মা মারা যাবার পর বাবা বললেন, ও ঘটি তোলো। চোর ডাকাতে লুটে নেবে। আমি সব সময় ও ঘটি সামলাতে পারবো না। তারপর আর কখনো সে ঘটিতে জল খাননি।
এখানেই মেয়েদের লেখা স্মৃতিকথার সার্থকতা। এমন ঘরোয়া ছবি, খুঁটিনাটি দেখবার চোখ মেয়েদেরই আছে। পুরুষ বড় প্রাণ, বড় মান, বড় কথার বেসাতি করে; মেয়েরা পায় বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর স্বাদ! ধনীর দুলালের সাদাসিধে জীবন কাঁটানোর সহজ-অভ্যেস আর স্ত্রীর প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা উমার আঁকা অবন ঠাকুরের এই ছোট্ট ছবিতে যতটা ফুটেছে একটা বিরাট প্রবন্ধে তত ভাল ফুটত না। এরপর উমা বসেছিলেন নিজের আত্মকথা লিখতে। শেষ হবার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। বেথুন স্কুলের শতবার্ষিকীতে সেই প্রাইজ পেয়েও পাওয়া মেয়েটিকে প্রাইজ দেবার তোড়জোড় চলছিল বোধহয়। কিন্তু উমারাণীর আর প্রাইজ নেওয়া হল না এবারও।
উমার সঙ্গে তার ছোট বোনেদের কথাও সেরে নেওয়া যাক। করুণার মৃত্যু হয়েছিল অল্প বয়সেই। তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল লেখক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের। দুটি ছোট ছোট ছেলেকে রেখে ওপারে পাড়ি দিলেন করুণা। তাঁর ছোট বোনের নাম সুরূপা। খুব ছোটবেলাতেই ডাকঘরের সুধা মালিনী সেজে তিনি সবার মন কেড়ে নিয়েছিলেন। ডাকঘরের সেই প্রথম অভিনয়ে অমল সেজেছিলেন আশামুকুল। অভিনয় হয়েছিল চমৎকার। সুরূপার মনে আছে অভিনয় হয়েছিল পাঁচ দিন। অভিনয়ের শেষে সবাই দুই শিশু অভিনেতাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন। সুরূপ লিখেছেন, আমাদের কেউ মেডেল দেয়নি কিন্তু সবাই এত আদর করেছিলেন, সে কি বলব। রবিদা তো। খুশি হয়ে আমার বেনে পুতুলের জন্যে একটা চমৎকার সবুজরঙের জরি-পড় দেওয়া সিল্কের রুমালই আমাকে বকশিশ দিলেন। পরে ডাকঘরের কথা উঠলেই কবি দুঃখ করে বলতেন, আমার অমল সুধা বড় হয়ে গেল, আর কে অভিনয় করবে। সুরূপাকে বড় ভালবাসতেন কবি, আদর করে তাকে ডাকতেন মালিনী বলে। দ্বারে কেন নাড়া দিলে ওগো মালিনী বুঝি এই মালিনীর উদ্দেশ্যেই লেখা। বড় হয়ে তিনি একবার হয়েছিলেন নটীর পূজার মালতী। সেও বেশ মজার ঘটনা। আগে থেকে কোন ঠিক ছিল না। রূপা লিখছেন, ও-বাড়ির দালানে নটীর পূজা হবে। শান্তিনিকেতন থেকে মেয়েরা এসেছে, তারা অভিনয় করবে। অভিনয়ের একদিন আগে হঠাৎ মালতী সাজবে যেমেয়েটি তার খুব জ্বর এসে গেল। মহা বিপদ! রবিদাদা তৎক্ষণাৎ দিনুদাদাকে ডেকে হুকুম দিলেন, আমার মালিনীকে নিয়ে এস। ব্যস, দিনুদা বিপুল বপু টেনে ঝড়ের গতিতে পালতোলা নৌকোর মত এ-বাড়িতে এসে আমাকে নিয়ে হাজির করল রবিদাদার সামনে। যত বলি, পারব না এত তাড়াতাড়ি, ছেড়ে দিন আমাকে, অন্য কেউ করুক। কে কার কথা শোনে! করতেই হবে তোকে, নিজে শেখাব। শিখিয়েও ছিলেন কবি যত্ন করে। অভিনয় ভালভাবেই উতরে গেল। অভিনয়ের পর কবি ওপরের বারান্দায় সুরূপাকে ডেকে আদর করে গলায় পরিয়ে দিলেন একটি ফুলের মালা। বললেন, এই তোর প্রাইজ। কিন্তু খুব বেশি অভিনয় করেননি সুরূপা তবে লিখেছেন, মৃত্যুর আগেও লিখতেন মাঝে-সাঝে, কবিতা কিংবা প্রবন্ধ। ছোট ছোট প্রবন্ধ অবনীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ ডাকঘর, সুধার স্মৃতি সাময়িক পত্র-পত্রিকার পাতা খুঁজলে হয়ত চোখে পড়বে। ডাকঘর নাটক সম্বন্ধেও অনেক কথা জানা যায়। একদিন রবীন্দ্রনাথ অবনঠাকুরকে হুকুম করলেন, তোমাদের বাড়ির একটি ছোট মেয়ে জোগাড় করো। তখন ছোটদের দিয়ে অভিনয় করাতে কেউই সাহস করত না। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরাই একটু-আধটু গান করত। রবীন্দ্রনাথ ডাকঘরে দেখালেন ছোটরাও ভাল অভিনয় করতে পারে। বাবার সঙ্গে ভয়ে ভয়ে এলেন সুরূপা, কবির আদেশে পড়লেন ডাকঘর। রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়ে বললেন, অবন একে সুধার ভূমিকায় তৈরি করে, তবে তুমি আবার বেশি শিখিও না। ওকে নিজের মতো করতে দিও। সুরূপা লিখেছেন, বাবা আমাকে সাজাতেন মাথায় উবু ঝুটি, গলায় পুতির মালা, পায়ে মল, পরণে। লাল শাড়ি আঁট করে পর, এক হাতে ফুলের সাজি এক বগলে বেনে পুতুল। সুধার স্মৃতি থেকে জানা যায়, ডাকঘরের অভিনয়ের সময় আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল। ঠিক অভিনয়ের আগে সুরূপা দেখলেন মঞ্চের সামনে চেয়ার-টেবিল পেতে লাট কারমাইকেল ও অন্যান্যদের বসবার জায়গা হয়েছে। টেবিলে ফুলদানীতে বড় বড় লাল গোলাপ সাজিয়ে দিচ্ছেন সমরেন্দ্রনাথ। সঙ্গে সঙ্গে সুরূপা বায়না ধরলেন, একটা লাল গোলাপ দাও, সাজিতে দেব। সমরেন্দ্রনাথও দেবেন না। বলেন, তোর সাজি তো খালি থাকবে, তুই ফুল তুলতে যাচ্ছিস। সুরূপাও নাছোড়বান্দা। রবীন্দ্রনাথ দেখে বললেন, আহা দাও দাও। মালিনীর বাড়িতেও তো বাগান আছে, সেখানকার ফুল ও তুলেছে। ছোটখাট কাজে বাবার মতো সুরূপারও উৎসাহ ছিল। দিদির মত সেলাই-বোনা নিয়ে না থাকলেও তিনি অবন ঠাকুরের দেখাদেখি তৈরি করতেন ঝিনুকের কুটুমকাঁটাম পুতুল কিংবা আরো টুকিটাকি দু-একটা জিনিষ এই আর কি!
হাতে তৈরি খেলনা কিংবা পুতুলের ওপর ঝোঁক ছিল সুনলিনী, পূর্ণিমা ও সুজাতা তিন বোনেরই। সুনন্দিনী গগনেন্দ্রর বড় মেয়ে। প্রভাতনাথের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিল বলতে গেলে জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই। বেশ চঞ্চল আর হাসিখুশি মেয়ে। দুষ্ট মি বুদ্ধিতেও সেরা। দাদাদের পরামর্শে ঘুমন্ত পণ্ডিতমশাইয়ের টিকি কেটে দিলে ঠাকুরমা সৌদামিনী বললেন, অনেক পড়াশুনো হয়েছে, এবার বিয়ে দিয়ে দাও।
