কেন?
পৃথিবীর মধ্যে যদি কোনও কুৎসিত কিছু থাইকা থাকে, তাইলে ওই বেডি।
কও কি? ছবিতে ত সুন্দরই লাগতাছিল।
উফ। তরা যদি দেখতি বেডিরে। কাইল্যা পচা। পুইট্যা। বুইড়া। হাসলে উচা উচা দাঁতগুলা রাক্ষসের লাহান বাইর হইয়া পড়ে। পাতিলের তলার লাহান কালা মাড়ি। জীবনে কোনওদিন পেত্নী দেখি নাই, আজকে দেইখা আইলাম।
কেন, চুল ত দেখলাম কত লম্বা। পাছা ছাড়াইয়া যায়!
চুল। চুল দিয়া আমি কি করাম। চুল ধইয়া পানি খাইয়াম?
একটু থেমে বললেন, মনে হয় নকল চুল লাগাইয়া ফটো তুলছে। সামনের উঁচা একটা দাঁতও নকল।
দাদা সুলতানার জন্য রঙিন কাগজে মুড়ে কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো সেভাবেই ফেরত এনেছেন। সারাদিনের না খাওয়া দাদা হাপুস হুপুস করে খেয়ে পথের ধুলো কালি ধুয়ে দীর্ঘ ঘুম ঘুমোলেন।
সুলতানার স্বপ্ন দূর করে দিয়ে দাদা পরদিন থেকে বেগমে মন দিলেন। বেগম দিতে আসা হকারকে বলে দিই চিত্রালী পূর্বাণী আর বিচিত্রা দিতে। বলি বটে, কিন্তু এখন আর ইশকুল নেই যে রিক্সাভাড়া থেকে দুআনা চারআনা জমিয়ে রাখব, কাগজও বাড়তি নেই যে শিশিবোতলকাগজঅলার কাছে বিক্রি করে বেশ কটি আধুলি উপার্জন করব। পত্রিকা পড়ার জন্য মন আকুলিবিকুলি করে কিন্তু পত্রিকা কেনার টাকা যোগাড় করব কোত্থেকে! লোকে যেমন আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আমি করি দাদার ওপর। দাদার করুণার উদ্রেক সবসময় হয় না, দাদা আল্লাহতায়ালার মত দয়াশীল দানশীল হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না বরং হাড়কিপ্টে বলে তাঁর নাম আছে। রিক্সাভাড়া যেখানে দুটাকা, তিনি আজও সেখানে হাতে আট আনা দিয়ে রিক্সাঅলাকে ধমকে বিদেয় করেন। রিক্সাঅলার সঙ্গে তারস্বরে দাদার চিৎকার বাড়ির লোক তো বটেই, পাড়ার লোকও শোনে। এতে কোনওরকম ভ্রূক্ষেপ দাদা করেন না, তাঁর ভাষ্য এই তো কয়দিন আগেই আট আনা দিয়া আইছি।
কয়দিন আগে মানে? মা বলেন, সে ত পাঁচ বছর আগে।
পাঁচ বছরকে দাদার কয়দিন আগেই মনে হয়।
হাতে পয়সা থাকলে রিক্সাঅলাকে দুটাকার জায়গায় চারটাকা দেন মা, রিক্সাঅলা যদি অভাবের কথা কোনওদিন বর্ণনা করে পথে, তবে কেবল টাকাই নয়, বাড়ি পৌঁছে খাটের তলে ডাঁই করে রাখা ঝুনা নারকেলের একটি বেছে রিক্সাঅলার হাতে দিয়ে বলেন, পুলাপান নিয়া খাইও। মার এসব আচরণ দেখে দাদা বলেন, মা হইল নানার ডুপ্লিকেট। হাতে যা থাকে সব মাইনষেরে দিয়া দেয়।
দাদা মোটেও মার চরিত্র পাননি। দাদার মন সবসময় বলে পৃথিবীর সবাই তাঁকে ঠকাচ্ছে, তাই তিনি ছলে বলে কৌশলে সবাইকে ঠকাতে চেষ্টা করেন। দোকানে গিয়ে দর কষাকষি করার অভ্যেস দাদার। সকলেই দামাদামি করে, কিন্তু দাদার তুলনা হয় না। দাদার সঙ্গে দোকানে গেলে আমাকে কম লজ্জায় পড়তে হয় না। দোকানি যদি চায় পঞ্চাশ, লোকে তিরিশ টাকায় দিবেন? বা চল্লিশে হইব? জিজ্ঞেস করে। পঞ্চাশ টাকা দাম শুনে দাদা বলেন, তিন টাকায় দিবেন? দোকানি হাঁ হয়ে থাকে। কোথায় পঞ্চাশ আর কোথায় তিন! দাদা সেই তিন থেকে সোয়া তিন সাড়ে তিন করে ওপরে ওঠেন। দোকানি শেষ অবদি কুড়ি বা একুশে রাজি হয়। রাজি হয় বটে, তবে বলে দেয় কাস্টমার অনেক দেখছি ভাই, আপনের মত দেহি নাই। ঠগাইয়া গেলেন। লাভ ত হইলই না, আসল দামডাই উঠল না।
দাদার ওপর ভরসা করি বটে, কিন্তু দাদার কৃপণতা সীমা ছাড়িয়ে গেলে ছোটদার পথ অনুসরণ করা ছাড়া আমার আর উপায় থাকে না। দাদা একবার গোসলখানায় ঢুকলে যেহেতু ছোট বড় মাঝারি সব সেরে আসতে ঘন্টাখানিক সময় নেন, ঘরের আলনায় ঝুলে থাকা তাঁর প্যাণ্টের পকেটে কাঁপা একটি হাত ঢোকে আমার। দাদার পকেটে হাত ঢুকিয়েই হাতেখড়ি হয় এ বিদ্যের, তখন বাবার পকেটেও হাত যায়। কেবল হাত নয়, বুকও কাঁপে, হাতে পাঁচ টাকা দশ টাকার বেশি ওঠে না যদিও, কিন্তু শরমে মাথা নত করতে হয়, স্বস্তি জোটে না। এ বিদ্যে পরে ইয়াসমিনকেও আক্রান্ত করে।
ছোটদার ওপর দাদার রাগ দিন দিন বাড়ে। বাইরে যাওয়ার আগে দাদা তাঁর ঘরে ওষুধের বাক্স ঢুকিয়ে তালা দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু ঘরে তালা তো আর দিবানিশি দেওয়া চলে না। দাদা বাড়ি থাকলে ঘরের দরজা খোলাই থাকে। দাদা বাড়িতে আছেন, কিন্তু নিজের ঘরে নেই, এরকম কোনও সময় দেখলেই ছোটদা আমাদের পাঠান ওঘর থেকে ওষধু তুলে নিয়ে আসতে। ওষুধ হাতে করে নিয়ে আসতে গেলে বিপদ হতে পারে বলে দরজার তল দিয়ে পাচার করার উপদেশ দেন। দাদার আর ছোটদার ঘরে যে সবুজ কাঠের দরজা, তার তলে ওষুধের বোতল না হলেও ট্যাবলেট ক্যাপসুল পার হওয়ার মত ফাঁক আছে। ছোটদার একনিষ্ঠ বাহিনী আমি আর ইয়াসমিন প্রচণ্ড দুঃসাহস নিয়ে এই অপকর্ম করে যাই। এই খবরটি দাদার জানা হয়ে যায় একদিন। তিনি কাঠের দোকান থেকে মাপ মত একটি কাঠ এনে দরজার ফাঁক বন্ধ করে দেন। এরপরও যে ওষধু পাচারে কিছু ভাটা পড়ে, তা নয়। ঢিলে জামার আড়ালে করে ক্যাপসুল ট্যাবলেট তো বটেই, ওষুধের বোতল আনার কাজেও আমরা ব্যবহৃত হতে থাকি। বিত্তবানের বিরুদ্ধে বিত্তহীনের লড়াই, সভ্য ভাষায় বলা যায়। এত কিছুর পরও ছোটদার সঙ্গে সাপে নেউলে সম্পর্কে গড়ে তোলা দাদার পক্ষে সম্ভব হয় না, হয় না দাদার হাড় ফোটানো ব্যারামের কারণে। দাদার এই হাড় ফোটানো ব্যারামটি দাদাকে অদ্ভুত আনন্দ দান করে। হাড়ে হাড়ে ঘষর্ণ লেগে যে শব্দ হয়, সেটি তাঁর কর্ণকুহরে সংগীত মছূর্ নার সৃষ্টি করে। দাদা প্রতিদিনই তাঁর শরীরের যত হাড় আছে, তা ফোটান। আঙুলের হাড়ের প্রতিটি সন্ধিস্থল তিনি ঊর্ধ্বে নিম্নে ডানে বামে যত দিকে সম্ভব টেনে শব্দ তোলেন। পায়ের সবগুলো আঙুল নিয়েও একই কাণ্ড করেন। এরপর মেরুদণ্ডের সবগুলো হাড় তার ফোটানো চাই। এক হাত থুতনিতে আরেক হাত মাথায়, এবার হেঁচকা টান মেরে মাথাটা ডানে ঘুরিয়ে নাও, এরপর বামে, ঘাড়ের হাড়গুলো ফুটে গেল। দাদা নিজে একাই পারেন এ কাজটি করতে, কিন্তু ছোটদার সহযোগিতায় জিনিসটি ভাল হয়। ছোটদাকে হাতের কাছে পেলে দাদা বিছানায় বা মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন। শুয়েই কাতরকণ্ঠে দে না কামাল দে, একটু টাইন্যা দে বলে ছোটদাকে ডাকতে থাকেন, ছোটদার পা ধরতে বলা হলে পা-ও ধরবেন এমন। ছোটদা দাদার মেরুদণ্ডের ওপরের চামড়া শক্ত করে ধরে ওপরের দিকে হেঁচকা টানেন, ফোটে। ঘাড়ের নিচ থেকে শুরু করে ফোটাতে ফোটাতে একেবারে নিতম্বের কাছের শেষ হাড়টি অবদি ফোটান। দাদার মেরুদণ্ড ফোটানো শেষ করে ছোটদা একইরকম উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন, দাদা একইভাবে ছোটদার পিঠের সবগুলো হাড় ফুটিয়ে দেন। ছোটদাকে বর্জন করার সংকল্পে অটল থাকার অভিপ্রায়ে দাদা একদিন আমাকে বলেছিলেন পিঠের হাড় ফোটাতে। আমার হাতে সেই জাদু নেই, গায়ে যত শক্তি আছে, সবটুকু খাটিয়ে দাদার চামড়া ঊর্ধমুখি টেনেও একটি হাড়কেও নড়াতে পারি না।যাহ ছেড়ি, তুই পারস না, কামালরে ডাক দে। অগত্যা কামাল এসে দাদার হাড় ফোটানোর ব্যারামে ওষধু ঢালেন। কেবল নিজের নয়, অন্যদের হাড়ের ওপরও দাদা ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাড় না ফুটিয়ে অন্যরা কি করে জীবন যাপন করছে তিনি ভেবে পান না। দাদা একবার অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে আমার হাত পায়ের কুড়ি আঙুল ফুটিয়ে দেওয়ার পর আমার ঘাড় খামচে ধরেন, ঘাড়ের হাড় ফোটাবেন। ডান দিকে ঘাড়টিকে যখন হেঁচকা টান দিলেন, আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে দাদার হাত থেকে দৌড়ে পালালাম। তিনি আমার পেছনে দৌড়োচ্ছিলেন বলতে বলতে যে ঘাড়ের আরেকদিকটা না ফোটালে আমার ব্যথা বাড়বে। আরেক দিকটায় দাদাকে আর কিছুতেই হাত দিতে দিই নি। হাড় ফোটানো ছাড়াও দাদার আরও একটি রোগ আছে, রোগটির নাম বায়ুরোগ। পায়ুদেশ হইতে বায়ু নিষ্কাষণ। সেটি এমনই ভয়াবহ যে অন্যদের হাসির খোরাক না হয়ে বরং বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা বলেন, নোমানের পেটটা আইজও ভাল হইল না,জন্মের পর থেইকাই ওর পেটের গণ্ডগোল। দাদার ঘরে ঢুকতে হলে পা বাড়ানোর আগে আমার নাক বাড়াতে হয়, ভেতরে ঢোকা উচিত হবে কি হবে না তা বুঝতে। বায়ুর বিড়ম্বনা কম নয়। বাড়িতে যদি আড্ডা হচ্ছে কোনও, যেই জমছে আড্ডা তখনই দুর্গন্ধ জনিত কারণে দাদা ছাড়া বাকি সবাইকে নাক মখু চেপে উঠে আসতে হয়। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ থেকে দাদা পড়ছেন, মন দিয়ে শুনছি, তখনই এই একটি কারণে আমার প্রস্থান ঘটে, দাদা বই হাতে একা বসে থাকেন। দাদার চেয়ে বড়দাদা কম যান না। বড়দাদা একবার দাদার এই বায়ু নিষ্কাষণ দেখে বলেছিলেন, চল লাগি। দাদা ঘর ফাটান তো বড়দাদা বাড়ি ফাটান। শব্দে গন্ধে আমরা সাত হাত দূরে ছিটকে পড়েছি। একসময় দাদার পেটে বায়ুর অভাব, জোর খাটিয়েও তাঁর পক্ষে কোনও শব্দ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বড়দাদা দিব্যি শব্দের রাজা হয়ে বসে আছেন। জেতার জন্য দাদা এমনই মরিয়া হয়ে উঠলেন যে সারা শরীর সঙ্কুচিত করে মৃদু হলেও একটি শব্দ তৈরি করতে চাইছেন, বড়দাদা বললেন, বেশি কুত দিস না, হাইগ্যা দিবি। কিছু একটা অশোভন ঘটেছিল নিশ্চয়ই তা না হলে দাদা রণে ভঙ্গ দিয়ে সেদিন গোসলখানার দিকে দৌড়োবেন কেন!
