতাবাসের দিকে। বিশাল মিছিলের ছবি। হাতে ব্যানার, ফেস্টুন। বাংলাদেশের ধর্মীয় ও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে মার্কিন দূতাবাস অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল।
বিক্ষোভ মিছিলের আগে সমাবেশে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশের বিশাল মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, বিদেশী শক্তির আঁচলে মুখ লুকিয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মদ্রোহীরা কোনওদিনই রেহাই পাবে না। দেশপ্রেমিক তৌহিদী জনতা যে কোনও মূল্যে দেশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কোরানের অবমাননাকারী ও ধর্মদ্রোহী তসলিমার পক্ষে ওকালতি করে বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের আবেগ অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার পরও মুরতাদ তসলিমার পক্ষে আমেরিকার মত একটি দেশের প্রেসিডেণ্টের পক্ষাবলম্বন লজ্জাজনক ও ঘৃণ্যতম কাজ। সকাল সাড়ে নটা থেকে ব্যানার নিয়ে বিভিন্ন দল বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জমা হয়। হাজার হাজার মানুষে সড়ক ফুটপাত সব ভরে যায়। মোট ১৩টি সংগঠন মিলে গড়ে উঠেছে এই সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ। বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। ঘণ্টাব্যাপী গণজমায়েত শেষে বিশাল মিছিল বায়তুল মোকাররম ছেড়ে পল্টন হয়ে বিজয়নগরের দিকে যেতে নিলে পুলিশ কড়া ব্যারিকেড দিয়ে মিছিলের গতি রোধ করে। সংগ্রামী জনতা তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ক্লিনটন, তসলিমা ও মুরতাদ বিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। উত্তাল জনতাকে শান্ত করতে নেতৃবৃন্দকে হিমশিম খেতে হয়। মিছিলকারী স্লোগানমুখর তৌহিদী জনতা তখন রাস্তার ওপর বসে পড়ে। বিক্ষোভরত জনতাকে শান্ত করতে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের নেতা এনডিএ সেক্রেটারি আনোয়ার জাহিদ বক্তৃতা করেন। নেতারা মিছিলকারীদের বায়তুল মোকাররমে ফিরে যাওয়ার জন্য বলেন। তারা ফিরে গিয়ে মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেন। আনোয়ার জাহিদের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে স্মারক লিপি দিয়ে আসেন। আনোয়ার জাহিদের সঙ্গে ছিলেন জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান আর খেলাফত মজলিসের মহাসচিব প্রিন্সিপাল মসউদ খান।
