প্রাণ ফিরে পাই যেদিন বন্দর ত্যাগের আয়োজন হয়, যদিও ঢাকার পথে নয়, যাত্রাটি আরও গভীর গ্রামের পথে, তবু এ বাড়ির শুয়ে বসে থাকা জীবনটি শেষ করার জন্য আমি আকুল হয়ে রওনা হই। গ্রামে নিশ্চয়ই বন্দরের মত শ্রমিকের উৎপাত নেই, রুদ্রর হাত ধরে সেইসব শস্যের সবুজ ক্ষেতের আলপথ ধরে হাঁটতে পারব, যেসব ক্ষেতের কথা বারবার সে লিখেছে কবিতায়। মিঠেখালি গ্রামটি নিশ্চয়ই ছবির মত সুন্দর একটি গ্রাম, যে গ্রামের সৌন্দর্য রুদ্রকে বারবার টেনে আনে এখানে। কোথায় বসে সে কবিতা লেখে, কোন বৃক্ষতলে সে উদাস বসে আমাকে ভাবে, কোন ভরা জ্যোৎস্নার মাঠে সে একা একা দৌড়ে যায়, দুচোখ ভরে দেখব সব। মোংলা থেকে ছইঅলা নৌকোয় মুখ আড়াল করে আরও সব মেয়েমানুষের সঙ্গে খাল পেরিয়ে মিঠেখালি যেতে হয়। গভীর গ্রামের ভেতর চারদিকে ফসলের ক্ষেত, কিছু গোলপাতার ঘর এদিকে ওদিকে, মাঝখানে গাছগাছালি ঘেরা বড় একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে একটি পুকুর, পুকুরে শান বাধাঁনো ঘাট। সন্ধে হলেই বাড়ির ঘরে, বারান্দায়, সিঁড়িতে প্রচুর হারিকেন জ্বলে। ঝাড়বাতি থাকলে এটিকে সত্যিকার জমিদার বাড়িই বলা যেত। অবাক হই, এই ঘোর গহীন গ্রামে কে এনেছে ইট পাথর, কে গড়েছে এই বাড়ি! রুদ্রর নানার বাড়ি এটি। নানার দাপট ছিল এলাকায়, তার চেয়ে বেশি দাপট ছিল তার বড়মামার। গ্রামগঞ্জের দাপুটে অনেক লোক একাত্তরে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনিও ছিলেন। রুদ্রর মেজমামাও স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন না। এমন পরিবারে মানুষ হয়ে রুদ্র অন্যরকম। নিজে সে নিজের নাম রুদ্র রেখেছে। না রাখলে পিতৃদত্ত মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নামটি নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হত। কবিতা লেখে স্বাধীনতার পক্ষে, মসনদে রাজাকারের ফিরে আসায় প্রচণ্ড ক্ষোভে সে বলে, জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন। কবিতায় শকুন বলে গাল দিলেও রুদ্রর অগাধ শ্রদ্ধা দেখি তার সেই মামাদের জন্য। গোবরে পদ্মফুলটির জন্য গৌরব হয় হয় করেও হয় না। গ্রামের বাড়িতে যখন থাকে সে, তার বড়মামার ঘরে থাকে। ঘরে বড় বড় দুটো পালঙ্ক, বড় বড় কাঠের আলমারি, বড় বড় চেয়ার। সবই বড় বড়। জমিদারি গন্ধ বেরোচ্ছে সব কিছু থেকে। বড়মামা বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর বউ আছেন, বউটি একদিকে তার বড়মামি আরেকদিকে বড়ফুপু। রুদ্র কাকু বলে ডাকে তাঁকে। কাকুর কথা সে আমাকে চিঠিতে লিখেছে অনেক। কাকুর নিজের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। রুদ্রকেই তিনি নিজের ছেলের মত লালন পালন করেছেন। এখানে জানালার কাছে বড়মামার পুরোনো টেবিলটিতে বসে রুদ্র কবিতা লেখে, বড়মামার পালঙ্কে নরম গদিতে ঘুমোয়। ঘুমোয়, চাকরবাকর আরদালি খানসামা তার আদেশ পালনের অপেক্ষায় থাকে। মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয় সে এ বাড়িতেই। এমন জমিদারি আমি যখন ফ্যালফ্যাল করে দেখছি, রুদ্র বলে, আরও ছিল, এখন তো পড়তির মুখে! এখন পড়তির মুখে না হয়ে উঠতির মুখে হলে সম্ভবত আনন্দ হত তার! যৎসামান্য অবশিষ্ট আছে, আগে অনেক ছিল, আরও ছিল! সেই আগের আরোর জন্য, আগের অঢেলের জন্য, অনেকের জন্য রুদ্রর গর্ব হচ্ছে টের পাই। ধনসম্পত্তি নিয়ে তার অহঙ্কার সে চাইলেও গোপন করতে পারে না। কিন্তু দরিদ্রকে শোষণ না করে কেউ কি এত ধনসম্পত্তি করতে পারে? পারে না, মন বলে, পারে না। রুদ্র তো সেই আশিভাগের পক্ষে কবিতা লেখে, যারা তার দোতলার ঘরটিতে কখনও পৌঁছতে পারে না, নিচের সিঁড়ি থেকেই যাদের হটিয়ে দেয় পাইক পেয়াদারা। যারা রোদে পুড়ে পুড়ে ক্ষেতে লাঙল দিচ্ছে, ওইসব বরগাচাষীরা, যাদের শ্রমের ফসল উঠছে এ বাড়ির গোলায়! যাদের আর রুদ্রর মধ্যে অনেক ফারাক। আমি মেলাতে পারি না। সা−ম্যর জন্য চিৎকার করে কবিতা পড়ে রুদ্র, সাম্য কি সত্যিই সে মন থেকে চায়! ঘরের চার দেয়াল ক্রমশ পা পা করে এগোতে থাকে আমার দিকে। রুদ্রকে বলি, চল বাইরে বেরোই।
বাইরে কোথায় যাবে?
গ্রাম দেখতে।
গ্রামে তো দেখার কিছু নেই।
দেখার কিছু থাকবে না কেন?
দেখার কিছু নেই, শুধু ক্ষেত।
ক্ষেতই দেখব।
ক্ষেত দেখে কি করবে? এসব ধানের ক্ষেত দেখার কোনও মানে হয়?
চল দুজন হাঁটি গ্রামের পথে। তুমি তো আমাকে চিঠিতে কতবার লিখেছো, যে, তোমার নাকি ইচ্ছে করে দিগন্ত অবদি সুবজ ধানের ক্ষেত দেখাতে আমাকে? দেখাতে গ্রামের আশ্চর্য সুন্দর রূপ!
খামোকা বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়িতে বসে কাকুর সাথে গল্প কর। বীথি ওরা আছে, ওদের সাথে সময় কাটাও।
সময় তো আমি রুদ্রর সঙ্গে কাটাতে চাই। কথা বলতে বলতে দপু রু গড়িয়ে যাবে, বিকেল গড়িয়ে যাবে, টের পাবো না। রাতের কালো পর্দা এসে আমাদের মুখ ঢেকে দেবে, আমরা যে পরস্পরকে আর দেখতে পাচ্ছি না, টের পাবো না। আমাদের নিঃশ্বাসের কাছাকাছি আমরা থাকব, আমাদের স্পর্শের কাছে থাকব, আমাদের অনুভবের কাছে, টের পাবো না। জীবনের টুকরো টুকরো নিয়ে, টুকরো টুকরো জীবন নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা, অথবা কোনও কিছু না নিয়ে, মনে যা আসে তাই নিয়ে, সপুুরি গাছের মাথায় এইমাত্র যে পাখিটি এসে বসল, সেই পাখিটি নিয়ে, একটি বালক দৌড়ে এসে পুকুরে ঝাপঁ দিল, সেই বালকটি নিয়ে। কিন্তু আমি চাইলেও রুদ্রর নিস্পৃহতা লক্ষ করি, সে একা একা শুয়ে থাকতে চায় পালঙ্কটিতে। তার বুকের লোমে আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে জীবনে কি কি আমার ইচ্ছে করে, কি কি করে না বলব, চায় না সে। আমার হাঁটুর কাছে তার মাথা, তার হাঁটুর কাছে আমার, এভাবেই শুয়েই স্মৃুতি থেকে কবিতা পড়ে যাব যে যতটা জানি, চায় না সে। সে চায় সারাদিন আমি বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে কাটাই, রাতে শুতে আসি তার বিছানায়। ঢাকার রুদ্র আর মিঠেখালির রুদ্রকে আমি শত চেষ্টা করেও মেলাতে পারি না।
