ব্বতীনবাবু সর্বসময়
ব্যস্ত আছেন ভারি,
সবই কিন্তু পরের তরে
কোন কাজ নেই তারি
কনকবাবু অধিক সময় জমিদারির কাজ দেখিতে মফস্বলে ঘোরেন, মাঝে মাঝে জোড়াসাঁকো আসিয়া উদয় হন; কে খুব খাইতে পছন্দ করে কে গান গাহিতে ঘাড় নাচ’য়; কে সারা দিন বসিয়া শুধু নভেল পড়ে—ইত্যাদির বর্ণনায় গানটি ভরা ছিল। আমরা নাচিয়া নাচিয়া সেই গান গাহিয়া খুব আনন্দ উপভোগ করিয়াছিলাম।
নীচের তলার ঘরে মাঝে মাঝে বসিয়া আমরা যত সব আজগুবি গবেষণা করিতাম। এই কাজে ব্রতীন্দ্রনাথের বুদ্ধি ছিল খুব প্রখর। একদিন আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হইল—রবীন্দ্রনাথ কবি নন, একেবারেই নকল—তাহাই প্রমাণ করা। এক একটি করিয়া, পয়েন্ট টোকা হইল–
১। রবীন্দ্রনাথ খুব ভাল খাইতে পছন্দ করেন। কোন কবিই বেশি খান না।
২। কবিদের দেখা যায়, সন্ধ্যা-সকাল আকাশের দিকে বিভোর ভাবে চাহিয়া থাকিতে। রবীন্দ্রনাথ শেষরাত্রে উঠিয় স্নান করিয়া অনেক গুলি সন্দেশ খাইয়া লিখিতে বসেন। সুতরাং তিনি যাহা লেখেন, তাহা সেই সন্দেশ খাওয়ারই প্রভাব। সত্য সত্য তাহার ভিতরে কোন কাব্য নাই।
৩। বহু বৈষ্ণব কবিতা তিনি নকল করিয়া মারিয়া দিয়াছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তার পশারিণী’ কবিতার উল্লেখ করা যাইতে পারে। তিনি মাঝে মাঝে কাসিয়া উঠেন। তাহাও নিতান্ত অকবি-জনোচিত।
৪। যেহেতু তিনি জমিদারি কার্যে অত্যন্ত সুদক্ষ, সুতরাং কবি হইতে পারেন না।
৫। তাহার কণ্ঠস্বর ক্রমেই কর্কশ হইয়া যাইতেছে। কেমন ভাবলেশহীন। ইহা সত্যকার কবির লক্ষণ নয়।
এইভাবে যে যত পয়েন্ট বাহির করিতে পারি, তাহার তত জিত হইত। এই সব আলোচনার পরে রবীন্দ্রনাথের গান বিকৃত করিয়া গাওয়া হইত। এই কাজে আমি ছিলাম বোধহয় সব চেয়ে অগ্রণী। আমার না ছিল তাল-জ্ঞান, না ছিল সুর-জ্ঞান। রবীন্দ্রনাথের গানগুলিকে ভাটিয়ালি সুরে গাহিয়া সকলের হাস্যের উদ্রেক করিতাম। এই জন্য দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর অতর্কিতে একদিন আমাদের সভায় ঢুকিয়া আমাকে তাড়া করিয়াছিলেন। তার সব চাইতে ক্রোধের কারণ, আমার বেতালা সুরে গান গাওয়া। অন্য কোন কারণে কেহ কোনদিন তাঁকে রাগিতে দেখেন নাই, কিন্তু তার সামনে বেতালা বেসুরো করিয়া কেহ গান গাহিলে তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করিয়াই আমরা বেতালা সুরে গান গাহিয়া তাকে রাগাইয়া দিতাম। আমার রচিত গ্রাম-গান তিনি খুব ভালবাসিতেন। তিনি আমাকে কথা দিয়াছিলেন, “তোমার গ্রাম্য-গানগুলির স্বরলিপি করিয়া আমি একটি বই তৈরী করিয়া দিব।” কিন্তু অকালে তাঁহার মৃত্যু হওয়ায় ইহা ঘটিয়া উঠে নাই।
একবার নিখিলবঙ্গ সঙ্গীত-সম্মেলন হয়। খুব সম্ভব ১৯৩০ সনে। দিনু দা সেই সম্মেলনে পল্লীসঙ্গীত বিভাগে আমাকে বিচারক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময় এই সম্মেলন বসে। তখন আমি বাড়ি চলিয়া আসি। সেইজন্য উহাতে যোগদান করিতে পারি নাই। রবীন্দ্রনাথের মাঝে মাঝে শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীর দল লইয়া কলিকাতায় অভিনয় করিতে আসিতেন। এই উপলক্ষে সাত-আট দিন ঠাকুরবাড়িতে অনন্সরত রিহার্সাল। বাহিরের কাহারো প্রবেশ করিবার উপায় ছিল না। দিনু-দাকে অনুরোধ করিতেই তিনি আমাকে রিহার্সাল শুনিবার অনুমতি দিলেন।
দিনু-দার পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের গানের মহড়া যাঁহার না শুনিয়াছেন, তাহারা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতের একটা খুব বড় জিনিস। উপভোগ করিতে পারেন নাই। রবীন্দ্রনাথের নতুন নতুন গান দিনু-দা শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের শিখাইতেন। তাঁহার কণ্ঠ হইতে গানের পাখি বাহির হইয়া নানা কণ্ঠে সুরের ডানা মেলিয়া ঘুরিত। এ যেন পক্ষি-মাতা তার শাবকগুলিকে ওড়া শিখাইত। তাদের ভীরু অপটু সুরের সঙ্গে তাঁর সুদক্ষ সুর মিলিয়া রিহাসেলের আসরে যে অপূর্ব ভাব-রসের উদ্রেক হইত, তাহার তুলনা মেলে না। সেই ভাব-সমাবেশ প্রতিদিন গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইত। এক একটি রিহাসেলে গান এমনই জমিত যে, স্টেজে প্রকৃত গানের আসরে তাহার শতাংশের এক অংশও জমিত না। প্রতিদিন আমি দিদার গানের রিহাসেলের সময় বসিয়া অপূর্ব সঙ্গীত-সুধা উপভোগ করিতাম।
১২.
দিনুদা সকলের নিকট অবারিতদ্বার। কারও কোন উপকার করিতে পারিলে যেন কৃতার্থ হইয়া যাইতেন। শৈলেনবাবু নামে এক ভদ্রলোক ময়মনসিংহ হইতে কলিকাতা আসেন। পল্লী-সঙ্গীতে -তাহার খুব নৈপুণ্য ছিল। কিন্তু অর্থ ভাবে কলিকাতা আসিয়া তিনি বিশেষ কিছু করিয়া লইতে পারেন নাই। দিনুদা তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দিয়াছিলেন। দিনুদার মৃত্যুর পর আমি একটি কবিতা লিখিয়া বিচিত্র কাগজে প্রকাশ করিয়াছিলাম।
এ বাড়ির এতসব লোকের কথা এমন করিয়া ইনাইয়া-বিনাইয়া কেন বলিতেছি, পাঠক হয়ত জিজ্ঞাসা করিবেন। রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথের কথা সকলেই জানিবেন, কিন্তু সেই মহাতরুদ্বয়ের ছায়াতলে তিম্ভে তিলে যারা নিজেদের দান করিয়া তরুর বুকে শত শাখাবাহুবিস্তারে সাহায্য করিয়াছিলেন, তাঁদের কথাও কিছুই লিখিত থাকা উচিত। সঙ্গীত-জগতে দিনুদা যদি অন্য পথ ধরিতেন, তবে হয়ত আরও বেশী সুনাম অর্জন করিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু মহাকবি যশ-সমুদ্রের তরঙ্গে তিনি সব কিছু স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বড় হইয়াছিলেন, এ যেন দিদার নিজেরই সাফল্য। এ কথা শুধু দিদার বিষয়েই খাটে না। ঠাকুর-পরিবারের সমস্ত লোক এই প্রতিভাদ্বয়কে নানা রকম সুযোগ সুবিধা করিয়া দিতে যে-কোন সময় প্রস্তুত হইয়া থাকিতেন।
