ছোটদা খবর আনলেন, চিপাচসের অনুষ্ঠান হচ্ছে, ঢাকা থেকে অভিনেতা বুলবুল আহমেদ আসছেন। সেই বুলবুল আহমেদ, ভাল অভিনেতা হিসেবে যাঁর খ্যাতি, অদ্ভুতুড়ে মারদাঙ্গা ছবিতে আর যে অভিনেতাই থাকুন বুলবুল আহমেদ নেই সেই বুলবুল। সূর্যকন্যা ছবির বুলবুল।সীমানা পেরিয়ের বুলবুল। চন্দনার সুযোগ হয়নি অনুষ্ঠানে যাওয়ার, বাড়ি থেকে ওর অনুমতি মেলেনি। ছোটদার সঙ্গেও বাইরে বেরোনো সহজ কথা নয়, ছোটদা বখে যাওয়া ছেলে, তাঁর সঙ্গে ঘুরে আমাকে নষ্ট হতে দিতে বাড়ির কেউ রাজি নন। কিন্তু তারপরও অনুমতি জোটে, চলμচিত্রের অভিনেতা অভিনেষনীর জন্য মার এক ধরনের পক্ষপাত আছে, যতই তিনি ধার্মিক হোন না কেন। চোখের সামনে সিনেমার নায়ককে দেখব, উত্তেজনায় ছটফট করছি। ছোটদা বললেন অটোগ্রাফ খাতা লইতে ভুলিস না। অটোগ্রাফ খাতা বলতে কোনও খাতাই আমার নেই। যাবার পথে একটি লাল নীল সবুজ রঙের কাগজঅলা খাতা কিনে দিলেন ছোটদা। বুলবুল আহমেদ বসেছিলেন বিশাল এক টেবিলের এক কোণে, আর সেই টেবিলের কিনার ঘেঁসে লোক ছিল বসে, দাঁড়িয়ে। সহজ ভঙ্গিতে তিনি কথা বলে যাচ্ছিলেন সবার সঙ্গে যেন এরা তাঁর জন্ম জন্ম চেনা। যাঁর যা প্রশ্ন ছিল, হেসে উত্তর দিচ্ছিলেন। যখন অটোগ্রাফ নেবার সময় হল, বুক কাঁপছিল, কি বলব তাঁকে? আপনার অভিনয় খুব ভাল লাগে। অভিনয় নিশ্চয় খুব ভাল লাগে, তা না হলে এখানে আসা কেন, অটোগ্রাফ নেওয়াই বা কেন! অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় নাম যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমি মৃদু কণ্ঠে নামটি উচ্চারণ করলাম, তিনি পুরো নাম জানতে চাইলেন!বলার পর প্রাণোচ্ছল হাসিতে আমাকে অভিভূত করে বললেন, তুমি তসলিমা নাসরিন? তুমি আমার অটোগ্রাফ নেবে কি! আমি তো নেব তোমার অটোগ্রাফ। তুমি তো আমার চেয়ে বিখ্যাত হে! আমি মখু লুকোলাম ছোটদার আড়ালে। সিনেমার লোকেরা যে আর সাধারণ মানুষের মতই মানুষ, তারাও যে হাসে কাঁদে গাল দেয় গাল খায়, তারাও যে পেচ্ছাব পায়খানা করে, তাদেরও যে সর্দি হয়, গা ম্যাজম্যাজ করে আগে আমার বিশ্বাস না হলেও বুলবুল আহমেদকে কাছ থেকে দেখার পর হল। রাজ্জাক, কবরী, আজিম, সুজাতা, জাফর, ববিতা, আলমগীর শাবানা সকলে যে আমাদের মত মানুষ, তাতে বিন্দুমাত্র সংশয় রইল না।
চন্দনা পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়ির ছেলে ছোকড়াদের ছুঁড়ে দেওয়া চিঠি বা চিরকুটের খুচরো প্রেম ছেড়ে হঠাৎ জাফর ইকবালে নিমজ্জিত হয়। জাফর ইকবাল চলμচিত্র জগতের সবচেয়ে সুদর্শন নায়ক। নায়ক জাফর ইকবাল আর নায়িকা ববিতার প্রণয় নিয়ে নানা কথা লেখা হয় পত্রিকায়। ওসব আমরা মোটেও পরোয়া করি না। সুদর্শন বলে কথা। চারদিকে সুদর্শনের এমন অভাব যে জাফর ছাড়া আমাদের গতি নেই সে আমরা দুজনই বুঝি। একদিন চিপাচসের হয়ে ছোটদা ঢাকায় গিয়ে জাফর ইকবালের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে এলেন, আমি আর চন্দনা দুজনই ছোটদার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি আদ্যোপান্ত শুনতে। শুনে আগ্রহের আগুনে আরও সেরখানিক ঘি পড়ে। ছোটদার কাছ থেকে জাফর ইকবালের পাঁচ নয়াপল্টনের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে সে ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠাই। দুদিন পরই জাফর ইকবালের উত্তর। জাফ লেখা সুন্দর কাগজে ভুল বানানে বন্ধু সম্বোধন করে লেখা ছোট চিঠি। আত্মহারা বিকেল কাটে। পরদিন সকালে চন্দনাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে অন্য দিনের মত কলেজে যাই বটে, তবে আমাদের পুরো দিন জুড়ে জাফর ছাড়া আর কিছু থাকে না। না পড়া,না লেখা,না অন্য কিছু চিঠির বানান ভুল আপাতত আমরা ক্ষমা করে দিই, সে জাফর ইকবাল বলেই দিই। পত্রমিতা হওয়ার অনুরোধ করে যারাই ভুল বানানে চিঠি পাঠায়, তাদের কিন্তু রীতিমত উপেক্ষা করি। চন্দনাকে জাফরের কাছে লিখতে ইন্ধন যোগাই। কিছুদিন পর ওর কাছেও চিঠি আসে জাফরের। সে চিঠি নিয়ে ও পরদিন কলেজে আমার সঙ্গে দেখা না হওয়ার অপেক্ষা করে প্রায়-উড়ে অবকাশে চলে আসে। জাফরের স্বপ্নে আমাদের দুজনেরই সময় শিমুল তুলোর মত উড়তে থাকে। দাদার সঙ্গে গিয়ে দুজন দুটো ইংরেজি ছবি দেখে আসার পর আমার তেমন প্রতিক্রিয়া না হলেও, চন্দনা উঁচু জুতো কিনে জাফরের ছবি সে জুতোয় সেঁটে ছবির ওপর আই লাভ ইউ লিখে দিব্যি কলেজে আসতে লাগল। কেবল তাই নয়, বিদেশি ফ্যাশন ম্যাগাজিনএর ডিজাইন দেখে একটি লম্বা স্কার্ট বানিয়ে, পরে, মাথায় একটি বড় হ্যাট লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে লাগল, লোকে চোখ গোল করে চন্দনাকে দেখে, যেন ও এ শহরের তো নয়ই, এ জগতেরও কেউ নয়। আমিও ঠিক একই রঙের একই রকম কাপড় কিনে চন্দনার স্কার্টের মত একটি স্কার্ট বানাই। ফ্যাশনের কোনও বোধ আমার ভেতর আগে ছিল না, বীজটি চন্দনাই বপন করে। এর মধ্যে আমার প্রাচীনপন্থী বাবা একটি কাণ্ড ঘটান যা আমাদের যগু পৎ বিস্মিত ও মগ্ধু করে। তিনি বাড়িতে একটি টেলিফোন আনেন। টেলিফোনটি তালা দেওয়া সুতরাং বাড়ি থেকে কোথাও কথা বলার সুবিধে নেই। টেলিফোন আনার মূল উদ্দেশ্য বাবা আরোগ্য বিতান থেকে ফোন করে বাড়ির মানুষ সব যে যার জায়গামত আছে কি না, যে যার কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালন করে যাচ্ছে কি না খবর নেবেন। বাড়িতে ফোন আসায় সবচেয়ে খুশি ছোটদা। তিনি তারকাঁটা বাঁকিয়ে ফোনের তালা খুলে ঢাকায় গীতার কাছে প্রতিরাতে ফোন করা শুরু করেছেন। আঁচ পেয়ে বাবা তালাবন্ধ টেলিফোন তাঁর ঘরের সেত্রে²টারিয়েট টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে ড্রয়ারে তালা দিলেন। এই সমস্যাটির সমাধান আর কারও মাথায় না খেলুক ছোটদার মাথায় খেলে। তিনি দিব্যি টেবিলের ঢাকনা সরিয়ে ড্রয়ার থেকে ফোন বের করে আগের মতই বাঁকা তারকাঁটায় ফোনের তালা খুলে কথা বলতে লাগলেন। এদিকে বাড়িতে টেলিফোন আসার আনন্দে আমি দিকে দিকে বিলি করে যাচ্ছি নম্বর। তারপর সেই সন্ধেটি আসে, যে সন্ধেয় স্বয়ং জাফর ইকবাল ফোন করেন আমাকে। ছোটদা ফোন ধরে আমাকে দিলেন। এর আগে টেলিফোনে আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। হ্যালো বলার পর আমার আর স্বর ফোটে না। এক ঠাণ্ডা নিস্তব্ধতায় আমি ডুবে যেতে থাকি। মরিয়া হয়ে শব্দ খুঁজি। অন্তত একটি বা দুটি শব্দ। যত খুঁজি, ততই যেন শব্দ সব আমার ত্রিসীমানা থেকে পালায়। ওদিক থেকে জাফর একা কথা বলতে বলতে এপাশে কোনও প্রাণী নেই ভেবে ফোন রেখে দেয়। আবারও ফোন বাজে, আমি দৌড়ে অন্য ঘরে চলে যাই বলতে বলতে জাফর ইকবাল ফোন করলে আমারে দিও না। পরদিন রাতেও ওই হয়। ফোন বেজে চলে। ছোটদা ধরেন, আমাকে জানান জাফর ইকবাল আবার ফোন করেছিল। কিন্তু আমার কি করার আছে! চিঠিতে আমি তুমি লিখি জাফর ইকবালকে, তার কণ্ঠস্বরের সামনে পেটে বোমা মারলেও আমার মখু থেকে তুমি বেরোবে না। শেষে হ্যালো বলা, তুমি বলা, কেমন আছো ভাল আছি ইত্যাদি কথা ঘন্টাখানিক চর্চা করার পর যখন ফোন এলে ধরব বলে প্রস্তুতি নিই, ফোন বাজে, ধরে শুনি বাবার কণ্ঠ, ফোন কি কইরা ধরলি!ফোন ত তালা দেওয়া ড্রয়ারে। দেবনাথ পণ্ডিত যেমন চোখ্যে ভাসাইতে বলেন কোনও জটিল অংকের সমাধান, এই ফোন ধরার পরিণাম কি হতে পারে তা চোখ্যে ভাসিয়ে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি আমার মাতৃভাষা বাংলা। এর পরের ফোনটি সাহস করে ছোটদা ধরেন, ওটি জাফর ইকবালের। আমাকে রিসিভার দিয়ে চাপা স্বরে বলেন, ক হ্যালো, হ্যালো ক। আমার হ্যালো বলা হয়, কেমন আছর উত্তরে ভাল আছি বলা হয়, চিঠি পেয়েছোর উত্তর পেয়েছি বলা হয় কিন্তু আমার দিক থেকে কোনও প্রশ্ন করা হয় না যেহেতু প্রশ্ন করতে গেলেই তুমি সম্বোধনটির প্রয়োজন হয়। কি পড় তুমি? প্রশ্নটি শোনার পর আমাকে যেন জাফর ইকবাল নিতান্তই বেণী দোলানো কিশোরী না ভাবে, বলি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলি ঠিক এ জগতে দাঁড়িয়ে নয়, টেবিলের ঢাকনা সরিয়ে চুরি করে তারকাঁটা দিয়ে তালা খোলা টেলিফোন সেটের পাশে দাঁড়িয়ে নয়, বাইরের ল্যাম্পপোস্ট থেকে জানালার লাল নীল কাচ বেয়ে যে আলো এসে পড়ে আমার গায়ে সেটিকে চাঁদের মনোরম আলো বলে ভুল করতে করতে, জাফর ইকবালের সঙ্গে নির্জন সমুদ্রতীরে হাত ধরে মনে মনে হাঁটতে হাঁটতে।
