আমি কোনও কথা বলি না। শাদা শার্ট শব্দে শব্দে হাঁটে, পেছন পেছন নিঃশব্দে আমি। হাপাঁতে হাপাঁতে আমি।
দৌড়াইতাছিলা কেন? ছেলেগুলা কিছু করছে তোমারে?
কোনও কথা নেই।
কিছু বলছে তোমারে?
এবারও কথা নেই।
ছেলেরা যা করেছে, যা বলেছে জানাতে আমার লজ্জা হয়। যেন ছেলেদের কীর্তিকাণ্ডের সমস্ত দায় আমার, লজ্জা আমার। ছেলেরা অন্যায় করেছে, যেন আমারই দোষে করেছে।
ঈশান চক্রবতীর্ রোডের কাছে এসে শাদা শার্ট বলে বাসায় যাইবা তো?
আমি দুপাশে মাথা নাড়ি।
তাইলে কই যাইবা?
আবারও দুপাশে মাথাটি নড়ে। কোথাও না অথবা জানি না জাতীয় উত্তর।
শাদা শার্টের পেছন পেছন দিব্যি আমি তাদের বাড়িতে গেলাম, ঠিক তাদের বাড়িতে নয়, তাদের বাড়িঅলার বাড়িতে, ঠিক বাড়িতেও নয়, বাড়ির ছাদে। ছাদে বসে হাওয়া খাচ্ছিল শাদা শার্টের বড় ভাই আর তার বন্ধু। আমরা ছাদে পৌঁছোলে ভাই বন্ধু দ্রুত ছাদ থেকে নেমে যায়।
কি খাইবা?
আমি মাথা নাড়ি, কিছু খাব না।
মাথা নাড়া ছাড়া শাদা শার্টের কোনও প্রশ্নের উত্তরে কোনও শব্দ উচ্চারণ করা হয় না আমার। শাদা শার্ট তার ছোট ভাইকে ছাদ থেকে গলা ছেড়ে ডেকে নিচে পয়সা ফেলে একটা সেভেন আপ নিয়ে আসার আদেশ দেয়। ছোট ভাই সেভেন আপ আনতে গেল দৌড়ে, এদিকে ছাদের অন্ধকারে শাদা শার্ট আমাকে সিনেমায় রাজ্জাক যেমন কবরীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে তেমন করে জড়িয়ে ধরতে চায়। এরকম আলিঙ্গনের আহবান এলে আমারও আবেশে বুকে মিশে যাওয়ার কথা। কিন্তু লক্ষ করি গা কাঠের মত শক্ত হয়ে আছে আমার। কাঠ ছিটকে সরে দাঁড়ায়। সেভেন আপ আসে, একলা বসে থাকে, আমার ছোঁয়া হয় না। অবকাশের ছাদ থেকে গোলপুকুর পাড় থেকে হেঁটে এসে সের পুকুর পাড়ের মোড়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শাদা শার্টকে দেখে মনে হত বোধহয় এর প্রেমে পড়ে গেছি। বুক যে ধুকপুক করেনি তা নয়। কিন্তু রাজ্জাকের মত ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরার ব্যাপারটি এত কৃত্রিম লেগেছে যে অস্থি মজ্জায় বুঝেছি আমি চাইলেই কবরী হতে পারি না, চাইলেই ববিতা হতে পারি না, গল্প উপন্যাস আর সিনেমার মত জীবনের সবকিছু নয়। হলে ওই আলিঙ্গনটি আমার ভাল লাগত। হলে আমি প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ওই ছেলের পালকে আর ওই প্যান্ট শার্ট পরা অসভ্য লোকদুটোর চাপার দাঁত তুলে নিতে পারতাম। পারিনি।
সেই দুপুরে বেরিয়েছি, এখন অন্ধকার হয়ে গেছে, বাড়িতে কি শাস্তি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা কল্পনা করার শক্তি আমার নেই। সেই বাড়িতে, শাদা শার্ট বলে, চল দিয়া আসি তোমারে। কোথাও যাবার নেই বলে ছাদ থেকে নেমে মরিয়ম ইশকুল ডানে, সুধীর দাসের মূর্তির দোকান বাঁয়ে রেখে গোলপুকরু পাড়ের চৌরাস্তা পেরিয়ে আমাকে বাড়ির দিকে নিস্তেজ হাঁটতে হয়। হতাশা আর আতঙ্ক সম্বল করে শাদা শার্টের পেছন পেছন অবকাশের কালো ফটক অবদি আসি। এরপর প্রাণহীন একটি জড়বস্তুর মত ভেতরে ঢুকি। বাড়ির লোকেরা আমার দিকে এমন চোখে তাকায় যেন কেউ চেনে না আমাকে। আমার নাম ধাম পরিচয় কেউ জানে না। আমি কেন এসেছি, কোত্থেকে এসেছি, কারও জানা নেই। এরপর চোখ খানিকটা ধাতস্থ করে কই ছিলি এতক্ষণ, কার কাছে গেছিলি, তর মনে কি আছে ক, অত সাহস কই পাইলি ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নের সামনে আমি নির্বাক নিস্পন্দ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকি। আমি আমার জীবন যৌবন কোথাও বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফিরেছি অনুমান করেই সম্ভবত দাদা আর মা দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাক নিস্পন্দ আমার ওপর কিল ঘুসি লাথি, নিশ্চল আমার ওপর চড় থাপড় নির্বিকারে নির্বিচারে চালিয়ে যান। অবসন্ন শরীর পেতে সব বরণ করি। আপাতত ওই ছেলেছোকড়াদের আক্রমণ, শাদা শার্টের অস্বাভাবিক আলিঙ্গন থেকে বাঁচা গেল বটে, কিন্তু দাদা আর মার অনাচার থেকে বাঁচা সম্ভব হয় না। আমার বিবমিষা বাড়তে থাকে সব কিছুর কারণে।
ছাদে দাঁড়ালে আমার চেয়ে বয়সে ছোট এক ছেলে তাদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে লুঙ্গি উঁচু করে তার নুনু দেখায়। আমাকে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়। ছাদের রেলিং থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। অন্য কিছু দেখতে চায় এই চোখ, সুন্দর কিছু শোভন কিছু বিকেলের এই ছাদে ওঠা, স্যাতসেঁতে ঘর থেকে বেরিয়ে আলো হাওয়া খাওয়া, আপন মনে জগত দেখা, এ বড় আনন্দের সময় আমার। খোলা জগত আমার কাছে তো ওটুকুই। স্বাধীনতা আমার ওখানেই। দুপুরের গা পোড়া গরমকে বিকেলের শীতল শান্ত হাওয়া যখন বিদেয় দিতে থাকে, তখনই সময় খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে হাওয়ার সেই স্নিগ্ধতা গা ভরে নেওয়ার। কেবল গা ভরে নয়, আমি প্রাণ ভরেও নিই। এই ছাদেও আমি নিরাপদ নই ভেবে কুঁকড়ে যেতে থাকি, যেন আমিই দোষী, যেন আমারই দোষে ভাল মানুষ ছেলেটি লুঙ্গি তুলেছে। তন্ন তন্ন করে নিজের দোষ খুঁজতে থাকি।নিজের এই অস্তিত্ব আমাকে ব্যঙ্গ করতে থাকে। আমি নিজের জন্যই নিজের কাছে লজ্জিত হই। লজ্জিত হই যখন কালো ফটকের উল্টোদিকে স্বপনদের বাড়ির ডান পাশের মুসলমানের বাড়ির বারান্দায় লুঙ্গি গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে থাকা কৎু সিত দেখতে ছেলে জগলু পাড়ার আবদুল বারীর বউকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় আমাদের বাড়িতে। মৃত্যুঞ্জয় ইশকুলের মাস্টার কৃকলাশ আবদুল বারীর বেলুন-বেলুন মেচেতা-গালি বউ আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে আসেন, মার সঙ্গে শাদামাটা ঘরসংসার রান্নাবান্নার গাল গল্প করে চলে যান। তাঁর মুখে বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনে আমার গা কাঁপে ভয়ে, গা জ্বলে রাগে। মা অবশ্য গা জ্বলা কথা কিছু বলেন না তাঁকে। অপ্রসন্ন মুখে মখু মলিন করে বলেন, মেয়ের বাবা মেয়েরে আরও লেখাপড়া করাইব। এহনই বিয়ার কথা শুনলে খুব রাগ হইব। আবদুল বারীর বউ মার ওই কথা শোনার পরও আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে ব্লাউজের ভেতর থেকে একটি দলামোচা চিঠি আমার হাতটি টেনে হাতের ভেতর গুঁজে দিয়ে আথিবিথি বেরিয়ে যান। চিঠিটি গোসলখানায় নিয়ে খুলে পড়ি। তোমাকে ভালবাসি জাতীয় কথায় দুপাতা ঠাসা। চিঠিটি, আমাকে লেখা কোনও চিঠি এই প্রথম, কুটি কুটি করে ছিঁড়ে পায়খানার গু মুতের মধ্যে ফেলে দিই। ফেলে দিয়ে, কাউকে না জানিয়ে চিঠির কথা, বসে থাকি একা, সবার আড়ালে।
