বাবা আমার বেড়ে উঠতে থাকা শরীর দেখে মার কাছ থেকে একটি ওড়না সংগ্রহ করে আমার দুকাঁধে ফেলে বললেন, এইভাবে পইরা থাকবা, তাইলে সুন্দর লাগবে। বাবার এই কথায় এত তীব্র অপমান আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে যে বেড়ে ওঠা বুকের লজ্জায় সারারাত আমি বালিশে মখু গুঁজে কাঁদি। বুক ঢেকে রাখার এই বাড়তি কাপড়টি পরতে আমার লজ্জা হয়, কারণ এটিই আমার মনে হয় প্রমাণ করে যে এটির আড়ালে কিছু আছে, কিছু নরম কিছু শরম কিছু না বলতে পারা কিছু তাই ঢাকতে হয়, কারণ যা আছে তা বড় অশ্লীল, বড় লাগামছাড়া বেড়ে ওঠা, ওসব যেন দৃশ্যমান না হয়। ওড়না যেন না পরতে হয়, শরীরের কোনও অশ্লীলতা যেন প্রকাশিত না হয় আমি কুঁজো হয়ে হাঁটি। কুঁজো হওয়াই অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। মা পিঠে কিল দিয়ে বলেন সোজা হইয়া হাঁট, ওড়না পইরা ল। ওড়না পরলে সোজা হইয়া হাঁটবি, এমন যে গুঁজা হইয়া হাঁটস, পিঠের হাড্ডি পরে আর সোজা হইব না। তারপরও ইচ্ছে করে না সোজা হতে, বুক ঢাকতে ওড়নায়। জিনিসটিকে বেঢপ একটি জিনিস বলে মনে হতে থাকে। ওড়না পরি বা না পরি, মানুষ জানে যে আমি বড় হয়ে গেছি। মেট্রিক দেওয়া মেয়েদের, বিয়ে কি, বাচ্চা কাচ্চাও হয়ে যায়, মা বলেন। শুনে একটি ধারালো কাঁটা বিঁধে থাকে বুকে। বুক ধড়ফড় করে। আমার বড় হতে ইচ্ছে করে না। বিয়ে ব্যাপারটি আমার কাছে কেবল ভয়ের আর যন্ত্রণার নয়, বড় অশ্লীলও মনে হয়। সে অন্য কারও বেলায় হলে হোক, আমার বেলায় যেন কখনও না হয়। ছুঁড়ে ফেলে দিই বাবার পরিয়ে দেওয়া ওড়না। আমি বড় হয়ে গেছি, এ ব্যাপারটি কাউকে বোঝাতে আমার ভয় হয়।
পরীক্ষার পর ইশকুলের বই থেকে নিস্তার পাবো,এরকম একটি স্বপ্ন ছিল। ঢাকার পিকনিক থেকে ফিরে এলে বাবা আমার স্বপ্ন গুড়িসুদ্ধ উপড়ে নিয়ে বলেছেন পুরোনো বইগুলোই আবার আগাগোড়া পড়তে, প্রতিটি কলেজে ভর্তি পরীক্ষা হবে, খুব কঠিন সেই পরীক্ষা, না পাশ করলে আমার কপাল থেকে পড়াশোনার পাট জন্মের মত চুকে যাবে, সারাজীবন অশিক্ষিত খেতাব নিয়ে আমাকে দুঃসহ জীবন পার করতে হবে। অতঃপর সেই একই বই সামনে নিয়ে আমাকে বসে থাকতে হয়। পড়া থেকে উঠে কি করতে হবে তাও বাবা জানেন, অবসর বিনোদনের জন্য তো তিনি দিয়েই রেখেছেন বেগম।
মেট্রিকের ফল যেদিন বেরিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ দাস দুপুরের দিকে অবকাশে ছুটে এসে উল্লাসে জয়ধ্বনি করলেন। আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি। খবরটি শুনে যখন আমি বাড়িময় খুশিতে লাফাচ্ছি, বাবা এলেন, হাতে পরীক্ষার ফলের কাগজ। তিনি আমাকে কাছে ডেকে মা মা বলে জড়িয়ে ধরবেন, খাঁচা ভরে রসগোল্লা, মালাইকারি,কালোজাম, চমচম এনে বাড়ির সবাইকে খাওয়াবেন,এ ব্যাপারে আমি অনেকটাই নিশ্চিত। যখন আমাকে ডাকলেন, খুশিতে উপচে ওঠা মখু টি নিয়ে কাছে গেলাম। বাবার আলিঙ্গনের অপেক্ষায় যখন আমার শরীর প্রস্তুত, বাবার হষোগচ্ছঅ!স উপলব্ধি করতে যখন আমার মন প্রস্তুত, গালে শক্ত এক চড় কষিয়ে বললেন, থার্ড ডিভিশন পা্ইছস, লজ্জা করে না?
থার্ড ডিভিশন? স্তম্ভিত মখু বাবাকে শুধরে দেয়, আমি তো ফার্স্ট ডিভিশন পাইছি।
বাবা এবার আমার মুখে মাথায় ক্রমাগত চড়ের বন্যা বইয়ে দিতে দিতে বলেন, স্টার পাইছস? পাস নাই। কয়ডা লেটার পাইছস? লেটার না পাইয়া ফার্ষ্ট ডিভিশন পাওয়া মানে হইল টাইন্যা টুইন্যা পাশ করা,টাইন্যা টুইন্যা পাশ করা মানে থার্ড ডিভিশন পাওয়া। আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তন থেকে মোট তিনজন প্রথম বিভাগে পাশ করেছে, কেউই তারকাখচিত নয়। কারও লেটার জোটেনি। তা না হোক, বিদ্যাময়ী ইশকুল থেইকা তো পাইছে, জিলা ইশকুল থেইকা তো পাইছে! বাবা আমাকে কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে পড়ার টেবিলের কাছে ধাক্কা দিয়ে ফেললেন। দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, যারা স্টার পাইছে, তারা ভাত খাইছে,তুই খাস নাই? মাস্টার রাইখা তরে আমি পড়াইছি, থার্ড ডিভিশন পাওয়ার লাইগা নাকি, হারামজাদি। সামনে একটি বই খুলে আমি স্থির বসে থাকি, বইয়ের অক্ষরে টপটপ পড়তে থাকে নোনা জল।
অনেক রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমি বেড়ালের মত শব্দহীন হেঁটে হেঁটে ইঁদুরের বিষ খুঁজতে থাকি। আমার এই বেড়ে ওঠা শরীর, আমার এই উদ্ভট অস্তিত্ব, আমার এই অপদার্থ মস্তিষ্ক সব কিছুই আমাকে এমন একরত্তি করে তোলে যে ক্ষুদ্র হতে হতে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ইচ্ছে করে অদৃশ্য হয়ে যেতে। ইঁদুরের কোনও বিষ জোটে না, যা জোটে তা ঘরের কোণে ধুলো পড়া একটি ইঁদুর ধরার ফাঁদ।
০৬. ও আমার ছোট্ট পাখি চন্দনা
আবাসিক আদর্শ বালিকা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেনী থেকে প্রতিটি শ্রেণীতেই বৃত্তি পেয়েছি আমি, সে বৃত্তির একটি টাকাও কোনওদিন নিজের জন্য রাখতে দেননি বাবা, গুনে গুনে তুলে নিয়ে গেছেন। মা বলেছেন, তর বাবা তর ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখতাছে টাকা। তুই বড় হইলে দিব। মার কথা বিশ্বাস হত আমার। বাবার হাতে চলে যাওয়া টাকাকে নিজের টাকা ভেবে একধরণের স্বস্তি হত। বড় হয়ে ওই টাকায় ঘর বোঝাই বই কেনার স্বপ্ন দেখতাম। ইয়াসমিন পঞ্চম শ্রেণীতে দুবার থেকে একটি কাণ্ড ঘটিয়েছে, ওকে ইশকুল বোর্ডের বৃত্তি পরীক্ষায় বসিয়েছিলেন বাবা, পরীক্ষায় ভাল করে ও দিব্যি বৃত্তি পেয়ে গেছে। এখন ইয়াসমিনকে ডাকতে হলে বাবা বলেন, কই বৃত্তিধারী ছাত্রী কই! পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষা আমার দেওয়া হয় নি, অষ্টম শ্রেণীরটি দেওয়া হলেও কপালে কিছু জোটেনি। কপালে কিছু জোটেনি বলেই আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ইয়াসমিনকে বৃত্তিধারী ছাত্রী বলে ডাকেন বাবা। কেবল তাই নয়, বাবা আমাকে নর্দমার কীটের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেক। শুনে নিজেকে অনেকবারই সত্যিইনর্দমার কীট বলে মনে হয়েছে। তারকাখচিত প্রথম বিভাগ জোটেনি বলেও আবার নিজেকে নর্দমার কীট বলে মনে হতে থাকে। চন্দনা দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছে। এ নিয়ে তার কোনও দুশ্চিন্তা নেই। দ্বিতীয় বিভাগেই পাশ করেছে বেশির ভাগ ছাত্র ছাত্রী। দ্বিতীয় বিভাগ যদি আমার জুটত, তবে বাবা চাবকে আমাকে রক্তাক্ত করে বাড়ি থেকে সত্যি সত্যি তাড়িয়ে দিতেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সে দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে স্বস্তি জোটে, প্রথম বিভাগ পাওয়ার ফলে কলেজে বৃত্তি পাব, বিনে পয়সায় কলেজে পড়ব, বাবা বৃত্তি জিনিসটি খুব পছন্দ করেন, খানিকটা হলেও ভারমুক্ত হই। অন্তত এ ব্যাপারটি না ঘটলে উঠতে বসতে বাবার দাঁত খিঁচোনো দেখতে হত। এখনও যে হয় না তা নয়। আমি নিশ্চিত, বৃত্তি না জুটলে আরও হত।
