খুব ধুম করে বিয়ে হল। গৌরীদান করলেন গগনেন্দ্রনাথ। বিবাহবাসরে সেলাই করা কাপড় নিয়ে আপত্তি উঠেছিল সেকথা আগেই বলেছি। গগন দেখালেন তিনি মেয়েকে যে ধাঁচে শাড়ি পরিয়েছেন সেটি যেমন আর্টিস্টিক তেমনি সুন্দর। সবারই ধরনটি বেশ পছন্দ হল। মেয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাবে। গগনেন্দ্র আর্টিস্টকে দিয়ে মেয়ের প্রমাণ সাইজের একটা ছবি আঁকালেন—সেই কেতায় শাড়ি পরা, হাতে কাজললতা, অপূর্ব ছবিটি—এখনো আছে সুনন্দিনীর ছেলে দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।
এই বিয়ের পরে বেশ একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। গগনেন্দ্র বড় মেয়েকে দিয়েছেন একসেট হীরের গয়না। তাই নিয়ে মেয়েমহলে এক তর্ক ওঠে। চিরকেলে মেয়েলি তর্ক যেমন হয় আর কি? একদল বললেন, ও হীরে নয়, পোখরাজ। আরেকদল বললেন, না, ও হীরেই। তর্কের মীমাংসার জন্যে ব্যাপারটা অনেকদূর গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত মেয়েদের থামতে হয় বাড়ির কাদের কাছে ধমক খেয়ে। যারা বলেছিলেন পোখরাজ তারা বাজি হেরে একশ টাকার মিষ্টি তত্ত্ব পাঠালেন।
এতটা হবে মেয়েরাও বুঝতে পারেননি। এই সুন্দর গল্পটি উপহার দিয়েছেন সুনন্দিনীর সেজো বোন পূর্ণিমা। কিন্তু তাঁর গ্রন্থে প্রদত্ত বিবরণটি সত্য নয়। এই তর্কের মধ্যে মহর্ষি পরিবারের মেয়েরা ছিলেন না, ছিলেন পাথুরেঘাটার ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা। ব্রাহ্ম বলে মহর্ষি পরিবারের মেয়েরা সেখানে সেদিন নিমন্ত্রিত হননি। কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি এবং তথ্যগত প্রমাদ থাকলেও পূর্ণিমার লেখা ঠাকুরবাড়ির গগন ঠাকুর পাঁচ নম্বর বাড়ির অন্দরমহলের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ। তিনি সবার কথাবার্তা ভাবভঙ্গি এমন কি কণ্ঠস্বরটি পর্যন্ত যেন পৌছে দিয়েছেন ভাবীকালের পাঠকদের কাছে। তার বই পড়ে বোঝা যায় এ সময় বাইরের ঘটনার বর্ণবিচ্ছুরণে অন্তঃপুরের কোণগুলো আর আলোকিত হয়ে উঠছে না। সেখানে তখনো সেই পুরনো চাল, সাবেকী ঢং বজায় আছে। হয়ত মেয়েরা শাড়ির বদলে ফ্রক পরছেন, স্কুলে যাচ্ছেন এইমাত্র। তার বেশি নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কত মেয়ে জেলে গেল, হারিয়ে গেল, কে তার খোঁজ রাখে? কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, প্রীতিলতা ওহদেদারের কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ি—সেই অন্ধকারের বুক চিরে উষার অস্ফুট আভাস ফোঁটানো বাড়ির মেয়েরা এখন যেন অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। কিংবা বলা যায় তারা এখনো ধরে আছেন উনিশ শতকের সোনালি সময়টাকে।
যাক সে কথা, পাঁচ নম্বর বাড়ির মেয়েরা শিখেছিলেন কি করে গাৰ্হস্থ্য জীবনকে সুন্দর করে তুলতে হয়, সরল করে রাখতে হয়। সাধারণ জীবনে এর দামও তো কম নয়। শিল্পীকন্যারা শিখেছিলেন নানারকম হাতের কাজ। বিদেশী পুতুল বর্জন করে দেশী পুতুলকে আদর করতে শেখালেন তারা। সুনন্দিনী কাপড় দিয়ে সুন্দর সুন্দর পুতুল তৈরি করতে পারতেন। একে বলা হত গুড়িয়া পুতুল। তাঁর পানওয়ালী ও সাপুড়ে পুতুল যে দেখেছে সে-ই মুগ্ধ হয়েছে। হিতকারী সভা থেকে সাপুড়ে পুতুলটি পুরস্কৃত হয়, প্রাইজ পেয়েছিলেন ক্যালকাঁটা একজিবিশন থেকেও। ইদানিং হাতের কাজ বিশেষ করে পুতুলটুতুলের খুব আদর, মেয়েদের হাতে তৈরি খেলনা-পুতুল চড়া দরে বিকোয়। অনেক মহিলা কিংবা মহিলা-প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে প্রদর্শনীর আয়োজনও করেন। ঠাকুরবাড়ি থেকেই এসব জিনিষের আদর শুরু। সুনন্দিনী অবশ্য শুধু পুতুলই করতেন না, ভাল অভিনয়ও করতে পারতেন। গানের গলাটিও ছিল চমৎকার। একবার মৃণালিনী নাটকে সেজেছিলেন গিরিজায়া, সবার ভাল লেগেছিল সে অভিনয়। লোককে বোকা বানাতেও তার জুড়ি ছিল না। তার দুব্বোঘাসের চচ্চড়ি খেয়ে যে কত লোক বোকা বনেছেন তার ঠিক নেই। কারুর বাড়িতে জামাই ঠকানোর দরকার হলেই ডাক পড়ত নন্দিনীর। তিনিও কোমর বেঁধে বসে পড়তেন রাধতে। সেও যেন শিল্প-ব্লটিংয়ের রাবড়ি, তুলোর বেগুনি, খড়কুটোর হেঁচকি খেতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির জামাইরা যে কত ঠকেছেন তার ইয়ত্তা নেই।
পূর্ণিমা অনেকটা উমারাণীর মতোই শিল্পী। তার হাতের কাজ বিশেষ করে নকশী কাথাগুলো চোখে না দেখলে ধারণা করা শক্ত। এ ছাড়াও তিনি তৈরি করতেন কাগজের বাড়ি, মেওয়ার পুতুল, ডালের ছবি। সেগুলো কি কাজে লাগত? মেয়ের বিয়েতে তত্ত্ব পাঠানো হত। ঠাকুরবাড়ির তত্ত্ব দেখবার মতো জিনিষ ছিল। একশো-দেড়শেজন লোক যেত। পুরনো ঝিচাকরেরা নিয়ে যেত কলকাতার সব বিখ্যাত খাবার। যশোর থেকে আসত স্পেশাল অর্ডার দেওয়া নারকেল চিড়ে, জিরে-নারকেলের ফুল-মেয়েরা হাতে তৈরি করে চিনিতে পাক করে পাঠাত। এক এক থালা ভরা এক একটা বাতাসা, বড় ঝুড়িতে একটা কদমা। কত রকম ঠাট্টার জিনিষ। এদের সঙ্গেই পাঠানো হত ট্রে ভর্তি মেওয়ার পুতুল, নানারকম ডাল দিয়ে ট্রের ওপরে সাজানো নানারকম ছবি। কাগজের বাড়িগুলোও ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু কালের কবল থেকে তারা কেউ রক্ষা পায়নি। আজ পূর্ণিমাও নেই, শুধু আছে তার লেখা ঠাকুর বাড়ির গগন ঠাকুর। আছে তার অধসমাপ্ত আত্মাহিনীর পাণ্ডুলিপি চাঁদের বুড়ি। নাতিদের ভোলাবার জন্যে লেখা—গগনের মেয়ে পূর্ণিমা, জামাই নিশানাথ, সবাই যেন চন্দ্রলোকের বাসিন্দা। ঘর আলো করা মেয়েটি এসেছিল চন্দ্রলোক থেকে।
অতি বৃদ্ধ বয়সে লেখা ঠাকুরবাড়ির গগন ঠাকুর-এর মধ্যে দু-চারটে ঘটনা হয়ত ঠিকমতো সাজান হয়নি। তবু তথ্যপূর্ণ এবং রসগ্রাহী। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন লেখা জিনিষ নয়। মুখের সামনে বসে কেউ গল্প বলে যাচ্ছে, কানের ভিতর দিয়ে গল্প প্রবেশ করছে মরমে। খবরও আছে অনেকরকম। যেমন ধরা যাক হিতকারী সভার কথা। আত্মীয় পোষণ ছিল সে যুগের ধনীদের দস্তুর। তাই রবীন্দ্রনাথ গগনেন্দ্র ও অন্যান্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করেন যে, সব বাড়ি থেকে কিছু কিছু উঁদা তুলে একটা সাহায্য ফাণ্ড খোলা হবে। হলও তাই। দুঃস্থ ঠাকুররা সাহায্য পেতেন। তহবিলে টাকা তোলার জন্যে বছরে একবার করে হত দানমেলা। বাড়ির মেয়েরা হাতে তৈরি জিনিষ দিত এবং তা বিক্রী করে টাকা জমানো হত। পরে অবশ্য হিতকারী সভা থেকে গগনেন্দ্র সরে দাঁড়ালেন। এই খবরটা আমাদের জানিয়েছেন পূর্ণিমা। গগন ঠাকুরকে এই বইয়ে বড় আপন করে পাওয়া যায়।
