দাদার বদঅভ্যেসগুলো বাদ দিলে মানুষ হিসেবে দাদা মন্দ নন, আমার তাই মনে হয়। তাঁর কপৃ ণতার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে হঠাৎ কিছু কিছু খসে পড়ে। তাও তো পড়ে। কিন্তু বাবার কৃপণতায় কোনও ফাঁক নেই, কিছু খসে পড়ার উপায় নেই। দাদা এবার লান্ডির মাল নয়, আমার আর ইয়াসমিনের জন্য ঈদের জামা বানাতে শার্টিনের কাপড় কিনে আনেন। ওগুলো দিয়ে মা যখন আমাদের জন্য জামা বানাতে থাকেন, দাদার একটিই অনুরোধ, শীলা যেই ডিজাইনে জামা বানাইয়া দিছিল, ঠিক ওই ডিজাইনে জামা বানাইয়া দেন। মা তাই করেন। শীলার বানানো জামার মত গলায় ঢেউ খেলানো ডিজাইন দিয়ে দেন মা। একেবারে ঠিক শীলার ডিজাইন মত বানিয়ে দিলেও দাদার মনে হয় না ঠিক হয়েছে, তাঁর ধারণা শীলার বানানো আরও ভাল। দাদা জিভে চুক চুক শব্দ করে বলেন, হইছে কিন্তু ঠিক শীলার মত হয় নাই। শার্টিনের কাপড় আরও বেঁচে যাওয়ার পর দাদাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে আমি চন্দনাকে বাকি কাপড়টি দিয়ে আসি, ও যেন ওটি দিয়ে জামা বানায়। চন্দনার বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় দাদা বলেন, তর কি গারো চাকমা মগ মুড়ং হাজং ছাড়া নরমাল কোনও বান্ধবী নাই?
নরমাল মানে? চন্দনা কি এবনারমাল নাকি?
এবনরমালই ত।
চন্দনার চেয়ে নরমাল আর কেউ নাই।
চন্দনাডা বালাই ছিল। নাকটা খাড়া হইলেই বিয়া কইরা ফালা যাইত। কিন্তু.. কিন্তু কি?
চাকমা ত!
চাকমা হইছে তাই কি হইছে?
আরে দূর ! শেষ পর্যন্ত চাকমা বিয়া করাম নাকি? মাইনষে কি কইব!
মাইনষের কথা ত পরে, তুমি কি কইরা মনে করলা তুমি চাইলেই চন্দনা তোমারে বিয়া করব?
দাদা হো হো করে হেসে উঠলেন, যেন আমি মজার কোনও কৌতুক বলেছি।
আমার মত যোগ্য ছেলে ও কি সারাজীবনে পাইব নাকি?
হা!চন্দনার ঠেকা পড়ছে তোমারে বিয়া করবার!
অনেকক্ষণ চপু করে থেকে দাদা বলেন, তর বান্ধবী দিলরুবাডা সুন্দর ছিল। সুন্দরী মেয়েরা থাকে না। ইষ্কুলে পড়ার সময়ই ওদের বিয়া হইয়া যায়। আইএ বিএ এমএ পড়ে যে মেয়েরা, সব হইল বিয়া না হওয়া অসুন্দরীগুলা।
মন ভাল থাকলে দাদা কেবল ঈদেই নয়, ঈদ ছাড়াও জিনিসপত্র কিনে দেন আমাকে আর ইয়াসমিনকে। একবার দুবোনের জন্য গলায় পরার পাথরের হার কিনে আনলেন। সেই হার পরিয়ে চিত্ররূপা ছবিঘরে নিয়ে দুবোনকে দুপাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তুললেন ঠোঁট ভিজিয়ে হেসে। দুর্গাবাড়ি রোডে চিত্ররূপা ছবিঘর, দাদা বেলা নেই অবেলা নেই ওই ছবিঘরে গিয়েই চিত্তরঞ্জন দাসকে বলেন, দাদা, বাধাঁনো যায়, এমন ছবি তুইলা দেন তো। চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দাদার বন্ধুত্ব ভাল। বহু বছর ধরে নানা ঢংএর ছবি তুলছেন তিনি দাদার। নকল টেলিফোনের রিসিভার কানে লাগিয়ে; পিরিচ থেকে কাঁটা চামচে নকল মিষ্টি তুলে কারো দিকে বাড়িয়ে আছেন মিষ্টি মিষ্টি হাসি মুখে; পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ছেন, পাশে বড় ফুলদানি; কখনও আবার বাঘ সিংহের মূর্তির মাথায় হাত দিয়ে, পেছনের পর্দায় নকল সমুদ্র বা পাহাড়ের ছবি। দাদাকে পাঞ্জাবি পাজামা পরিয়ে, শাল পরিয়ে, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরিয়ে, হাতে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা ধরিয়ে বেতের চেয়ারে বসিয়ে আঁতেল বানিয়েও তুলেছেন ছবি। চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর পছন্দ মত আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন, দাদার ডানপাশে আমাকে রেখে আমার কাঁধে দাদার একটি হাত রাখেন, ইয়াসমিনের কাঁধে দাদার আরেকটি হাত, আমার আর ইয়াসমিনের হাতগুলো কোথায় রাখতে হবে, মখু কোনদিকে ফেরাতে হবে, মুখে কতটুকু হাসি আনতে হবে, হাসিটি কেমন হবে দাঁত বের করে নাকি মুচকি—সব বলে দেন। আমাদের মুখের ওপর কড়া আলো জ্বলে ওঠে। তিনি লম্বা পা লাগানো ক্যামেরায় চোখ রেখে দেখেন কেমন দেখাচ্ছে, কোথাও কোনও ত্রুটি আছে কি না পরীক্ষা করে এগিয়ে এসে দু আঙুলে আমাদের চিবুক ধরে সরিয়ে দেন ডানে বা বামে সামান্য, কপালে বাড়তি চুল পড়ে থাকলে তাও আলতো করে সরিয়ে দেন। কড়া আলোর তলে তখন ঘেমে নেয়ে মুখে একটি নকল হাসি ধরে রাখতে রাখতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি জাতীয় একটি আকুলতা আমার চোখে। হাসিটি ধরে রাখতেই হবে, চিত্তরঞ্জন দাস পই পই করে বলে দিয়েছেন। ক্যামেরায় চোখ রেখে আবার জামার হাতাটা বা ঝুলটা টেনে দিতে বা গলার কাছে বুকের কাছে ভাঁজ হয়ে থাকলে সেই ভাঁজ সরিয়ে দিতে তিনি ক্যামেরা ছেড়ে আসেন। এই করে একটি ছবি তুলতে আধঘন্টার চেয়েও বেশি খরচা হয়, কিন্তু খরচা করেও ছবি যা ওঠে, তা অন্য সব ছবিঘরের চেয়েও দাদা বলেন বেস্ট। দাদা তাঁর ভাল ছবিগুলো বাধাঁই করে ঘরে সাজিয়ে রাখেন। নিজের ছবিগুলোকে কাছ থেকে দূর থেকে ডান বাম সব কোণ থেকে দেখেন আর বলেন, ক, মেয়েরা পাগল হইব না কেন! চেহারাটা দেখছস! দাদার রূপ আছে সে আমরা সবাই স্বীকার করি, কিন্তু প্যান্ট শার্ট খুলে লুঙ্গি পরলেই তাঁর বেজায় কৎু সিত স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়। দাদার ডান বাহুতে বড় একটি কালো দাগ আছে, তিনি অবশ্য বলেন ছোটবেলায় তাঁর বাহুর ওপর দিয়ে একটি অজগর সাপ হেঁটে গিয়েছিল, চিহ্ন রেখে গেছে। অনেকদিন ওই জন্মদাগটিকে অজগরের দাগ ভেবে ভয়ে সিঁটিয়ে থেকেছি। জন্মদাগ বড় ব্যাপার নয়, এরকম সবারই কিছু না কিছু থাকে। কিন্তু লুঙ্গি পরেই তিনি যখন চুলকোনো শুরু করেন পা ফাঁক করে দুউরুর মধ্যিখানে, তখন দেখে মনে হয় না দাদা আদৌ কোনও সুদর্শন পুরুষ। এরপরও যে কাণ্ড করেন, সেটি দেখলে কেবল বমির উদ্রেক নয়, রীতিমত পেটে যা কিছু আছে সত্যিকার বেরিয়ে আসে। গায়ের ময়লা হাতে ডলে তুলে কালো গুলি বানিয়ে ফেলে দেওয়ার আগে তিনি শুঁকে দেখেন। দাঁতের ফাঁকে বাঁধা মাংস এনেও গুলি বানিয়ে শোঁকেন।
