লেখাটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ হয়ে বসে থাকি আমি। নিঃসন্দেহে এটি বুদ্ধিমান লোকের লেখা। কে এই মাসুদ নিজামী আমি জানি না। নামটি আগে কখনও শুনেছি বলে মনে হয় না। এটি কারও সত্যিকারের নাম নাকি ছদ্মনাম, তাও জানি না। একটি প্রশ্ন আমার মনে বাসা বাঁধে, মৌলবাদীরা ব্লাসফেমী আইনের দাবি করছে কেন, তারা তো ইচ্ছে করলেই আল্লাহর আইনের দাবি করতে পারে, যে আইনে অবিশ্বাসীদের হত্যা করার বিধান আছে। কেন তারা মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য খ্রিস্টানদের তৈরি ব্লাসফেমী আইন চাইছে? কেন আল্লাহর আইনটির, যে আইনে অবিশ্বাসীদের হত্যা করতে হয়, ডান হাত এবং বাঁ পা, বাঁ পা আর ডান হাত প্রথম ঘচাং ঘচাং করে কেটে ফেলতে হয় পেছন থেকে, তার দাবি করছে না! আল্লাহর আইনের চেয়ে খ্রিস্টানের তৈরি আইনে তাদের কেন বেশি আস্থা? কী কারণ এর পেছনে, ভেবে দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়, ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে যুগের পর যুগ বাস করে এখনও মাথা নোয়ানো প্রভু প্রেমটি যায়নি। সাদা চামড়া দেখলেই ভক্তি ধরে এদের, আল্লাহর চেয়ে বেশি ভক্তি।
প্রচার মাধ্যমের এমনই এক গুণ যে কোনও মন্দ খবরই আগুনের মত সাঁ সাঁ করে দৌড়ে যায়, বাতাসের আগে আগে যায়। একজন কেউ যদি কোথাও একটি মিথ্যে কথা লিখে ফেলে, তাহলে সেই মিথ্যেটি এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পত্রিকায় লিখে দিল যে কোরান পড়তে পড়তে সিগারেট খেয়েছি। ব্যাস, এ কথাই এখন ধ্রুব সত্যের মত দাঁড়িয়ে গেছে। যেমন লজ্জা লিখে আমি ৪৫ বা ৪৮ লক্ষ টাকা পেয়েছি বিজেপির কাছ থেকে। এটি লেখা হয়েছিল ইনকিলাবে। যে মানুষেরা ইনকিলাবের কোনও খবর বিশ্বাস করে না, তারা কিন্তু এই টাকার খবরটি বেশ সুন্দরভাবে বিশ্বাস করে বসে আছে। আমি যে এই মিথ্যেটির প্রতিবাদ করেছি, সেটি কেউ গ্রাহ্য করছে না। লক্ষ করেছি, আমার সম্পর্কে নেতিবাচক খবরগুলো মানুষের মনে খুব ধরে। যেমন আমি কোরান সংশোধনের কথা বলেছি, আমি যে প্রতিবাদ করেছি এর, বলেছি যে না আমি এ কথা বলিনি, মানুষ শুনেও এটি শুনছে না। আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করার বিষয় তা হল, মৌলবাদীরা বলছে যে তাদের বিপক্ষ শক্তি তসলিমার পক্ষের লোক। কিন্তু মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে আমার নামটি কিন্তু উচ্চারণ করা হয় না, তারা যে আমার পক্ষের কেউ নয়, তারা যে আমাকে মোটেও পছন্দ করে না, তা বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছে। তারপরও মৌলবাদীরা অমৌলবাদীদের দোষ দেবার জন্য তসলিমার সমর্থক বলে গাল দিচ্ছে। তসলিমাকে সমর্থন করা এ দেশে দোষের বিষয়। তসলিমা একটি ঘৃণ্য নাম। এই নামটি একটি কালো কুচ্ছিত নাম। এই নামের কালিমা মেখে কেউ অμছুত হতে চাইছে না।
আজ পোলাও মাংস খাওয়ালেন ঞর স্ত্রী। পাশে দাঁড়িয়ে পাতে তুলে দিলেন খাবার। যেন আমি এ বাড়ির সম্মানিত কোনও অতিথি। আরও খাও, আরও নাও বললেন অনেকবার। অনেকটা মার মত। জানি না মা কেমন আছেন। মা কি খাচ্ছেন দাচ্ছেন কিছু! মনে হয় না। নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছেন না মা। নিশ্চয়ই দিন রাত কাঁদছেন। মাকে সান্ত্বনা দেবার মত কেউ কি আছে পাশে! জানি না কিছুই। ঞর স্ত্রী আমাকে বলেছেন এই বাড়িটি আমার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। এত কাছে বসে আছি, অথচ আমার সাধ্য নেই আমার বাড়িটিতে যাওয়ার। আমার বাড়ির কেউ কি জানে যে আমি কত কাছে এখন তাদের! মার চেয়ে বেশি বাবার কথা মনে হয়। বাবা কখনও কাঁদার মানুষ নন। তিনি শক্ত মানুষ। তিনি যুক্তির মানুষ। বাবাকে আমি এখন বেশ কল্পনা করতে পারি, দুশ্চিন্তায় তিনি মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছেন, তাঁর রক্তচাপ বাড়ছে। তিনি মুড়ির মত ওষুধ খাচ্ছেন রক্তচাপ কমাতে, কিন্তু কিছুতেই কমছে না। তিনি ভাবছেন তাঁর দুর্ভাগা কন্যাটির কথা। বাবার রক্তচাপ বেড়ে বেড়ে হঠাৎ যদি হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়! তবে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ি তো আমিই হব। নিজেকে কোনওদিনই ক্ষমা করতে পারবো না আমি। বাবাকে একবার আমি দেখতে পাবো তো আমার বা তাঁর মৃত্যুর আগে! একবার কি দেখা হবে না আমাদের! ইচ্ছে করে আবার কৈশোরে ফিরে যেতে। বাবা মা ভাই বোন নিয়ে চমৎকার নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করতে ইচ্ছে করে। লেখালেখি করব না। ডাক্তারি করব। বাবা যেমন আমাকে বড় ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন, তেমন বড় ডাক্তার হব। শহরে একটি ক্লিনিক দেব, দেখে তিনি ভীষণ আনন্দ পাবেন। তাঁর কোনও একটি ছেলেমেয়ে ডাক্তার হয়নি আমি ছাড়া। আমাকে দেখে তিনি নিজের জীবনকে সার্থক মনে করবেন। –স্বপ্নটি নিয়ে আমি শুতে যাই, রাতে ঘুম হয় আমার।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩২
পাঁচ জুলাই, মঙ্গলবার
গতকালের পত্রিকায় ছাপা খবর ইচ্ছে করেই পড়িনি। আজ হাতে নিয়েই দেখি বিশাল মিছিলের ছবি। সন্ত্রাসী নৈরাজ্যবাদীদের গ্রেফতার ও বিচার, দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন সংবাদপষেন হামলাকারীদের শাস্তি প্রদান ও ব্লাসফেমী আইন প্রণয়নের দাবিতে জাতীয় যুব কমাণ্ড কেন্দ্রীয় কমিটি গতকাল রাজধানীতে যে বিশাল মিছিল করেছে, তার ছবি।
তসলিমা পালালে সরকারকে জনতার আদালতে যেতে হবে। জাতীয় যুব কমাণ্ড ঘোষণা করেছে যে তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বক্তব্য সংবাদপষেন প্রচারকারী ইউসিসএর প্রেস বিজ্ঞপ্তিটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা না হলে যুব কমাণ্ড বাংলাদেশের মার্কিন তথ্য কেন্দ্র ঘেরাও করবে। গতকাল দৈনিক বাংলার মোড়ে আয়োজিত এক সমাবেশে যুব কমাণ্ড নেতারা এ ঘোষণা দেন। বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে কুখ্যাত মুরতাদ তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি কার্যকর করা হবে। তারা সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে তসলিমা যদি পালিয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতাসীনদের জনতার আদালতে দাঁড় করানো হবে। বক্তারা অবিলম্বে তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতারের দাবি জানান। যুব কমাণ্ড সভাপতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উদ্দেশে বলেন, তসলিমার প্রতি তোমার ভালবাসা থাকতে পারে, কিন্তু এটি আমেরিকা নয়, এটি বাংলাদেশ। ওলামা মাশায়েখের এ দেশে ইসলামের অবমাননা করা হলে জনতা চুপ করে থাকবে না। তসলিমাকে এ দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নরওয়ের কূটনীতিক কোনও ভূমিকা রাখলে বাংলাদেশ জ্বলে উঠবে।
