সৌম্যকে বলি, “তুমি ঈশ্বর মান না, কিন্তু আর্ট-সাহিত্য ত মান? আজ ঈশ্বরকে বাদ দিলে জগতের কত বড় ক্ষতি হবে জান? মধ্যযুগের খৃস্টান-গির্জাগুলিতে দেখে এসো, রঙের রেখার ইন্দ্রজালে অচির সৌন্দর্যকে চিরকালের করে রেখেছে। ভারতবর্ষের মন্দির আর মসজিদগুলিতে দেখ, যুগে যুগে কত রঙ-পিপাসুর দল তাদের কালের যা-কিছু সুন্দর, অমর অক্ষরে লিখে রেখে গেছে। এগুলি দেখে আজ আমরা কত সান্ত্বনা পাই।”
সৌম্য আমার কথাগুলি বিকৃত ভঙ্গীতে উচ্চারণ করিয়া উত্তর দেয়, “আহা মরি মরি রে! কালীর মন্দিরে মানুষ বলি দেওয়া, দেবস্থানে দেবদাসী রাখা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন দেওয়া, পুরুষের চিতার উপরে জোর করে স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা ধর্মের কী অপরূপ কীর্তি! পৃথিবীতে ধার্মিক লোকেরা যত নরহত্যা করেছে, কোন তৈমুরলং বা নাদির শাহ, তা করতে পারেনি।”
সৌম্যের সঙ্গে তর্ক করিয়া পারি না। নানা যুগের ইতিহাস লইয়া সৌম্য নূতন নূতন ব্যাখ্যা করে। তার সঙ্গে সব সময় একমত হইতে পারি না। কিন্তু তার কথা শুনিতে ভাল লাগে।
এ-বাড়িতে ও-বাড়িতে কৃচিৎ রাজনীতি লইয়া আলোচনা হয়। সবাই আলোচনা করেন সাহিত্য লইয়া, শিল্পকলা লইয়া। দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানে বিরাট পার্থক্য থাকিলেও পরস্পর মিশিতে কোন অসুবিধা হয় না। সৌম্যের আলোচনা দেশের রাজনীতি লইয়া। হিন্দু-মুসলমান কোন রাজনৈতিক নেতা তার কঠোর সমালোচনা হইতে বাদ যান না। কংগ্রেসের নেতা, হিন্দুমহাসভার নে, সমাজতন্ত্রী নেতা—এদের সৌম্য এমনই কঠোরভাবে সমালোচনা করে যে কোন গোঁড়া মুসলমান রাজনৈতিকের সমালোচনাও তার ধারকাছ দিয়া যাইতে পারে না। মুসলিম নেতারা অনেক সময় হিন্দু নেতাদের গাল দেন কোন রকমের যুক্তি না দেখাইয়াই। হিন্দু নেতারাও মুসলিম নেতাদের সেই ভাবে গাল দেন। যুক্তির বহর কোন দলেই ততটা শক্ত হয় না, কিন্তু সৌম্য এদের দুই দলকেই গাল দেয় যুক্তির অবতারণা করিয়া। সেইজন্য সৌম্যের সমালোচনায় হল থাকিলেও তাহাতে বিষ মেশানো থাকিত না।
দুই দলকে সমান ভাবে সে গাল পাড়িল। হিন্দু নেতাদের গাল দিতে সে যেসব যুক্তির অবতারণা করিত, তাহা শুনিয়া মাঝে মাঝে আনন্দ পাইতাম। কারণ, তাঁদের সকলকে আমি সমর্থন করিতাম না। আবার যেসব মুসলিম নেতাকে আমি সমর্থন করিতাম, তাদের বিরুদ্ধে সে কিছু বলিলে প্রাণপণে তার যুক্তির বিরুদ্ধে তর্ক করিতাম, হারিয়া গিয়া কিছুটা ব্যথা পাইতাম।
সৌম্য বলিত, “আস্তে আস্তে দেশ থেকে ধর্মে ধর্মে ভেদ উঠে যাবে। ধর্মের ভেদ জিইয়ে রেখেই দেশের নেতারা সমাজতন্ত্রের প্লাবন দাঁড়াতে দিচ্ছে না। এই যে মানুষে প্রভেদ—একদল ফেলে ছড়িয়ে খাচ্ছে, আর একদল না খেয়ে মরছে—এই অসাম্য দেশ থেকে কখনো যাবে না যদি ধর্মের লড়াই এমনি ভাবে চলতে থাকে। দেখছ না—এই যে তোমাদের মুসলানদের শক্তির লড়াই, এ শক্তি কার অন্য? মুষ্টিমেয় কয়েকজন সুবিধাবাদীর জন্য। দেশের না-খাওয়া ভুখা জনগণের জন্য নয়। আর হিন্দুরা যে তোমাদের বাধা দেয়, তা-ও সেই বনিয়াদি কয়েক ঘর ধনীর স্বার্থ নষ্ট হবে বলে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মুসলিম দলের ভুখা জনগণ বুঝতে পারে না, হিন্দুদলের সর্বহারারাও তা বোকে না। দুই সমাজের ধনিক লোকেরা নিজ নিজ সমাজের শ্রমিক লোকদের একের বিরুদ্ধে অপরকে লেলিয়ে দেয়। কত জীবন নষ্ট হয়। বড়লোকেরা কিন্তু ঠিকই থাকে। সেই জন্যে আমরা চাই, দেশের জনগণ ধর্ম সমাজ সব-কিছু ভুলে রুটির লড়াইয়ে নেমে আসুক।”
আমি বলি, “তোমার রুটির লড়াইয়ে আজ যারা তোমার সঙ্গে, ‘তাদের সংখ্যা হাতের আঙুলে গণা যায়। মনে কর, আমরা একদল মুসলিম তোমার সঙ্গে এসে যোগ দিলাম; ধর্মের কোন ধার ধারলাম না। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান, দুই সমাজেই ত সাম্প্রদায়িক লোকেরা একে অপরের বাড়ি আগুন ধরাবে। যেহেতু আমরা কয়েকজন তোমার সঙ্গে রুটির লড়াই করছি, এ জন্যে কি হিন্দু সাম্প্রদায়িকবাদী আমাদের বাদ দেবে? আমাদের ঘর যখন পুড়বে, তখন আমাদের রক্ষা করবে কে? তোমার সমাজতন্ত্রবাদ যখন আসবে, মেনে নিলাম, সেদিন কোন সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই কারো কোনো ভয় থাকবে না। কিন্তু যতদিন সমাজতন্ত্রবাদ না আসে, ততদিন আমাদের রক্ষা করবে কে?”
সৌম্য বলে, “তবে কি তুমি দেশকে এই ভাবেই চলতে দিতে চাও? দুই দলের সুবিধাবাদী কয়েকজন সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বালিয়ে রেখে সমস্ত দেশকে এইভাবেই শোষণ করে যাবে?
তর্কের উপর তর্ক চলিতে থাকে। কোন কোন রাতে আকাশে শুকতারা আসিয়া উদয় হয়।
সৌম্যের কাগজ গণবাণীতে আমি মহাত্মা গান্ধীকে সমালোচনা করিয়া বেনামীতে একটি কবিতা প্রকাশ করিয়াছিলাম। এতেই বোঝা যাইবে, সৌম্যের মতবাদ তখন কতটা প্রভাবিত করিয়াছিল। মোপল-বিদ্রোহের উপর সৌম্য একখানা বই লিখিয়াছিল, সেই বিদ্রোহ সম্পর্কে মতভেদ হইয়া আলী-ভ্রাতারা মহাত্মা গান্ধীর দল হইতে বাহির হইয়া যান। সৌম্য তার ছোট্ট বইখানায় যুক্তি এবং তথ্যসহ প্রমাণ করিয়াছিল, মোপলা-বিদ্রোহ বনিয়াদি ধনিকদের বিরুদ্ধে দেশের জনগণের স্বতস্ফুর্ত ফরিয়াদ।
তৎকালীন কংগ্রেস-নেতা কিদোয়াই এবং আরও অনেকের মতামত উদ্ধৃত করিয়া সৌম্য দেখাইয়াছিল, মোপল-বিদ্রোহকে সাম্প্রদায়িক বলিয়া মহাত্মা গান্ধী ভুল করিয়াছিলেন। সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় যে, তখনকার দিনের সব চাইতে অধিক মুসলিম স্বার্থরক্ষাকারী স্যার নাজিমুদ্দীন সেই পুস্তকখানা গভর্নমেন্টের তরফ হইতে বাজেয়াপ্ত করিয়াছিলেন।
