ক রবীন্দ্রনাথের কত সনে জন্ম?
বানান কর–মুহূর্ত।
কাজলা দিদি কবিতা কার লেখা?
দাদার প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় হয় আমার। কখন আবার কি ভুল বলি, চটাশ করে চড় দেবেন গালে নয়ত সারা বাড়ির লোক ডেকে আমার পড়া শুনিয়ে হাসবেন। ঈশ্বরগঞ্জ যাওয়ার আগে, একদিন শখের মাস্টারি করতে বসে দাদা বলেছিলেন বানান কইরা কইরা পড়। তখন স্বরে অ স্বরে আ ছেড়ে যুক্তাক্তর ধরেছি। অক্ষরের চেয়ে বেশি দেখি ছবি। দাদার আদেশে কত ছবি কত কথা বইটি নিয়ে অক্ষরে আঙুল রেখে বলেছিলাম হ, লয় হ্রস্য উকার দ।
দাদা বললেন–কি হইল, ক।
ছবির দিকে তাকিয়ে দেখি, আদার ছবি। বলি আদা।
–কয় ওইকার, ছবি দেখে নিশ্চিন্তে বলেছিলাম–মাছ।
আমার তের বছর বয়সের শিক্ষক মা’কে ডাকেন, রুনু খালা, ঝুনু খালা, নানি, হাশেমমামা, টুটমামা সবাইকে ডেকে শীতলপাটির চারদিকে বসালেন। বললেন–শুন সবাই, ও কেমনে পড়ে। পড় দেখি এইবার।
আমি বুঝে পাচ্ছিলাম না আমার সামান্য পড়া দেখাতে এত সবাইকে ডাকার মানে কি! বোধ হতে থাকে খুব ভাল পড়েছি বলে আমাকে বাহবা দিতে এসেছেন ওঁরা। চমৎকার পড়তে পারলে আমাকে কোলে নিয়ে নাচবেন রুনু খালা, টুটুমামা লজেন্স দেবেন খেতে, নানি গাছের বড় পেয়ারাটি পেড়ে হাতে দেবেন। শুদ্ধ উচ্চারণে পড়ি, অক্ষরে আঙুল রেখে–হ, লয় হ্রস্যউকার,দ; এবার ছবির দিকে তাকিয়ে, আদা। ঘরে হুল্লোড় পড়ে হাসির। ঝুনু খালা হাসতে হাসতে মেঝেয় বসে পড়েন, তাঁর ওড়না খসে পড়ে গা থেকে। রুনু খালা হি হি হি হি। দাদা আর টুটুমামা হা হা হা। নানি আর মাও সশব্দে হেসে ওঠেন। আমি সকলের মুখের দিকে তাকাই, আমার মুখেও হাসি ফোটে, হাসি সংক্রামক কি না। সংসারের ছোটখাট এক রঙ্গমঞ্চে আমি একাই অভিনেষনী, আর সবাই দর্শক শ্রোতা। নানি হাসতে হাসতে আমাকে বলেন–হ লয়হ্রস্রউকার দ, হলুদ। হলুদের আর আদার ছবি দেখতে এক রকম বইলা তর কি হলুদরে আদা পড়তে হইব! ছবি আমার মনে গাঁথা, শব্দ নিয়ে আদৌ মাথা ব্যথা নেই। আসলে আমি ছবি পড়ি, শব্দ নয়। অক্ষর আঁকার আগে এঁকেছি গাছ, ফুল, নদী, নৌকো।
ঠাকুরগাঁয়ের পিটি আই ইস্কুল আমাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন ছোটদা, কোলে করে নিয়ে ঠেসে বসিয়ে এসেছিলেন ক্লাসঘরে। সে কী চিৎকার আমার! মাস্টার তাঁর কোলে বসিয়ে আমার কান্না থামাতে গান গেয়েছিলেন সেদিন, খৈয়া খৈয়া চাঁদ খুলা আসমান। কান্না থামলে আমাকে আর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসিয়ে দিয়ে মাস্টার বলেছিলেন– খোকা, খুকি, একটা কলস এঁকে দেখাও তো।
দিব্যি দু’তিন টানে কলস একেঁ ফেলি। কলসের গলায় মালা পরিয়ে দিই ফুলপাতার। ছেলে মেয়েরা নিজেদের আঁকা থামিয়ে আমার কলসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পিটিআই ইস্কুলে সেই প্রথম দিনই নাম হয়ে যায় আমার। মাস্টার দু’হাতে আমার কোমর ধরে উঁচু করে তুলে বলেছিলেন–এই খুকিকে দেখ, এ খুব বড় শিল্পী হবে একদিন।
পড়াতে বসে দাদা বললেন চল চল কবিতাটা মুখস্ত ক।
–চল চল চল
উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চলরে চলরে চল।
এটুকু অবদি বলতেই প্রশ্ন অরুণ অর্থ কি?
আমি মুখ বুজে থাকি। দাদা কাঠের পেনসিল দিয়ে আমার আঙুলে জোরে টোকা মেরে মেরে বলতে লাগলেন–বান্দরের মত খালি মুখস্ত করলেই হইব? অর্থ না জাইনা! দাদার মাস্টারির শখ যেদিন হয়, সেদিন পেনসিলের ঠোকর, গালে চড়, পিঠে ঘুসি এসবেই আমার সন্ধে পার হয় যতক্ষণ না মা রাতের খাবার খেতে ডাকেন। বাকি সন্ধেগুলো নানির ঘরের উঠোনে পাটি বিছিয়ে টুটু মামা, শরাফ মামা, ফেলু মামার সঙ্গে এক সারিতে বসে পাঠশালার ছাত্রদের মত শব্দ করে পড়তে হয়। শব্দ করে, যেন ঘর থেকে বড়রা শুনতে পান পড়ছি। এক হারিকেনের আলোয় দু’জন করে, দুলে দুলে। শরাফ মামা আর আমি শব্দ করে ছড়া পড়তে থাকি, ফেলু মামা তখনও মা কলম কলায়। তুফান আসিল প্রচন্ড বেগে। টিনের চাল উড়িয়া যাইতে লাগিল বাতাসে। গাছপালা গুড়িসুদ্ধ উপুড় হইয়া পড়িল। মানুষ আছাড় খাইয়া পড়িতে লাগিল পড়ে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবদি হাসে টুটু মামার। ফেলু মামা আর শরাফ মামাও হেসে কুটি কুটি। তুফান এলে টিনের চাল উড়ে গেলে, মানুষ আছাড় খেয়ে পড়তে থাকলে দুঃখের বদলে ওঁদের হাসি কেন আসে আমি ঠিক বুঝে পাই না। হাসি শুনে নানি ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলেন–পড়তে বইয়া হাসি কিয়ের! টুটু মামার এই নিয়ম, প্রতিরাতে একবার করে তুফানের গল্পটি না পড়লে তাঁর চলে না। রাত আটটায় পাকঘরে ডাক পড়ে আমাদের। পিঁড়িতে বসে মাছ ডাল যা দিয়েই ভাত খাওয়া হোক, শেষে কবজি ডুবিয়ে দুধ নিতে হয় পাতে। মা বাবার সঙ্গে এক খাটে ইয়াসমিন ঘুমোয় বলে জায়গার অভাবে নানির চৌচালা ঘরে পাশাপাশি তিনটে খাটে পাতা লম্বা বিছানায় শরাফ মামা ফেলু মামা, নানা, নানির সঙ্গে ঘুমোতে হয় আমাকে।
ঠাকুরগাঁ থেকে ফেরার দু’মাস পর নানা আমাদের, শরাফ মামা, আমাকে আর ফেলুমামাকে ভর্তি করে দেন রাজবাড়ি ইস্কুলে। আমি আর শরাফ মামা টুতে, ফেলুমামা ওয়ানে। ইস্কুলে যাওয়ার জন্য কালো তিনটে ছাতাও কিনে দেন নানা। শাদা কালিতে যার যার নাম লিখিয়ে আনেন ছাতায়। সকালে ঘি চিনি মাখা ভাত খেয়ে রওনা হই, হেঁটে, ছাতা মাথায়। দুপুরে ইস্কুলে টিফিন খেতে দেয়। বিকেলে ফিরে এসে ভাত খেয়ে খেলতে যেতে হয় বাড়ির লাগোয়া মাঠে। খেলে সন্ধের মুখে গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে কলপাড়ে হাত মুখ ধুয়ে হারিকেন জ্বেলে পড়তে বসতে হয়। আমার জীবন দু’আঙিনায় কাটে, নানির বাড়ির আর আমাদের বাড়ির। দু’ঘরে আমার বই পত্তর, জামাজুতো, কোনওদিন এ ঘরে খাওয়া, কোনওদিন ও ঘরে। সুখ দুঃখ দুইই তখন ঘন ঘন আসে আর যায়, যেন এরা পাশের বাড়ি থাকে। ইস্কুলে যাওয়া শুরু করা অবদি আমি লক্ষ করি টিফিনে টিনের রঙিন থালা পেলে মনে আমার সারাদিন সুখ থাকে। ফুল ফল আঁকা কিছু থালা আছে, আছে কিছু শাদা থালাও। টিফিনের ঘন্টা পড়লে ক্লাসের একজন সবার সামনে থালা রেখে যায়, পরে দপ্তরি এসে থালার ওপর এক এক করে টিফিন দিয়ে যায় কখনও কলা ডিম রুটি, কখনও খিচুড়ি। পপি, ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা ভাল ছাত্রী, দিব্যি ছবিআঁকা থালা বেছে নেয় নিজের জন্য। পপির মা খালা আবার ইস্কুলের মাস্টার। সে যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে, তা পেছনের বেঞ্চে মাথা নুয়ে বসে থাকা ক্যাবলাকান্ত আমার সাধ্য নেই করি। কখনও কখনও কারও হাত ফসকে আমার ভাগে ছবির থালা পড়ে। চোখ পড়ে থাকে থালার ছবিতে, খাবারে নয়।
