আজ তারা কে কোথায়, জানি না। আমার সেই নিঃসহায় প্রথম জীবনে তারা যে ভাবে আমাকে উৎসাহিত করিতেন, তাহা ভাবিয়া আজিকার অসাম্যের দিনে আমার দুই নয়ন অশ্রুপ্লাবিত হয়। ‘
গবাদী পূর্বের মতই আমায় এই প্রদর্শনীর দ্রব্যগুলিকে যথাস্থানে সাজাইবার ভার নেন। প্রতিদিন স্ত্রী-পুরুষ বহুলোক আসিয়া এই প্রদর্শনীতে ভীড় করিত।
গ্রীষ্মের ছুটিতে একটি বড় বাক্সের মধ্যে এই শিল্পনিদর্শনগুলি সাজাইয়া বন্ধুবর অজিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে রাখিয়া আমি দেশে যাই। ছুটির পরে আসিয়া দেখিলাম, ঠাকুরবাড়ির দারোয়ান আমার সংগ্রহগুলি বাক্স হইতে ফেলিয়া দিয়া সেখানে তাহার কাপড়চোপড় বোঝাই করিয়াছে। সংগ্রহগুলির কথা জিজ্ঞাসা করিলে বলিল, আবর্জনা মনে করিয়া সে ফেলিয়া দিয়াছে। একথা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হইল না। আজও মন বলে, কোন বিশিষ্ট পল্লীশিল্প সংগ্রাহক কোন লালের সাহায্যে আমার সংগ্রহ গুলি কবল করিয়াছিলেন। তাঁর সংগৃহীত নিদর্শনগুলি তিনি বহুলোককে দেখাইয়াছিলেন, কিন্তু আমাকে দেখান নাই।
আজও একান্ত মনে বুসিয়া থাকিলে আমার মানসনয়নে কে যেন সেই নক্সীকাঁথাগুলি মেলিয়া ধরে। তার উপরে পুতুলগুলি, গাজীর পট, মনসাপূজার সরা, বিবাহের পিড়ি চিত্র একের পর এক আসিয়া কেহ নাচিয়া কেহ গান করিয়া যার যার অভিনয় নিখুতভাবে সমাধা করিয়া যায়। এক এক সময় ভাবি, এই সব জিনিস ভালবাসিবার মন যদি বিধাতা দিলেন, এগুলি সংগ্রহ করিয়া ধরিয়া রাখিবার অর্থসঙ্গতি আমাকে দিলেন না কেন? ভাবিয়া কিছু সান্ত্বনা পাই, আমার বন্ধু দেবপ্রসাদ ঘোষ কলিকাতায় আশুতোষ মিউজিয়ামে, ও শিল্পী জয়নুল আবেদীন তাঁর আর্ট-ইস্কুলে পল্লী-শিল্পের নিদর্শনগুলি অতি যত্নের সঙ্গে সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছেন।
পূর্বেই বলিয়াছি, ১৯৩২ সনে কিছুদিনের জন্য আমি বন্ধুর অজিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নীচের তলায় কয়েকটি ঘর ভাড়া লইয়া ঠাকুর-বাড়িতে থাকিতাম। ও-পাশে দোতলায় থাকিতেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বহুকাল ইউরোপ ঘুরিয়া তিনি দেশে ফিরিয়াছেন—নানান দেশের নানান অভিজ্ঞতা লইয়া বহুজন-সমাগমপূর্ণ বাড়ির এই ভদ্রলোক যেন আর এক দেশের মানুষ। আর সব বাড়িতে আটের কথা, সাহিত্যের কথা, নাট্যকলার কথা। সৌম্যেন ঠাকুরের ঘরে কুলীমজুরের কথা, চাষীর কথা—লোকের অন্নবস্ত্রের কথা। এ বাড়িতে ও-বাড়িতে লোক আসিত মোটরে করিয়া। তাহাদের গায়ের সুগন্ধী প্রলেপের বাসে বাতাস সুরভিত হইত। সৌম্যেন ঠাকুরের ওখানে আসিত ছোঁড়া খদ্দর-পরা কোন প্রেসের পদচ্যুত কম্পােজিটর; নিকেলের আধরঙা চশমাজোড়া কোন রকমে কানের সঙ্গে আটকাইয়া আলিত গোবিন্দ-মিলের ফোরম্যান বুকপকেটে রাঙা রেশমী রুমালেব আর্ধেকটা ঝুলাইয়া চটিজুতা পায়ে আসিত চট্টগ্রামের জাহাজী রহিমুদ্দীন, ছেড়া পাঞ্জাবীর উপর ওভারকোট পরিয়া জর্দাকিমাম সহ পান চিবাইতে চিবাইতে আসিত মেছুয়াবাজারের বছিরদ্দি। এদের লইয়া সৌম্যেন সারাদিন কী সব গুজুর-গুজুর করিত। এ-বাড়ির ও-বাড়ির লোকেরা ঠাট্টা করিয়া বলাবলি করিত, “দেখ গিয়ে ওখানে নতুন কাল মার্কসের উদয় হয়েছে।”
এই সামান্য লোকদের লইয়া সৌম্য মহাশক্তিমান বৃটিশসিংহের কি ক্ষতি করিত, জানি না। কিন্তু প্রতিমাসে দুইবার তিনবার তার বাড়ি খানাতল্লাসী হইত।
এ-বাড়ির ও-বাড়ির লোকে ঠাট্টা করিয়া বলিত, ওসব সাজানো খানাতল্লাসী। খানাতল্লাসী করাইয়া সে পলিটিক্সে নাম করিতে চায়; খবরের কাগজে নাম উঠাইতে চায়। কিন্তু খবরের কাগজগুলি যাঁদের হাতে, সৌম্য তাদেরও গাল পাড়িত; তাদের বরখাস্ত কর্মচারীদের লইয়া ফুসুর-ফুসুর করিত। খবরের কাগজে তার নাম উঠিত না। এ-বাড়ির ও-বাড়ির লোকদের চলা-বলার ভঙ্গীর অনুকরণ করিয়া সৌম্য তাদের ঠাট্টা করিত, গাল দিত, আর ভবিষ্যৎবাণী করিত “এদের তাসের ঘর ভাঙল বলে। দেশের সঙ্গে এদের সম্পর্ক নেই। মানুষের অভাবের কথা এরা বোঝে না, বুঝতে চেষ্টাও করে না। মিথ্যার উপরে এদের বেশাতি; প্রজার রক্তের উপর এদের জমিদারী। এদের সব-কিছু একদিন ভেঙে পড়বে। দেখছ না, এরা সব কেমন অলসের দল! এদের নিত্যকার গল্প ওখানে গেলুম। অমুক এলেন, অমুক গেলেন, গল্পটা এমন জমল জান! ওদের বাড়ি সেদিন যা খেলুম—এমন ভাল হয়েছিল রান্নাটা! সেদিনকার অভিনয় বেশ ভাল জমেছিল।—এইসব হল এদের নিত্যকার আলোচনা। যাঁরা প্রতিভা, তারা দিনরাত খাটছেন, তপস্যা করেন। কিন্তু সেই প্রতিভাগুলির সঙ্গে পরগাছাগুলো কী মধুর আলস্যে দিন কাটাচ্ছে। কোন কাজ করে না; কোনকিছু জানতে চায় না। এদের পতন একদিন হবেই।” সন্ধ্যার সময় সৌম্যের গুণগ্রাহীর দল চলিয়া যাইত। তখন ছাদে বসিয়া তাহার কাছে শুনিতাম নানান দেশের গল্প; ইতিহাসের নানা রকমের কাহিনী। সৌম্য কিছুই মানে না। গান্ধী হইতে আরম্ভ করিয়া নাজিমুদ্দীন সাহেব পর্যন্ত সবাইকে গাল দেয়। হিন্দু দেবদেবী, আল্লা, ভগবান, ব্বহ্মসমাজের কাহাকেও সে বাদ দেয় না। নিজের আত্মীয়স্বজনের ত কথাই নাই। সৌম্য সবাইকে সমালোচনা করে। আমার পক্ষে তার সঙ্গে তাল রাখিয়া চলা বড়ই মুস্কিল। মাঝে মাঝে তুমুল তর্কের অগ্নিদহনের পাশ দিয়া স্নেহের প্রতিমূর্তি সৌম্যের মা আমাদের দিকে একটু চাহিয়া মৃদু হাসিয়া চলিয়া যাইতেন।
সৌম্যের তর্কের আর এক মজা, সে আপোস করিতে জানে। তার মত হইতে সে এক ইঞ্চি ও এদিক-ওদিক হইতে চায় না। যখন তর্কে হারিয়া যাই, তাকে গাল দিই: “তুমি সেই চিরকালের ভুৎমার্গী বামুনপণ্ডিত। তোমার ছোঁয়াছুয়ির ছুৎমার্গ আজ রূপগ্রহণ করেছে তোমার উৎকট মতবাদে। তোমার সঙ্গে যার মতের মিল নেই, তাকে তুমি অস্পৃশ্য বলে মনে কর।” সৌম্যও আমাকে বলে, “কাঠমোল্লা তোমার মুখে দাড়ি নেই, কিন্তু তোমার দাড়ি ভর করেছে তোমার সেকেলে মতবাদে।”
