অবনীন্দ্রনাথের নীচের তলায় এক ঘরে বসিয়া গবাদা (ব্বতীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ছবি আঁকিতেন। পাশে তাঁর শিষ্য অম্বি, প্রশান্ত এরাও ছবি আঁকিতেন। ওঘরে অলক বাবু ছবি আঁকিতেন। সমস্ত বাড়িটা যেন ছবির রঙে ঝকমক করিত। গবাদ এখন ছবি আঁকেন না। সন্ধ্যাবেলা পশ্চিম আকাশের মেঘ কাটিয়া গেলে সবুজ ধানের ক্ষেতের উপর যে আবছা আলোর একটু মৃদুপেলব স্পর্শ দেখা যায়, তারই মোহময় রেশ তিনি ছবিতে ধরিয়া রাখিতে পারিতেন। আমার ধানক্ষেত পুস্তকের প্রচ্ছদপটের জন্য তিনি অমনি একখানা ছবি অকিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু ব্লক করিয়া ছবি ছাপাইয়া দেখা গেল, সেই আবছা আলোর মোহময় রেশটি ছবির ধানক্ষেতের উপর রক্ষিত হয় নাই। আমার মন খারাপ হইয়া গেল। গবাদাকে এ কথা বলিতে তিনি বলিলেন, “হ্যাঁ ছবিতে যা এঁকেছি হাফটোন ব্লকে তার অর্ধেকটা মাত্র ধরা দেবে। সবটা পাওয়া যাবে না। এ জন্য দুঃখ করো না।”
সারাটি সকাল গবাদা ছবি আঁকিতেন। তারপর আর তাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইত না। ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউটে কোথায় একজিবিশন হইবে, কোন কলেজে ছেলেরা নাটক অভিনয় করিবে—সাজানোগোছানোর ভার গবাদার উপর। ভারবোঝ তাহাকে দিতে হইত না, তিনি নিজেই যাচিয়া ভার গ্রহণ করিতেন। কোন কোন অনুষ্ঠানে তিন-চার দিন অনাহারে অনিদ্রায় একাদিক্রমে কাজ করিতেন। অনুষ্ঠানের কার্যসূচিতে তার নাম পর্যন্ত ছাপা হইত না। এ সব তিনি খেয়ালও করিতেন না।
বহুদিন বহু গ্রামে ঘুরিয়া আমি নানা রকমের পুতুল, নক্সীকাঁথা, গাজীর পট, পিঁড়ি-চিত্র আলপনা-চিত্র, ব্যাটন, সিকা, পুতুলনাচের পুতুল প্রভৃতি সংগ্রহ করিয়াছিলাম। বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন এইগুলি দিয়া কলিকাতায় প্রদর্শনী খুলিতে। কিন্তু কে আমার প্রদর্শনী দেখিতে আসিবে? প্রদশনী খোলর আগে বড় বড় নামকরা দুএকটি মতামত সংগ্রহের প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের ঘরের ছাতে গবদা এই সংগ্রহগুলি উত্তম করিয়া সাজাইয়া রবীন্দ্রনাথকে ডাকিয়া আনিলেন। অবনীন্দ্রনাথও আসিলেন। তখন আমার মনে কত আনন্দ! এতদিনের পরিশ্রম সার্থক বলিয়া মনে হইল। রবীন্দ্রনাথ আর অবনীন্দ্রনাথ আমার সংগ্রহগুলির এটা-ওটা নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ত পুতুল নাচের পুতুলগুলি দেখিয়া খুশিতে বিভোর।
সমস্ত দেখিয়া রবীন্দ্রনাথ বলিলেন, “আমার ইচ্ছা করে, এমনি পল্লীশিল্পের রকমারি সংগ্রহ আমার শান্তিনিকেতন সংরক্ষিত করি।”
দিনে দিনে আমার সংগ্রহগুলির বহর বাড়িতেছিল। এই সংগ্রহগুলি কোথায় রাখিব, সেই ছিল আমার মস্তবড় সমস্যা। কবিকে বলিলাম, “আপনি যখন পছন্দ করেছেন, এগুলি শান্তিনিকেতনে নেবার ব্যবস্থা করুন। এগুলি আপনাকে যে আমি দিতে পারলাম, এটাই আমার বড় গৌরবের কথা। আপনার ওখানে থাকলে দেশবিদেশের কলারসিকেরা নখে আনন্দ পাবেন। নতুন শিল্পীরা তাদের শিল্পকাজে প্রেরণা পাবে। এটাও কি কম কথা?”
রবীন্দ্রনাথ বলিলেন, “আমি নন্দলালকে এগুলি নিয়ে যাবার কথা বলব।”
নন্দলাল বাবু আমার সংগ্রহগুলি একবার আসিয়া দেখিলেন, কিন্তু লইয়া যাইবার আগ্রহ প্রকাশ করিলেন না। দুই-একদিন তাকে তাগিদ দিয়া আমিও নিরস্ত হইলাম। পল্লী-শিল্পের এই প্রদর্শনী দেখিয়া রবীন্দ্রনাথ যে বিবৃতি দিয়াছিলেন, তাহা তৎকালীন পত্রিকা গুলিতে ছাপা হইয়াছিল।
পরে আমার এই শিল্পকলার নিদর্শনগুলি দিয়া কতিপয় বন্ধুর সাহায্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগে আমরা একটি প্রদর্শনী খুলিয়াছিলাম। এই উপলক্ষে সেখানে আমাকে কয়েকটি বক্তৃতা দিতে হয়। এই শিল্পগুলির কোনটি কি ভাবে কাহারা তৈরী করে, কোথায় কি উপলক্ষে ব্যবহৃত হয়, এর সঙ্গে কি কি পল্লীগান ও ছড়া মিশিয়া রহিয়াছে, এই শিল্পগুলি আমাদের গ্রাম্যজীবনের আনন্দবর্ধনে ও শোকতাপ হরণে কতটা সাহায্য করে, রঙে ও রেখায় কোথায় এই শিল্প কোন রূপময় কাহিনীর ইঙ্গিত বহিয়া আনে, আমি আমার বক্তৃতায় এই সব কথা বলিয়াছিলাম।
সভাপতির ভাষণে শ্রদ্ধেয় কালিদাস নাগ মহাশয় যাহা বলিলেন, তাহা আমার সমস্ত বলাকে ম্লান করিয়া দিল। কিন্তু বক্তৃতা শুনিয়া গর্বে আমার বুক সাত হাত ফুলিয়া গেল। সমস্ত পৃথিবীর শিল্পকলা তার নখদর্পণে। তিনি বলিলেন, “আজ ইউরোপের একদল শিল্পী তাঁদের যুগযুগান্তরের শিল্পকলার পথকে নিতান্ত বাজে আখ্যা দিয়ে লোকশিল্পের সুধা-আহরণে মশগুল হয়েছেন। সেই আলো-আঁধারী যুগের স্তম্ভের গায়ে পাথরের গায়ে যে সব ছবির ছাপ রয়েছে, তারই উপরে তারা নতুন শিল্পকলা গড়ার সাধনা করছেন।”
সেই বক্তৃতার মধ্যে তিনি গর্গার জীবনের কাহিনী অবতারণা করিলেন। সারা জীবনের শিল্প-সাধনাকে পশ্চাতে ফেলিয়া তিনি টিহিটি দ্বীপে গিয়া সমুদ্রতীরে উলঙ্গ হইয়া সেই আদিম যুগের বাসিন্দাদের মত সূর্যোদয় দেখিয়া তাহাদের মত বিস্ময় অনুভব করিতে চেষ্টা করিতেন। এই কাহিনী তিনি এমন সুন্দর করিয়া বলিলেন, যাহার রেশ আজও ছবির মত আমার মনে আঁকিয়া আছে।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বিনয় বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন ঘোষ, বীরেন ভঞ্জ এবং আরও কয়েকজনের চেষ্টায় ইউনিভারসিটি ইনস্টিটিউটের হলে আমার সংগ্রহগুলির আর একটি প্রদর্শনী হয়। তারা সকলেই চাহিতেন, গ্রাম্য লোক-শিল্প এবং লোক-সংস্কৃতির প্রতি আমার যে অনুরাগ, তাহা আরও দশজনে অনুভব করেন; কোন অর্থবান লোক আসিয়া আমার এই প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করেন।
