এর মধ্যে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। আমাকে বাড়ি এসে পড়িয়ে যাওয়ার জন্য দেবনাথ চক্রবর্তীকে নিয়োগ করেছেন বাবা। দেবনাথ চক্রবর্তীর বাড়িতে ছাত্র ছাত্রীরা দল বেঁধে পড়তে যায় আর আমাকে তাঁর মত পণ্ডিত লোক রাজি হয়েছেন বাড়ি এসে পড়াতে,চাট্টি খানি কথা নয়, সীমা ছাড়ানো সৌভাগ্য! কিন্তু এর একটি বিপদ লক্ষ করি, কলেজের ক্লাসে আমার শ্রীমখু খানা তাঁর দর্শন করা চাই। কেবল দর্শন করা নয়, যত প্রশ্ন তাঁর, সব আমাকেই করা চাই, এবং সঠিক উত্তর আর কারও নয়, আমার কাছ থেকেই তাঁর শোনা চাই। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার পক্ষে উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় না, এবং তিনি প্রতি ক্লাসে আমার মাথায় চড় ঘুসি ডাস্টার সব কিছুরই বষর্ণ ঘটান। বিকেলে যখন তিনি অবকাশে উদয় হন, শরীর আমার অবশ হয়ে আসে। গোলআলুর মত শরীর, পরনে চিরাচরিত নীল শার্ট কালো প্যান্ট, শার্টের পকেটে একটি মোটা কালো কলম, পকেটের নিচে কালির দাগ, পায়ে রাবারের কালো জুতো, সিঁথি করে চুল আঁচড়ানো, মখু ভর্তি পান,হেলে দুলে হাঁটেন, মানুষটি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কলিমুদ্দিন সলিমুদ্দিন যে কেউ হতে পারত, কিন্তু তিনি দেবনাথ চক্রবতীর্, বিশাল মাথা জুড়ে জটিল বিজ্ঞানের জ্ঞান, তাঁর কাছে না পড়ে কোনও ছাত্র ছাত্রীর পক্ষে সম্ভব নয় ভাল ফল করা পরীক্ষায়। দেবনাথ পণ্ডিতের কারণে আমার প্রতিটি বিকেল ধং্ব স হতে থাকে। আমি অংকে ভুল করলাম কি পদার্থবিজ্ঞানের স−ূ ত্র তিনি সঙ্গে সঙ্গে খাতা বই দলামোচা করে ছুঁড়ে ফেলে দেন মেঝেয়। ইয়াসমিন আশে পাশেই থাকে ওগুলো আবার টেবিলে তুলে দেওয়ার জন্য। শক্ত শক্ত কিল ঘুসি থাপ্পড় বিরামহীন চলতে থাকে আমার মাথা লক্ষ করে। বাড়ির মানুষেরা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার করুণ অবস্থা দর্শন করে। মা দয়াপরবশ হয়ে ইয়াসমিনের হাতে একদিন কাঁঠাল গাছের একটি ডাল ভেঙে পাঠালেন, যেন এটি দিয়ে আমার পিঠে মারা হয়। পিঠে যেন মারা হয়, মাথাটি যেন বাঁচে। মাথায় যেইভাবে উল্ডা পাল্ডা মারে, কবে না জানি মাথাডাই যায়! মা আমার মাথার চিন্তায় চিন্তিত। দেবনাথ পণ্ডিতের রাগ যখন ওঠে, তখন আর ডালের দিকে তাঁর চোখ পড়ে না, ডাল পড়ে থাকে ডালের মত, আগের মত আমার মাথায় কিল ঘুসি মেরেই যেতে থাকেন তিনি, আবারও আগের মত দলামোচা করে ছুঁড়ে ফেলতে থাকেন বইখাতা। আমার বিকেল কেবল নয়, জীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন দেবনাথ পণ্ডিত।
অতিষ্ঠ জীবনে তারপরও উত্তেজনা কম নয়। বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন নামে একটি বিভাগ শুরু হওয়ার পর আমি আর চন্দনা সিদ্ধান্ত নিই এতে লিখব। একটি শব্দের জন্য আটআনা খর্চা, চারটে শব্দে দুটাকা। দুতিনটাকার বেশি আমার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব নয়, কলেজের রিক্সাভাড়ার পয়সা বাঁচিয়ে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে পোস্টাপিসে নেমে মানিঅর্ডার ফরমে বিজ্ঞাপন লিখে পাঠাই, চন্দনাও। সিনে পত্রিকায় চলচিত্রের চালচিত্র আর বিচিত্রায় দেশ-কাল-সমাজ নিয়ে থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়এর বাইরে যা ইচ্ছে তাই লেখার একটি মোক্ষম সুযোগ জোটে আমাদের। আমরা যা ইচ্ছে তাই করার জন্য ছটফট করা দুজন মানুষ। কবি রফিক আজাদ ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, একটি চুমু দিলে একটি কবিতা দেব, দেখে উৎসাহ ক্যাঙারুর মত লাফায়। চন্দনা আর আমি দুজন মিলে লিখি, আমরা এক আত্মা এক প্রাণ। আমি লিখি আমি দুরন্ত দুর্বার, চন্দনা লেখে আই এম দ্যা গ্রেটেস্ট। আবারও চিত্রালীর পাতার মত কাণ্ড ঘটে, আমি একটি লিখি তো আমাকে নিয়ে কুড়িজন লেখে, কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। মাত্র দুটো তিনটে শব্দ দিয়ে গড়া একটি বাক্য মরা পুকুরে পাথর ছোঁড়ার মত, পুকুর জুড়ে ঢেউ ওঠে। পাড়ে বসে ঢেউ দেখার আনন্দ আমি আর চন্দনা দুজনই উপভোগ করি। আমাদের গণ্ডির জীবন, চারদিকে বেড়াজাল, পায়ে পায়ে নিষেধ, গায়ে গায়ে না, এই না নিষেধ অমান্য করার শক্তি বা সাহস আমরা শব্দ দিয়ে অর্জন করি। আমাদের শব্দগুলো এমন সগবের্ সদম্ভে উচ্চাজ্ঞরত যে পড়লে যে কেউ ভেবে বসে অহংকারি, অবিনীত, উদ্ধতমনা, উন্নাসিক দুটো উগ্র কিশোরী, বাধঁ ন মানে না, নীতিরীতির থোড়াই তোয়াক্কা করে;যদিও বাস্তব সম্পূর্ণই বিপরীত, বাধঁ ন না মানা জীবনটি কেবল আমাদের স্বপ্নের জীবন। অনেকে আবার এও ভাবে, এক মানুষের আড়ালে দুটি নাম, চন্দনা আর তসলিমা ভিন্ন কোনও অস্তিত্ব নয়। রিক্সাভাড়া থেকে শীতের পিপঁ ড়ের মত দুআনা চারআনা সঞ্চয় করে শিশিবোতলকাগজ থেকে আর বাপদাদার পকেট থেকে তাঁদের জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারেও যে পয়সা কামাই করি, তা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের খর- স্রোতে ভেসে যেতে থাকে।
চন্দনা আর আমার কখনও শুদ্ধ বাংলায় কথা হয়নি, সবসময়েই ময়মনসিংহের গ্রামঅঞ্চলের ভাষায়। আমার চেয়ে এ ব্যাপারেও চন্দনা এক কাঠি দু কাঠি নয়, চার কাঠি ওপরে। আমি বলি, গোসলটা কইরা আসি, চন্দনা বলে, গুসুলডা কইরা আহি। চন্দনার ভাষা শুনে আমার হাসি পেত প্রথম প্রথম, কিন্তু অচিরে নিজেই আমি পতিত হই ওই ভাষার জালে। কে কত বেশি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করতে পারে, তারই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় আমাদের মধ্যে। বরাবরই আমি হেরে যাই ওর কাছে। ইশকুল কলেজে যেতে যেতে ছেলে মেয়েরা আঞ্চলিকতা যতদূর সম্ভব কমাতে চেষ্টা করে। চন্দনা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি অঞ্চল থেকে এসেছে, বাড়িতে চাকমা ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোলে ওর মত শুদ্ধ বাংলা যেমন লোকে কম জানে, ওর মত আঞ্চলিক সূরে এবং শব্দে কথা বলা জন্ম থেকে এ শহরে বেড়ে ওঠা লোকও জানে কম। চন্দনা আমাকে মুগ্ধ করে তো বটেই, অবাকও করে। চন্দনার সঙ্গে কথা যেমন বলেছি ময়মনসিংহের অজ পাড়া গাঁর ভাষায়, চিঠি লেখাও সে ভাষাতেই হয়েছে। লোকে, এ জানি, মুখে যে রকম ভাষাতেই কথা বলে, চিঠির বেলায় শুদ্ধ ভাষা চাই। চন্দনা এ জিনিসটি মানেনি কোনওদিন। যার সঙ্গে যে ভাষায় ও কথা বলেছে সে ভাষাতেই চিঠি লিখেছে। ময়মনসিংহে আসার আগে ও ছিল কুমিল্লায়, কুমিল্লার বান্ধবীকে চিঠি লিখেছে কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায়, কুমিল্লা আসার আগে ছিল চট্টগ্রামে, ওখানকার বান্ধবীকে চট্টগ্রামের ভাষায়। আর আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর সব বান্ধবী বাতিল করে দিয়ে এক আমাকে নিয়েই মেতে থাকল। এদিকে আমার জগতে চন্দনা ছাড়া বাকিরা ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করেছে। আমার হাত ছিল না এতে, চন্দনার ব্যক্তিত্ব, অভিনবত্ব, অসাধারণত্ব আমাকে অভিভূত করে রাখে, আচ্ছত করে রাখে সকল সময়। মেট্রিকের পর এবং কলেজ শুরু হওয়ার আগে খুব সঙ্গত কারণেই আমাদের দেখা হওয়ার সুযোগ ছিল কম। ঘরে বসে থাকতে আমাকে যেমন হত, চন্দনাকেও। বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে যেতে পারব যখন তখন, প্রশ্নই ওঠে না। বাইরে বের হওয়া মানে মার সঙ্গে নানিবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, পীরবাড়ি যাওয়া তো অনেক আগে বাদই দিয়েছি, মার কাছ থেকে অনুমতি পুরো না নিতে পারলেও অন্তত নিমরাজি করিয়ে ছোটদার সঙ্গে অনুষ্ঠানাদিতে যাওয়া, দাদার সঙ্গে সিনেমায় যাওয়া। সিনেমায় সবসময় দুপুরের শোএ যেতাম, বাবা যেন টের না পান। শো শেষ হত বিকেলে, তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে আমি দাদা ইয়াসমিন এমন মুখ করে বসে থাকতাম যেন কস্মিন কালেও সিনেমা কাহাকে বলে জানি না। চন্দনাকে নিয়েও কদিন গিয়েছি সিনেমায়, তবে সে দাদারই আয়ত্তাধীন হয়ে। আলমগীর কবীরের সীমানা পেরিয়ে ছবিটি দেখে আসার পর দেখে আসার পর ছবিতে বুলবুল আহমেদের সংলাপ আমাদের মুখে মুখে ফিরত। বোকা সোকা তোতলা লোকের ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে এক নির্জন দ্বীপে বুলবুল বলেছিলেন জয়শ্রীকে, ত তর লা লাইগা আমি কি না করছি, ত তরে আমি বুকে রাখছি, পিঠে রাখছি .. ! বুলবুলের এই সংলাপ আমার আর চন্দনার মুখে মুখে ফিরত। মূলত চন্দনাই শুরু করেছিল, ওর ছোটভাই সাজুর সঙ্গে ওর এক দফা যুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর। সাজুর হাতে কিলচড় খেয়ে ক্ষুব্ধ চন্দনা আমার সঙ্গে দেখা হতেই ঘটনার বর্ণনা করে বলল, ও ওর লাইগা আমি কি না করছি, ও ওরে আমি বুকে রাখছি, পে পেটে রাখছি, মা মাথায় রাখছি, কান্ধে রাখছি। ভাই দুটোর সঙ্গে যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে আহত হওয়ার কোনও কষ্ট চন্দনা পুষে রাখত না, কিন্তু একটি কষ্ট ও জীবনভর পুষে রেখেছে। মলিনা চাকমা যখন জন্ম দিয়েছিলেন কন্যা সন্তান, সুব্রত চাকমা বড় একটি দা নিয়ে নিজের কন্যাকে আঁতুর ঘরে হত্যা করতে এসেছিলেন, কন্যা তাঁর পছন্দ নয় বলে। আঁতুরঘরে আত্মীয়দের হস্তক্ষেপে চন্দনা বেঁচে গেছে ঠিকই, মলিনা চাকমা এরপর দুটো পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার পর চন্দনার ওপর ত্রে²াধটিও সুব্রত চাকমার কমেছে, কিন্তু চন্দনা কখনই ওর বাবাকে ক্ষমা করতে পারেনি, এখনও দুঃস্বপ্নের মত দৃশ্যটি দিবসরজনী ওর মনের ভেতর নাছোড়বান্দার মত বসে থাকে।
