গানের ভিতর দিয়ে আমরা আপনাকেই উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের ব্যথা আনন্দ-বিরহ মিলন এই সকলের সঙ্গেই গানের সুরের অনির্বচনীয়তা মিশ্রিত হয়ে তাদের অসীম সৌন্দর্য দান করে। অন্তরের বাহিরের এই সুরের দেওয়া নেওয়ার ভিতর দিয়েই আমরা বিরোধের মধ্যে ঐক্যকে আর বিচ্ছেদের মধ্যে মিলনকে লাভ করি।
কবির আরো কয়েকজন নাতবৌ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন অমিতা ও অমিয়া ঠাকুর। শ্ৰীমতী কাছে এসেছিলেন বিয়ের অনেক আগে। তবে এরা সবাই এসেছেন বেশ পরে। বরং তার আগে একবার গুণেন্দ্র পরিবারের খোঁজ নিয়ে আসা যাক।
১৪. প্রমোদকুমারী, নিশিবালা ও সুহাসিনী
সৌদামিনীর তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে। ঘরে এসেছেন প্রমোদকুমারী, নিশিবালা ও সুহাসিনী। নাতি-নাতনীদের নিয়ে ভরা সংসার। ছেলের বৌয়ের সাংসারিক কাজে সুনিপুণ। প্রমোদকুমারী, নিশিবালা এবং সুহাসিনীর কথা আমরা খুব বেশি জানতে পারিনি। তারা বাড়ির সনাতন নিয়ম মেনে ঘরকন্নার কাজ নিয়ে থাকতেই ভালবাসতেন। এদের মধ্যে প্রমোদকুমারীর ছিল দুরন্ত সাহস। সবাই তার ওপর নির্ভর করতে পারতেন। পারিবারিক নাট্যানুষ্ঠানে তাদের যোগ দিতে দেখে মনে হয় এদিকে একটু উৎসাহ পেলে তারাও নিজেদের দক্ষতা দেখাতে পারতেন। একবার রত্নাবলী নাটকের অভিনয়ে তারা তিন বোই অংশগ্রহণ করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের দুই ননদ! তবে গান বা নাটক-অভিনয় নিয়ে মেতে না উঠলেও পাঁচ নং বাড়ির পরিবেশটি সব দিক থেকেই মনোরম ও অন্তরঙ্গ করে রেখেছিলেন তিনজনে। অতিথিসেবা, দেবপূজা, ছেলেমেয়েদের মানুষ করা, সংসারের কাজ দেখা সবই করেন তারা। সৌদামিনী বালিশে আধশোয়া হয়ে সব দেখতেন আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেন। তার নাতনীরা ঘর-সংসারের চার দেওয়ালের গণ্ডির মধ্যে থেকেও জীবনকে সুন্দর করে তুলতে শিখেছিলেন। তাই বড় কিছু না করলেও এই পরিবারের মেয়েদের বুকে ছিল তৃপ্তির নিঃশ্বাস, শান্তির স্বাদ। অনেক পৌত্রী সৌদামিনীর। গগনেন্দ্রর তিন মেয়ে সুনন্দিনী, পূণিমা ও সুজাতা; সমরেন্দ্রের পাঁচ মেয়ে মাধবিকা, মালবিকা, কমলা, সুপ্রিয়া ও অণিমা; আর অবনীন্দ্রের তিন মেয়ে উমা, করুণা ও সুরূপা। সবাই সমান গুণের নয় তবে ঘর-সংসারের কাজে সবাই বেশ দক্ষ। তাদের সেলাই শেখাবার জন্যে এলেন এক ব্রাহ্ম মহিলা ইন্দুবালা দেবী। সবার চেয়ে বড় হচ্ছেন উমা। তার চেয়ে কয়েক মাসের ছোট সুনন্দিনী একেবারে পিঠোপিঠি বোন আর কি। এখন আর দুজনের কেউ নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও ছিলেন উমা। ছিয়াশী বছর বয়সে অপটু দেহের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন এক প্রাণচঞ্চল দশ বছরের কিশোরীকে। কিশোরীটির মনে দুঃখ ছিল বেথুন স্কুলে ভাল রেজাল্ট করেও প্রাইজটা আনতে যাওয়া হয়নি বলে। যাওয়া হয়নি বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাই।
ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মতো উমারও নানা ধরনের গুণ ছিল। একবার নাটকের রূপ দিয়েছিলেন বাবার লেখা ক্ষীরের পুতুলকে। ঘরোয়া নাটকে মাঝে মাঝে অভিনয় করা ছাড়াও দুবার তিনি বেশ বড় মাপের অভিনয় করেছিলেন। একবার আলিবাবা নাটকের মর্জিনা আর একবার বিরহের গোলাপী। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন সে নাটক। মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন তার সঙ্গে জাভায় যেতে, যাওয়া হয়নি। বাধা দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, উমা! ও কি পারবে অত ধকল সহ্য করতে? কাজেই যাওয়া হল না।
কলকাতায় বসে বসেই তিনি এই সেদিন পর্যন্ত কাঁপা কাঁপা হাতে বুনে গেছেন সুতোর নকশা, মাকড়সা জালের মতো সূক্ষ্ম আঁকিবুকিতে ফুটে উঠেছে লতা-পাতা-কলকা—সে যুগটাও যেন বাঁধা পড়ে আছে উমারাণীর সুতোর ফাসের বঁধনে। সেলাই ফোঁড়াইয়ে উমার হাত বড় ভাল, তার বোনেরাও কেউ কম যান না। ইন্দুবালা সকলকেই যত্ন করে শেখাতেন। সেকালের মেয়েরা সেলাই-টেলই ভালই শিখতেন, এখনও শেখেন কিন্তু তার সঙ্গে উমার সেলাইয়ের পার্থক্য ছিল। তিনি ছিলেন শিল্পী-পিতার শিল্পী মেয়ে। মেয়ের সীবন-দক্ষতা বাবার মনে উৎসাহ জাগাত। তিনি এঁকে দিতেন নানারকম নকশা, সুতোর রঙের সাথে রঙ মিলিয়ে!
পশ্চিমবঙ্গে কাঁথার চল্ ছিল না, ছিল লেপ, বালাপোষ। পূর্ববঙ্গে ছিল কাঁথর বাহার। ঠাকুরবাড়ির বৌয়েরা আসতেন যশোর থেকে। তাই তারাও জানতেন নকশী কাঁথা সেলাই করতে। অবন ঠাকুর ছিলেন নকশী কাথার সমঝদার। তিনি নানারকম কঁথার নকশা ও ফোড়নের নমুনা সংগ্রহ করে রাখতেন; উমা কাঁথায় তুলতেন সেইসব বয়কা-বাঁশপাতা-তেরসী সেলাই। এখনও সেসব কথা আছে তার ছেলেমেয়েদের কাছে। অনেক রকম নতুন টীচেরও উদ্ভাবক তিনি। তবে এসব তো লিখে রাখেননি তাই ছড়িয়ে পড়েনি দশ জনের মধ্যে। এসময় অনেকেই সেলাইয়ের বই লিখেছেন। তার মধ্যে তুষারমালা দেবীর কাট ছাট বুনন সূচের কাজ, সুশীলা দেবীর আদর্শ সূচী শিল্প, কাননবালা ঘোষের আদর্শ সূচীচিত্র, অপরাজিতা দেবীর সূচীচিত্র শিক্ষা, গায়ত্রী দেবীর সূচীলিখন, যমুনা সেনের সেলাইয়ের নক্শা, সুলেখা দেবীর সূচীরেখা, প্রকৃতি দেবীর চিত্রন, উমা দেবীর কাঠিয়াবাড়ী সেলাই ও কাচের কাজ, মীরা দেবীর সচিত্র উল শিল্প সেলাইয়ের বই হিসেবে স্বতন্ত্র দাবি করে।
বৃদ্ধ বয়সে, হাতে যখন অনেক সময়, ক্ষীণদৃষ্টিতে সেলাই করা যায় না তখন উমারাণী শুরু করলেন স্মৃতিকথা লিখতে। কার কথা লিখবেন? কেন, বাবার কথা! উমার বইয়ের নামও বাবার কথা। অবনীন্দ্রনাথকে এত কাছে থেকে জানবার সুযোগ আর মিলবে না। শেষ বয়সে স্মৃতির আকার দিয়ে আঁকা ছবিগুলো তিনি কারুর কথা ভেবে আঁকেননি। পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হয়েছিল লিখে রাখার কথা। তাহলে লেখার রেললাইন বেয়ে হয়ত পোঁছনো যাবে ছবির ইস্টিশনে। আমার বাবা ছবি আঁকতেন, আমি লিখব পুরনো দেখা ছবির কথা। এর মধ্যে কোন ধারাবাহিকতা নেই, ইতিহাস নেই, এ শুধু এক নিতান্ত ঘরোয়া মেয়ের পিছন ফিরে চাওয়া। তার মধ্যে সবার কথাই আছে, বাবার কথাই বেশি। কোন বিখ্যাত মানুষকে আমরা তার আপনজনের দৃষ্টি দিয়ে যখন দেখি, নতুন করে আবিষ্কার করি। রবীন্দ্রনাথের সংসার, সোনার বোম পরা নিয়ে মৃণালিনীর সঙ্গে মতান্তর, রান্নার এক্সপেরিমেন্ট, বাসর ঘরে গান কিংবা রোগশয্যায় স্ত্রীকে হাওয়া করার মতো ঘটনাগুলো কি কোনো পুরুষের চোখে ধরা পড়ত? ধরা পড়েছিল হেমলতার চোখে। সেই কাকারই ভাইপো অবন। কাকা সোনার বোম পরতে চান না, ওপাল পাথর পরেন দায়ে পড়ে। ভাইপোই বা কম কী? খুঁটিনাটি নিয়ে তারও আপত্তি। ছোট ছোট ছবি এঁকেছেন উমারাণী। একটা কঁসার ঘটিতে জল খেতেন অবনীন্দ্রনাথ। সাবিত্রী ব্রত উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তার স্ত্রী তাকে একটি রূপোর ঘটি করিয়ে দিলেন। কিন্তু বাবা কিছুতেই সে ঘটিতে জল খাবেন না। আমি তাই শুনে তাঁকে বল্লম, মা দুঃখ পাবেন। তুমি কিছুদিন জল খাও, তারপর আবার তুলে রেখে দিও। তখন থেকে সেই ঘটিতে জল খেতে লাগলেন।
