কাকুর সঙ্গে গল্প করতে গেলে তিনি আলমারি খুলে শাড়ি বের করেন আমার জন্য, গয়নার বাক্স খুলে ভারি ভারি গয়না পরিয়ে দেন গায়ে। স্বামীকে সুখী করার জন্য যা যা করতে হয় স্ত্রীদের, তার সবই যেন আমি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাই, কর্তব্যকাজে যেন কখনও অবহেলা না করি। কাকুর উপদেশের সাগরে আমি খড়কুটোর মত ভাসতে থাকি। কাকু না হয় পুরোনো কালের মানুষ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর একশ রকম কর্তব্যের কথা তিনি জানেন, কিন্তু নতুন কালের মানুষ বীথির কাছে গিয়ে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অন্তত একটি কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। রূপসী বীথির রূপসী কপাল নিভাঁজ পাওয়ার আশায় বসে থাকি, ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়। বীথি সারাদিনই সংসারের নানারকম সমস্যা নিয়ে এর ওর সঙ্গে কথা বলছে, আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বলে বৌদি বস, কিন্তু সমস্যার খুব কাছে আমি বসে থাকি, তা সে চায় না। বীথির সমস্যার অন্ত নেই। তার অভিযোগের শেষ নেই। বাবা মা মেজমামা কাকু সবার বিরুদ্ধে তার গণ্ডা গণ্ডা অভিযোগ। মোংলা বন্দরের সংসার তাকে দেখাশোনা করতে হয়, এ সংসারও। মেজ মামার ছেলে মণির সঙ্গে বীথির বিয়ে হয়েছে। সম্পর্কের শেকলে মোংলা আর মিঠেখালির মানুষেরা খুব শক্ত করে বাধাঁ, বীথির মেজমামাই বীথির শ্বশুর, সম্পর্কগুলো কি রকম একটির সঙ্গে আরেকটি লেগে আছে শেকলের মত! শেকল নিয়ে রুদ্রর মা মোটেও ভাবেন না, সংসারের কোনও কাজ নিয়েও ভাবেন না অথচ অগুনতি দুর্ভাবনা নিয়ে মিঠেখালির বাড়ি এসেও পালঙ্কে শুয়ে দিন কাটান। তাঁর সেবায় আমি সামান্যও ব্যবহৃত হতে পারি কি না জানতে যখন ঘরে ঢুকি, তিনি কাউকে জলদি করে ডেকে বলেন, দেখ তো শহিদুল্লাহর বউএর কিছু লাগবে কি না দেখ!
না, আমার কিছু লাগবে না, আমি এমনি এসেছি। বিব্রত শাশুড়ির সামনে ঘোমটা- মাথার ততোধিক বিব্রত বউটি বলে।
এমনি এসে তাঁর ঘরে কেউ বসে থাকলে তিনি যে বিব্রত হন বেশ বুঝতে পারি। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আমার যে গল্প করার ইচ্ছে, তা বলে তাঁকে আরও বিব্রত করতে ইচ্ছে করে না।
বিকেলে রুদ্র একা বেরোবে বাইরে। তার কাজের অন্ত নেই। কেন যাচ্ছে!, যেও না, প্লিজ, থাকো, আমার এসব ছেঁদো অনুরোধ পুকুরে ঢিলের মত ছুঁড়ে দিয়ে সে মোংলা বন্দরে যায়, ফিরে আসে গভীর রাতে, এক শরীর ঝাঁঝালো গন্ধ নিয়ে।
গন্ধ কেন?
এই একটু মদ খেয়েছি।
কেন খেয়েছো?
খেতে ইচ্ছে করেছে তাই খেয়েছি।
তোমাকে আর কত বলব মদ খেও না! তুমি কি কোনওদিন আমার কথা শুনবে না?
ঘরে কাকু আছেন, অন্য বিছানায়, রুদ্র ভ্রুক্ষেপ করে না, যত রাতই হোক তার শরীর চাই।
তুমি কি কেবল শরীরই বোঝো রুদ্র? মন বোঝো না?
না রুদ্র মন বোঝে না, সে বিশ্বাস করে শরীরেই বসত করে মনরূপ পাখি। শরীর মেলালে মনের দেখা মেলে।
রুদ্রর শরীর চাই। প্রতি রাতেই তার চাই, যে করেই হোক, যে পরিবেশেই হোক, চাই। পূর্ণিমায় যখন গ্রাম ভেসে যাচ্ছে, আলোয় আমার মন ভাসছে, রুদ্রকে নিয়ে ছাদে যাই পূর্ণিমা দেখতে। ঝকঝকে চাঁদের তলে শীতল পাটিতে শুয়ে আছি, আলোয় আমার মন নাচছে, তার একটি হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে আলোয়-ভেজা শীতে কাঁপি, এভাবেই চল সারারাত চাঁদের আলোয় স্নান করি, চল সারারাত, চল সারারাত এভাবেই। আলোয় আমার মন উড়ছে। রুদ্র আলোয় ভাসতে চায় না, উড়তে চায় না, সে আমার শরীরে ডুবতে চায়। ওই ছাদে যে কেউ চলে আসতে পারের বিপদের দুআঙুল দূরে দাঁড়িয়ে সে শরীর ভোগ করে। বেঘোরে ঘুমোয়। আমি আর চাঁদ জেগে থাকি একা একা, সারারাত একা একা।
ঘরে বসে থাকব আর খাবার চলে আসবে ঘরে, এ খুব আরামের হয়ত, কিন্তু আমার দ্বিধা হয় এ বাড়ির সমস্ত আরাম আয়েশে গা এলিয়ে দিতে। এ আমার শ্বশুর বাড়ি না হোক, শাশুড়ির বাড়ি তো। নিজেকে সংসারের প্রয়োজনে লাগাতে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি আমি একটি বাড়তি মানুষ, হুকুম খাটার লোকের অভাব নেই বাড়িতে। জমিদারের বাড়িতে যা হয়। এ বাড়ির বড় বড় জিনিসগুলো আমার বোধগম্য হয় না সহজে। রুদ্র যখন বীথির সঙ্গে জমিজমা ধান চাল সহায় সম্পত্তি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলে, আমি বেশির ভাগই বুঝি না। রুদ্র পরে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছে, ভীষণ এক জটিল অবস্থার মধ্যে আছে এই জমিদারি। মিঠেখালির জমি থেকে যা আয় হয়, তার মায়ের ভাগ সে নিয়ে যায় এখান থেকে। বহু বছর হল এভাবেই নিচ্ছে সে ভাগটি। ভাগ নিয়ে কিছু সে নিজের জন্য রেখে বাকিটা রেখে যায় বন্দরের সংসার-কাজে। কিন্তু রুদ্র এখন ভাগের ধান বিক্রিতে বিশ্বাসী নয় আর। অনেকদিন থেকে সে তার মাকে বলছে যেন মেজ মামা জমি ভাগের ব্যবস্থা করেন। তার মায়ের ভাগেরটুকু থেকে কিছু বিক্রি করে সে ঢাকায় ছাপাখানার ব্যবসা শুরু করবে। রুদ্র ঢাকার পঞ্চাশ লালবাগের বাড়িটিতেও তার মায়ের ভাগ দাবি করে, ওটিও ছেড়ে দিতে সে রাজি নয়। বীথি তার দাদাকে লোক চক্ষুর অন্তরালে সমর্থন জানিয়ে যায়। জমি ভাগ করতে মেজ মামা রাজি হন না। বড়মামার পর এখন মেজই হর্তকর্তা, তিনি না চাইলে ভাগ সম্ভব নয়। জমিজমা বিষয়ক জটিলতা থেকে আমার মন উঠে দৌড়ে যায় শান বাধাঁনো পুকুরঘাটে। চল যাই, হাঁসের সাঁতার দেখি বসি। চল, পুকুরে গোসল করি। আমার আবদার শুনে বাড়ির সবাই হাসে, রুদ্রও হাসে। যেন আমার বোধ হয়নি বুদ্ধি হয়নি, যেন জীবন কাকে বলে তার কিছুই আমি এখনও জানি না। আমি আমার শিশুসুলভ অপরিপক্বতা দিয়ে কেবল লোক হাসাতে পারি। পুকুরে বাইরের মানুষ গোসল করতে আসে, ও পুকুরে বাড়ির বউএর নাওয়া চলবে না। গোসল করতে হলে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে ভেতরের পুকুরে। ভেতরের ঘোলা পুকুরে আমি পা ডুবিয়ে বসে থাকি।
