আমি আরও জোরে জোরে মন্ত্র পড়িতে লাগিলাম।
“আয় আয়—কালকেচণ্ডী আয়, শ্মশানকালী আয়—”
অদূরে সামনে আসিয়া সাহেবভূত খাড়া হইল। উপস্থিত ভক্তমণ্ডলীর কাছে আমি বলিলাম, “যার যা খাবার ইচ্ছে, সাহেব ভূতের কাছে চেয়ে নাও।”
একজন বলিল, “আমি আম খাব।” কেউ বলিল, “আমি বিস্কুট খাব।” বলিতে না বলিতে সাহেব তার ঝুলির ভিতর হইতে যে যাহা চায়, ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়। বিস্ময়ে ঘেটু কেবল কাঁপিতেছে। তাকে বলিলাম, “ঘেটু, তুমি কিছু চাও।”
মোহনলাল তাহার কানে কানে বলিয়া দিল, “বল, আমি লকেটফল চাই।”
ঘেটু তাহার নির্দেশমত বলিল “আমি লকেটফল চাই।”
আমি, ভুতকে বলিলাম, “শিগগীর লকেটফল নিয়ে এসো।” ভুত ইসারা করিয়া ‘না, না’ বলে। আমি বলি, “তা হবে না। তুমি এখনই সেই শ্বেতদ্বীপে গিয়ে লকেটফল নিয়ে এসো। অনেক দূর–কষ্ট হবে, তাই বলছ? কিন্তু মা-কালীর মুণ্ড চিবিয়ে খাবে যদি আমার কথা না শোন। দোহাই তোর দেব-দেবতার, দোহাই তোর কার্তিকগণেশের। আমার কথা রাখ।”
তখন ভূত অন্ধকারে মিশিয়া গিয়া খানিক বাদে একছড়া লকেটফল ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। ঘেটু তাহা পাইয়া আমার পায়ের উপর পড়িয়া কেবল বলিতে লাগিল, “দাদা আপনি মানুষ নন। সাক্ষাৎ ভগবান।”
তখন আমি ভূতকে বলিলাম, “তুই আরও এগিয়ে আয়। ঘেটুকে আশীর্বাদ করে যা। ঘেটুর যেন চাকরি হয়।”
ভূত আসিয়া ঘেটুর মাথায় হাত রাখিয়া আশীর্বাদ করিল। ঘেটু তবু সাহেববেশধারী সুজনকে চিনিতে পারিল না।
তখন আমি ঘেটুকে কাছে ডাকিয়া বলিলাম, “ভাই ঘেটু, সবই অভিনয়। তোমাকে নিয়ে আজ আমরা কিছু মজা করলাম। তোমার বন্ধু সুজন সাহেব-ভূত সেজে তোমাকে আশীর্বাদ করে গেল। তুমি কিন্তু চিনতে পারনি।”
কিন্তু ঘেটুর চেহারায় কোনও রূপান্তর হইল না। সে আমার কথা বিশ্বাস করিল না। পরদিন যখন সে সমস্ত ব্যাপার বুঝিতে পারিল, লোকের ঠাট্টার ভয়ে সাত-আটদিন ঘরে দরজা দিয়া রহিল। এখনো ঘেটুর সঙ্গে দেখা হইলে সেই পূর্ব রহস্যের হাসিতামাসার রঙটুকু আমরা উপভোগ করি।
এই রহস্যনাট্যের অন্যান্য অংশে যাহারা অভিনয় করিয়াছিল, তাদের সঙ্গে দেখা হইলেও এই ঘটনাটির উল্লেখ করিয়া আমরা পরস্পর আনন্দ লাভ করি। দশে মিলিয়া ভগবানকে কেমন করিয়া ভূত বানান যায়, এই ঘটনাটি তার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন।
১১.
শুনিয়াছি, মোহনলালের পিতা খুব বন্ধুবৎসল ছিলেন। সেই গুণ অনেকখানি মোহনলালের মধ্যে বর্তাইয়াছে। তার মত বন্ধু খুব কমই মেলে। যে কোন ব্যাপারে অসুবিধায় পড়িলে মোহনলাল তাহার সুরাহা করিয়া দিবে। “মোহনলাল; আজ টাকা নাই, এখনই আমার একশ টাকার প্রয়োজন।” মোহনলাল হাস্যমুখে বলে, “কোন চিন্তা নেই। এখনই এনে দিচ্ছি।” “মোহনলাল, আমার রিসার্চ-স্কলারশিপের রিপোর্ট কালই দাখিল করতে হবে। এতগুলো পৃষ্ঠা কি করে নকল করব একদিনের মধ্যে?” মোহনলাল বলে, “কোন চিন্তা নাই। আমি নকল করিয়ে দিচ্ছি।” মোহনলাল আমার কাছ হইতে কাগজ লইয়া তার মামাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিলি করিয়া দিল। এক রাতের মধ্যে সমস্ত কাজ হইয়া গেল।
“মোহনলাল, টাকা নেই, রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার দেখব।” মোহনলাল পিছনের দরজা দিয়া আমাকে ভিতরে ঢুকাইয়া দিয়া আসিল।
বই-এর পাণ্ডুলিপি তৈরী করা, প্রচ্ছদপটে ছবি আঁকান প্রভৃতি কত কাজই সে আমাকে হাসিমুখে করিয়া দিয়াছে! তার সঙ্গে মতের কোন অমিল হইত না কোনদিন। আমি যদি বলিতাম “হু” সে বলিত “হঁ।”। কোনখানে বেড়াইতে যাইতে, কাউকে অসময়ে গিয়া বিরক্ত করিতে—যখন যে-কোন অসম্ভব কাজে তাহাকে ডাকিয়াছি, সে বাতাসের আগে আসিয়া সাড়া দিয়াছে।
একদিন জ্যোৎস্নারাত। আমরা দুইজনে বসিয়া গল্প করিতেছি। রাত প্রায় একটা। আমাদের খেয়াল হইল, চল, আব্বাসউদ্দীন সাহেবকে ঘুম হইতে জাগাইয়া দিয়া আসি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি হইতে রিকসায় চাপিয়া চলিলাম পার্ক সার্কাস। বৌবাজার হইতে দুইজনে দুইগাছি ভাল বেলফুলের গোড়ের মালা কিনিয়া লইলাম।
আব্বাসউদ্দীন থাকিত কড়েয়া রোডের এক মেসে। বড়ই ঘুমকাতুরে। ঘুম হইতে জাগাইতে সেত রাগিয়া অস্থির। আমরা অভিনয়ের ভঙ্গীতে বলিলাম, “হে গায়ক প্রবর, আজ আমরা দুই বন্ধুতে স্থির করিলাম, অখ্যাতবিখ্যাত আব্বাসউদ্দীন সাহেবকে রজনী যোগে গিয়া ফুলের মালা পরাইয়া আসিব। অতএব আপনি ক্রোধ সংবরণ করিয়া এই মাল্য গ্রহণ করুন।”
দুই জনে তাহার গলায় দুইটি মালা পরাইয়া দিলাম। বন্ধুবর হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল। তারপর বহু ক্ষণ গল্প গুজব করিয়া জোড়াসাঁকো ফিরিয়া আসিলাম। পথের দুই ধারে ফুটপাথের উপর সারি সারি গৃহহীন সর্বহারারা শুইয়া আছে। মাঝে মাঝে রিক্সা থামাইয়া বহুক্ষণ তাহাদের দেখিলাম। মোহনলাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিল, “এদের কবিতা কোন কবি লিখবে?”
মোহনলালকে লইয়া আরও কত আমোদ করিয়াছি! কোন কোন দিন আমাদের নাচে ইত। নাচের উপযুক্ত গান তৈরী করিয়া তখন তাহাতে সুর সংযোগ করিয়া মোহনলালের ভাইদের শিখাইয়া দিতাম। কেহ একটা ঢোলক আনিয়া বাজাইতে বসিত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের নাচ চলিত। এই আসরে নরেন্দ্রনাথ, ব্বতীন্দ্রনাথও মাঝে মাঝে আসিয়া যোগ দিতেন।
দোলের দিনে ওদের বাড়ি খুব আমোদ হইত। একবার দোলের সময় আমি ঠাকুরবাড়ির সবাইকে তামাসা করিয়া একটি কবিগান ব্লচনা করিয়া ছিলাম। বাড়ির ছেলেরা সেই কবিগানের ধুয়া ধরিয়াছিল। ব্বতীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে লিখিয়াছিলাম–
