রুদ্র নেমে যায় ওপর থেকে। একদিকে দেয়াল আরেকদিকে রুদ্র, আমার শক্তি নেই কোনও দিকে একবিন্দু নিজেকে সরাই। স্থির হয়ে আছি। ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখছি যেন আমি অপারেশন থিয়েটারের বাইরে, পোস্ট অপারেটিভ রুমে। আমার জ্ঞান ফিরছে। জ্ঞান ফিরলে আমি টের পাই আমি কোনও পোস্ট অপারেটিভ রুমেও নই, আমি রূপসা নদীর ঘোলা জলে শুয়ে আছি। আমার শরীর ভাসছে জলের ওপর। চারদিকে কেউ নেই, একা আমি। এত একা কোনওদিন বোধ করিনি। যেন আমার কেউ নেই, কোনওকালে ছিল না। আমার বাবা নেই, মা নেই। আমার কোনও ভাই বোন নেই। আমার কোনও বন্ধু নেই, কোনও প্রেমিক নেই, কোনও স্বামী নেই। আমার কোনও ঠিকানা নেই কোথাও যাওয়ার। আমি রূপসার জলের ওপর ভেলার মত ভেসে কোথাও যাচ্ছি আমি জানি না। যখন শক্তি জোটে নিজেকে তোলার, তুলে আমি নামতে যাই বিছানা থেকে, পথ জুড়ে পাহাড়ের মত একটি বাধা, সেটি রুদ্র। বলি, যেতে দাও। এই প্রথম আমি রুদ্রকে সম্বোধন করি। রুদ্র পথ ছেড়ে দিলে আমি নেমে পেচ্ছাবখানা খুঁজতে থাকি অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে। নিম্নাঙ্গ ছিঁড়ে যাচ্ছে, হাঁসের মত হাঁটতে থাকি জলহীন ডাঙার অন্ধকারে। পেচ্ছাবখানায় পেচ্ছাব নয়, রক্ত বয়ে যায়, রূপসার জলের দিকে যায়। আর্তনাদের শক্তি আমার নেই। গোঙাতে থাকি অসহ্য যনণ্ত্রায়।
পরদিন রুদ্র যখন বেরিয়ে যায় আমাকে ফেলে, আমার আবারও একা লাগতে থাকে। আমি ঠিক বুঝে পাই না কি র্কতব্য আমার। শ্বশুরের পা টেপা, শাশুড়ির উকুন বাছা, তেষ্টা পেলে পানিটা এগিয়া দেওয়া, গোসলের সময় গামছাটা, নামাজের সময় জায়নামাজটা! আমাকে কি ঘোমটা মাথায় রান্নাঘরে ঢুকতে হবে রান্না করতে, যেহেতু এ বাড়ির বউ আমি! আমাকে কি রান্নাঘরের পিড়িতে বসে পেঁয়াজটা রসুনটা অন্তত কেটে দিতে হবে! হাঁসের মত হেঁটে রান্নাঘরে ঢুকি। গোলপাতার ছাউনি দেওয়া রান্নাঘর, মাটির মেঝেয় মাটির চুলো, চুলোর আগুন থেকে ধোঁয়া উঠছে, যেন আলাউদ্দিনের প্রদীপ থেকে ওঠা ধোঁয়া, ইচ্ছে করে এক্ষুনি ধোঁয়া থেকে দৈত্য বেরিয়ে আমাকে বলে দিক, কি করা উচিত আমার, ভাত তরকারি রান্না করব, নাকি রুদ্রর ভাইবোনদের ইশকুলের পড়া দেখিয়ে দেব, বলে দিক বাড়ির মানুষগুলো আমি কি করলে খুশি হবে, বলে দিক কি করলে বলবে বউটি বড় লক্ষ্মী, বড় ভাল। দৈত্যের দেখা পেতে আমি ধোঁয়ার দিকে এগোই। রান্নাঘরে যেই না মাথা গলিয়ে দিই, বীথি বলে, এখানে ঢুকছো কেন? ধোঁয়ায় টিকতে পারবে না।
কি করছ তোমরা দেখি।
দৈত্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে বলি, আমি কি কিছু করব!
বীথি হাসে, রুদ্রর আর সব ভাই বোনেরাও হাসে। আমার অস্বস্তি হতে থাকে। আমাকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে হবে, কোথায় বসতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, বললে কি কথা বলতে হবে এসব আমি জানি না। আমার একা লাগে। আমি চাই দ্রুত রাত নেমে আসুক, তখন আমি জানি, আমাকে কি করতে হবে, তখন আমাকে শুতে হবে, ঘুমোতে হবে।
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে বীথি বলে, তুমি গোসল করে নাও! পরে পানি ফুরিয়ে যাবে। এখন কি করতে হবে এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গোসলখানায় ঢুকে দেখি দরজা আছে, কিন্তু দরজায় কোনও ছিটকিনি নেই। সংকোচে বেরিয়ে আসি। দেখে বীথি হাসতে হাসতে বলে, নিশ্চিন্ত মনে গোসল করে নাও তো, কেউ ঢুকবে না। আমার গোসল হয়, কিন্তু নিশ্চিন্ত মনে হয় না।
বারবার খসে যেতে থাকা আঁচলটি বারবার মাথায় তুলে দিতে দিতে, আঁচলের কোণ টেনে আঁচলকে মাথা থেকে খসতে না দিয়ে, নিশ্চিন্ত হয়ে, শুয়ে থাকা শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে রুগ্ন কণ্ঠে তাঁর ন ছেলেমেয়ের মধ্যে বাড়িতে উপস্থিত সাতজনের একজনকে, এই তর বৌদিরে বসতে দে বলে আপাতত আমাকে তাঁর চক্ষুর সামনে থেকে সাদরে বিদেয় করে চক্ষু বন্ধ করেন। শাশুড়ির ঘরের পাশে একটি ঘরে আমকে বসতে বলা হয়, বিছানার এক কোণে বসি। বউ কথা বলে না, বউএর দেমাগ বেশি এরকম কথা যেন কেউ না বলে, তাই হাতের কাছে যাকে পাই ছোট ছোট ভাই বোন, নাম জিজ্ঞেস করি, কোন ইশকুলে কোন ক্লাসে পড়ে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেয়ে বসে থাকি চুপ হয়ে, আর কোনও প্রশ্ন পাই না করার, ওরাও কোনও প্রশ্ন করে না। ভাইবোনগুলো আশ্চর্যরকম শান্ত, কোনও চিৎকার চেঁচামেচি নেই বাড়িতে। এতগুলো ভাইবোন থাকলে অবকাশ সারাদিন মাছের বাজার হয়ে থাকত। নদী থেকে তপ্ত হাওয়া আসে ঘরগুলোয়। কেমন হু হু করে। আমার একা লাগে। বিকেলে বীথি আমাকে সোনার গয়না দেয় পরতে। সোনার গয়না না পরলে সংসারে মান থাকে না, তাই মান বাঁচাতে বীথির দেওয়া ভারি গয়না পরে বসে থাকতে হয়, নিজেকে কিম্ভুত লাগে দেখতে। আসলে কানে গলায় হাতে এত অলংকার আমাকে মানায় না। আমার সয়ও না এসব। মাত ৃ জুয়েলাসের্ হালখাতার নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে কানের লম্বা লম্বা দুল কিনে দিয়েছিলেন বাবা, সবই হারিয়েছে। আমি অনেকক্ষণ পরে রাখতে পারি না কানে কিছু সে সোনা হোক রূপো হোক, কান চুলকোয়। আঙুলে কিছু পরলে আঙুল চুলকোয়, খুলে রাখি এখানে সেখানে, ব্যস অদৃশ্য হতে সময় নেয় না। মা আক্ষেপ করেন, স্বর্ণের গয়নার দিকে ওর একদম নজর নাই। কই যে খুইলা রাখে জানেও না। অতিথিরা চলে গেলে বীথির গয়না খুলে রাখি, নিজেকে এক জড়ববস্তু বলে মনে হয়, যেন পুতুল আমি, আমাকে শাড়ি পরানো হচ্ছে, গয়না পরানো হচ্ছে, আর আমার মুখে কোনও রা নেই, উঠতে বললে উঠছি, বসতে বললে বসছি আর হ্যাঁ শুতে বললেও শুচ্ছি।
