ঙ প্রশ্ন করলেন—তুমি নাকি গত পরশু সাক্ষাৎকার দিয়েছো! কাল লিখল ইনকিলাব এ।
—‘সাক্ষাৎকার! পরশু!’ অসহায় তাকাই।
—হ্যাঁ তুমি নাকি এগারো তারিখে ইংলণ্ডের দ্য টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক ক্রিস্টোফার টমাসকে বলেছো, তুমি আদালতে যাওয়ার পথে বা জেলের ভেতর মৌলবাদীদের হাতে মরতে প্রস্তুত নও। তুমি নাকি নিরাপত্তা চেয়েছো, বলেছো দেশ ত্যাগ করবে না।
—তাই নাকি! তেতো হাসি ঠোঁটে।
—এটাই নাকি কোনও সংবাদপষেনর সঙ্গে তোমার প্রথম সাক্ষাৎকার! হানটেড ফেমিনিস্ট সিকস সেইফটি, নট এসকেপ রুট, ফিচারটির শিরোনাম এই।
—আশ্চর্য, এমন খবর কি করে দেয়! আমি বুঝি না এদের ব্যাপারগুলো। আমি আবার কথা বললাম কখন কার সাথে। আমি দেশ ছেড়ে পালাতে চাই না এটা ঠিক। কিন্তু, কি করে ওই লোকেরা জানলো তা! আমি তো কোনও সাংবাদিকের সাথে কথা বলিনি!
ঙ বললেন— অনুমান করে নিয়েছে বোধহয়।
হতে পারে।
ঙ বলেন —সাংবাদিকরা আজকাল অনুমানের ভিত্তিতেই অনেক কিছু লেখে। কিন্তু তুমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে!, তা লিখেছে। তা কি করে জানবে? আর মিথ্যে কথাই বা লিখবে কেন যে তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে। তোমার সঙ্গে সরাসরি কোনও কথা হয়েছে নাকি কারও মাধ্যমে কথা হয়েছে! তোমার ভাই কামালের কথা লিখেছে। তোমার বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে পরিবারের লোকেরা অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কামাল বলেছে, তোমার বাবার বাড়িতে হামলা হয়েছে, তারা যেখানে যাচ্ছে, সেখানেই তাদের পেছনে সরকারি গোয়েন্দার লোক পিছু নিচ্ছে। এসব অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাইছে সবাই।
ক বললেন— কামালের সঙ্গে হয়ত ক্রিস্টোফারের কথা হয়েছে।
—সে হতেই পারে। ঙ বললেন।
—আসলেই এ কথা লেখা আছে যে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে! নাকি ইনকিলাবের বানানো গপ্প এটি! আমি প্রশ্ন করি।
ক বললেন—ইনকিলাবকেই বা বিশ্বাস করা যায় কি করে! হয়ত টাইমসে লেখা হয়েছিল হাইডিং এ আসার আগে যে কথা বলেছিলেন তসলিমা সেসব, নিশ্চয়ই এটা আগের কোনও ইন্টারভিউ।
একটু থেমে কর দিকে তাকিয়ে বললেন–নাকি ট!
কর কপালে ধীরে ধীরে ভাঁজ পড়তে থাকে।
ঙ বললেন—দ্য টাইমসে এর আগে তোমাকে নিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে,সেন্সরশিপ বাই ডেথ। আর ইনকিলাব খবরটি নিয়েছে অষ্ট্রেলিয়ার পত্রিকা দ্য অষ্ট্রেলিয়ান থেকে।
ঝ সবাইকে থামিয়ে বললেন—এটা তো খুব ভাল খবর যে বিদেশের বড় বড় পত্রিকায় লেখালেখি চলছে এ নিয়ে।
তা ঠিক তা ঠিক বলে ক আর ঙ দুজনই সায় দিলেন কিন্তু এও বলে দিলেন যে সাংবাদিকরা যদি আজ আমার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও রকম পথ অবিষ্কার করতে পারে, তবে মোল্লাদের বেশিদিন লাগবে না আমাকে খুঁজে পেতে। সুতরাং সাবধান। এই রহস্যটি নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। যদি ইনকিলাবের খবর সত্য হয়, তবে কি করে ওই সাংবাদিক আমি দেশে কি করছি না করছি জানছে! কোনও কি গুপ্তচর আছে কোথাও! ধন্দে পড়ি।
ঝ প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন যে সংসদে তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন যে সরকারি দল ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিধিবহির্ভূত বাজেট অধিবেশনের শেষ মুহূর্তে মওলানা ওবায়দুল হককে তসলিমা সম্পর্কে বলার সুযোগ করে দিয়েছে।
এ সময় ক হেসে উঠলেন, পত্রিকার একটি পাতা ঝর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন— গোলাম আযমের কথা উঠছে না যে! গোলাম আযম জামাতের সভায় বক্তৃতা দিচ্ছে।
—ইনডোর সভায় নিশ্চয়ই! বলতে বলতে ঝ পত্রিকাটির পাতা তুলে নিলেন।
—ইনডোর হবে কেন! বিশাল ময়দানে। দিনের আলোয়।
পত্রিকার পাতার দিকে ঝুঁকে দেখি ছবিটি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাম আযমের মাথায় জিন্নাহ টুপি, মুখে শাদা দাড়ি, সামনে অগুনতি শাদা টুপির শ্রোতা। কি কাণ্ড কি কাণ্ড! কেউ বাধা দিল না! এত সাহস পেয়ে গেছে গোলাম আযম! স্পর্ধা হল কি করে! কোথায় এখন আওয়ামী লীগ, কোথায় নির্মূল কমিটি! কেউ কিছু বলছে না?
ঙ ঠোঁট উল্টে বললেন— কে আর কী করতে পারবে!
—গোলাম আযম কাদের সাথে দেখা করেছে, সেটা পড়েন।
কর কথায় খবরটিতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে থ হয়ে যাই, সুপ্রিম কোর্ট গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে রায় দেওয়ার পর বাংলাদেশ হিন্দু সংগ্রাম কমিটির লোকেরা জামাতের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। আর গোলাম তাঁদেরই উদ্দেশে বলেন, যে, ধর্মের ভিত্তিতে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, সেটিই প্রকৃত বন্ধুত্ব। এ ধরনের বন্ধুত্বই সবচেয়ে গভীর হয়। ধর্মহীন বন্ধুত্ব ক্ষণভঙ্গুর হতে বাধ্য।
আশ্চর্য! গোলাম আযম ওই হিন্দুদের বলেছেন, আপনাদের মত সত্যের সাধককে শ্রদ্ধা না করে পারছি না। কারণ আপনারা বাংলাদেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে যাচ্ছেন। একজন প্রকৃত ধার্মিকের সাথে অপর ধার্মিকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবেই। একজন ধার্মিক আরেকজন অধার্মিকের চেয়ে ধার্মিককে বেশি পছন্দ করবে, এটাই স্বাভাবিক।
এটুকু পড়েই আমি পত্রিকাটি কর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলি—গোলাম আযম ঠিকই বলেছেন, মিথ্যে বলেননি। তাই তো দেখি আমরা, এদেশের জামাত নেতা ভারতে গিয়ে বিজেপি নেতার সঙ্গে দেখা করছে। কোলাকোলি করছে। দাওয়াত খাচ্ছে। দুদলে তো ভাল বন্ধুত্ব।
ঝ পত্রিকার পাতাটি মাঝখান থেকে তুলে নিয়ে বলেন—সারা দেশে দেখছি হরতাল সফল হয়েছে বলে বিশাল জনসভা হচ্ছে, মোল্লারা মহানন্দে মিছিল করে বেড়াচ্ছে। বলছে, ৩০ জুনের সর্বাত্মক হরতাল এদেশে ইসলামি শাসন কায়েমের পথে জ্বলন্ত মাইলফলক। এসবই খবর! কোনও কি ভাল খবর নেই?
